মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
‘বৈজ্ঞানিক বিস্ময়’ সনাক্ত করার জন্য কুর’আন পড়া
অতিসম্প্রতি, বিশেষত বর্তমান হিজরীর শুরু থেকে কুর’আনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময় এক বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে যা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে, পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় মুসলিম বিশ্ব যে অনেক পিছিয়ে পড়েছে, এই সত্য উপলব্ধি করে সম্ভবত হীনমন্যতাবশতই, এই হিজরী শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও লেখকই এই কথাটা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন যে, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কুর’আনের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং উভয়ের কোন বিরোধই নেই। কুর’আনের ব্যাখ্যা বা তাফসীর লিখতে গিয়ে বিজ্ঞানের সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা এ যুগেই যে প্রথমবারের মত করা হলো তা নয়। বিজ্ঞানের ভিত্তিতে যারা কুর’আন ব্যখ্যা করতে চেয়েছেন, তাদের মাঝে আবু হামিদ মুহম্মাদ আল গাজ্জালীকেই প্রথম বলে বিবেচনা করা হয় - যদিও বিজ্ঞানের সাহায্যে কুর’আনের ব্যাখ্যা দিতে চাওয়া পুরানো ও আধুনিক স্কলারদের ভিতর দৃষ্টিভঙ্গীর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। সাধারণত, আগের স্কলাররা কুর’আনকেই তাদের বিশ্বাস ও জ্ঞানের ভিত্তি বলে গ্রহণ করতেন এবং তাদের সমকালীন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কোনগুলি কুর’আনকে সমর্থন করে সেটা হয়তো উল্লেখ করতেন। পক্ষান্তরে আধুনিক যুগের অনেক লেখক বা স্কলাররাই বিজ্ঞানকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এবং কুর’আনকে এমন ভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন যা এসকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সমর্থন করবে - যদিও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো মোটেই ঐসব থিওরীর প্রতি ইঙ্গিত করেনি।
যাহোক্, কুর’আন নিজেই যে এক অলৌকিক বিস্ময় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুর’আনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়সমূহকে সঠিকভাবেই কুর’আনের অলৌকিক প্রকৃতির একটা দিক বলে ধরা যেতে পারে। এই বিস্ময়কর দিকটা কিছু মানুষকে এ ব্যাপারে আরো নিশ্চিত বিশ্বাস দান করেছে যে, কুর’আন আসলেই সত্য। অমুসলিমদের ইসলামের পথে ডাকার জন্য এ ব্যাপারটাকে একটা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কুর’আনের অলৌকিক প্রকৃতি যা রাসূলের (সা.) সত্যবাদিতা প্রমাণ করে, সেটাকে কুর’আনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহের একটি বলে বর্ণনা করেছেন কুর’আনের বিখ্যাত তাফসীরকার ইবনে আশুর। আল্লাহ্ মানবজাতিকে কুর’আনের সদৃশ কিছু উপস্থাপন করতে চ্যালেঞ্জ করেন। সুতরাং কুর’আনের কোন তাফসীরকারের কার্যবিধির একটা অংশ হচ্ছে কুর’আনের অলৌকিক প্রকৃতিকে প্রস্ফুটিত করে তোলা। কিন্তু তিনিও মনে করেন যে, কুর’আনের ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’কে ন্যূনতম পর্যায়ে সংযত রাখা উচিত এবং সেগুলো যেন কুর’আন শিক্ষার এক মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে না দাঁড়ায়।’ আমরা এখানে ঠিক একথাটাই জোর দিয়ে বলতে চাচ্ছি:
বৈজ্ঞানিক বিস্ময়সমূহ সনাক্তকরণ এবং বিস্তারিতভাবে সেগুলোর গভীরে প্রবেশ করে সেগুলো অধ্যয়ন কুর’আন শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। আসলে কুর’আনের সত্যিকার দিকনির্দেশনা লাভের জন্য কুর’আনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়সমূহ সনাক্তকরণ আবশ্যক নয়। এজন্যই রাসূলের (সা.) সাহাবীগণ, যাঁরা সঠিকভাবে কুর’আনকে প্রয়োগ করার ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রগামী, তাঁরা কুর’আনের এই দিকটি নিয়ে তেমন একটা ভাবেননি, তথাপি তাঁরা কুর’আন বুঝেছিলেন এবং কি করে তা প্রয়োগ করতে হবে তাও জেনেছিলেন।
