somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ময়নাতদন্তহীন একটি মৃত্যু

১৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৫:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ধনরাজ আর শাহাবুদ্দিন ল্যাটকা মেরে বসে ছিল। আধমরা কতগুলো ফুলের গাছ লাগানো আছে জেনারেল ওয়ার্ডের পাশ ঘেঁষে, আর লোহার গেটটা পর্যন্ত। কয়েকটা মোরগফুলের গাছে নারকেলের জমাট ছোবড়ার মত ফুল ধরে আছে। ভাল করে না দেখলে মানুষের গুয়ের মত দেখায়। এপাশে খান তিনেক দুপুরমণির গাছ গোঁয়ারের মত বেঁচে আছে। পাতাবাহারের গাছ চারটা দীর্ঘদিন কাঁচির অভাবে ডাঁটাশাকের গাছের মত ধিঙি। সেই বাগানটাকে ইটের চাঁতাল করে ঘেরা। সেখানে পাছা পেড়ে পা মেলে দিয়ে বসে ছিল শাহাবুদ্দিন। আর দুই হাঁটু ভাঁজ করে সেখানে মুখ আর গলার গামছাখানা একত্রে গুঁজে রেখে বসে ছিল ধনরাজ। দুজনেরই দৃষ্টি জেনারেল ওয়ার্ডের বারান্দায় যেখানে ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিল জনা তিনেক লোক। পেছনে নেহায়েৎ হুকুমসাপে হয়ে দাঁড়িয়ে নিরুপায় দুজন কনস্টেবল পুলিশ। কথা বলছিল যে তিনজন, তাদের একজন মাঝারী বয়সের পুরুষ। সে-ই হাত নেড়ে অনেক কথা বলছিল। আর ওসি সাহেব মাথা নাড়ছিল। দূর থেকে সম্মতি মনে হয়। মনে হয় ধনরাজদেরও। সেদিকে তাকিয়েই তারা ল্যাটকা মেরে বসে ছিল। কথা শেষ করে দুজন পুলিশ সমেত ওসি উঠল গিয়ে ডাইহাটসু জীপে, ওয়ার্ডের পাশের ন্যাড়ামাঠে রাখা। তারপর জীপ ঘুরিয়ে হাসপাতালের মরচে ধরা লোহার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল, ধনরাজদের একেবারে কাছ দিয়ে।

জীপটা বেরিয়ে গেলে শাহাবুদ্দিন কান্তভাবে উঠে দাঁড়াল।

ছোট্ট শহরের সবকিছুই লাগোয়া। কেবল কলেজের পাশ দিয়ে যে সড়কটায় দূরপাল্লার বাসগুলো আসা যাওয়া করে সেখানে ধান আর গমের তে, মৌসুমে ছোলা কিংবা মুসুরি। যখন দিকভ্রান্ত বাতাসেরা শহরের ভেতরে ঢুকব ঢুকব করেও না ঢুকে পাশ দিয়ে চলে যায়, যাবার কালে সেই সব েেতর উপরে আলতো করে ছোঁয়া রেখে যায়। আর ধানের, গমের কিংবা ছোলার কচি দেহগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকে সেই বাতাসে। দুধের সরের মতো কাঁপন তাদের। সে কাঁপন দেখে দলছুট যে বুলবুল একমনে খুঁটির উপর বসে ছিল সে উড়ে অন্য কোথাও যায়। ধনরাজ কিংবা শাহাবুদ্দিনের দিন কেটে যায় তাই দেখে। তাই দেখে দেখে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে, অবেলায়। আবার অবেলাতেই ঘুম থেকে ওঠে। যা কিছু কাজ ওদের তা সব রাত্রিবেলাতেই বেশি।

