somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নাম বিভ্রাট- বাংলা, আরবী, ইংরেজী বিবিধ ভাষা এবং ধর্ম সমাচার!

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নাম নিয়ে অনেকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন, বিশেষ করে আমাদের দেশে অনেকেই নাম আরবী ভাষায় হলো না বাংলা ভাষা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ বিচলিত।


ধর্ম আর সংস্কৃতিকে অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন, সেক্ষেত্রে প্রায় প্রথম আঘাতটি এসে পড়ে নামের উপর। ধর্মভীরু, ধর্ম বিদ্বেষী, উভয়দল নিজেদের মতো করে এই নামকরন নিয়ে টানা হেঁচড়া করেন। অনেকে মনে করেন বাংলা নাম না রেখে আরবী নাম রাখায় ধর্মান্ধতা এবং নিজের ভাষার প্রতি অনীহা প্রকাশ পায়, আবার অনেকে মনে করেন আরবীতে নাম না রাখলে ইসলাম সন্মত হয়না। আমি ব্যক্তিগত ভাবে দুটি দলের কারো সাথেই সহমত পোষন করতে পারিনা।

ধর্ম আর নামের সম্পর্কের কথা এলে বলতে হয় শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মানুষের মাঝে ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত মহাপুরুষের নাম, গ্রন্থের ভাষায় চমৎকার অর্থ বা বিশেষনে নামকরনের একটি প্রবণতা দেখা যায়। নামের সাথে ধর্মগ্রন্থের ভাষার সম্পর্ক একটি সার্বজনীন বিষয়। আহমেদ, ফাহাদ, নূর, 'আব্দুল্লাহ্', 'মুহম্মদ আলী' 'শাহবাজ' নামগুলো শুনে ব্যক্তির দেশ সম্পর্কে ধারনা করা না গেলেও বলে দেয়া যায় তিনি মুসলিম। তেমনি 'বড়ুয়া" নামটি শুনলে বুঝতে পারি তিনি বৌদ্ধ। "ইন্দ্রজিৎ,শ্যাম, কৃষ্ণা, লক্ষন, গোপাল, রাধা, সীতা ইত্যাদি নাম দেশ নয় বরং হিন্দু ধর্মাবলম্বীর পরিচয়কে তুলে ধরে।সুতরাং নামের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশিরা বিশেষত বাংলাদেশি মুসলিমরা ধর্মকে আঁকড়ে ধরে কথাটি সম্পূর্ণ ভুল।


মূলত "পালী" ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হলেও সংস্কৃত একটি উল্লখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। বেদ পূরানের ভাষা সংস্কৃত, হিন্দুদের মাঝে সজল, প্রদীপ, সুনীল ইত্যাদি নাম গুলো প্রচলিত থাকায় অনেকেই এধরনের বাংলা নামকে হিন্দুয়ানি নাম মনে করেন। খ্রীষ্টানদের মাঝে পিটার, উইলিয়াম, ডেভিড, যোসেফ ইত্যাদি নাম বেশ প্রচলিত, উৎস সন্ধান করলে ফিরে যেতে হয় বাইবেলে। আমি খ্রীস্টান আর ইহুদীদের নামে তেমন পার্থক্য বুঝতে পারিনা জেনে আমার পরিচিত এক ইহুদী ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, "আমি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাম শুনে বলে দিতে পারবো ইহুদী না খ্রীষ্টান"। পরবর্তীতে লক্ষ্য করেছি শুমাক, বার্গ ইত্যাদি নামগুলো ইহুদীদের মাঝে বেশি প্রচলিত, সেক্ষেত্রে চলে আসে হিব্রু ভাষার কথা।