একজন পাঠক, যিনি কেবল বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা খুঁজতেই ব্যস্ত, তার জন্য এদিকটায় অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ বিপদ বয়ে আনতে পারে। কেননা, তিনি যে আয়াতটি পড়ছেন, সে আয়াতটির অন্তর্নিহিত মর্মকথাটি হয়তো তিনি বুঝতে ব্যর্থ হবেন। তিনি হয়তো কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ের গবেষণায় জড়িয়ে পড়বেন - যেগুলো তার দিকনির্দেশনা লাভের জন্য মোটেই আবশ্যক নয় - অথচ, তা করতে গিয়ে, ঐ আয়াত যে বৃহত্তর দৃশ্যপট বর্ণনা করছে, সেটা হয়তো তার চোখ এড়িয়ে যাবে। নিম্নলিখিত আয়াতটি হচ্ছে এধরনের সম্ভাবনার এক উত্তম উদাহরণ :
“তুমি কি দেখনি তোমার প্রভু কিভাবে ছায়া ছড়িয়ে দেন? তিনি চাইলে সেগুলোকে স্থির রাখতে পারতেন। কিন্তু আমরা সূর্যকে এর নির্দেশক বানিয়ে দিয়েছি। তারপর আমরা এটাকে নিজেদের কাছে প্রত্যাহার করে নিই, এক ধীর ও গোপন প্রত্যাহার।” (সূরা ফুরক্বান, ২৫:৪৫-৪৬)
এই পর্যায়ে যে কেউ এই আয়াতের কথাগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করতে পারে এবং সেগুলোর সাথে ছায়াসমূহের প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা ছায়াসমূহের সাথে সূর্যের সম্পর্কের বিষয়ের সংশ্লিষ্টতা বের করার চেষ্টা করতে পারে। এই ধরনের আয়াতের সম্ভাব্য প্রধান উদ্দেশ্য কি - সে বিষয়ে মুহাম্মাদ কুতুব এক দৃষ্টি উন্মোচনকারী আলোচনা করেছেন।
কুতুব লিখেছেন যে, এই আয়াতের শব্দগুলিতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কোন নতুন বা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার যে রয়েছে এমন কোন কথা নেই। তবু, এই আয়াত পড়ার পরে কেউ, যে দৃষ্টিতে ছায়াসমূহ দেখে থাকতো তা পরিবর্তন হবার কথা। প্রতিদিন একজন মানুষ ছায়া দেখে থাকে এবং এও দেখে থাকে যে দিনের বিভিন্ন সময়ে সেগুলো কিভাবে বড় থেকে ছোট এবং ছোট থেকে বড় হয়। একটা গরম দিনে, ছায়ায় বসে নিজেকে ঠান্ডা করা ছাড়া, ছায়া নিয়ে ভাবতে গিয়ে কেউ বিশেষ সময় ব্যয় করে না। কিন্তু উপরের দুটি আয়াত দৈনন্দিন জীবনের এই সাদামাটা ব্যাপারটাকেও সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখার দাবী জানায়।
এই আয়াতগুলো এটা পরিষ্কার করে দেয় যে, ছায়াগুলো নিজ থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে না। একইভাবে আজকাল যেমনটি বলা হয়, ব্যাপারটাকে এই বলে ঢালাওভাবে ‘প্রকৃতির নিয়ম’ বলে শেষ করে দেয়া যায় না। বরং এই বলে “তুমি কি দেখনি কিভাবে তোমার প্রভু ছায়া ছড়িয়ে দেন?” বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ্ই প্রতিদিন এগুলো পরিবর্তন করছেন। দৈনন্দিন ভিত্তিতে আল্লাহ্ই এগুলোকে সরাচ্ছেন ও পরিবর্তন করছেন। আর তিনি যদি চান তবে তাৎক্ষণিকভাবে সকল গতি ও পরিবর্তন থেমে যাবে। যদি আল্লাহ্ তা চাইতেন, পৃথিবীর কোন শক্তিই কখনোই তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারতো না।
বিশ্বাসীগণসহ অনেক মানুষের বেলায়ই যা ঘটে থাকে, তা হচ্ছে এই যে, তাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশে আল্লাহর নিদর্শন দেখে তারা পরিতৃপ্ত ও অভ্যস্ত হয়ে যায়। তারা সেগুলোকে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন ‘প্রকৃতির নিয়ম’ বলে ভাবতে শুরু করে। তারা সেহেতু আসলে কি ঘটে যাচ্ছে তা দেখার মত দৃষ্টিশক্তি হারায় - যার প্রতি এই আয়াতগুলো দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও এই নির্দশনগুলো তাদের চারপাশে সার্বক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তবুও এগুলো বোঝার ব্যাপারে তাদের অন্তরে আর বোধশক্তি থাকে না - কেননা, তারা এই নিদর্শনগুলোকে সঠিক পদ্ধতিতে অনুধাবন করছে না।
