(১ম পর্ব)
তাবিজ সম্পর্কে হরেক রকমের বই পুস্তক বাজারে রয়েছে। ঐ সব বইয়ে তাবিজের স্বপক্ষে কোন সমর্থনযোগ্য বর্ণনা নেই। অথচ অনেক কিচ্ছা কাহিনীসহ অসংখ্য তাবিজের বর্ণনা ও ফাযায়েলে ভরপুর। ঐ সব বই পড়ে যে কোন মানুষ বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, রোগ, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভের আশায় তাবিজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হয়। তাবিজের ব্যবহার আজ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে।
প্রখ্যাত গবেষক ড: আলী আল-উলাইয়ানী তাঁর 'আকীদার মানদণ্ডে তাবিজ' নামক পুস্তিকায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টি ভঙ্গিতে তাবিজের গ্রহণযোগ্যতা পর্যালোচনা করেছেন। তাবিজ ব্যবহার শরীয়ত সম্মত কিনা- এর পক্ষের ও বিপক্ষের দলীলসমূহ তিনি কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। এতে তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য পেশ করার পর এটা প্রমাণ করেছেন, তাবিজের যে রেওয়াজ বর্তমানে প্রচলিত আছে তার অধিকাংশই সহীহ আকীদার পরিপন্থী এবং সরলপ্রাণ মুসলিমদেরকে তাদের অজ্ঞতার সুযোগে ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ তথা বাঁচা-মরার অবলম্বন হিসাবে বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে এবং এর ফলে তারা নিজেদের অজান্তে বিদ'আত ও শিরকের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর, যদি মুমিন হয়ে থাক। (সুরা মায়িদা: ২৩ আয়াত)।
রাসূল সা. বলেছেন: যে তাবিজ ব্যবহার করবে, আল্লাহ তাকে পূর্ণতা দেবেন না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে শিরক থেকে মুক্ত রাখুন এবং তাঁর ক্রোধ ও জাহান্নামের আগুন থেকে হিফাযত করুন, আমাদের যাবতীয় প্রয়োজনে তাঁর সাহায্য কামনা করার ও মুছীবতের সময় একমাত্র তাঁর উপর নির্ভর করার যে নির্দেশনা কুরআন মাজীদ ও রাসূল (সাঃ) সুন্নাহর মধ্যে রেখেছেন তা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার তাওফীক তিনি আমাদের সবাইকে দান করুন।
আরবীতে ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ কবজকে রুকিয়া বলা হয়।
ঝাড়-ফুঁক দু'ভাগে বিভক্ত:
প্রথম ভাগ: যে ঝাড়-ফুঁকে শিরকের লেশ মাত্র থাকে না, তা এমন যে, রোগীর উপর কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করা হয়। অথবা আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণাবলী নামসমূহ দ্বারা রোগ মুক্তি চাওয়া হয়, এমন ঝাড়-ফুঁক জায়েয। কারণ রাসূল (সাঃ) ঝাড়-ফুঁক দিয়েছেন ও তিনি ঝাড়-ফুঁক সমর্থন করেছেন। এ ব্যাপারে আওফ বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা জাহিলিয়াতের যুগে ঝাড়-ফুঁক করতাম, তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন: তোমরা আমার নিকট তোমাদের ঝাড়-ফুঁকের কালামগুলি পেশ কর। শিরক না হলে তো ঝাড়-ফুঁকে কোন দোষ নেই। (মুসলিম)
আল্লামা সুয়ূতী (রহঃ) বলেন: তিনটি শর্তে ঝাড়-ফুঁক জায়েয হওয়ার ব্যাপারে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন। তা হলো:
১. ঝাড়-ফুঁক কুরআন ও আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণাবলী নামসমূহ দ্বারা হতে হবে।
২. আরবী ভাষায় হতে হবে, যার অর্থ বুঝা যায়।
৩. এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, ঝাড়-ফুঁকের নিজস্ব কোন প্রভাব নেই বরং আরোগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। ( ফাতহুল মাজিদ পৃষ্ঠা ১৩৫)
ঝাড়-ফুঁকের পদ্ধতি:
রোগীর উপর কুরআনের কোন আয়াত অথবা আল্লাহর গুণাবলী নামসমূহ পড়ে ঝাড়-ফুঁক দেওয়া। অথবা পানিতে ফুঁক দিয়ে তা অসুস্থ ব্যক্তিকে পান করানো। হাদীসে সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে: রাসূল (সাঃ) “বুতহান” নামক স্থান হতে মাটি নিয়ে আসেন, অত:পর তা বড় পেয়ালায় রাখেন, তারপর তিনি তাতে পানি দিয়ে ফুঁক দেন, এবং তা তাঁর শরীরে ঢেলে দেন। (আবু দাউদ)
বহু সংখক সহীহ হাদীসে উল্লেখ আছে , রাসূল (সাঃ) নিজে প্রতি রাতে শোবার সময় বা অসুস্থ হয়ে পড়লে সূরা নাস ও ফালাক তিন বার পড়ে নিজের দু'হাতে ফুঁ দিয়ে মাথা হতে পা পর্যন্ত পুরো শরীরে ফিরিয়ে দিতেন, যতদূর তাঁর হাত পৌঁছিত।
সর্বশেষ রোগে তিনি যখন এরূপ করতে পারছিলেন না, তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) -এর নির্দেশে এ সূরা দু'টি পড়ে বরকতের আশায় তাঁরই হাত দ্বারা শরীরে ফিরিয়ে দিয়ে ছিলেন। এ সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ও আবু দাউদ গ্রন্থে আয়েশা (রাঃ) হতে নির্ভরযোগ্য সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে।
