ভারতীয় বন্ধু, গোপাল গনেশন ৬ ফুট এর এক জন প্রানবন্ত মানুষ। একটি আর্ন্তজাতিক টেলিকম্যুনিকেশন কম্পানির প্রোগ্রামার। ৩০ বছরের জিবনের প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস উপভোগ করা ওর উদ্দেশ্য। যে কোন এ্যাডভেন্চার অন্তত এক বার এক্সপেরিয়েন্স করার প্রবল আগ্রহ। স্কিইং, হাইকিং, ডাইভিং, সার্ফিং সব কিছুর স্বাদ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে র্যাফ্টিং ওর জন্য সব চেয়ে উপযোগী। পাহাড়ি নদীর খরস্রোতের বিপরিতে ছোট্ট একটি ভেলা ভাসিয়ে চলায় ওর যত আনন্দ। প্রচন্ড উৎসাহ এই কাজে, কতোবার যে বুঝাতে চেষ্টা করেছে এক বারের জন্য হলেও যেন এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আসি।
খুব ভালো বন্ধু। যে কোন কাজে, যে কোন বিপদে গোপাল উপস্থিত। বন্ধুর জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি, কতদিন অফিস কামাই করেছে বা দেরি করেছে অসুস্থ কোন বন্ধু কে হাসপাতালে নিবে, অসুস্থ বন্ধুর সেবা প্রয়োজন, কারো রাইড প্রয়োজন এয়ারপোর্টে যাবে, কেউ মন্দিরে যাবে বিশেষ কোন উপলক্ষ্যে পুজো দিতে। সদ্য ভারত থেকে আসা মানুষদের সাহায্যেও ওর ক্লান্তি নেই।
অন্য সব স্মার্ট মানুষের মতো সেও আত্মসমালোচনায় মুখর। বুঝতে পারেনা তার পরিচিত কিছু মানুষের কেন এতো কার্পন্য,কেন যথেষ্ট ভালো বেতনের আকর্ষনীয় হাইটেক জব সত্বেও ৩/৪জন মানুষ কষ্ট করে একটি ২ বেডরুমের এপার্টমেন্টে বাস করে! গোপাল অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই উদার। ছোট্ট একটি উদাহরন, নতুন জব পেয়ে এটল্যান্টা ছাড়বে, নিজের এপার্টমেন্ট সাজানো আসবাব আর প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক্সে। এসব ক্ষেত্রে সাধারনত সাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে অনেকেই সল্পমুল্যে বিক্রি করে যেতে চেষ্টা করেন। গোপাল যেহেতু সবার মতো নয়, সে সদ্য ভারত হতে আগত এক জন কে তার এপার্টমেন্ট এর চাবি দিয়ে বলেছে "আগামি ২১ দিনের জন্য এই বাসা তোমার, পছন্দ হলে লিজ নিজের নামের করে নিবে না হলে যেখানে ভালো লাগে। এই বাসার সব কিছুর মালিক তুমি"।
নতুন শহরে এসে এক সময় লক্ষ্য করেছে কেবল টিভির প্রতি প্রবল আকর্ষনের কারনে ভোরে জাগতে সমস্যা হচ্ছে। বেশ কষ্ট করে আছে এমন এক জন পরিচিত ভারতীয় কে ডেকে তার ৪২" টিভি ধরিয়ে দিলো, টিভি সেট ছাড়া কেবল এর লাইনটির জন্য খরচ করছে কারন তার ফোন সংযোগটি কেবল এর মাধ্যমে। ভারতীয়দের মাঝে গোপালের মতো উদাহরন খুব বেশি নেই।
বাংলাদেশের প্রতি পরম শ্রদ্ধা গোপালের, অনেক খবরই নিয়মিত পড়ে। বর্তমান সরকারের দুর্নিতী বিরোধী কার্জকলাপে সে মুগ্ধ! কিছুতেই ভেবে পায়না মাত্র ৩৭ বছরের বাংলাদেশ তত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি কার্যকর আইডিয়া বের করে প্রয়োগ করেছে অথচ ভারত এতো বছরের পুরোনো একটি দেশ হয়েও এমন চমৎকার একটি কাজ আজ ও করেনি। আমি তাকে স্মরন করিয়ে দিয়েছি ৩৭ বছরে নয়, ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশ এই সরকারের প্রচলন করে। তবে ভারতের রাজনিতীর ও অনেক ভালো দিক আছে যা বাংলাদেশে এখনো নেই।
আমি জিবন অথবা মানুষ, কাউকেই ফরগ্র্যান্টেড হিসেবে ধরে নেয়ার দলে নই। বাবাকে হারানোর পর সাবধান হয়েছি, পরিচিত যে কেউ যে কোন সময় ছেড়ে যেতে পারেন মনে করি, চেষ্টা করি কারো সাথে আমার শেষ আলাপ যেন মন খারাপ করা বা কষ্টের না হয়। তারপর ও...
