তেমনিই একটি ঘটনা: ১৯৯৮ সালে আমি সাভার সেনানিবাসে কর্মরত ছিলাম। সেই সময় পিছনের ক’এক বছরে দেশের আইন শৃঙ্খলা এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিলো যে, কোন ক্রমেই আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে আসছিলো না। আর সেটা না আসারই কথা, কারণ যাদেরকে সন্ত্রাস দমন করে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে আনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো সেই লোভী, স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতক বেঈমানরাই সন্ত্রাসীদের কাছে ঘুষ নিয়ে সন্ত্রাসের কাজে সহযোগিতা করছিলো। এমন পরিস্থিতিতে রক্ষকরাই যখন ভক্ষকের ভুমিকায় অবর্তীণ হন, তখন কোন সরকারই তা নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেন না।
তখন দেশের ঐ রকম পরিস্থিতি দেখে আমার অন্তঃকরণে ভীষণ মর্মবেদনার সৃষ্টি হলো। কিন্তু আমি একজন সাধারণ সৈনিক আমার তো করার কিছুই নাই। তাই আমি আমার পরম প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বললামঃ
“ হে আমাদের প্রতিপালক ! আমাদের দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি সম্মক অবগত। যা কিছু ঘটছে তা আপনার চোখের সামনেই ঘটছে। দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যাদেরকেই নিয়োগ করা হচ্ছে, তারাই সন্ত্রাসীদের কাছে তাদের শপথ বিক্রি করে তাদের কাছে ঘুষ নিয়ে সন্ত্রাসকে উস্কিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এখনও আমাদের দেশের সেনা বাহিনী অনেকটাই সৎ আছে। কাজেই বি.ডি.আর-এর প্রেষণে আমাদের অফিসার নিয়োগের মত পুলিশ বাহিনীতে আমাদের সেনা বাহিনীর সাধারন সৈনিকদেরকেও ২/৩ বছরের জন্যে প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে দায়িত্ব পালনের ব্যাবস্থা করে দিন, তাহলে আপনার অসহায় ও নিরীহ বান্দা-বান্দীগুলো কিছুটা হলেও শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। আমাদের দেশেতো তেমন কোন নিয়ম কানুন নেই বা তেমন কোন সংস্থাও এখনও নেই। তাই আপনি মেহেরবানী করে আমার অন্তঃকরনের প্রার্থনাটুকু কবুল করে সেইরকম একটা সংস্থার ব্যবস্থা করে দিন।”
আমার উপর্যুক্ত কথাগুলো কেউ বিশ্বাস করুন বা না’ই করুন, এবং কেউ মানুন বা না’ই মানুন, তাতে আমার কোন অসুবিধা নাই। আমার এ কথাগুলিতো আর কোন মানুষকে জানিয়ে বলি নাই। আমি যার কাছে নিবেদন করেছি তিনি সব কথাই অবগত আছেন। দয়াময় প্রতিপালক যখন কোন মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে ইচ্ছা করেন, তখন তার কোন এক বান্দাকে তার সৃষ্টির নিদর্শণগুলি দেখিয়ে দেন এবং তার উপলব্ধিতে ভাল-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরেন এবং তা বুঝার শক্তিও দিয়ে দেন। তখন আল্লাহ তায়ালা সেই বান্দার অন্তঃকরণে কিছু নিদর্শণ ঢেলে দিয়ে তার মাধ্যমে কিছু কল্যাণজনক কাজ করিয়ে নেবার ইচ্ছা করেন। যখন সেই বান্দা আল্লাহর ইচ্ছায় বুঝতে পারেন, কোন কাজে মানুষের কল্যাণ হবে, তখন সেই কাজের জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানান। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তখন সেই বান্দার প্রার্থনা মঞ্জুর করে প্রাপ্যতা পূরণ করে দেন অথবা অন্য আরো ভালো কোন কল্যাণজনক কিছু থাকলো সেটাই দান করেন। এ কথাগুলো আমার নিজের কথা নয়, এগুলো পবিত্র আল-কুরআন ও হাদীস থেকে পাওয়া কথা।