নামকরনের সাথে শুধু ধর্মগ্রন্থের ভাষা নয়, সংস্কৃতির প্রভাব যথেষ্ট। আমাদের দেশে হিন্দুদের মাঝে সাবরিনা, নাতাশা, শাহনাজ ইত্যাদি নাম শোনা যায়না, বরং মুসলিমদের মাঝে বেশ প্রচলিত। অথচ এই নামগুলোর আরবী ভাষা নয়, আমার জানা মতে যথাক্রমে স্প্যানিশ, রাশিয়ান এবং ফার্সী শব্দ। বাঙালী মুসলিমদের মাঝে বহুল প্রচলিত 'শবনম', 'আরজু', 'রাসেল' এগুলো আরবীভাষা নয়।বাংলাদেশী এবং খ্রীস্টানদের মাঝে ইংরেজী নামকরনের প্রবণতা, উইলিয়াম, এন্ড্রু, এ্যালবার্ট, রবার্ট, রোজমেরী নামগুলো বেশ প্রচলিত। আবার যখন শুনি কারো নাম 'ফরহাদ খান' বুঝতে পারি তিনি বাংলাদেশি, ভারতীয় অথবা পাকিস্তানি মুসলিম। আমি এখন পর্যন্ত কোন আরবের নামের শেষে 'খান' উপাধি শুনিনি।শুধু তাই নয় প্রায় প্রত্যেক পুরুষের নামের শুরুতে 'মুহম্মদ' ব্যবহারের প্রচলন আমাদের দেশে বেশি।


নামের উৎপত্তি যে ভাষায় হোক, দেশ এবং সংস্কৃতির প্রভাব বেশ সুস্পষ্ট। আমেরিকানদের 'জেসাস' স্প্যানিশদের মাঝে গিয়ে হয়ে যায় 'হেসুস", সেক্ষেত্রে বাইবেল এবং হযরত ঈসা(আঃ) যথাস্থানে শুধু দেশ ভেদে নামের এমন পরিবর্তন। বাঙালীদের মাঝে শ্যাম, বিবেক, রবি, অজয় উত্তর ভারতে গিয়ে হয়ে যায় শাম, ভিভেক, রাভি, আজেয়। আমরা 'খায়ের", 'ফাহাদ', 'আনোয়ার' নামগুলো যেভাবে উচ্চারন করে থাকি আরবদের মাঝে সেভাবে উচ্চারিত হয়না।



নামকরনের ক্ষেত্রে বাংলা, আরবী, সংস্কৃত, স্প্যানীশ ইত্যাদির চেয়ে মনে হয় নামের অর্থ অনেক বেশী জরুরী। সুন্দর অর্থবহ নাম সব ভাষা এবং সংস্কৃতিতে সমাদৃত। "জাহান্নাম" আরবী শব্দ, কেউ নিশ্চয় এই নামে নিজের সন্তানের নামকরন করবেননা। কোন ধর্মপ্রাণ মুসলিম যদি আরবী ভাষায় নাম করন করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই এমন নাম রাখেন যা'র অর্থ 'আবর্জনা', "পরিত্যাজ্য" কেমন হবে! 'সাইয়া জিদ্দান' শুনে বুঝা যায় আরবী শব্দ, শ্রুতিমধুর না হলেও তেমন খারাপ শোনায় না.. অথচ এই শব্দের অর্থ "খুব খারাপ"।

বর্তমান বিশ্বে নামকরন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ভারতীয়রা। তাঁরা নিজেরা নিজেদের অনেকেই এই প্রবণতা নিয়ে মজা করেন, অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রযুক্তিতে ভারতীয়দের দক্ষতা আর প্রসারের সাথে সাথে পাশ্চাত্যের সাথে তাঁদের যোগাযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার সার্ভিসে ফোন করলে জবাব আসে ভারত থেকে।''ভেংক্টরামন', 'সুব্রামনিয়াম' নাম গুলো আমেরিকান, ইউরোপিয়ানদের জন্য উচ্চারন করা কিছুটা কঠিন হলেও এসব দেশে এসেও অধিকাংশ তাঁদের পিতৃপ্রদত্ত নামটি ত্যাগ করতে নারাজ। অথচ অনেকে ভারতে বসেই উৎসাহী হয়ে নিজেদের নাম 'স্টিভ', 'মার্ক', 'জন', "মাইক" রেখেছেন।


