কলকাতা থেকে রওয়ানা দিয়ে ২২ ঘন্টা ট্রেন জার্নি শেষে আমরা পৌঁছেছি আগ্রায়। মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম নিদর্শন, ভারতবর্ষের অন্যতম পর্যটন-তীর্থ তাজমহলের আগ্রায়। ২০ হাজার শ্রমিকের ২২ বছরের পরিশ্রম (অথবা ২২ হাজার শ্রমিক, ২০ বছর সময়- ইতিহাসে একদমই কাঁচা আমি)- এর ফসল, শাহজাহান আর মমতাজমহলের অবিস্মরণীয় প্রেমের স্মারক আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। অন্যরকম আনন্দ খেলা করে সবার মধ্যে। প্রেমিক প্রেমিকাদের চেহারায় নতুন এক আভা। যুগশ্রেষ্ঠ প্রেমের প্রতীকের সামনে হাতে হাত রেখে নতুন করে প্রেমের অঙ্গীকার করার অভিপ্রায় দুচোখেই পরিস্ফুট।
কিন্তু সেই তাজমহল দর্শন অত সহজ কম্ম নয়। আমরা বেড়াতে গেলাম আর দারোয়ান দরজা খুলে 'আসুন, আসুন' বলে অভ্যর্থনা জানাবে - ব্যাপারটি মোটেও তেমনটা নয়। 'ফেল কড়ি, মাখো তেল'-এর উত্তর আধুনিক সংস্করণের যুগ। নিজের দেশের লোকের জন্য প্রবেশমূল্য কম হলেও বিদেশীদের কড়ির বদলে কাড়ি কাড়ি টাকা/রূপী/ডলার খসাতে হয়। প্রবেশমূল্য এখানে রূপীতেই। টাকা বা ডলার আগেই ভাঙিয়ে নিতে হয়। দেশীরা বিশ রূপীতে ঢোকার সুযোগ পেলেও বিদেশীদের গুণতে হয় গুণে গুণে সাড়ে ৩৭ গুণ,৭৫০ রূপী। কোন এক সময় বাংলাদেশ ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত হলেও আমরা তো আর ১৯৪৭ সালের আগে তাজমহল দেখতে যাচ্ছি না। আমরা যাচ্ছি ২০০২ এ। ১৯৪৭ পূর্ব যুগে গেলে হয়তো আমরাও একই মূল্য গুণতাম।(এবং সেটা ২০ রূপীর চেয়ে অনেক কম-ই হতো।)
যা-ই হোক , আমরা তো আর অত রূপী খরচ করবো না। তাজমহলের সাথে জড়িত আবেগ হৃদয়কে যতই স্পর্শ করুক, ভাবাবেগে উদ্বেলিত করুক, আমাদের বেশীরভাগেরই হৃদয় অতোটা বড় নয় যে ৪-৫ শ সাল পুরনো একটা মসজিদ-মতো দালান দেখতে অতো রূপী ব্যয় করবো। দু'একজন হয়তো অন্য কোন উপায় না থাকলে তা-ই করতো। কিন্তু 'দশজনে করে যাহা তুমিও করিবে তাহা'
ফর্মূলায় বাকিরা ২০ রূপীতে গেলে তারাও ২০ রূপীতেই যাবে- নচেৎ নয়- এই রকমটাই স্থির হলো।
২০ রূপীতে যে আমাদের পক্ষেও যাওয়া সম্ভব- এই ব্রেকিং নিউজটা দিয়েছেন আমাদের গাইড ফাহিম ভাই। যে ট্যুরিজম কোম্পানী আমাদের সাথে ভ্রমণ- সংক্রান্ত চুক্তিতে আবব্ধ, যারা আমাদের ৭৫ জনকে হিন্দুস্তানের কতিপয় দর্শনীয় স্থান চাক্ষুষ করানোর গুরুভার নিজ স্কন্ধে নিয়েছে ( অবশ্যই টাকা পয়সার বিনিময়ে) , ফাহিম ভাই তার সর্বেসর্বা। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হলো আমাদের 'অপারেশন তাজমহল এন্ট্রেন্স'-এর প্রস্তুতি।