সেনাবাহিনীর চাকুরী থেকে অবসরে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর শুনতে পেলাম সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণের সমন্বয়ে পুলিশ বাহিনীর পাশা-পাশি র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (RAB) নামক একটি নতূন সংস্থা গঠিত হয়েছে। তাদের কাজ হবে দেশের ভিতরে সন্ত্রাস দমন এবং আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে রাখা। খবরটা শোনার সাথে সাথে খুশিতে আমার দুচোখে বন্যার পানি নেমে আসলো। আমি আমার সুমহান প্রতিপালকের মহান দরবারে অশ্রুশিক্ত নয়নে শুকরিয়া জানালাম এবং বললামঃ
“ হে আমার প্রতিপালক ! আপনি আপনার এ অধম বান্দার দোয়া কবুল করেছেন, কিন্তু আমি আর সে পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারলাম না। যারা আপনার দেয়া পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন, তারা আমারই সহকর্মী ও জাত ভাই। কাজেই তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের উপর আপনার রহমত ও বরকত নাযিল করুন এবং তাদের সৎকাজে আপনি তাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগীতা প্রদান করুন।”
RAB গঠনের প্রাথমিক অবস্থায় তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে নিষ্ঠার সাথেই পালন করছিলো। এতে দেশে বিদেশে অনেক সুনাম ও প্রশংসাও অর্জিত হচ্ছিলো। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত আনন্দিতই হয়েছিলো। কিন্তু যারা সন্ত্রাসীদেরকে লালান-পালন করছিলেন তাদের কাছে সেটা ভালো লাগে নাই। তাই তারা RAB এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে হই চই শুরু করে দেয়। আর তাতে RAB এর অর্জিত সুনাম কিছুটা ক্ষুন্ন হয়। এ পর্যায়ে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের একটি কথা বলা প্রয়োজনবোধ করছি, আর তা হলো এই যে, একটি ধারালো অস্ত্র যখন কোন ন্যায়পরায়ন, আল্লাহভীরু ও ঈমানদার শাসকের হাতে থাকে, তখন সেটা যালিম সন্ত্রাসীদের প্রতি ব্যবহৃত হয়, ফলে তার কল্যাণজনক ফলাফল উপভোগ করে সাধারন জনগন আত্মতৃপ্তি পায়। আর যখন সেই ধারালো অস্ত্রটি’ই কোন যালিম শাসক বা যালিম সন্ত্রাসীদের হাতে থাকে, তখন নিজের ব্যক্তি স্বার্থে সেটাকে সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগনের উপর অপপ্রয়োগ করা হয়। তার ফলে সাধারণ জনগন অকল্যাণ ভোগ করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সেই ধারালো অস্ত্রটির দোষ কোথায়? দোষ হচ্ছে অস্ত্রটি ব্যাবহারকারীর। পত্রিকার পাতায় একটি খবরে জানতে পারলাম যে, আমাদের সেই আল্লাহর নিদর্শণপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী এলিট সংস্থা RAB কে নাকি ইন্ডিয়ান র্যাপিড এ্যাকশন ফোর্স তথা RAF এর আদলে পুনঃর্গঠন করা হচ্ছে। (সূত্র: সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ০২ জুলাই ২০১০, পৃষ্ঠা নং-১১)। তাই এ পরিস্থিতিতে বিবেকের তারনায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই আমার এ নিদর্শণপূর্ণ কথাগুলো সামু ব্লগে প্রকাশ করে RAB সংক্রান্ত এ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি ব্যক্ত করতে বাধ্য হলাম। এ পর্যায়ে আমাদের মহামান্য সরকার ও সরকারের সকল পর্যায়ের নীতি নির্ধারণী মহলের শ্রদ্ধেয় সম্মানিত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গের নিকট আমার সবিনয় প্রার্থনাঃ আমাদের দেশের RAB আল্লাহ প্রদত্ত একটি নিদর্শণপূর্ণ সংস্থা এবং আমাদের দেশের গর্ব। কাজেই আপনারা দয়া করে তাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের নিজস্ব অবস্থানের উপর থাকতে দিন। তাতে দেশ ও জাতির মহাকল্যাণ সাধিত হবে ইনশা-আল্লাহ। