(পর্ব-১)
আমার এই প্রবন্ধের শিরোনামটি কুরআনুল করীমের একটি আয়াত। সূরা আলাম নাশরাহ (আল ইনশিরাহ) এর চার এবং পাচঁ নাম্বার আয়াতে পরপর দুই বার এসেছে এই কালাম টি।
* ফাইন্না মা'য়াল উসরি ইউসরা
* ইন্না মা'য়াল উসরি ইউসরা।
নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুশকিলের সাথে আসানীও রয়েছে। বিপদ মুসিবতে সংকট সংঘাতে, কষ্টের কষাঘাতে - এই আয়াত দু'টি আমার শান্তি ও শান্তনার অমিয় ধারা। চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদে শিরিন শিতল হাওয়া। দুঃখের অমারাতে স্বস্তির বাতীঘর। ছাতি ফাটা তৃষ্ণায় অলৌকিক আবে হায়াত।
জীবন তো ফুলশয্যা নয়। বিশেষ করে দায়ী ইলাল্লাহর জীবন। বিপদ মুসিবত তো আসবেই। এটাই নিয়ম। এটাই সত্য। দুইয়ে দুইয়ে যেমন চার হয় তেমনি সত্য।
রাসুল (সঃ) এর কাছে যখন প্রথম অহী নাযিল হয়। রাসুল (সঃ) নিজেও বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারেন নি। ভয় পেয়েছিলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী এবং প্রধান পৃষ্ঠ পোষক খাদিজা (রাঃ)-র কাছে কাপঁতে কাপঁতে এসে বলেছিলেন, “হে খাদিজা আমার কি হয়ে গেলো?”। খাদিজা (রাঃ) তাকে বিভিন্ন ভাবে শান্তনা দেওয়ার পর তাকে তৎকালীন প্রখ্যাত জ্ঞানী তাপস বৃদ্ধ ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা ছিলেন খাদিজার চাচাত ভাই। তিনি ছিলেন ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী এবং আরবী ও ইবরানী ভাষার পন্ডিত। রাসুল (সঃ) এর কাছে স্ববিস্তারে বর্ণনা শোনার পর ওয়ারাকা বললেন, “ইনি সেই নামুস (অহী বহনকারী ফেরেশতা) যাকে আল্লাহ মূসা (আঃ) এর ওপর নাযিল করেছিলেন। হায় যদি আমি আপনার নবুওয়াতের যামানায় শক্তিশালী যুবক হতাম! হায় যদি তখন আমি জীবিত থাকি যখন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে।” রাসুল্লল্লাহ (সঃ) বললেন, “এরা কি আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেন, “হ্যাঁ, কখনো এমনটি হয়নি, আপনি যা নিয়ে এসেছেন কোনো ব্যক্তি তা নিয়ে এসেছে এবং তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। যদি আমি আপনার সেই আমলে বেচেঁ থাকি তাহলে আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করবো।”
জ্ঞানী ওয়ারাকা প্রাচীন ইতিহাস এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে এই মহা সত্যটি জানতে পেয়েছেন যে রাসুল (সঃ) কে যে দাওয়াত এবং মিশন দিয়ে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। এই পর্যন্ত যে বা যারাই এই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন তারাই অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কাউকে করাত দিয়ে দুই টুকরো করা হয়েছে। মেরে ফেলা হয়েছে। কাউকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
তাই তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে রাসুল (সঃ) এবং তার অনুসারীদের উপর নির্যাতন হবে এবং দেশ থেকেও বের করে দেওয়া হবে। এই একই অপরাধে(?) পূর্ববর্তী প্রায় সব নবীদের উপরই নির্যাতন চালানো হয়েছে। আদম (আঃ) আর সোলায়মান (আঃ) ব্যাতিত কোনো নবী রাসূলই এই নিপিড়নের হাত থেকে রেহাই পান নি। ইব্রাহীম (আঃ) কে তো প্রথমে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। তারপর দেশ থেকে বের করে দেয় তৎকালীন ক্ষমতাধরেরা। মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ), ইউনুস (আঃ) কার উপর অত্যাচার না করা হয়। জাকারিয়া (আঃ) কে তো করাত দিয়ে দ্বিখন্ডিত করেছে তার বিরুদ্ধবাদীরা। সেই ধারা অনুযায়ীই নির্যাতন নিপীড়ন ও অত্যাচারের ষ্টীম রোলার নেমে আসে মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর অনুসারীদের উপর।
আজও তা অব্যাহত আছে। নবী রাসুলদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব যারা পালন করতে যায় তাদের উপরই চলতে থাকে অত্যাচার আর নির্যাতন। এ যেন এক স্বতসিদ্ধ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কি করতে হবে তার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামিন। আল কুরআনের পাতায় পাতায়।
কি ভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে? কি ভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হবে? বিজয়ী হলে কি করতে হবে? প্রতিটি বিষয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে কুরআন মাজিদে। আর রাসুল (সঃ) তার বাস্তব নমুনা দেখিয়ে গেছেন। আমরা যারা রাসুল (সঃ) এর উম্মত বা অনুসারী বলে দাবী করি তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর নির্দেশিত এবং রাসুলের প্রদর্শিত পথেই চলতে হবে। এটিই ঈমানের দাবী। এর মধ্যেই নিহিত দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি।
তাই প্রথমেই জানা দরকার নবী রাসুলগন কি নিয়ে এসেছেন? কি সেই বানী কিংবা মতাদর্শ যার জন্য কায়েমি স্বার্থ বাদীরা সব মারমুখি হয়ে উঠলো?