আমাদের চারপাশে কেবল আল্লাহর সৃষ্ট কিছু ‘নিয়ম’ কার্যরত - ব্যাপারটা বাস্তবে কিন্তু সেরকম নয়। পবিত্র কুর’আন বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যা কাউকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়: আল্লাহ্ই ওগুলোকে সারাচ্ছেন এবং তিনিই সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন, সুতরাং একজন মানুষ তার চারপাশের এই নিদর্শনগুলোকে দেখলে তার আল্লাহর কথা স্মরণ হওয়া উচিত, যাঁর সৃষ্টি ও প্রজ্ঞা সবসময়ই তার চারপাশে বর্তমান। সে যখন এই নিদর্শনগুলোকে দেখে, তখন তাকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আর এই নিদর্শনগুলো যেহেতু তার জীবনে প্রতিদিনই তার চারপাশে রয়েছে, সুতরাং সেগুলো সবসময়ই তাকে তার সৃষ্টিকর্তা ও প্রভুর কথা মনে করিয়ে দেয়। চারপাশের প্রকৃতিতে ‘আল্লাহর উপস্থিতি ও কাজের’ অনুভূতি ছাড়াও, একজন মানুষের মনে আল্লাহর বিরাটত্ব ও আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞার ধারণা জন্মায়। যিনি এই পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং এই পৃথিবীর কর্মকাণ্ডকে নিখুঁতভাবে সমাধা হবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই কারো কল্পনাশক্তিতে যা ধারণ করা যায় তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি বড় ও জ্ঞানী। এই অনুভূতি পর্যায়ক্রমে কাউকে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়: আল্লাহ্, যিনি এই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য বা কারণ ছাড়া এমনি এমনি এতকিছু সৃষ্টি করেননি। এ পর্যায়ে কেউ সৃষ্টির মাঝে নিজের একটা ভূমিকার কথা এবং তার প্রভুর কাছে তার দায়বদ্ধতা বুঝতে শুরু করে। প্রকৃতিকে অবলোকন করা এবং আল্লাহর বিরাটত্ব ও প্রজ্ঞা অনুধাবন করে এর স্বাভাবিক ও অপরিহার্য অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রক্রিয়া কুর’আনের নিম্নলিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে :
“আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে এবং বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এটা [অর্থাৎ, এই সব] অর্থহীনভাবে সৃষ্টি করেননি, আপনি পবিত্র, আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। ‘হে আমাদের প্রতিপালক! কাউকে আপনি আগুনে নিক্ষেপ করলে তার লজ্জাকর অবস্থা হয় এবং যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই; হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে (এই) আহ্বান করতে শুনেছি: 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনো!' সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পাপ ক্ষমা করুন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করুন এবং আমাদের সৎকর্মশীলদের সাথে মৃত্যু দান করুন। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদের যা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আমাদের দান করুন এবং শেষ বিচারের দিনের লজ্জা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আপনি কখনোই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।’ ” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯০-১৯৪)
উপরের আয়াতগুলো কেবল একটা উদাহরণ। এই ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে, যেগুলো এই পৃথিবীর কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট অথচ আশ্চর্যজনক দিকগুলোর প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আয়াতগুলো যে কাউকে স্রষ্টার বাস্তবতা এবং সৃষ্টির মাঝে মানুষের সত্যিকার অবস্থান কি তা মনে করিয়ে দেয়। সেগুলো থেকে পাঠক সতর্কবাণী সহকারে এমন একটা শিক্ষা লাভ করে, যা সারাজীবন তার সাথী হয়ে থাকে : (এই শিক্ষা) যে, এই মহাবিশ্ব, কোন প্রয়োজনীয়তা বা উদ্দেশ্য ছাড়াই, কাকতালীয়ভাবে সংঘটিত এক বিস্ফোরণের ফলশ্রুতিতে উদ্ভূত কতগুলো বৈজ্ঞানিক নিয়ম দ্বারা গঠিত নয়। বরং এই মহাবিশ্বের কর্মকাণ্ড একজন প্রভুর ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে - যিনি মানবকুলকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। উপরন্তু, তিনি চাইলে, সৃষ্টির নিয়মাবলীর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক সমাপ্তি ঘটাতে পারেন। সুতরাং, আল্লাহ্ যে মহাবিশ্বের কর্মকাণ্ডগুলোকে যথাযথভাবে ঘটতে দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত দয়া করছেন এবং আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে অর্থহীনতায় পরিণত করছেন না, সেজন্য আমাদের উচিত তাঁর শুকরিয়া আদায় করা। আল্লাহ্ যদি আমাদের সফল হতে না দেন, তবে আমাদের সকল প্রচেষ্টা শূন্যতায় পর্যবসিত হবে - এই সত্যটা অনুধাবন করে আমাদের সবসময় দুর্বিনীত ভাব পরিহার করে চলা উচিত।
