পাদটীকা শিরোধার্য
অনুরোধের আসরে গান গাইবার অভ্যাস আমার ছিল। কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করেছিলাম লেখালেখির জগতে কিছুতেই অনুরোধে ঢেঁকি গেলা অভ্যাস গড়ে উঠতে দেব না। শক্ত একটা মনের মালিকানার কারণে এবং মুখ্য দৈনিকসমূহের প্রিয়পাত্র না-হবার কারণে আমার পক্ষে এই ফয়সালা অনুযায়ী আমার চলতে সমস্যা হয় না। তারপরও মাঝেমধ্যে হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলি যখন আমার গড়িয়ে গড়িয়ে আলসেমি উপভোগ করার কথা তখন আসলে কোনো একটা তারিখসীমা খচখচ করছে। এবং উপরোধটা না রাখলেও চলত। ততক্ষণে একটা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়ে গেছে। নিতান্ত সাধারণ কাজ হয়তো। আমার মুকুটে তেমন কোনো পালক সংযোগও তা ঘটাবে না। এমনকি অনুরোধে রাজি হবার কারণে ও ধরনে সম্পাদক বড়জোর আমাকে আরও ছোট লেখক মনে করলেন যতটা মনে করে যোগাযোগ করলেন তার থেকেও। তারপরও সেটার তারিখসীমার কামড়ানি আমি খেয়ে চলেছি। আমার এই নিতান্ত আহাম্মুকিজনিত কাজবৃদ্ধিকে আমি 'কচু লাগিয়ে চুলকানি' হিসেবে দেখি। কিন্তু হয়। নৃপ অনুপের অনুরোধে এ দফা আমি লিখতে বসিনি। কিন্তু তিনি যে অনুরোধ করেছেন সেটা স্বীকার না-করা অস্বস্তির কারণ হবে।
মূলপ্রসঙ্গ পাদদেশে
জা.বি. শিক্ষক সমিতি বেশ কয়েকটা মীটিং করেছে। সবগুলোর তারিখ ঠিকঠাক মতো দিতে গেলে আমার আবার অহেতু কিছু লিপিমালা এদিক সেদিক থেকে যোগাড় করতে হবে। কিছু অধ্যাপক ছানোয়ার হোসেন-কে কথিত সেই মারধরের ঘটনার রাত্রিতেই সিন্ডিকেট তড়িঘড়ি ৬ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করার পর শিক্ষক সমিতির নেতৃবর্গের (একাংশের) মূল লক্ষ্য ছিল শাস্তিটাকে পাকাপোক্ত করার। আবছা আমার মনে পড়ে ২১শে অক্টোবর ঘটেছে কথিত পিটাপিটির ঘটনা। ওই রাত্রেই সিন্ডিকেটের বহিষ্কার এবং পরদিন শিক্ষক সমিতির জরুরি সভায় ২৯ তারিখের সীমারেখা বেঁধে দেয়া হয়েছিল। মূল দাবি ওই ৬জনের সবধরনের সদনবাতিল সমেত বহিষ্কার। কোনো এক কারণে, যদ্দুর মনে পড়ে, ২৯তারিখের সময়সীমার পর শিক্ষক সমিতির সভা বসতে বসতে ০৬ই নভেম্বর হয়। এবং সম্ভবত ওই তারিখ থেকেই শিক্ষক সমিতি অনির্দিষ্ট কালের জন্য দিনে এক ঘণ্টা অন্ততঃ কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্মবণ্টনে এই ঘণ্টা গুরুতর কোনো আছর ফেলার সম্ভাবনা নেই কিন্তু সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য অন্যত্র। নিশ্চয়ই সেটা বোধগম্য। এখানে উল্লেখ করার মতো আরেকটি বিষয় হচ্ছে এই যে শিক্ষক সমিতির সভায়/সভাগুলোতে কিছু শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে এবং না-করে ব্যাপক নিন্দামন্দ করা হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী যে এই নিন্দামন্দের টার্গেটদের একজন আমার না হয়ে উপায় নেই। আমাদের অপরাধ মূলত এই যে একজন সহকর্মীর প্রহৃত হওয়ার ঘটনাকে আমরা 'পরিকল্পিত'ভাবে অন্য দিকে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করছি। এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের 'যোগসাজশ' আছে।
বটেই তো! আমাদের সম্পর্ক আছে তো! আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছে। আন্দোলন থামানোর জন্য যে পেটোয়া বাহিনী নামানো হয়েছে তাদেরও আমরা শিক্ষক। শিক্ষক সমিতিরও আমরা এখনো অবহিষ্কৃত-থাকার-সুবাদে সদস্য, ফলে সহকর্মীদের সঙ্গেও আমরা সম্পর্কিত। এমনকি যে বেচারা ছানোয়ার হোসেন প্রহৃত হয়েছেন বলে জানা যায় তাঁরও আমরা দুর্ভাগা সহকর্মী।
আমাদের এই 'আমরা' ঐতিহাসিকভাবেই ঘন একটা বস্তুপিণ্ড নয়। অন্ততঃ জনাব ছানোয়ার হোসেন-এর এই 'দুর্দিনে' যাঁরা এগিয়ে এসেছেন সেই পেশাজীবী শিক্ষকদের মতো ঠাসাঠাসি করে পরস্পর একত্র-থাকা মাস্টার আমরা নই। আমাদের দরকার পড়ে না। যে যার ক্লাস আর গার্হস্থ্য অর্থনীতি সামলে সুমলে চলি। প্রতি সন্ধ্যায় পানি-পড়া আনতে কারো দরবারে যাওয়া লাগে না। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে আমাদের সমস্যা হয় না। আবার কখন কী কর্তব্য তা ঠিক করার জন্য ক্যাম্পাসে বা বাইরে কারো বাসায় দমবন্ধ উত্তেজনায় বসে থাকতে হয় না। কিংবা ক্যাম্পাসের ঠিকাদার মাস্তান দলের (বা দলদ্বয়ের) সঙ্গে বৈঠক করার দরকার পড়ে না। তারপরও 'নেতৃবর্গীয়' শিক্ষকদের কাছে আমরা হচ্ছি 'আমরা'।