লাশ-কাটা ঘরখানা সরকারী। কিন্তু অন্যসব সরকারী অফিস থেকে কিছু দূরে। একটা তিন কামরার একতলা বাড়ি। দরজাগুলো দুই পাল্লার। এতগুলো বছরের গাঢ় স্মৃতিতে সেগুলো ভাঁজে ভাঁজে মিশ খায় না। ঠেসে ধরে লাগাতে হয়। তবে লাগানোর তেমন রেওয়াজ নেই। লাশ আসে লাশ যায়। লাশেরা সওয়ার হয়ে আসে, সওয়ার হয়েই যায়। ধনরাজরা কেবল কেউ না কেউ থাকেই ওখানে। জানালার পাল্লাগুলোর খাবলা উঠে গেছে। লোহার সমান্তরাল শিকের দুয়েকটি উধাও। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর নিচের দিক য়ে গেছে। প্রায় আগরবাতির মতো দেখায়। বাইরের দেয়ালে কোনো এক কালে লাল রং করা হয়েছিল। আর এই ঐতিহ্যকে বরাবর রাখতে এখন চল্টা ওঠা দেয়ালেও একপ্রস্থ লাল রঙ লাগিয়ে যায় রঙের কর্মচারিরা। তারই মাঝখান থেকে বেয়াড়া রকমের বেঁচে-থাকা অশ্বত্থের তিনখানা গাছ তিন প্রান্ত থেকে অহেতু এক প্রতিযোগিতায় বাড়ছে। ভেতরের দেয়াল সাদা। সেই সাদা দেয়ালে রক্ত, পানের পিক, অসতর্ক কাশির শুকনো অবশিষ্ট, আর নিছক মনোযোগে আঁকা কয়লার ফুল-লতা-পাতা। বাইরের বৃষ্টিরা অবাধ ভেতরে ঢুকতে পারে না Ñ এই যন্ত্রণায় দেয়ালটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঢ্যাবসা হয়ে গেছে। সেই সোঁদা দেয়ালে কয়লা-শিল্পীর কসরৎ করে আঁকশিল্প জারি রাখতে হয়। তথাপি এভাবেই অলস কর্মহীন কোনো রাত্রে সে এঁকে যায়। লাশ-কাটা ঘর বলেই বোধহয় এই স্বাধীনতায় কোনো
হস্তপে হয় না এই সরকারী ভবনে। তিন কামরার একটিতে পাশাপাশি দুটো তক্তপোশ পাতা। নিমকাঠের কাঠামো লালচে হয়ে আছে। আর ওপরে আমকাঠের ছাউনি পেরেকের নিষ্ঠুরতায় ঠিকমতো বেঁকে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে ধনরাজ কিংবা শাহাবুদ্দিন, কিংবা মহারাজ, রামগোপাল, কার্তিক, আর মোফাজ্জল ঘুমিয়ে কাটায়। রাতে ঘুমায় যখন প্রায়শই মধ্যঘরে রাখা টিনের দেরাজে কোনো না কোনো নি®প্রাণ অতিথি ঘুমায়। বিত তাদের দেহ কিছুমাত্র অস্বস্তিতে ফেলে না এদের। বরং নিয়মিত লোডশেডিং-এ ষাট ওয়াটের টিমটিমে বাতিটাও যখন জ্বলে না, সেই অন্ধকার রাতে মায়াবী এক আবিষ্টতা ঘরটাকে ঘিরে রাখে। ধনরাজদের সেই মায়া আর কাটানো হয় না।

ঠিক কবে এই বাড়িটা বানানো হয়েছিল এবং কী উদ্দেশ্যে তা বলবার মতো কেউ নেই। ধনরাজ জন্মানোরও ঢের আগে ওর বাবা এই কাজই করেছে। ধনরাজের বাবাই বা কোত্থেকে এসে এই লাশকাটা ঘরের সম্রাট হয়েছিল সেও এক রহস্য। কিন্তু ধনরাজ কিংবা ওর ভাই মহারাজ ছোটবেলা থেকেই জানত যে এই কাজে তালিম নেয়া তাদের কর্তব্য। সেই কর্তব্যে এতগুলো বছরেও কিছুমাত্র সংশয় দেখা দেয়নি, দেখা দেয় না।