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা যখন তার নিজ ইচ্ছা কোন বান্দার অন্তঃকরণে প্রক্ষিপ্ত করেন, তখন সেই বান্দাটি সেই ভাবে আল্লাহর নিকট কোন কল্যাণজনক জিনিস প্রার্থনা করেন, আর তখন আল্লাহ তার বান্দার প্রার্থনা মঞ্জুর করে প্রাপ্যতা পূরণ করে দেন অথবা তার চেয়ে আরো ভালো কোন কল্যাণজনক কিছু থাকলো সেটাই দান করে মানব কল্যাণ সাধন করেন। আমাদের দেশের জঅই এর উপর মহান আল্লাহর অযস্র রহমত ও বরকত রয়েছে। যা আমাদের দেশ ও জাতির মহাকল্যাণ বয়ে আনবে ইনশা-আল্লাহ। আপনারা সেই রহমত ও বরকত থেকে আমাদের দেশ ও জাতিকে বঞ্চিত করবেন না। RAB এর গঠন সম্পর্কে আমি আল্লাহর হুকুম ছাড়া নিজের ইচ্ছায় যে, কিছুই করি নাই সে সম্পর্কে আল্লাহর বাণী ঃ
“তোমরা (নিজের থেকে কোন সৎকাজের) ইচ্ছা করবে না, যদি জগত সমূহের প্রতিপালক ইচ্ছা না করেন।” (সূরা:তাকভীর:২৯)।
তিনি আরো অন্যত্র বলছেন ঃ
“ তোমরা (কখনই নিজের থেকে কোন সৎকর্মের) ইচ্ছা করবে না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহের অন্তর্ভূক্ত করেন, কিন্তু যালিমরা; তাদের জন্যে তো তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা: দাহর:৩০-৩১)।
অন্য আরো একটি আয়াতে আল্লাহ বলছেন ঃ
“অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে; তিনি ছাড়া আর কেউ তা জ্ঞাত নয়; স্থল ও জল ভাগের সব কিছুই তিনি অবগত রয়েছেন, তার অবগতি ব্যতীত বৃক্ষ হতে একটি পাতাও ঝরে না এবং অন্ধকারে একটি দানাও পড়ে না, এমনিভাবে কোন সরস ও নিরস বস্তুও পতিত হয় না; সমস্ত বস্তুই সুস্পষ্ঠ কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।” (সূরা:আন’আম:৫৯)।
কাজেই আমাদের ঐতিহ্যবাহী RABও আল্লাহ প্রদত্ত একটি কল্যাণজনক সংস্থা, দয়া করে আপনারা সকলেই তাদেরকে কল্যাণজনক অবস্থানে থাকতে দিন। যাতে দেশ ও জাতির মহাকল্যাণ সাধনে কাজ করতে পারে।
দয়াময় প্রতিপালক আমাদের দেশের প্রত্যেকটি সৈনিক ও জনসাধারণকে খাঁটি দেশ প্রেমিক হিসেবে কবুল করে তাদের অন্তঃকরনে দেশপ্রেম ঢেলে দিন। আমাদের দেশ ও জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার বিরূদ্ধে যে কোন কুচক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, এবং ধ্বংসাত্মক অপতৎপরতা থেকে বাঁচানোর জন্যে তাদের অন্তঃকরণে সঠিক ঈমানী শক্তি ও মনবল সুদৃঢ় করে তাদের প্রতি তিনি তাঁর সর্বাত্মক সাহায্য অব্যাহত রাখুন। আমাদের দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে যে কোন মহাশত্রুদের মোকাবিলা করার তাওফীক দান করুন। যে কোন অকল্যাণজনক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড থেকে আমাদের দেশ ও তাঁর নিরীহ বান্দা-বান্দীগণকে রক্ষা করুন। আমিন
সার্জেন্ট (অবঃ) মুহাম্মাদ শফিকুল ইসলাম
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০১০ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