তাবরানী 'সগীর' গ্রন্থে হযরত আলীর (রাঃ) বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (সাঃ) নামাজ পড়ার সময় এক বিচ্ছু তাঁকে দংশন করে। পরে তিনি পানি ও লবন ক্ষতস্থানে লাগাতে লাগাতে সূরা কাফেরূন ও সূরা ইখলাস পড়তে লাগলেন। মুসলিম শরীফে আবু সাঈদ খুদরীর (রাঃ) বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সাঃ) একবার অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন জিবরাঈল (আঃ) এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি কি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন? রাসূল (সাঃ) বললেন হাঁ, জিবরাঈল (আঃ) বললেন, আমি আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ছি এমন সব জিনিস হতে যা আপনাকে পীড়া দেয়। এবং প্রত্যেক নফ্স ও হিংসুকের অনিষ্ট হতে। আল্লাহ আপনাকে নিরাময় করুক। আমি তাঁর নামে আপনাকে ঝাড়ছি। (মুসলিম)
রাসূল (সাঃ) ঔষধ ব্যবহার ও রোগের চিকিৎসা করতে কখনো নিষেধ করেন নি। বরং তিনি বলেছেন; আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রোগের ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তোমরা ঔষধ ব্যবহার কর। কিন্তু আসল কথা হলো: ঔষধ উপকার করে আল্লাহর অনুমতিতে ও তাঁর হুকুমে। তবে ঔষধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ থাকলে তা প্রয়োগ না করে শুধু ঝাড়-ফুঁকের উপর নির্ভর করা, তাকেই যথেষ্ট মনে করা ঠিক নয়। কারণ এ সুযোগে কিছু লোকের তাবিজের দোকান খুলে বসা ও তাকেই উপার্জনের উপায়রূপে গ্রহণ করা কখনো শোভনীয় বা উচিত হতে পারে না।
দ্বিতীয় ভাগ: যে ঝাড়-ফুঁক শিরক যুক্ত তা হারাম। যে ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্যের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। যথা- জ্বিনদের, ফেরেশ্তাগণের, নবীগণের এবং নেক লোকদের নাম উচ্চারণ করে ঝাড়-ফুঁক করা হয় তা হারাম, না জায়েয।
অথবা: ঝাড়-ফুঁক আরবী ভাষায় নয়, কিংবা এমন ভাষা যা বুঝা যায় না, এ ধরনের ঝাড়-ফুঁক হারাম।
অথবা: কুরআনের কিছু আয়াত লিখে বা আল্লাহর কোন গুণবাচক নাম লিখে তা দ্বারা আরোগ্যের উদ্দেশ্যে গলায় বা শরীরে ঝুলানো হয় যা আরবীতে তোয়ালা বলা হয়।
এ ব্যাপারে সালফে সালেহীনদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ এর অনুমতি দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এর অনুমতি দেন নি, বরং শরীয়ত কর্তৃক নিষেধ বলে গণ্য করেছেন।
আর যারা কুরআনের কিছু আয়াত তাবিজ-কবজ ধারণ করার পক্ষে অভিমত পেশ করেছেন, তাদের মধ্যে হলেন; আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)। তিনি এই মর্মে আয়েশা (রাঃ) হতে স্পষ্টভাবে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ মতের সাথে একমত পোষণ করেছেন আবু জাফর আল- বাকের ।
অপর পক্ষে অধিকাংশ সাহাবায়েকেরামদের মতে কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাবিজ ব্যবহার করা জায়েয নয়। এ মতের সাথে একমত হয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) , ইবনে আব্বাস, হুযায়ফা, উকবা বিন আমের, এবং ইবনুল আকীম প্রমুখ। আর তাদের এ মতের সাথে তাবেঈনদের একটি জামা'আত একমত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, ইবনে মাসউদের সহচরবৃন্দ, আহমদ বিন হাম্বল ও তার অনুসারীরা।
পরবর্তী মনিষীরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসকে দলিল হিসেবে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন; আমি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ এবং ভালবাসা সৃষ্টির তাবিজ ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। (আহমদ আবু দাউদ ইবনে মাজাহ তিরমিযী)
উল্লেখিত হাদীসে এমন তাবিজ-কবজ যদ্বারা স্ত্রীর অন্তরে স্বামীর ভালবাসা এবং স্বামীর অন্তরে স্ত্রীর ভালবাসার উদ্রেক হয়। হাদীসের আলোকে তা হারাম।
হাদীসের এই মতটি তিন কারণে সঠিক:
(ক) উল্লেখিত হাদীসটিতে ঝাড়-ফুঁক এবং তাবিজ-কবজের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে ব্যাপকতা বিদ্যমান, এবং এ হাদীসের বিপরীতে কোন দলিল আসেনি।
(খ) অবৈধ তাবিজ চালু হওয়ার পথ বন্ধ করা, কেননা যদি কুরআনের দ্বারা তাবিজ-কবজ ঝুলানোর অনুমতি দেয়া হয়, তবে এর ফলে কুরআন ছাড়াও অবৈধ তাবিজের প্রচলন ঘটবে।
(গ) কুরআন তাবিজ মাদুলিতে বা ঠোলে ভরে ঝুলানো হলে কুরআনকে অবমাননা ও কুরআন নিয়ে খেল-তামাশা করা হয়। কারণ এতে ধারণকারী ব্যক্তি পায়খানা প্রশ্রাব করার সময় ময়লা নোংরা ও অপবিত্র স্থানে নিয়ে যায়, যে সকল স্থান থেকে কুরআনকে পবিত্র রাখা অপরিহার্য। (ফাতহুল মাজিদ পৃষ্ঠা ১৩৫) (চলবে.....)
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।