ধনরাজরা জানে যে ওরা সরকারী কর্মচারি। কিন্তু সেই কথা তিরতির করে কাঁপতে-থাকা ধানগাছের শরীর দেখবার কালে তাদের আর মনে পড়ে না। এমনকি মনে পড়ে না যখন রাত্রিবেলা অপর্যাপ্ত আলোর মধ্যে দু’জন মানুষ চারপাশ থেকে তাগাদা পায় তাড়াতাড়ি শেষ করবার জন্য, আর ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকে টেবিলের ওপর শায়িত মরদেহের সঙ্গে। হাসপাতালের লোকেরা আসে, আবার চলে যায়। ডাক্তারদের আসারও কথা। তারাও আসে। সুবিধামত। আবার চলে যায়। শক্ত বাদীপ না থাকলে ডাক্তারদের কাজটা এমন কিছু না। পুলিশেরা আসে। তারা অত সহজে যায় না। মরদেহের কিছু একটা ফয়সালা করে তারপর যায়। কেবল প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে ধনরাজরা আদালতের কেরাণীর কাছে বেতন আনতে যায়। কেরাণী তাদের নাম ডেকে ডেকে বেতন দেয়। তখন ওরা সবাই একত্রেই যায়। সেটাই নিয়মের মতো হয়ে গেছে।
“মহারা আ আ জ”
“জ্বি”
“ধনরা আ আ জ”...
“রামগোপা আ আ ল”...
“কার্তি ই ই ই ক”...
এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা যে আদালতের কেরাণীর পে এত জোরে না ডাকলেও চলে। এ নিয়ে ভেবেছে ওরা। কিন্তু এই একটা দিনে লাশ-কাটা ঘরের বাইরে তাদের নামগুলো প্রকাশ্যে যখন ঘোষিত হয় তখন একটা চাপা উত্তেজনা বোধ করে ওরা। এই নামগুলো এখন ওরা এরকম জোরেই এদিন শুনতে চায়। কেবল শাহাবুদ্দিন বা মোফাজ্জলকে ডাকবার সময় প্রায় প্রতিবারই কেরাণী স্বরবর্ণে মনোনিবেশ না করে ব্যঞ্জনবর্ণে হোঁচট খায়।
“শাহাব... উদ্দিন... কীরে মুসলমানের ছেলে লাশকাটতে আসলি কেমনে?”
এমন নয় যে প্রতিমাসেই প্রশ্নটা করে কেরাণী। কিন্তু মাঝেমধ্যেই করে। আর শাহাবুদ্দিনও প্রথম প্রায় না-জানা উত্তরটাই হাতড়ে হাতড়ে দিতে চেষ্টা করত। এখন অবশ্য বুঝতে পারে উত্তরটা দেবার বিশেষ আবশ্যকতা নেই। কেরাণী চায় শাহাবুদ্দিন জানুক তার আর ধনরাজের মধ্যে বিশেষ ফারাক আছে। কিংবা জানুক ধনরাজ। কিন্তু ফারাকটা ভাল করে শাহাবুদ্দিনের কখনোই বোঝা হয় না। বিশেষতঃ যখন শিকভাঙা জানালা দিয়ে সামনের বিস্তরণশীল েেতর দিকে তাকিয়ে থাকে সে, আর পাশের তক্তপোষে ধনরাজ উপুড় হয়ে লালা-ঝরানো অঘোর ঘুমিয়ে Ñ কিছুতেই শাহাবুদ্দিন বুঝতে পারে না। কেবল আবছাভাবে মনে করতে চেষ্টা করে কবে কোন অদৃষ্ট রহস্যে কৈশোরে লাশকাটা ঘর দেখতে সে এসেছিল। তারপর কীভাবে এখানেই থেকে গেছে। হয়তো আর কোনো কাজ ও করতেই পারত না!

