somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভ্যানক্যুভার!! ভ্যানক্যুভার!! দিস্ ইজ ইট্!!!!!

০৫ ই জুন, ২০০৮ রাত ১১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"ভ্যানক্যুভার!! ভ্যানক্যুভার!! দিস্ ইজ ইট্!!!!!"

উত্তেজনা, আকুতি, আনন্দ, কষ্ট, অসহায়ত্ব আর বিস্ময় ভরা কন্ঠে উচ্চারিত আর্তচিৎকার!




শান্ত সৌম্য ধূসর পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, চমৎকার দৃশ্য!
সে ধূসর পাহাড়টি আজ সাদা বরফে ঢাকা! শীতের শেষে এখন বরফ গলার সময়, জায়গায় জায়গায় তুষারের পুরু আস্তর গলে কেমন সাদা কালো ডোরার মতো, মনে হচ্ছে পাহাড়টি যেন জেব্রার ডোরাকাটা চামড়ায় আবৃত!


এই যে পাহাড়, কখনও ধূসর, কখনও শুভ্র তুষার ঢাকা আবার কখনো জেব্রার মতো সাদা কালো.. এখানেই তার বৈশিষ্টের শেষ নয়!!!

আমার সামনে অটল দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড়টি একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি!ফ্রাইড আইসক্রীমের বিপরিত, হীম শীতল বরফে ঢাকা এক জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড! মাত্র আঠাশ বছর আগে অন্তঃদহন সইতে না পেরে প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো এই অনিন্দ্য সুন্দর পর্বত! ধ্বংস করেছিলো আশে পাশের সকল প্রান, তা মানুষ, পোকামাকড় থেকে গাছ পালা, ঘাস লতা গুল্ম পর্যন্ত সব কিছুই! সেই ধ্বংসে সীমাবদ্ধ থাকেনি তার আক্রোশ, চিরতরে পরিবর্তন করে সংলগ্ন এলাকার ভৌগলিক চিত্র!!

পাহাড়টির উত্তর দিকে বিভিন্ন স্থানে ছিন্ন মস্তকে পরে থাকা ভস্মীভূত গাছের ধ্বংসাবশেষ সেই ভয়ংকর অগ্নুৎপাতের স্মৃতি চিহ্ন আজও বয়ে বেড়ায় ! তার সাথে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমূলে উৎপাটিত বিশাল বিশাল গাছের গুড়ি, মনে করিয়ে দেয় আঠাশ বছর আগের এই শান্ত পাহাড়ের উদ্দাম তান্ডবের কথা।

ঐ দূরে দেখা যায় স্পিরিট লেক, যাকে ঘিরে তখন গড়ে উঠেছিলো এক স্বর্গীয় ভূবন!! অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়ের পাদদেশে টলটলে জলের এই লেকটির চার পাশে নিরিবিলিতে গড়েছিলো কিছু মানুষের সেন্কচুয়ারী। যান্ত্রিক জীবনের অস্থিরতা, জনকোলাহল আর গতি থেকে কিছুটা দূরে শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে শান্তিময় আবাসস্থল! ১৯৮০ সালের ১৮ই মে, সেন্ট হেলেন পর্বত উদরের জ্বলন্ত লাভা উদগীরন করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয় নিজের যন্ত্রণা, সেদিন সেই অগ্নুৎপাতের প্রচন্ড গতি আর ভূমির কম্পনে স্পিরিট লেকের পানি ৮০০ ফুট উপরে উঠে যায়, যখন সে পূর্বস্থানে ফিরে আসে ততক্ষনে তার নীচে জমেছে লাভা আর ভস্মীভূত গাছের ২০০ ফুট পুরু স্তর! আশেপাশে গড়ে উঠা অবকাশ যাপনের চমৎকার বাড়িগুলো তলিয়ে গেছে শতশত ফুট উত্তপ্ত প্রস্তর, ম্যাগমা আর ভস্মীভুত গাছের নীচে।

সেদিনের বিস্ফোরন আকাশ জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো যে ধোঁয়ার কুন্ডলী তৈরী করেছিলো, তা দিনের বেলা নামিয়েছিলো রাতের আঁধার। বেলা এগারো বারটায় আশে পাশের বিস্তীর্ণ অন্চল ঢেকেছিলো গাঢ় অন্ধকারে!


একবার গর্জে উঠে থেমে থাকেনি সেন্ট হেলেন, পরবর্তিতে কয়েকবার এবং এখনও মাঝে মাঝে গর্জে উঠে! নড়াচড়া করে জানিয়ে দেয় নিজের ভিতরের জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডের অস্তিত্ব।

সেন্ট হেলেনের এতো কিছু, এতো ঘটনা, ভাঙ্গা গড়া, এসব কিছু ছাপিয়ে আমার কাছে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ববহন করে ডেভিড জন্সটন নামের ত্রিশ বছরের একজন মানুষ! প্রচন্ড মেধাবী হাস্যোজ্জল চেহারার এই মানুষটির কথা গভীর ভাবে ছুঁয়ে যায় মন।

