নিবাসের কাছাকাছি পৌঁছুতেই ভালুকটা কোত্থেকে দৌড়ে এসে আমার পা চেটে দেয়।
আমি তত ঘাবড়াই না। বা ঘাবড়ানোর থেকেও আমার স্বভাবদোষে ভালুকের পা-চাটা রহস্য নিয়ে নিবেদিতপ্রাণ গবেষক হই। আমার পড়শিরা হচ্ছেন সুশীল মানুষ। তাঁরা তাঁদের জানালা দিয়ে, কিংবা বৈকালিক হণ্টন-শেষে ফিরবার কালে ভালুকটার কসরৎ লক্ষ্য করলেন। আর যে যার জানালা দিয়ে, কিংবা আমার কাছ পর্যন্ত এসে বিড়াল জাতির লয়্যালটি ও গৃহপালিত মনোভাবের প্রশংসা করতে থাকলেন। তাঁরা বললেন:
"বাহ্ আপনার বিড়ালটিতো বেশ! এত বছর ধরে আপনার পা-টা ঝামা ঝামা হয়ে গেল। কিন্তু ওর চাটাচাটির অভ্যাসটা একদম সতেজ ও নবীন হয়েই আছে।"
আমার রাগ হয়। মনে হয় বলি: "তা আপনারাই তো মনে হচ্ছে ওর প্রতি বেশি লয়্যাল। আমার থেকেও।" কিন্তু বলি অন্যকথা: "কিন্তু এটা তো বিড়াল না। এটা তো ভালুক।"
পড়শিরা আমার চোখের ডাক্তারের কাছে যেতে বলেন। খুব আন্তরিক ও সুশীলভাবেই বলেন। তাঁরা স্মরণ করাতে ভোলেন না যে আমার নবুয়ত পাবার বয়স সমাসীন এবং বিড়ালকে ভালুক বলে ভ্রম হওয়া এই বয়সে মানানসই। বলাইবাহুল্য, ডাক্তারের কাছে যেতে আমি রাজি হই না। এমনিতে আমার বিড়াল বা ভালুক কোনোকিছুতেই বিদ্বেষ বিশেষ নেই। তবে ভালুককে বিড়াল বললে পেশাদারিত্বের সংকট হয় আমার। আমি তাঁদেরকে উস্কানি দেবার চেষ্টা করি যে তাঁরা হয়তো ভালুকের গৃহপালিত্ব যোগ্যতা কিংবা ধরা যাক পা-চাটার অধিকার নিয়ে কথা বলতে চাইছেন। তাহলে আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা আলাপ তুলতে হবে। কিন্তু এরকম ডিফিনিশনাল সংকটে থাকলে তো কোনো আলাপ বৃথা। কিন্তু পড়শিরা বিশেষ বিচলিত নন। বরং, একথা বলায়, আমাকে ডাক্তারের কাছে যাবার জন্য পীড়াপিড়ি করতে থাকেন। তাঁরা বলপ্রয়োগ করবেন না এই ভরসা আমার ছিল। কিন্তু তাঁদের পারসুয়েশন যোগ্যতা নিয়েও আমার সংশয় ছিল না। তাঁরা অচিরেই ডাক্তারের কাছে যাবার জন্য আমাকে টার্গেট করে য়্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইন প্রগ্রাম খুলে বসতে পারেন এই আশঙ্কা আমি বোধ করছিলাম। ডাক্তারের কাছে আমি যেতে চাই না। ফলে পরিত্রাণ খুঁজি।
এরই মধ্যে আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে ভালুকটা একটা বিরাট ডাক দিয়ে বসে -- "মিঁউউউউ"। বুঝলাম এতক্ষণ ভালমতো কথাবার্তা শুনেছে সে। এমনকি আমি আসার আগেই পড়শিদের সঙ্গে তার বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে। ওর রিহার্সাল শেষ। তেমন কোনো ভরসা নেই বুঝতে পারি আমি।
ভালুক নিয়ে যত রহস্য আমার, পড়শিদের নিয়ে রহস্য তার থেকে ঢের বেশি। কী কাণ্ড! জলজ্যান্ত একটা ভালুককে এঁরা বিড়াল বলে চালিয়ে দিচ্ছেন?! ক'দিন এভাবেই ভুম মেরে থাকলাম। তদ্দিনে লয়্যাল ভালুক আমার ডিফিনিশন না পেলেও কনসেন্ট পেয়ে গেছে। প্রকৃতার্থে ওর জব ডেস্ক্রিপশন ভালমতো বোঝাবুঝি ছিল। পুরান বিড়ালটাকেও কোথাও দেখি না।
আসলে পড়শিদের ঠিক দোষ দেয়াও যায় না। এদ্দিন তাঁরা ভালুকরূপী বিড়াল মার্কেট করে এসেছেন। এবং অবশ্যই সেগুলোকে ভালুক বলেই চালিয়েছেন তাঁরা। এখন নীতিগতভাবে তাঁদের পক্ষে বিড়ালরূপী ভালুকটাকে মানা ছাড়া উপায় নেই।
ভালুকটা সেটা জানে।
এক মুহূর্তের জন্য যদি আমার পা বাড়িয়ে দেয়াতে একটু ইতস্তত দেখে সে অমনি বুঝে যাবে যে আমি তার বিড়ালত্ব মানি না। আমি যাই জানি না কেন, ধরা যাক সে বিড়াল না ভালুক, মনে হয় তা নিয়ে এটার সমস্যা নেই। প্রপারলি বিহেভ করলেই সব ঠিক থাকবে। ফলে আমার এখন কাজ হলো পা-টা স্মুদলি বাড়িয়ে দেয়া। যাতে গৃহ ও আমার প্রতি ওর যে লয়্যালটি ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেটার অফিসিয়াল রেকর্ড অটুট থাকে। আমি মুখস্তের মতো সেটা করা রপ্ত করি যাতে একদিনও ওর মনে না হয় যে আমি বিগড়ে গেছি।
আল্লা মালুম! সুশীল পড়শিদের সঙ্গে ওর কী কী নিয়ে পরিকল্পনা হয়!
---
মোহাম্মদপুর, ১৪ মার্চ ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