কিন্তু ধনরাজ বা শাহাবুদ্দিনের জগতে এই দিনটা, কিংবা দিনটাকে ঘিরে যে দেনাপাওনা, তার পুরা মাহাত্ম্য কখনোই স্পষ্ট হয় না। যখন বেতন হিসেবে কুড়ি টাকা পায় ওরা তখন একটা স্তম্ভিত ফ্যালফ্যালে অনুভূতি তৈরি হয়। বহুণ সেই টাকাটা কোথাও গুঁজে রাখতে ভুলে যায় ওরা। যে যার নোটের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে কেরাণীর ঘর থেকে। আবার ওরা টের পায় এই টাকাটা ওদের কাজের স্বীকৃতি। এমনকি হয়তো একমাত্র স্বীকৃতি যে ওরা সরকারের জন্য কাজ করছে। ওরা এমন একটা কিছু করছে যেটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছুতেই ওরা বুঝতে পারে না সেটা এমন চোরের মতো সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখতে হয় কেন। কেন অনায়াসে আর পাঁচজনে ওদের সঙ্গে পাঁচ-দশটা প্রাত্যহিক আলাপ করে না। কিংবা লাশ-কাটা ছাড়া আর কীইবা করতে পারত তারা। এই সংশয়ের ঘোর অন্য দিনগুলোতে, বিশেষতঃ যখন পেশাগত ব্যস্ততায় কাটে, তাদের মনে অনেক দাগ কাটে না। মাসের তিন, চার বা পাঁচ তারিখে বেতন তুলতে গেলে এটা প্রতিবারেই সামনে চলে আসে। অনেক আলাপ তাদের মুখে আসে না। বরং তারা হাতে-পাওয়া নোটটা নাড়তে নাড়তে প্রত্যেকেই আলাদা করে ভাবতে থাকে। তারপর ফিরে আসে। আবারো তাদের কাজে। এই তিন কামরার দূরবর্তী অফিসে।

তবে হিসেব করে দেখলে বোঝা যাবে ধনরাজদের আয় কেবল মাসকাবারি বেতন এই কুড়ি টাকা নয়। ওরা লাশের মালিকপ থেকেও পয়সা পায়। লাশের মালিক তো আর লাশ নিজে হতে পারে না! তাহলে ওদের পাবার কোনো আশা থাকত না। কিন্তু লাশের মালিক প থাকে। তারা লাশপ্রতি পঞ্চাশ টাকা এমনকি একশ টাকা পর্যন্ত দেয়। একবার মোহনপুরের এক লোক এসেই পাঁচশ টাকা ধরিয়ে দিয়েছিল ধনরাজের হাতে। ধনরাজ ভালরকম ঘাবড়ে গিয়েছিল প্রথম। সেদিনও শাহাবুদ্দিন ছিল। ধনরাজ হাতে টাকাটা পেয়ে শাহাবুদ্দিনের দিকে তাকায়। দুজনেরই মনে হয়েছে কোনো ঝামেলা আছে মামলায়। ওদের বিস্ময় আর চেপে রাখতেও পারেনি।
“পাঁচশো টাকা!”
“এই তো শেষ। আর তো কোনো খরচ নাই।”
কথাগুলো বলতে বলতে লোকটা কেঁদে ফেলেছিল। সেবার লাশ কাটতে গিয়ে কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল ধনরাজদের।

এই বখশিস নেয়া নিয়েও অনেক ভেবেছে ওরা। মরা মানুষের ওপর বখশিস নেয়া ওদের ঠিক মনে হয় না! কিন্তু ওদের এই ভাবনার অনেক ফুরসৎ থাকে না। যখন বেলার পর বেলা, দিনের পর দিন একটা লাশ আসে না বলে লাশ-কাটা ঘরের মধ্যে অলস বসে থাকে, ওরা অনুভব করে এক তীè অপোর ভার। তারপর সচকিত হয় Ñ লাশের জন্য অপো করছে এই ভেবে। তাও অপঘাতে মৃত্যু! গ্লানি বোধ করে। পরিতাপ বোধ করে। কিন্তু পরের প্রহরে আবার অপো করে। এই চক্র থেকে অনায়াসে মুক্তি ওরা পায় না।