গতকাল দুপুরে একটি ফোন আসে, গোপালের বড় ভাই করেছেন। গোপাল ভাই এর চাকুরীর ব্যবস্থা করে কয়েক মাস আগে ইন্ডিয়া থেকে এনেছে সদ্যবিবাহিত ভাই ভাবীকে। উনি বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে জানালেন " আপনাদের জন্য একটি দুৎসংবাদ আছে, গোপাল আমাদের মাঝে আর নেই"। গোপালের সাথে আমার শেষ কথা হয়েছে শুক্রবার সন্ধ্যায়। ওনার কন্ঠের স্বাভাবিকতা আর আর খবরের আকস্বিকতায় ধরে নেই উনি ঠাট্টা করছেন। উনি অসহায় এর মতো বললেন "বিশ্বাস করুন, ঠাট্টা নয়।"
গোপাল শনিবার সন্ধ্যায় ফিরছিলো র্যাফ্টিং শেষে, খারাপ আবহাওয়ায় একটি সার্প টার্নিং মিস করেছিলো বোধহয়, গাড়ি ছিটকে পড়ে গেছে পথের বাইরে খাদে, স্পট ডেথ। গোপালের নিষ্প্রান দেহের সাথে ওর ব্যক্তিগত জিনিষ ও মোবাইল পুলিশের হেফাজতে থাকায় ওর ভাই ফোন নাম্বার খুঁজে পাননি, অনেক ঝামেলা করে প্রায় ২৪ ঘন্টা পর পেয়ে জানালেন। ছুটে গেলাম ওনার বাসায়, গোপাল কে দেখার অনুমতি মেলেনি কারো, মুখে আঘাত পেয়েছে সব চেয়ে বেশি। পরিবার, বন্ধু কারো অনুমতি নেই ওকে দেখার।
বিদেশে বিভিন্ন ঝামেলা, যে কোন লিগ্যাল বেপারে হাজার রকম কাগজ পত্র দিয়ে প্রমান করতে হয় রক্তের সম্পর্ক। এমন সব খেলার মাঝেও বাস্তবতা কখনও ভুলে যেতো না, তাই কোন এডভেন্চারে যাবার আগে ভাইয়ের নামে সব কিছু লিখে দিয়ে যেতো, তার কিছু হলে এই প্রবাসে তার পরিবারের যেন সমস্যা না হয়। এই নিয়ে বন্ধু মহলে অনেক হাসাহাসি করেছি আমরা।
বাংলাদেশের বাইরে কিছু দেশ দেখার সৌভাগ্য আল্লাহ দিয়েছেন তবে প্রতিবেশি সুন্দর দেশ ভারতে যাওয়া হয়ে উঠেনি। কথা ছিলো গোপালের বিয়ে উপলক্ষ্যে যাবো আমরা। ওর বাবা মা খুব জোর করছিলেন বিয়ের জন্য। যে ছেলের উদ্দেশ্য ৩-৪ বছর পর ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে গরীব বাচ্চাদের পড়াবে কয়েক বছর, তার পক্ষে মনের মতো মেয়ে পাওয়া একটু কষ্টের।
অনর্গল কথা বলতো গোপাল,এখন মনে হয় চলে যাবার খুব বেশি তাড়া ছিলো, তাই এতো সব জমা কথা বলে যেতে হবে বিদায় নেয়ার আগে। গত উইকেন্ডে আসতে চেয়েছিলো, সময় দিতে পারিনি বলে মন খারাপ করেছিলো। শনিবার একটি ওরিয়েন্টাল গ্রোসারিস্টোরে লিচু পেয়েছি, ভেবেছিলাম সামনের উইকেন্ডে নিয়ে যাবো ওকে। প্রচন্ড ধার্মিক গোপাল ছিলো নিরামিষভোজি।
আজ গোপালের আর্ন্তজাতিকখ্যাতিসম্পন্ন অফিসটিতে ওর টিমের ২১ জন মানুষ কোন কাজ করতে পারেননি। সবাই গোপালের কথা আলোচনা করেছেন, সহর্মমিতা ছিলো সবার মাঝে, দুপুরে সবাই গেছেন গোপালের প্রিয় রেস্টুরেন্টে লান্চে। ওর বস খাইয়েছেন নিজের টিমকে। অফিসে ফিরে সবার গ্রিফ কাউন্সিলিং। তাড়াতাড়ি অফিস ছুটি ওদের, এক দল এসেছে আমার বাসায়।
নিজেকে এক জন ধার্মিক মুসলিম বলে বিশ্বাস করি, কারো মৃত্যুতে জায়নামাজের বসে আল্লাহ্র র কাছে দোয়া করি। গতকাল খুব অসহায় মনে হয়েছে নিজেকে।
আগামিকাল একটি তীব্র কষ্টের দিন। গোপালের নিথর শরীরটিকে ভস্মীভুত করা হবে, তার পরেই ভস্ম নিয়ে যাওয়া হবে ভারত। শশ্মান বা চিতায় জ্বালানোর কথা শুনেছি, দেখা হয়নি। কাল প্রথম দেখবো তাও এমন একজন বন্ধুকে ছাই হয়ে যেতে। পেশাগত জিবনে কতো মৃত্যুই তো আমরা দেখি, তবু পরিচিত কারো মৃত্যু কে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারিনা।
মনে করতে চেষ্টা করছি শেষ কথা কি ছিলো ওর সাথে... নাহ্ তেমন কোন কথা নয়। মৃত্যুর ঠিক ২৪ ঘন্টা আগে কথা হয়, কথা শেষে ফোনটি পাশে বন্ধুর হাতে দেবার আগে হাসছিলো। ওর হাসির শব্দ ছিলো শেষ শোনা কন্ঠ।
এসব এলোমেলো কথা যখন লিখছি তখন গোপালের নিষ্প্রান দেহটি মর্গে বরফ করে রাখা। এতো এতো কথা নয়, ওকে মনে করে দু'টি লাইন লিখেছি জানলেও কি যে খুশি হতো! তবে থাক এই লেখা। জানিনা আমার আয়ু কতোদিন, কাল না হলে পরশু থেকে পৃথিবী আবার নিজের নিয়মে চলবে, সময়ের আবর্তে, কাজের ভিড়ে হয়তো হারিয়ে যাবে আমার এই বন্ধুটির শোক। তবু মাঝে মাঝে এসে ব্লগের পাতা খুলে দেখে যাবো আজকের এই দিনটির কথা, এই অসাধারন বন্ধুটির কথা।
যেখানেই আছো, তুমি ভালো থেকো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