** নবী রাসুলগন কি নিয়ে এসেছেন?
প্রথম অহী নাযিল হওয়ার পর ভীত বিহ্বল রাসুল (সঃ) কে খাদীজা (রাঃ) তার চাচাত ভাই বিজ্ঞ ও সুপন্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা সব শোনার পর বলেন, ----- কখনো এমনটি হয় নি আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা কোনো ব্যক্তি নিয়ে এসেছে এবং তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি।”
এই একই কারণে প্রত্যেক নবী রাসুলদের সাথে সমকালীন গোত্রপতি, রাষ্ট্রপতি এক কথায় ক্ষমতা ধরেরা শত্রুতা করেছে। অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। প্রশ্ন হলো কি সেই জিনিস কিংবা কি সেই দাওয়াত যা নিয়ে আসার কারণে সমাজের সবচেয়ে ভালো মানুষটির উপর এই নির্যাতন? প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক নবী রাসুল একই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন এবং তারা সবাই ছিলেন যার যার যামানার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। সেই সব নির্যাতন কারীরাও স্বীকার করতো যে এই দাওয়াত দানকারী ব্যক্তিটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান, সত্যবাদী, পরোপকারী, আমানতদার, দয়ালু এক কথায় সবচেয়ে ভাল মানুষ। রাসুল (সঃ) কে তারা উপাধি দিয়েছিল আল-আমীন, আস-সাদিক। অথচ রাসুল (সঃ) এর দাওয়াত কে গ্রহণ তো করেই নাই বরঞ্চ এই দাওয়াতের কারণেই রাসুল (সঃ) এর অতি আপন জনেরাও জানের শত্রু হয়ে দাড়ায়। চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কার ছোট বড় সবাই তাকে সম্মান শ্রদ্ধা ভক্তি ও ভালবাসার চোখে দেখেছে। তিনি যা বলেছেন নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছে। যে কোন সামাজিক সমস্যায়ও তাঁর দেওয়া সামধান কে সম্মানের সাথে মেনে নিয়েছে।
‘হাজরে আসওয়াদ’ স্থানান্তর করা নিয়ে কতো বড় জটিলা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল কুরাইশ গোত্র। আর কতো সহজেই না তাঁর সমাধান করে দিলেন বুদ্ধিমান মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ প্রত্যেকেই তা নির্দ্ধিধায় মেনে নিল।
অথচ যখনই সেই বিপ্লবী দাওয়াতটি তিনি পেশ করলেন সমস্ত সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে দাড়াল। তারা যেনো ভুলেই গেলো এই অতি ভদ্র সত্যবাদী পরোপকারী আমানতদার মানুষটি তাদের সামনেই জন্ম নিয়েছেন। কৈশর শৈশব যৌবন পার করেছেন। কোনদিন ই তাদের ধোকা দেন নি। নিজের স্বার্থকে কোন দিনই বড় করে দেখেন নি। কোন দিন তাঁর মুখে কেউ মিথ্যা উক্তি শোনে নি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা নিজেও কুরআনে সাক্ষী হিসেবে পেশ করে তাকে বলতে বলেছেন, “আমি তো এর আগেও তোমাদের মাঝেই জীবনের একটা অংশ অতিবাহিত করেছি। তবুও কি তোমাদের বুঝে আসে না? (সূরা ইউনুস ১৬০)
না তাদের বুঝে আসে না আসবে না। যে দাওয়াত নিয়ে রাসুল(সাঃ) এসেছেন সে দাওয়াত তারা কিছুতেই মানবে না। এই একটা পয়েন্টে মুশরিক, ইহুদি, আরব অনারবের সব বিরুদ্ধবাদীরা এক হয়েছিল। উম্মুল মুমীনিন হযরত সুফিয়া (রাঃ) বলেন ’আমি আমার বাবা ( ইহুদী সরদার হুয়াই) ও চাচার কাছে অন্য সব সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় ছিলাম। তারা উভয়ে সব সময় আমাকে সাথে সাথে রাখতেন। রাসুল (সাঃ) যখন মদিনায় এসে ’কোবায়’ অবস্থান করতে লাগলেন তখন আমার বাবা হুযাই বিন আখতাব ও চাচা আবু ইয়াসার বিন আখতাব খুব ভোরে তার সাথে দেখা করতে গেলেন। সূর্যাস্তের সময় ফিরে এলেন। মনে হলো, তারা খুবই ক্লান্ত ও অবসন্ন। তারা খুব ধীর গতিতে চলছিলেন। আমি অভ্যাস মত মুচকি হেসে তাদের সামনে গেলাম। কিন্তু ক্লান্তির কারণে তারা আমার দিকে ভ্রুক্ষেপই করলোনা। আমার চাচা আবু ইয়াসার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, “কি হে, ইনিই কি সেই (প্রতিশ্রুত নবী) ব্যাক্তি? ” বাবা বললেন ”হ্যা”
চাচা বললেন, “তুমি কি তাকে চিনে ফেলেছ? তুমি কি নিশ্চিত?”
বাবা বললেন, “হ্যাঁ।”
চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “এখন তাঁর সম্পর্কে তোমার মনোভাব কি?”
বাবা বললেন, “শুধুই শত্রুতা। যতদিন বেঁচে আছি, খোদার কসম, শত্রুতাই করে যাবো।”
এই ছিল ইহুদিদের আসল মানুষিকতা চিরাচরিত স্বভাব। অন্যান্য বিভিন্ন দিক দিয়ে শত্রুতা থাকলেও এই ক্ষেত্রে অন্যান্য মুশরিক জাতি একাত্ম ছিল। বর্তমানেও আমরা দেখতে পাই ইসলামের শত্রুতায় ইহুদি, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক, মুশরিক, ধর্মনিরপেক্ষ কায়েমি স্বার্থবাদী সবাই এক। (চলবে.....)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