তক্তপোশে ঘুমিয়ে পড়েছিল ধনরাজ। শাহাবুদ্দিন সকাল থেকে লাপাত্তা। একটা তক সেই সন্ধ্যা থেকে শিকভাঙা জানালার ওধার থেকে ডাকছিল। জানালার ধারে গিয়ে ধনরাজ খামকাই তকটাকে দেখার চেষ্টা হরে। বিকেলের আলো যখন সবটা শুষে নিল রাত, ধনরাজের বুকটা আচমকাই খালি লাগতে থাকল। তখনই ওর তকের ডাকটা নিদারুণ কর্কশ লাগতে শুরু করে। একবার ভাবল গৌরীর সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসে। কিন্তু ওর গায়ে বেশ ব্যথা। ধনরাজ ভাবছিল জ্বর আসবে বুঝি। তক্তপোশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ধনরাজ বাসায় যাবে নাকি শাহাবুদ্দিনের জন্য অপো করবে তাই ভাবছে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

সারাটা ঘর আগরবাতির গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে আছে। সেই গন্ধে ধনরাজের অবশ অবশ লাগে। ও ঘুমিয়ে পড়ার জন্য খুঁজে একটা বালিশ বের করে। আর কোথা থেকে শাহাবুদ্দিন এসে ধনরাজকে বোঝাতে শুরু করে এখন কিছুতেই ঘুমিয়ে থাকা যাবে না। ওর নাকি টেবিলে গিয়ে শুয়ে পড়তে হবে। আর দূর থেকে ‘টক্কা টক’ ‘টক্কা টক’ Ñ খুব আজব ধরনের ঢাকের বাজনা শুনতে পায় ধনরাজ। সে কথা সে শাহাবুদ্দিনের কাছে জানতে চায়। শাহাবুদ্দিন শুকনো মুখে থাকে। এসবের কিছুই উত্তর করে না। কেবল ধনরাজকে পীড়াপিড়ি করে টেবিলে গিয়ে শুয়ে পড়তে। অথচ ধনরাজের টেবিলে গিয়ে একটুও শুতে ইচ্ছে করছে না। ওর ভীষণ ভয় করছে। আর সেই ঢাকের আওয়াজটা ক্রমশঃ বাড়ছে। ধনরাজের তখন সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগতে থাকে। ওর মনে হয় শাহাবুদ্দিন এর সবকিছুই জানে। শাহাবুদ্দিনকে সে জোর করতে থাকে। ‘আমি ঘুমাব’। শাহাবুদ্দিন তাকে বলে সে নাকি মরে গেছে, তাই টেবিলে শুতে হবে। এরপর সে জোর করে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেতে চায় ধনরাজকে।