জনস্টন প্রথম ধারনা করেন, সেসময় ওয়াশিংটন স্টেটে যে অস্বাভাবিক ভস্মের অস্তিত্ব ভূ-তত্ত্ববিদরা খুঁজে পান, তা মোটেও রেইনিয়ার পর্বতের নয়, বরং আপাতঃ দৃষ্টিতে মৃত মনে করা সেন্ট হেলেনের। তিনি সবাইকে সজাগ করেন সেন্ট হেলেনের জেগে উঠা সম্পর্কে। ক্ষুদ্ধ হেলেনের চাপা ক্ষোভের প্রকাশ যখন ধীরে ধীরে তার দেয়ালে ফুটে উঠতে শুরু করে; তখন এই জনস্টন সকলকে সতর্ক করেন, "আর দশটি আগ্নেয়গিরি'র মতো, সেন্ট হেলেনের জ্বালামুখ কেন্দ্রে অবস্থান করবেনা বরং জ্বালামুখ হবে পাশের দেয়ালে"। শুধু তাই নয়, কর্তৃপক্ষকে বার বার তাগদা দিয়ে আসন্ন অগ্নুৎপাত সম্পর্কে সচেতন করে এলাকায় জনসাধারনের যাতায়াতের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য করেন।বেশ কিছুদিন ধরে সেন্ট হেলেনের শরীরের অস্থিরতা অনুধাবন করায় অধিকাংশ মানুষকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো নিরাপদ স্থানে, সেখানে সাধারনের যাতায়াত সীমিত করা হয়। তাই যে দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ করেছিলো সহস্র জীবন, তা ৭০-৭২ প্রাণনাশে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সেসময় বিজ্ঞান প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো এতোখানি উন্নত ছিলোনা। ভুতত্ত্ববিদরা একটি অতিসাধারন ছোট ট্ট্রেলার নিয়ে পালা করে রাত কাটাতেন সেন্ট হেলেনের পাশে, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষনের জন্য।

১৭ই মে রাতে ছিলো আরকজনের দায়িত্ব, তিনি নতুন কাজে একটি ইন্টারভিউ দিতে যাবেন বলে জনস্টনকে অনুরোধ করেন তাঁর হয়ে সে রাতে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। ডেভিড কিছুটা মন খারাপ করেই রাজী হয়ে যান আরেকজনের স্বার্থে। সন্ধ্যায় সহকর্মীরা তাঁকে রাতের পর্যবেক্ষনের দায়িত্বে রেখে বিদায় নেবার সময় ছবি তুলে হাস্যজ্জল জনস্টনের, পর্যবেক্ষন পোস্টের সামনে চেয়ারে বসে হাসছেন। পরদিন ভোরে গর্জে করে উঠে সেন্ট হেলেন, উদগীরনের ভয়াবহতা অনুধাবন করেন তিনি, বুঝতে পারেন প্রচন্ড গতি সম্পন্ন উত্তপ্ত এই অগ্নুৎপাত দেখার সৌভাগ্য হলেও তা ক্ষণস্থায়ী, আর এই বিরল অভিজ্ঞতা কারো সাথে শেয়ার করার ভাগ্য তাঁর হবেনা।

সময় খুব কম, কয়েক মুহুর্ত মাত্র! নিজের দায়িত্ব ভুলেননা সেসময়ও, ছুটে যান মাইক্রোফোনের কাছে! সেন্টহেলেনের উদগীরন সম্পর্কে অবগত করতে হবে সকলকে.. মূল কন্ট্রোল টাওয়ারের উদ্দেশে শুধু একটি কথা বলার সুযোগ পান তিনি

"ভ্যানক্যুভার!! ভ্যানক্যুভার!! দিস্ ইজ ইট্!!!!!"

আগ্নেয়গিরির ভয়ংকর শক্তিধর অগ্নুৎপাত উড়িয়ে নিয়ে যায় তাঁকে, নিমেষেই নীভে যায় এই নির্ভীক মেধাবী বিজ্ঞানীর জীবন প্রদীপ! চিরতরে হারিয়ে যান, তলিয়ে যান তিনি এই আগ্নেগিরির বিস্ফোরনের মাঝে। উত্তপ্ত লাভায় ঢাকা পড়ে যায় সব কিছু, নিশ্চিহ্ন হন ডেভিড জনস্টন নামের এই কর্মপাগল মেধাবী মানুষটি। তিনি যেখানে বসে সেদিন হেলেনের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করেছিলেন, সেখানে এখন ট্যুরিস্টদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ারটি নির্মিত, তাঁর সন্মানে নামকরন করা হয়েছে "জনস্টন রিজ অবজারভেটরি টাওয়ার"।

সেখানে দাঁড়ালে সেন্ট হেলেনের অপার সৌন্দর্য আর অসীম রহস্য যেভাবে আপ্লুত করে, তার চেয়ে বেশি গভীর ভাবে স্পর্শ করে বিজ্ঞান প্রযুক্তির জন্য, ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য আত্মাহুতি দেয়া ডেভিড জনস্টন নামের অসীম সাহসী অসাধারন মানুষটি।

মৃত্যুর পর তাঁর দেহাবশেষ বা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি! ধারনা করা হয়, শত শত ফুট ম্যাগমার নীচে চাপা পরে গেছে। অবজারভেশন ডেকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চমকে সরে যাই, যখন মনে হয়.. যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক তার নীচেই হয়তো শুয়ে আছেন জনস্টন নামের সেই অকুতোভয় বীর!! যাঁর একটি আর্তচিৎকার ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে বেজে চলেছে যুগ যুগ ধরে...


"ভ্যানক্যুভার!! ভ্যানক্যুভার!! দিস্ ইজ ইট্!!!!!"



ডেভিড জনস্টনের ছবি সুত্রঃ ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:০৭
৪৯টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×