স্কুলগামী ছাত্রীদের উপর বখাটেদের নির্যাতনের মাত্রা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন সবচেয়ে বেশি। বখাটেদের অত্যাচারে আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজে শিরোনাম হয়ে চলেছে। গত সাত বছরে বখাটেদের উত্ত্যক্ত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৪ হাজার ১২০ জন নারী। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ক্রটির কারণেই ঘটনাগুলি ঘটছে এতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও বর্তমান সরকার মেয়েদের স্কুলগুলোর সামনে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তাদের সহযোগিতা নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি ফোনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তবে তাতে কতটুকু ফল পাওয়া যাবে সেটা প্রশ্নের দাবি রাখে। স্কুলগুলোর অবস্থান ও বখাটেদের বসবাস কোনো না কোনো স্থানীয় ইউনিটে অর্থাৎ ইউনিয়নে কিংবা পৌরসভায় কিংবা নগর কর্পোরেশনে রয়েছে, সেজন্য গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী স্বাধীন ইউনিয়ন আদালত ও নগর আদালত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সে সঙ্গে ?এমপো? অনুযায়ী সমমর্যাদায় ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নর-নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নও খুবই প্রয়োজন।
গত ৪ এপ্রিল প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ঢাকার ইলোরার আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। রেজাউল নামের এক বখাটের অত্যাচারে ইলোরার পুরো পরিবারই ভীত-স?্র?স্ত ছিল। অল্প কয়েকদিন আগে শ্যামলীতে নবম শ্রেণীর ছাত্রী নাশফিয়া আখন্দ পিংকি একই ভাবে বখাটের অত্যাচারে গলায় ফাঁস দিয়ে আত?হত্যা করে। এর আগে সিমি ও তৃষা নামে দু?জন একই কারণে আত্মহত্যাা করে। সম্প্রতি ঈশ্বরদীতে একই দিনে বৃষ্টি ও ফাহিমা নামে দু?জন স্কুলছাত্রীও আত্মহত্যা করে একই কারণে। এভাবে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে এমন খবর আমরা প্রতিদিন পত্রিকায় পাতায় দেখছি। যারা আত্মহত্যা করছে তাদের খবর হয়তো পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এরকম হাজারো মেয়ে এবং তাদের পরিবার বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে, তাদের খবর কি আমরা জানি? একবিংশ শতাব্দিতে বিজ্ঞান যেখানে জয়-জয়কার, সভ্যতা যেখানে উচ্চ পর্যায়ের বলে দাবী করা হচ্ছে এবং উচ্চ-স্বরে মানবতার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে স্কুলগামী কিশোরীরা নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সামাজিক রীতি-নীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা নারীকে শুধু বঞ্চিতই করছে, সেই বিষয়টিও আত্মহত্যার মধ্যে দিয়ে ইলোরারা আমাদের চোখে আঙ্গুঁল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়েটিক না খাওয়ায়ে শুধু ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে শরীরের সব দুষ্ট ব্যাকটেরিয়া যেমন ধ্বংস করা যায় না, তেমনি সাদা পোশাকের পুলিশ নিয়োজিত করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাছাড়া কত স্কুলে কত পুলিশ নিয়োজিত করবে সরকার, স্কুল থেকে ফেরার রাস্তাও কি পুলিশ দিয়ে ঘিরে রাখা সম্ভব হবে? এই মুহুর্তেই আমাদের অনুসন্ধান করে কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ মেয়েই বখাটেদের দ্বারা লাঞ্চিত হওয়ার পর তাকে নিজ পরিবারের সদস্যরাও গাল-মন্দ করেছে। ইলোরার বাবা ইলোরার প্রতি রাগ করেছিল তা পত্রিকাগুলোই বলছে।
পাবনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষের নেতৃত্বে একটি দল ঈশ্বরদীর ফাহিমার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছেন, বখাটেদের অত্যাচারের পর ফাহিমার বাবাও ফাহিমার প্রতি রাগ করছিল। হারুন নামের এক বখাটে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে স্কুলের রাস্তায় রুম্পাকে উত্ত্যক্ত করার পর বিষয়টি বাসায় জানালে রুম্পার মা চুলের মুঠি ধরে রুম্পাকেই মারধর করে। হারুনের ভয়ে রুম্পা স্কুলে যেতে না চাইলে তার বাবা বাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। সুতরাং একটি বিষয় গবেষণার দাবী রাখে- যে পিতা-মাতা তাঁর কন্যাকে কলিজার টুকরার মত মনে করে, সেই পিতা-মাতাই কেন নিরপরাধ মেয়েকে দোষী সাব্যস্ত করে গালমন্দ করছে? অত্যাচারির বিপদে শক্তভাবে অবস্থান নেওয়া মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট হওয়া উচিত। আমার মনে হয়, মেয়েগুলো নিজেদের অসহায় মনে করছে এবং তাদের পরিবারও এ বিষয়ে তাদের পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে অসহযোগীতা করছে নিরাপত্তাহীনতার কারণেই। ফলে তাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। কোনো পুত্র সনতান যদি কারো দ্বারা অত্যাচার- নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরে ফেরে তখন কিন্তু তার অভিভাবক ঠিকই হৈ চৈ বাধিয়ে ফেলে কিন্তু কন্যা সনতানের বেলায় এর উল্টো ঘটে। কাজেই বিষয়টির শিকড় অনেক গভীরে এবং সমাধান করতে হলে গভীর থেকেই শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। তা না হলে বখাটেপনা দিন দিন বেড়েই চলবে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশটা বখাটেদের রাম-রাজত্ব হয়ে যাবে।