শাহাবুদ্দিন ঢুকেই ধনরাজের কপালে হাত দেয়। গরমে পুড়ে যাচ্ছে ধনরাজের গা। শাহাবুদ্দিন নিজের বিছানা থেকে কাঁথাটা এনে ধনরাজের গায়ে দিতেই ধড়মড়িয়ে ওঠে সে। শিকভাঙা জানালার বাইরে কাঁঠাল গাছটার ধারে তখনো তকটা ডাকছে Ñ ‘টিক্ কো, টিক্ কো, টিক্ কো। গত একটা সপ্তাহ ধরে যে লাশের জন্য অপোয় আছে ওরা, অন্ধকারে শাহাবুদ্দিনের মনে হলো সেই লাশই বুঝি ধনরাজ। সুইচ টিপে ষাট ওয়াটের বাতিটা জ্বালায় ধনরাজ। সদ্য ঘুম ভাঙা টসটসে লাল ঘোলাটে চোখ দেখলে কোনো জীবিত মানুষ মনে হয় না। কলসি থেকে মগে পানি ঢালে শাহাবুদ্দিন। হাতে সেই পানি নিয়ে ছিটিয়ে দেয় ধনরাজের চোখেমুখে। ধনরাজ খানিক ধাতস্থ হয়।
“স্বপন দেখিছি।”
“তোর তো জ্বর দেখি।”
“না জ্বর টর কই।”
ধনরাজ খানিক বিব্রত হয়। শাহাবুদ্দিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর ইচ্ছা করে স্বপ্নের পুরা কাহিনীটা বলে। কিন্তু গুছিয়ে বলতে আর ইচ্ছে করছে না। আর এই স্বপ্নের কোনো মাথামুণ্ডুও ও পায় না।
‘বাড়ি যাবি?’
শাহাবুদ্দিনের আকস্মিক প্রশ্নে ধনরাজ কথা খুঁজে পায় না। হঠাৎ ওর ডুকরে কান্না চলে আসে। সেটা সামাল দিতেই মাথার কাছে পুটলি পাকিয়ে রাখা আঁশটে গন্ধের গামছাখানা দিয়ে মুখ মোছার ভান করে ধনরাজ। মাথা নেড়ে জানায় ভাল আছে, বাড়ি যাবে না। শাহাবুদ্দিন এরপর ভাল খবরটা দিয়ে ধনরাজকে চাঙা করবার চেষ্টা করে Ñ
“হাসপাতালে বিষ-খাওয়া রুগি এসিছে।”

অনেকণ শাহাবুদ্দিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ধনরাজ। তারপর সম্ভবতঃ কথাটাকে এগিয়ে নিতেই জানতে চায় Ñ
“কখুন?”
শাহাবুদ্দিন সেই কথার উত্তর করে না। ধনরাজের পাশে এসে বসে Ñ
“এই রুগির টাকাডা তুই নিস। আমারি এবারি দেয়া লাগবি না।”

কিছুই আড়াল নয় জীবন তাদের। দিনলিপি গড়িয়ে গড়িয়ে শিকভাঙা জানালার এপাশ ওপাশ আসা-যাওয়া করে। আর পরস্পর উন্মোচিত হয়। ফলে যে জীবন এই লাশ-কাটা-ঘরের ধনরাজ বা শাহাবুদ্দিনের, বাইরের জীবনে সে জীবনের কোনো অননুপ্রবেশ্যতা নেই। সে জীবনে হাট হয়ে খুলে থাকে তারা। কেবল লাশ-কাটা ঘরে রাখা টিনের মরচে-পড়া দেরাজগুলোর মতো এই ঘরের এক খণ্ডজীবন আড়াল হয়ে থাকে। বাইরে থাকে, আর পরস্পরের কাছেও থাকে। কখনো কোনো অন্যমনস্ক নৈকট্যেও এই জীবনের পুঁথিপাঠ করতে বসা হয় না তাদের। রীতিবদ্ধভাবে তারা রাত্রির জন্য অপো করে, লাশের জন্য অপো করে, রাত্রিশেষে সকালের জন্য অপো করে। আর দুরূহ একেকটি লাশ-কাটা শেষ হলে বখশিসের টাকার জন্য অপো করে। সেই লব্ধ টাকার ভাগাভাগিটাও তারা রীতিবদ্ধভাবে সারে, তারপর যে-যার ঘরে ফেরে, সেই ঘর যেখানে লাশ-কাটা হয় না অথচ প্রতিটা সকালে লাশ-কাটা ঘর থেকে ফেরা জীবন্ত মানুষের জন্য প্রত্যাশা থাকে।

সেই রাত্রিতে অতঃপর, দুটি জীবন্ত মানুষ একটি লাশের জন্য অপো করে চলে। বাইরের তক কোন কালে তার ডাক থামিয়েছে ধনরাজ বা শাহাবুদ্দিন তা ল্যও করেনি। দূরে জেলখানার ঘণ্টায় যখন রাত দুটোর ঘণ্টা বাজে, কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে-থাকা ধনরাজকে নিয়ে শাহাবুদ্দিন বাড়ির পথে রওনা হয়। ধনরাজের জ্বর বোধহয় আরো বেড়েছে।

