প্রবাসে নোঙর ফেলে জীবন যেমন চলে
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
সুমহান মহিয়ান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জাত ওয়াল জালালের পবিত্র শাহী দরবারে অফুরান নিয়ামতের শুকর করছি। আলহামদুলিল্লাহ। প্রবাসী সকল ভাইয়েরা আজ হায়াতের প্রতিটি সেকেন্ড অতিবাহিত করছেন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সকল নিকট আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে ভিন দেশে নোঙ্গর ফেলেছে জীবনতরী রুটি-রুজী রোজগারের আশায়। মহান মনিব আল্লাহর অফুরন্ত কৃপায় হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখে দিন কেটে যাচ্ছে বহমান প্রবাসী জীবন।
পেছন ফিরে আমরা তাকায়ে দু’একটি লাইন ইতিহাসের পাতা স্মরণ করছি। রাসূলের শাসনামল খোলাফায়ে রাশেদীনের কালে স্পেনের মুসলিম সভ্যতা, ওসমানীয়া খেলাফত, পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বনামধন্য মুসলিম শাসক, মুসলিম জাহান, বিশ্ব মুসলিম জাহান, অর্ধ পৃথিবী শাসন করছেন ধুলার তখতে বসি, আগের মত বেশী বেশী ওয়াজ-মাহফিল, ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুনিক নসিহত, এই সব কিছু মুসলমানদের বীরত্ব গাঁথা আর শ্রেষ্ঠত্বেরই ইতিহাস। একবিংশ্ব শতাব্দী সূচনা লগ্নে মুসলমানদের অবস্থা চিন্তা করলে হায়রে কি বিভৎস চিত্র। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন;
নাই কোহিনূর ময়ুর তখত
নাই সে বাহিনী বিশ্বজয়ী
গঙ্গা, সিন্ধু নর্দমা কাবেরী যমুনা ঐ
বহিয়া চলেছে আগের মতন কৈরে আগের মানুষ কৈ?
মৌন স্তব্ধ সেই হিমালয়
তেমন অটল মহিমাময়...
সেই আগ্রা, সেই দিল্লী ভাই
পড়িয়া আছে সেই বাদশা নাই
কৈরে আগের মানুষ কৈ.....
প্রবাসেই জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। আর এ ব্যতিক্রম ঘটলে নির্মম দুর্ভোগ। আমরা বাংলাদেশী বেশির ভাগ ভাইয়েরা ৪র্থ শ্রেণীর কাজে নিয়োজিত। যা অত্যন্ত কায়িক পরিশ্রমের কাজ। দৈনন্দিন কাজের সূচী হচ্ছে এই রকম-
প্রথমত: বৃহৎ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান/ কোম্পানীগুলোতে ভোর ৪.৩০ / ৫.০০টা থেকে ডিউটি আরম্ভ হয়ে বিকাল ৫/৬ টা পর্যন্ত চলে। এরপর ছুটি আবার কোন প্রতিষ্ঠানের ওভারটাইম বাধ্যতামূলক করতে হয়।
দ্বিতীয়ত: বৃহৎ/ক্ষুদ্র বেসরকারী কিছু কিছু কোম্পানী বা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ১১ ঘন্টা, ১২ ঘন্টা, ১৪ ঘন্টা পর্যন্ত ডিউটি। যেন একেবারে মানুষটিকে কিনে ফেললো। দাম আর কাকে বলে? “শ্রমিকের শ্রম আইন” কি ডিপ ফ্রিজে রাখা কাগজের বস্তা?
বেতন কাঠামো :
পর্যালোচনা করলে এতে মারাত্মক রকমের বৈষম্য মূলক আচরণ পরিলখ্যিত হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশীরা এর শিকার। আমার জানা নাই মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে সঠিক বেতনকাঠামোর ভিত্তিতে বেতন দেয়া হচ্ছে কিনা? তবে কুয়েতে আন স্কিলড লেবার সর্বনিম্ন ৪০ দিনার মজুরী পাবেন।
আবাস স্থল :
থাকার ক্যাম্পসমূহের অবস্থা এই যে, আমাদের দেশের চিড়িয়া খানা থেকেও নোংরা, তথাপি খারাপ অবস্থা। একটি ১০' *১০' রুমে /১০' * ৮' রুমে যথাক্রমে- ৮,১০ ও ১২ জন লোক থাকেন। এতে করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন নিরীহ বাংলাদেশীরা। নিদারুণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিন অতিবাহিত করছেন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ এই যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহের এই ব্যাপারে কোন ভূমিকা নেই? অথচ বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবাসী ভাইদের পাঠানোর ফলে মাশাল্লাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। বিদেশে এসে কতই না কষ্টকর জীবন যাপন করছেন। কেউ কি নেই তাদের অভিভাবক? সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিদের নিকট জিজ্ঞাসা? অনুগ্রহ করে পূর্ণ দরদ দিয়ে ধৈর্যের সাথে সাহায্য সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। দায়িত্বে থেকে দায়িত্বহীনতার জন্য রোজ কিয়ামতে আল্লাহর আদালতে অবশ্যই এর জবাবদিহি করতে হবে।
প্রবাসী ভাইদের সার্বিক কল্যাণে আসতে পারে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা দূতাবাসের বরাবরে কিছু প্রস্তাবনা ও অনুরোধ-