বিরাট আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার প্রথম পদক্ষেপটি হলো নিজেকে ভারতীয় বানিয়ে ফেলা। সানি দেওলের মতো 'ম্যায় হু ইন্ডিয়ান' বলে চিৎকার করে দুনিয়াকে জানান দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তাজমহলের গেটে ঢোকার সময় দ্বাররক্ষী যদি সন্দেহবশত জিজ্ঞাসা করে , তবেই কেবল নিজেকে ভারতীয় বলে পরিচয় দিতে হবে। কিন্তু ঐ দ্বাররক্ষীরা এতই ভদ্র ও আহাম্মক যে, আমি বলব আমি ভারতীয় আর সঙ্গে সঙ্গে সেলাম ঠুকতে ঠুকতে বিশ রূপীর টিকিট হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেবে? - উহু ,মোটেই অতো সহজ না। দ্বাররক্ষী যখন নিবাস জানতে চাইবে, ভারতের কোন একটা এলাকার নাম বলতে হবে। যেমন, কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী, ব্যাঙ্গালুরু ইত্যাদি। অতো বড়ো এলাকা বললেও চলবে না । জানতে চাইবে, কলকাতার কোথায়, এমনকি রাস্তার নামও। বলতে হবে, মেদিনীপুর, বসাক লেন বা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ইত্যাদি। বলতে হবে বাড়ির নম্বর। যে এলাকার নাম বলবো ঐ এলাকার পার্লামেন্ট মেম্বার, মূখ্যমন্ত্রীদের নাম জানতে হবে। ঐ এলাকার পূর্ব-পশ্চিম- উত্তর দক্ষিণের এলাকাগুলোর নাম জানতে হবে; জানতে হবে ঐ এলাকার বিখ্যাত কোন স্থাপনা বা ভবনের নাম। মোট কথা, ভারতের সরকারী ক্যাডার সার্ভিসের প্রিলি পরীক্ষার 'স্বদেশ' অংশের প্রশ্নোত্তরের জন্য তারা যেরকম পড়াশোনা করে, ঠিক সেরকম না হলেও এক রাতে আমাদের তার কাছাকাছি পর্যায়ের পড়াশোনা করতে হবে।
অবশ্য আমাদের বইপত্র পড়ার দরকার নেই। ফাহিম ভাই সংক্ষিপ্ত 'ভারতকোষ'। তার লব্ধ জ্ঞানের কিয়দংশ আমরা ধারণ করার চেষ্টা করি।
প্রশ্ন হলো, আমি কোন এলাকার বাসিন্দা হবো? দিল্লী, মুম্বাই বলে ধরা খাবো নাকি? হিন্দীর 'হ'-ও জানি না। এক-দুই শব্দ চলতে পারে, কিন্তু ঐসব এলাকার বাসিন্দা বলে পরিচয় দিলে যতটুকু জানা দরকার তার ছিঁটেফোঁটাও জানি না। যারা জানে, তারা এই সব নামী দামী শহরজাত বলে নিজেদের পরিচয় দেয়ার অধিকার পেল, সেইসব শহরের সাধারণ জ্ঞানে নিজেদের সমৃদ্ধ করলো।
আমার মতো আকাট-মূর্খ, ক্ষেত শ্রেণীর লোকজনের শেষ ভরসা হলো কলকাতা। রাতের খাওয়া শেষে তাই কলকাতা সম্পর্কে কিছু প্রশ্নোত্তর কাগজে লিখে নিয়ে রুমে গেলাম। কঠিন পড়াশোনায় বসে গেলাম চার রুমমেটই। কতটুকু শিক্ষা হলো তা আবার একজন আরেকজনের কাছে পরীক্ষা দিলাম। আমাকে আবার বাংলাটা কিঞ্চিৎ ঘষামাজা করতে হলো। খেলুম গেলুম আর দাদা দিদি চর্চা 'করলুম' অনেকক্ষণ।
গভীর রাত পর্যন্ত চললো আমাদের 'সাধারণ জ্ঞান' শিক্ষা।
নাম পরিবর্তনঃ 'মারুফডি' থেকে 'মুনতাসীর মারুফ' ,
টুকরো টুকরো ভালবাসা - ৯
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৮:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



