বিশ্বে এখন প্রতি চারজনে একজন মুসলমান
মার্কিন একটি গবেষণা সংস্হার মতে, বর্তমান পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রতি চারজনে একজন মুসলমান। বিষয়টি খ্রিষ্টান বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে। পৃথিবীতে মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছে কেবল তাদের উচ্চ জন্মহারের জন্য নয়। অন্য ধর্মাবলম্বীরা গ্রহণ করছেন ইসলাম। বিশ্বে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ছে ইসলামের আকর্ষণ। এক সময় বলা হতো, ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়েছে তরবারির জোরে। কথাটা অতীতেও খুব সত্য ছিল না। কারণ, বিশ্বের বিরাট সংখ্যক মুসলমানের বাস ইন্দোনেশিয় ও মালয়েশিয়ায় এবং ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে। এসব অঞ্চলে বাইরে থেকে কোনো মুসলমান নৃপতি গিয়ে ইসলাম প্রচার করেননি। তাই বলা চলে না, এসব অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে কোনো রাজশক্তির চাপে। ইসলাম একটি প্রচারশীল ধর্ম, যা নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রচারের মাধ্যমে। বর্তমান বিশ্বে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে নিশ্চয় কোনো রাজশক্তির চাপে নয়। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক আফ্রো-আমেরিকান ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন ইসলাম। তাদের কেউ জোর করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেননি। ইসলাম একটি সরল অনাড়ম্বর এক-ঈশ্বরবাদী ধর্ম। ইসলামে প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে সমবেতভাবে বিশেষ পদ্ধতিতে, যা মানুষকে প্রদান করে বিশেষ শৃঙ্খলাবোধ। ধর্মের একটি লক্ষ্য জীবনকে শৃঙ্খলা প্রদান।
ইসলাম জীবনকে সুশৃঙ্খল করে। আর এই শৃঙ্খলাবোধ তার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধির একটি বিশেষ কারণ। ইসলামে জুয়া খেলা, নেশা করা নিষিদ্ধ। ইসলামে বলা হয়েছে সম্পদের অপচয় না করতে। ইসলাম একটি অজাগতিক ধর্ম নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, ধন কেবল ধনীদের মধ্যে সঞ্চালিত হতে দেয়া যাবে না (সুরা-৫৯ঃ৭)। কোরআন শরীফে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে খেতে দিতে বলা হয়েছে। খেতে দিতে বলা হয়েছে অনাথ শিশুকে, দরিদ্র আত্মীয়কে, পথে পড়া অভাগাজনদের (সুরা ৯ঃ১১,১২)। কোরআন শরীফে একটি কল্যাণব্রতী রাষ্ট্রের ধারণা সম্পৃক্ত হয়ে আছে; আছে একটি মানবিক মুল্যবোধ। আল কোরআনে ভালো-মন্দ বিচারের একটি মানদন্ড প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে-কোনো কিছুর ভালো-মন্দ বিচার করতে হলে দেখতে হবে সেটা কতটা ভালো, কতটা মন্দ। ভালো তাই যার মধ্যে মন্দের তুলনায় ভালোর ভাগ বেশি। কোরআন শরীফে জুয়া খেলাকে মন্দ বলা হয়েছে। কারণ জুয়া খেলায় মানুষের ভালোর চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে অধিক, (সুরা ২ঃ২১৯)। যাকে বলা হয় পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্হা, তাতে শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচা, বিদেশি মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা আসলে জুয়া খেলারই মতো। পুঁজিবাজারের একটি বড় অংশই হয়ে উঠেছে ফটকাবাজারি। যাকে বলা যেতে পারে ইসলামসম্মত নয়। ইসলামে খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রেখে ব্যবসা করা নিষিদ্ধ (হাদিস)। ইসলাম মজুতদারি সমর্থন করে না। ইসলাম শ্রমিককে দিতে বলে শ্রমের ন্যায্যমুল্য। বলে শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকাবার আগেই তার শ্রমের মুল্য পরিশোধ করে দিতে (হাদিস)। ইসলামে বলা হয়েছে, ফুল কেনার আগে খাদ্য কিনতে হবে (হাদিস)।
ইসলামের এসব শিক্ষার একটি বিরাট সামাজিক মুল্য আছে। ইসলামে বলা হয়েছে-মানুষ মর্ত� এবং আকাশের বস্তুগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম (সুরা ৪৫ঃ১২,১৩), যা মানুষের জ্ঞান চর্চার অঙ্কুর। কোরআন শরীফে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রথম মানুষ হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করেন কাদামাটি দিয়ে। তারপর এক সময় তাঁর মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন তাঁর আপন নিঃশ্বাস (সুরা ৩৮ঃ৭২)। এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, আল্লাহ মানুষকে প্রদান করেছেন তাঁর সৃজনী শক্তির অংশ। তাই মানুষের পক্ষে সম্ভব অনেক কিছুর উদ্ভাবন। আর তার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে তার অর্থনৈতিক জীবন গড়ে তোলা। মানুষ প্রানিজগতে অনন্য। মানুষ চিন্তা করে, মানুষ কাজ করে। চিন্তা