সূরা আল-ওয়াক্বিয়ায় এ বিষয়টা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
“তোমরা কি ভেবে দেখেছো তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে? তা কি তোমরা সৃষ্টি কর না আমরা সৃষ্টি করি? আমরা তোমাদের মধ্যে মৃত্যু নির্ধারিত করেছি এবং আমরা অক্ষম নই - তোমাদের গঠন বদলে দিয়ে পুনরায় নতুন রূপে তোমাদের সৃষ্টি করার ব্যাপারে - যা তোমাদের জানা নেই। তোমরা তো প্রথম সৃষ্টি সম্বন্ধে জেনেছো, তবে তোমরা অনুধাবন কর না কেন? তোমরা যে বীজ বপন কর সে সম্বন্ধে চিন্তা করেছো কি? তোমরা কি তা অঙ্কুরিত কর, না আমরা তা অঙ্কুরিত করি? আমরা ইচ্ছা করলে সেটাকে খড়কুটায় পরিণত করতে পারি, তখন তোমরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে; (বলবে) ‘আমরা তো দায়গ্রস্ত হয়ে পড়েছি,’ বরং (বলবে) ‘আমরা তো সর্বস্ব হারিয়েছি।’ তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্বন্ধে তোমরা কি ভেবেছো? তোমরা কি মেঘ থেকে তা নামিয়ে নিয়ে আসো, না আমরা তা বর্ষণ করি? আমরা চাইলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না? তোমরা যে আগুন জ্বালো, তা লক্ষ্য করে দেখেছো কি? তোমরাই কি তার (জন্য জ্বালানি) বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমরা সৃষ্টি করি? আমরা একে নিদর্শন ও মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু (হিসেবে সৃষ্টি) করেছি। সুতরাং তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। ” (সূরা ওয়াক্বিয়া, ৫৬:৫৮-৭৪)
উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রকৃতি সম্বন্ধে কারো জ্ঞান আরো বেশি সমৃদ্ধ না করলেও, তারা প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গী উপহার দেয় - যে দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের চারপাশের প্রকৃতির মাঝে আল্লাহর কর্তৃত্বের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এবং সেই সঙ্গে তাঁর বিরাটত্ব ও সর্বময় জ্ঞানের কথাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়। এই ধরনের আয়াতসমূহের সঠিক অনুধাবন, একজন বিশ্বাসীর উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। এই উপলব্ধি সমেত একজন বিশ্বাসী যখন তার চারপাশের প্রকৃতির দিকে চেয়ে দেখে, তখন সবসময় তার আল্লাহর কথা মনে হতে থাকে - যা তার ঈমান বৃদ্ধি করবে এবং তাকে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করবে। এই পর্যায়ের আলোচনার সারসংক্ষেপে আমরা আবারো বলতে চাই যে, কেউ যদি কুর’আনের দিক নির্দেশনার বৃহত্তর চিত্রটি সনাক্ত না করে, কেবল কুর’আনের বৈজ্ঞানিক বিস্ময়সমূহ আবিষ্কার করতে গিয়ে তার কুর’আন অধ্যয়নের বেশির ভাগ সময়ই ব্যয় করেন, তবে তিনি কুর’আনের জরুরী শিক্ষা ও এর উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হবেন। নবীর সাহাবীগণ - যাঁরা সম্প্রতি উদ্ঘাটিত অনেক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় সম্বন্ধেই জ্ঞাত ছিলেন না, কিন্তু প্রকৃতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্বলিত এসব আয়াত তাঁদের জীবনের জন্য কতটুকু শিক্ষণীয় তা ঠিকই বুঝেছিলেন - তাঁদের উপর কুর’আনের যে প্রভাব বাস্তবায়িত হয়েছিল, আমরা যদি কেবল বৈজ্ঞানিক বিস্ময়ের খোঁজে থাকি, তবে আমাদের জীবনে সেই প্রভাব প্রতিফলিত হবে না।
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের ঠিক আগের র্পবটা রয়েছে এখানে:
Click This Link ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