আমার পরিচিত একজন একটি গালর্স হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার অপরাধে একজন বখাটেকে আটকিয়ে রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, একজন পৌর কাউন্সিলর ওই বখাটেকে ছাড়িয়ে নেন। অথচ কাউন্সিলর কর্তৃক বখাটেদের আটক করার ব্যবস্থা নেয়ার কথা। সেজন্য স্থানীয় সরকারের প্রতিটি ইউনিটে পৃথক আদালত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার গবেষক ও সিডিএলজি নির্বাহী পরিচালক আবু তালেব প্রণীত ?গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা? শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তিনি স্থানীয় সরকারের ৫হাজার ৩শ ৬৫টি ইউনিটে পৃথক আদালত ব্যবস্থা চেয়েছেন। অর্থাৎ ইউনিয়ন সরকারে ?ই্উনিয়ন আদালত,? উপজেলা সরকারে ?উপজেলা আদালত,? জেলা সরকারে ?জেলা আদালত,? বিভাগীয় সরকারে ?বিভগীয় আদালত,? এবং নগর সরকারে ( অর্থাৎ ৩০৯টি পৌরসভায় ও ৬টি নগর কর্পোরেশনে) ?নগর আদালত? বাস্তবায়ন চেয়েছেন ( উল্লেখ্য বর্তমানে স্থানীয় ইউনিটগুলো প্রশাসনিক ইউনিট/এজেন্ট হওয়ায় সেখানে পৃথক আদালত ব্যবস্থা নেই। একই কারণে ওসব আদালত প্রশাসনিক কাজের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। ফলে বিদ্যমান গ্রাম আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা খুবই কম)। তাছাড়া তিনি সমমর্যাদায় ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারে নর-নারীর গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন চেয়েছেন। সে লক্ষে মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) অনুযায়ী ১১ দফা সুপারিশ উপস্থাপিত করেছেন।
এই ১১ দফা সুপারিশ হল: ১) জাতীয় সংসদের প্রতিটি নির্বাচনী আসনে একজন মহিলা জাতীয় সাংসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সাংসদ নির্বাচিত করতে হবে; ২) জাতীয় সংসদে একজ মহিলা ডেপুটি স্পীকার ও একজন পুরুষ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে; ৩) ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর/মেম্বার ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর/মেম্বার নির্বাচিত করতে হবে; ৪) ইউনিয়নে একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন পুরষ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে হবে; ৫) পৌরসভা ও নগর কর্পোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে একজন মহিলা কাউন্সিলর ও একজন পুরুষ কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে হবে; ৬) পৌরসভা ও নগর কর্পোরেশনে একজন মহিলা ডেপুটি মেয়র ও একজন পুরুষ ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত করতে হবে; ৭) উপজেলায় মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পাট ওয়ান (এমপো) অনুযায়ী নির্বাচিত একজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে; ৮) উপজেলা সংসদ, জেলা সংসদ ও বিভাগীয় সংসদ এর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা হতে একজন মহিলা সদস্য ও একজন পুরুষ সদস্য নির্বাচিত করতে হবে; ৯) জেলায় ও বিভাগে একজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে; ১০) জাতীয় সভা গঠনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক জেলা হতে একজন মহিলা জাতীয় সভাসদ ও একজন পুরুষ জাতীয় সভাসদ নির্বাচিত করতে হবে এবং ১১) মিলেনিয়াম প্রোপাজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) এর আলোকে অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে নারী-পুরুষের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে।
গবেষকরা বলেছেন, এদেশের মানুষেরা ক্ষমাশীল ও আবেগ প্রবণ। হাজার বছর যাবৎ শহর-গ্রামে একধরনের সালিশি বৈঠকের রেওয়াজ রয়েছে। আমরা যদি সামাজিক বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করতে চাই এবং নারী-পুরুষকে একে অপরের পরিপূরক করে ?গণস্বপ্ন ২০২০? অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে ?একটি উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ? গঠন করতে চাই, তা করতে হলে কেন্ত্রীয় ও স্থানীয় সরকারগুলোতে পৃথক আদালত ব্যবস্থা বাস্তবায়নসহ ১০০-১০০ প্রতিনিধিত্বে জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
লেখকঃ মিলন আহমেদ প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