ফজরের আজানও শুনতে পেল শাহাবুদ্দিন। তারপর পুবের আকাশ আরো ফর্সা হলে ধনরাজের বাসার দিকে রওনা দেয়। যে লাশ রাতে এসে পৌঁছোয়নি সেই লাশ সকালেই আসবে হয়তো। গৌরী জানত যেন সকালে শাহাবুদ্দিন আসবে। ধনরাজের মতোই মুখ গুঁজে-থাকা ছোট্ট চালাখানার সামনে ততোধিক গুটিসুটি মেরে সে বসেই ছিল। গৌরীর ঘোলাটে চোখের দিকে শাহাবুদ্দিনের তাকাতে সাহস হয় না। গত ক’দিন ধরে শাহাবুদ্দিন শুধু মরা মানুষের মুখ দেখে Ñ রাস্তায়, হাসপাতালের ওয়ার্ডে, কোর্টের সামনে দিনের বেলার জটলায়। শাহাবুদ্দিনকে দেখে হাসতে গেল গৌরী। শাহাবুদ্দিনের একটুও হাসি আসল না। ধনরাজ ওদের কথা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওর চেহারা দেখে শাহাবুদ্দিন একাই হাসপাতালে আসতে চেয়েছিল। ধনরাজ তা শোনেনি।

হাসপাতালে এসে ওরা এমার্জেন্সিতে ঢুকতে পারেনি। গার্ড বলেছে পুলিশ আবার আসবে। লাশের লোকজন পুলিশের জন্য বসে আছে। শাহাবুদ্দিন আর ধনরাজ দুজনেই তাকিয়ে থাকে পরস্পরের দিকে। একটা আশঙ্কা ততণে শাহাবুদ্দিনকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। আর ধনরাজের নিস্তরঙ্গ চোখ আরো স্থির আরো মৃতবৎ হয়েছে। পুলিশের গাড়ি ঢুকলে তারা এমার্জেন্সির মাঝারি কুঠুরিখানার কোণাকুণি ডান হাতে জেনারেল ওয়ার্ডের বারান্দাতে আসে। একটু পরে দারোগা রুগির আত্মীয় সমেত এদিকেই আসতে থাকলে ওরা ফুলের বাগানটার সামনে গিয়ে বসেছিল।

দারোগাকে চলে যেতে দেখে শাহাবুদ্দিন ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়ায়।

ধনরাজ তখনো গামছায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে আছে। শাহাবুদ্দিন তাকিয়ে দেখে ধনরাজ কাঁপছে। ভয় পেয়ে বসে পড়ে ও। ধনরাজের গায়ে হাত দিতেই সে মাথা এলিয়ে দেয় শাহাবুদ্দিনের কাঁধে। কোনোমতে তাকে খাড়া করিয়ে বসিয়ে দিয়েই শাহাবুদ্দিন ছোটে এমার্জেন্সির গার্ডের সঙ্গে কথা বলতে। এ দফা এমার্জেন্সির গার্ডকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে হয় না শাহাবুদ্দিনের। ওকে দেখেই ঠোঁট উল্টে গার্ড বলে দেয় ‘ফয়সালা শেষ।’

থুৎনিটা বুকের কাছে চেপে ধরে রেখে প্রাণপণে চোখ তুলে ধনরাজ তাকিয়ে আছে শাহাবুদ্দিনের আসতে থাকার দিকে। ওর আধবোঁজা চোখের দিকে তাকাল শাহাবুদ্দিন। সেই চোখ আরো বুঁজে আসছে।

আর শাহাবুদ্দিন ধনরাজের দিকেই আসছে।

খবর নিয়ে।

৩১শে অক্টোবর ২০০৪ -- ০৭ই মে ২০০৫। হিগাশি-হিরোশিমা

প্রকাশ: ওয়েবজিন পরবাস, সংখ্যা ৩৫, http://www.parabaas.com
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×