জনাব ছানোয়ার হোসেন-এর মওকুফপ্রাপ্তি এবং ৬জন শিক্ষার্থীর শাস্তি (মওকা পেলে আরও শিক্ষার্থী এই তালিকায় চলে আসতে পারেন কিন্তু) গভীরভাবে সম্পর্কিত বিষয়। এটা ক্যাম্পাসের ইতিহাস সম্পর্কে ক্রিটিক্যাল একটা দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেই কেবল বোঝা সম্ভব। যাঁরা জনাব ছানোয়ার হোসেন-কে পিটিয়েছেন তাঁরা কাজটা ভাল করেননি। খুবই খারাপ কাজ করেছেন। উপরন্তু, এটা করার মাধ্যমে নির্জীব এবং গতিমুখহীন শিক্ষক রাজনীতি (পড়ুন কোস্তাকুস্তি, দলবাজি, গদি দখলের ছ্যাঁচড়া লড়াই) চাঙ্গা করে দিয়েছেন। জনাব ছানোয়ার হোসেন-এর মার খাবার অছিলায় ময়দানে নেমেছেন এমন একদল শিক্ষক যাঁরা সদ্যগদিবিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যের গদিবিযুক্তিকে বেদনার সঙ্গে নিয়েছেন। যাঁরা সেই ভদ্রলোককে আবার চালক-আসনে দেখতে চান (এবং ভদ্রলোক নিজেও তাই চান; বা অন্তত ক্যাম্পাসের ক্ষমতা-ক্রীড়ায় মুখ্য চালিকাশক্তি থাকতে)। পক্ষান্তরে যেসব শিক্ষক 'নেতা' এই অংশের লোক নন তাঁরা নিজেদের জড়ো করে পুষ্ট হয়ে উঠতে চাইছেন। লক্ষ্য রাখা দরকার, অধ্যাপক ছানোয়ার প্রপঞ্চ তাঁদেরকে আর কিছু না হলেও গোলাম মোস্তফার কেইসটা আবার চাঙ্গা করে দেবার সুযোগ দিচ্ছে যে মোস্তফা আবার সেই অংশের লোক। 'হতভাগ্য' শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন এখানে একটা উছিলা মাত্র।
এটাও এখানে মনে রাখা দরকার যে ক্যাম্পাসের প্রশাসন ও অপ্রশাসনিক ক্ষমতা বলয়ের মানুষজনের সবচাইতে সমস্যা হয় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের বাইরে-থাকা অপরাপর রাজনৈতিক দলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এবং 'সাধারণ' শিক্ষার্থীদের নিয়ে। স্ট্যাটাস-ক্যুও বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক 'শৃঙ্খলা' বজায় রাখা যে জরুরি সেটা তাঁরা অভিজ্ঞতা (ও মুৎসুদ্দিপনা) দিয়ে জানেন। ফলে সাধারণভাবে 'আন্দোলন'পন্থী শিক্ষার্থীদের সুযোগ পেলেই দু' ঘা লাগিয়ে দেয়া একটা বহুকালের-চর্চা। এই জায়গাতে গদিপন্থী সকল শিক্ষকনেতাই মিত্রপক্ষ তা তাঁদের নিজেদের মধ্যে যতই না কেন কোন্দল থাকুক। জনাব ছানোয়ার হোসেন-কে আঘাত করে এই জাতীয়তাবাদী কিসিমের জোস উস্কে দিয়েছেন ওই শিক্ষার্থীরা (এক ইয়ে লোকান্তরে, লক্ষ ইয়ে ঘরে ঘরে ... এরকম আরকি!)। সেটা বিচক্ষণ কাজ হয়নি।
"ক্যাচ মী ইফ য়্যু ক্যান"
এরকম একটা পরিস্থিতিতে আপনার তৎপরতা যদি এই চরদখলের রাজনীতিতে সামিল করতে না চান পেশাজীবী হিসেবে তাহলে আপনি কী করবেন? অনেক রাস্তা খোলা নেই। থাকে না। প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় এবং রাষ্টোর্ধ্ব কারকপক্ষের যে জটিল যোগাযোগ সেগুলো হিসেব কষে দেখার বিষয় আছে। এটা একটা ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ যে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় আজকের জায়গায় এসেছে এবং কেন এই জায়গায় চাইলেই আপনি প্রতিরোধের জন্য একগাদা লোক সঙ্গে পেয়ে যান না। এই অবস্থায় গুরুতর আলাপ না করেই আপনি কিছু কাজ করতে পারেন। অবশ্যই আপনার চালচলনে, কথায়-বলনে একটা স্পর্ধা বয়ে বেড়ানোর কাজ। এটা সম্ভবত লাইফস্টাইল এনার্কিজমের মধ্যে পড়ে। এটা অনেকটা এই কথা অব্যক্তভাবে বলার মতো: "আপনাদের পারস্পরিক মাসল দেখানোর এই ঘোষণা আমি থোড়াই কেয়ার করি। আমি আমার মতো করে এখানে আছি। কাজ করছি। পারলে আমাকে ধরেন।"
দীর্ঘকালীন কোনো ফয়সালা এটা নয়। তা কোন আন্দোলনই বা ফয়সালা?! ফয়সালা হয় না বলেই তো আন্দোলন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