ও কাজের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে চায় তার নিজের জীবনকে। কোরআন শরীফের ১১৪টি সুরার (অধ্যায়) মধ্যে মাত্র একটি ছাড়া আর সবক�টিতে বলা হয়েছে আল্লাহ করুণাময় এবং ক্ষমাশীল। এসব কথার একটি সাধারণ মানবিক আবেদন আছে মানুষের মনের ওপর। ইসলাম বিশ্বাস করে ইসতিসলাহ নীতিতে। যার গোড়ার কথা হলো মানব কল্যাণই আইনের ভিত্তি। মানব কল্যাণের লক্ষ্যে যে কোনো ক্ষেত্রে কোনো নতুন আইন প্রণয়ন ইসলামের পরিপন্হী নয়; এরকম বলেছেন ইমাম মালিক। ইসলাম স্বৈরশাসন সমর্থন করে না। কোরআন শরীফে বলা হয়েছে, গুরুতর বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে (সুরা-৫২ঃ৩৮)। কোরআন শরীফে আল্লাহকে বলা হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ এবং আল্লাহর রঙে বা গুণাবলিতে মানুষকে রঞ্জিত হতে (সুরা ২ঃ১৩৮)। অর্থাৎ আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া মানব প্রগতি সম্ভব নয়। এদেশে নারীবাদীরা ইসলামের সমালোচনা করতে ব্যস্ত। কিন্তু আরবে এক সময় সম্ভ্রান্ত পরিবারে কন্যাশিশু জন্মানো পরিবারের জন্য কলঙ্কজনক মনে করা হতো এবং কন্যাশিশু জন্মালে মাটিতে পুঁতে মেরে ফেলা হতো। ইসলামে এই প্রথা রদ করা হয় (সুরা ৬ঃ৫৮,৫৯)। ভারতে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল সে দেশে হিন্দু মাতারা গর্ভে কন্যাসন্তান এলে গর্ভমোচন ঘটাচ্ছেন। তারা চাচ্ছেন না কন্যাসন্তান গ্রহণ করতে। কারণ হিন্দু মেয়ের বিয়েতে দিতে হচ্ছে বিরাট যৌতুক।
আমাদের দেশের একজন নারীবাদী লেখিকা (তসলিমা নাসরিন) ভারতকে মনে করেন একটি আদর্শ দেশ। জানি না কেন? ইসলাম একটি প্রচারশীল ধর্ম। এর একটা কারণ, এর মানবিক মুল্যবোধ। যার আবেদন নিষ্প্রভ হওয়ার নয়। ইসলামে মানুষকে মধ্যপন্হী হিসেবে বলা হয়েছে। নিষেধ করা হয়েছে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করতে (সুরা ৪ঃ১৭১)। কোরআন শরীফে বলা হয়েছে-ধর্মের নামে কোনো জবরদস্তি নেই (সুরা ২ঃ২৫৬)। এদিক থেকে বিচার করলে ইসলামকে বলতে হয় একটি ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম। অনেক দেশেরই রাষ্ট্রধর্ম আছে। যেমন বিলাতে রাজা ও রানীকে হতে হয় অ্যাঙলিকান খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী। ব্রিটেনে রোমান ক্যাথলিকরা রাজা বা রানী হওয়ার অধিকারী নন। সুইডেনে রাজা ও রানীকে হতে হয় লুথেরান খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী। বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এখানে প্রেসিডেন্টকে হতে হয় ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। রাষ্ট্রধর্ম করার একটি কারণ হচ্ছে, অন্য ধর্মে বিশ্বাসীরা যাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে না পারে। এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করে চেয়েছেন এ দেশের মুসলমানদের ওপর অন্য কোনো ধর্ম-সম্প্রদায়ের আধিপত্যকে প্রতিহত করতে। আজ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রবর্তনের কথা, যা হতে পারে বাংলাদেশে মুসলমানদের জন্য খুবই ক্ষতির কারণ। ধর্ম নানা দেশের ইতিহাসে পালন করেছে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা, যা মনে রাখারই মতো। কেবল বাংলাদেশেই যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তা নয়। আমাদের বাড়ির কাছের রাষ্ট্র মালয়েশিয়ারও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এক্ষেত্রে তাই বাংলাদেশকে কোনোভাবেই নজিরবিহীন বলা যায় না।
আওয়ামী লীগ ঠিক কী করতে চাচ্ছে, আমাদের কাছে তা স্বচ্ছ নয়। তবে মনে হচ্ছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে এ দেশের মুসলমান জনসমাজের স্বার্থ আবার বিপন্ন হতেই যাচ্ছে। সারা বিশ্বে ইসলাম আবার এখন নতুন করে হয়ে উঠেছে একটি রাজনৈতিক শক্তি। সেটাও রাখতে হবে আমাদের বিবেচনায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম গৃহীত হওয়ার ফলে মুসলিম উম্মায় বাংলাদেশের ভাবমুর্তি অনেক ভাস্বর হতে পেরেছে। আজকের বাংলাদেশ বাংলাভাষী মুসলমানের সংগ্রামের ফল। তাদের আবেগকে ক্ষুব্ধ করে আওয়ামী লীগ দ্রুত গণবিচ্ছিন্ন হওয়ার পথেই এগোচ্ছে। বিদেশি শক্তির তাঁবেদারি করে সে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারবে এমন ভাবার কারণ নেই। ১৯৭১-এর কথা মনে পড়ে; এ সময় কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ওঠায়নি। শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে যোগ দিতে যান ইসলামী মহাসম্মেলনে। শেখ মুজিব তার মেয়ের মতো অতটা সেক্যুলারিষ্ট ছিলেন বলে মনে হয় না। (সুত্র, আমার দেশ, ১৪/১০/২০০৯)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