সংস্কৃতিকে মুখ্য বিবেচনা করলে বলতে হয় আমাদের মাঝে বাংলা নামের সমাদর বেশি। পাশ্চাত্যে ব্যক্তি সাধারনত তাঁর পুরোনাম বা অফিসিয়াল নামে(আমাদের দেশে অনেকেই বলেন 'ভালো নাম:-) অধিক পরিচিত। সম্বোধনের ক্ষেত্রে পুরোনামের শেষ অংশটি বেশি ব্যবহৃত হয়। পরিবার পরিজন, নিকট আত্মীয় ছাড়া খুব কম মানুষ তাঁদের ডাক নাম সম্পর্কে অবগত। অথচ আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র; অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় সজন, পাড়া প্রতিবেশি থেকে শুরু করে সহপাঠি, পরিচিতদের মাঝে ডাক নামটি বেশি প্রচলিত। এমনকি শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে, কর্মক্ষেত্রেও অনেকের ডাক নাম বেশি পরিচিত। "তোমার/আপনার নাম কি?" এই প্রশ্নের(চাকুরি বা বিদ্যাপিঠে ভর্তির ইন্টারভিউ ছাড়া) জবাবে 'ডাক নাম'টি আমরা বলে থাকি। আর আমাদের দেশে ধর্ম নির্বিশেষে ডাক নামটি বাংলা ভাষায় রাখার প্রচলন বেশি। বাংলাদেশে অত্যন্ত ধর্মভীরু রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারের সন্তানদের বাবু, স্বপন, বন্যা, লাবনী, মিতা, সাগর নামে পরিচিত হতে দেখেছি। :)


ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরির হয়ে অনেকে নিজের নামটি পরিবর্তন করে আরবী নাম রাখেন, অনেকেই রাখেননা। 'Cat Stevens' ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে তাঁর নাম রেখেছেন 'ইউসুফ ইসলাম' আবার 'Malcom X' মূলত তাঁর এই ইংরেজী নামটিই ধরে রেখেছিলেন('X' অংশটি ইসলাম গ্রহনের পর যোগ করেছেন, বিগত দিনের দাস প্রথাকে স্মরণ করে), পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে পারিবারিক নাম হিসেবে 'শাবাজ' ব্যবহার করেছিলেন। ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধ, ভাবধারার পরিপন্থী অর্থের না হলে মনে হয় নাম পরিবর্তন জরুরি নয়, বরং একটি সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখা জরুরী।


অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্মান্তরীত হয়ে নাম পরিবর্তন করে আরবী নামটি রাখা পর্যন্তই, ধর্মপালন সেভাবে করছেননা। আমার পরিচিত একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভুত আমেরিকান, অনেক বছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছেন। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, সিয়াম সাধনা সহ ধর্মীয় আদেশ নিষেধ সতর্কতার সাথে মেনে চলতে চেষ্টা করেন।অথচ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এই মুসলিম ব্যক্তি তাঁর ব্রিটিশ নামটি পরিবর্তন করেননি।

বাংলাদেশির নাম বাংলা হলো না আরবী, সংস্কৃত, ফ্রেন্চ অথবা স্প্যানীশ.. তাতে বাংলা ভাষার কোন লাভ ক্ষতি আছে বলে মনে করিনা। বাংলায় নামকরন না হলে বাংলা হারিয়ে যাবে এমন কোন সম্ভাবনাকে অলীক মনে হয়। বাবা মা সখ করে নাম রাখলেন 'বর্ষা ধারা,' 'ধ্রুব তারা'.. সেই শিশু বাংলা শিখলোনা বা বড় হয়ে বাংলা ভুলে গেলো। আবার নাম "নজরুল ইসলাম", 'আব্দুউল্লাহ্ আবু সায়ীদ" "সুফিয়া কামাল" "মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্", "মুহম্মদ কুদরত-ই-খোদা" - তাঁরা বাংলা ভাষা প্রাণে ধারন করে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন, আগামী হাজার বছরের প্রজন্ম হয়তো তাঁদের লেখা থেকেই ভালোবাসতে শিখবে এই ভাষাকে।


(কুরআন বা সহীহ্ হাদিসে মুসলিমদের আরবী নামকরনের বিষয়ে সেভাবে কিছু বলা আছে বলে মনে পড়ছেনা। তেমন কিছু থাকলে কেউ রেফারেন্স সহ জানালে কৃতজ্ঞ হবো)

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:২৯
৫৮টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×