ক. প্রবাসে কোন কর্মী ভিসা পাওয়ার পর সে বিদেশে পৌঁছে এবং স্বীয় কর্মে যোগ দেয়। সে দেশের কাজের ওয়ার্ক পারমিট/ লেবার কার্ড, হেলথ কার্ড যাবতীয় কর্ম সম্পাদনের বিশেষ করে লেবার চুক্তি নামা ফাইলে স্বাক্ষরের প্রাক্কালে উভয় পক্ষের (দূতাবাসের) প্রতিনিধির উপস্থিত থাকার বিশেষ অনুরোধ। নিয়োগ পাওয়ার পূর্বে যাবতীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা করা। কর্মী সরকারি ভাবে কিংবা বেসরকারিভাবে আসুক এ-ব্যাপারে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
খ. বিভিন্ন লেবার ক্যাম্প পরিদর্শন করুন।
গ. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন প্রবাসে আছেন এ ধরনের সৎ যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজে লাগালে উপযুক্ত সফলতা আসবে।
ঘ. বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সেই দেশের ভাতা, কৃষ্টি-পরিবেশ, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ব পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে চাকুরীর যাবতীয় চাহিদা, ইত্যাদি জরিপ পরিচালনার আবেদন রাখছি। এতে করে চাকরীর বাজার সৃষ্টি হবে।
ঙ. দক্ষ জনশক্তি তৈরীর নিমিত্তে শ্রম বাজারের উপর চাহিদা রেখে বিভিন্ন ভাষার বই সি.ডিকে ভাষান্তরের মাধ্যমে প্রকাশনার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন ইসলামী সংস্থা, বাংলাদেশ কমিউনিটি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাখাগুলো থেকে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। এতে করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স আরো বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
প্রবাস জীবনতরী নানা দুঃখ কষ্টের বাঁকে বাঁকে, নির্বাক মৌন স্তব্ধতায় কঠিন সংগ্রামে বহমান। লাখ লাখ টাকা খরচ করে কর্জ্জের বোঝা মাথায় নিয়ে সোনালী স্বপ্নের হাতছানিতে প্রবাসে পাড়ি জমায়। ভাবনাটা নিষ্পাপ আর তাইতো ভাবে কাড়িকাড়ি পেট্রো ডলারের অর্থ কামাবে। কিন্তু এখানে বড়ই নির্মমতা। প্রথমত: দুই/ আড়াই লাখ টাকার কর্জ্জের বোঝা বছরকে বছর টানতে টানতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। কারণ অল্প বেতন, জীবন যাত্রার খরচ অনেক বেশী। দ্বিতীয়ত : যেই কাজের ভিসা সেই কাজ নেই, মাসকে মাস বসে আছেন অনেক অখ্যাত কোম্পানীতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এদের আসল রহস্য খুবই খারাপ। ইত্যাদি দুঃখ কষ্টে প্রবাসের মানুষ দিন কাটাচ্ছে।
তৃতীয়ত : ভিসার দালালী আরেক মহামারি! একটি ভিসার পিছনে ১ হতে ৪ জন দালাল সাজেন। এর সাথে দালালচক্র সব সময় সক্রিয় থাকে। একজন সামান্য লেবার তাঁর হাতে পৌছা পর্যন্ত একটি ভিসার দর উঠে ২,২০,০০০/= হতে ৩,০০,০০০/= টাকা পর্যন্ত। এই সব শিক্ষিত ভদ্র দালালদের ভিসার দালালী বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি।
চতুর্থত: পতিতা বৃত্তি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কিছু দেশে নায়াগ্রার জলপ্রপ্রাতের স্রোত ধারার মত পাপের প্রতিযোগিতা চলছে- শুনা যায় পতিতার আবার লাইসেন্স ও আছে নাকি। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ। আজ আরব জাহানের কি অবাক করা বেহায়াপনা চিত্র। শয়তানও আশ্চার্য হয় এগুলো আমার থেকেও বড় শয়তান। এই সব অসংখ্য অনৈতিক কাজে আমরা বাংলাদেশীরা কম এগিয়ে নেই। অসংখ্যা বাংলাদেশী যেনাকার পুরুষ মহিলা উভয় জড়িত।
আরব শাসকদের বোধোদয় কি হবে না। বেহায়পনা, অনৈতিক কার্যকলাপ রোধকল্পে বলিষ্ট ভূমিকা রাখার আবেদন জানাই। পাশাপাশি ইসলামী সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গদেরকে, পাপে নিমজ্জিত এই লোকদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমবেত প্রচেষ্টায় আহবান জানাই।
শেষ করছি এই বলে, আমাদের মাঝে আজ ইসলামী লেন-দেন, চলা-ফেরা, আচার-ব্যবহার, ইসলামী জীবন-যাপন সব কিছুই যেন শূন্যের কোঠায় ঠেকে গেছে। প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণ সাধনে সবাইকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার সংকল্প করি। আর প্রতিটি জীবত আত্মা হায়াত নামের হায়াতের কক্ষপথ থেকে যে হায়াত ছিটকে পড়েছে দুর্গন্ধ, পুঁতিময় নিলিপ্ত আবর্জনায়.....
“আল্লাহু আকবর ধ্বনি, দুর করে মনের পেরেশানী
আল্লাহ পাকের তাসবীহ যপে যপ মালায় ভূবন চারিধার
যে কন্ঠে ঝরে স্রষ্টার অমিয় বাণী
এই কামনা, মেনে চলুক মানবকুল
তবেই তো নসিব হবে সীরাতুল মুস্তাকিম
জান্নাতের পথে স্বর্গীয় সুধা পানে...।
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।