রওয়ানা দেয়ার আগে আরেকবার ফাহিম ভাইয়ের কাছে পরীক্ষা দিলাম সাধারণ জ্ঞানের। সবার প্রস্তুতিই মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু শুধুমাত্র সাধারণ জ্ঞান চর্চার মধ্যেই প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ রইলো না। ফাহিম ভাইয়ের আরো কিছু ইনস্ট্রাকশন ফলো করতে হলো। যেমন, সাজপোশাক হবে সাধারণ; দৃষ্টি কাড়তে পারে এমন সকল সাজ বর্জনীয়। মেয়েদের এমন সাজ ও সজ্জা থেকে দূরে থাকতে বলা হলো যা দ্বারক্ষীদের তাদের প্রতি কিঞ্চিত সময় বেশী দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। যত বেশী সময় দ্বাররক্ষীদের কাছাকাছি থাকা হবে, তত বেশী ধরা পড়ার আশংকা। সঙ্গে পাসপোর্ট বা পরিচিতি জ্ঞাপক কোন ধরণের কাগজপত্র তো হারাম-ই, অন্য কোন কাগজপত্র, মানিব্যাগ, বাড়তি টাকা পয়সা ইত্যাদি নিতেও নিরুৎসাহিত করা হলো। বিশ রূপীর ভাংতি থাকতে হবে অবশ্যই, যাতে টাকা ভাঙানো নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে না হয়। আর ক্যামেরা সাথে থাকবে।
আর 'সবার উপরে আমি সত্য ,তাহার উপরে নাই'। প্রত্যেকে একা ঢুকবে, সর্বোচ্চ একসাথে দুইজন। কাউকে ধরা পড়তে দেখলে তার সাহায্যে অন্য কারো এগিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। ধরা পড়লে শাস্তি তেমন নাই, শুধু ধৃত ব্যক্তি তাজমহলে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু কোনভাবে যদি ওরা টের পায় এইরকম বিশাল একটা গ্রুপ ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাহলে কড়াকড়ি বেড়ে যাবে, শেষে কারোরই আর তাজমহল দেখা না-ও হতে পারে। যে ভেতরে যেতে পারবে না, সে তাজমহলের গেট থেকে একটু দূরে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করবে, কতক্ষণ অপেক্ষা করবে ঠিক নেই। তাজ-দর্শন শেষে ফাহিম ভাই যেভাবে হোক তাদেরকে খুঁজে নেবেন। আর হ্যাঁ, ট্র্যাভেল এজেন্সীর কোন গাড়ি তাজমহলের দুই মাইলের মধ্যেই থাকবে না।
ভিতরে গিয়েও - কেউ কাউকে চিনি না- এমন ভাবে ঘুরতে হবে। ঘন্টা দু-তিন পরে চারদিকের অবস্থা বুঝে একত্রিত হওয়া যাবে। ভেতরে চেকিং বা পরিস্থিতি খারাপ হলে একত্র হওয়ারও দরকার নেই। অচেনা কারো সাথে খোশ-গল্প জুড়ে দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আদেশ-নিষেধের ব্যাপারগুলো ভালভাবে মাথায় ঢুকিয়ে রওয়ানা দিলাম। এবার আর অন্যবারের মতো সবাই দুই বাসে ভাগ হয়ে না, অসংখ্য টুকরায় ভাগ হয়ে রওয়ানা দিলাম তীর্থস্থানের দিকে । আমি যে টুকরায়, সেখানে আরো তিনজন- রনি, মোর্শেদ আর আমাদের সাথে যাওয়া একমাত্র শিক্ষক। হোটেল 'চন্দ্রগুপ্ত' থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিলাম। সে ট্যাক্সিও থামলো তাজমহলকে অনেকখানি দূরে রেখে। তারপর চারজন চারজনের কাছ থেকে এমনভাবে বিদায় নিলাম যেন বহুদিনের জন্য প্রবাসে চলে যাচ্ছি আমরা। গিয়ে দাঁড়ালাম টিকিটের লাইনে । রনি আমার আগে টিকিট কিনলো। আমার সময় এলে কাউন্টারে মুখ বাড়িয়ে 'একটা টিকিট..' বলে থেমে গেলাম। কলকাতার টানে 'দিন না দাদা' বলব নাকি 'দিজিয়ে', 'দো' এইসব বলব - ঐ মুহূর্তে আর সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। এতে অবশ্য টিকিটবিক্রেতার কিছু এলো-গেলো না। সে আামর দিকে ফিরেও তাকালো না। বিশ রূপী নিয়ে একটা টিকিট ধরিয়ে দিল।
টিকিট নিয়ে দাঁড়ালাম প্রবেশ লাইনে। আমার সামনে একজন, তার সামনে রনি। দুজন গার্ড ফটকে। রনির পকেটে হাত দিল এক গার্ড। পকেট থেকে বের করলো ক্যামেরাটা। এই বের করার ফাঁকেই জিজ্ঞেস করলো , সে কোথা থেকে এসেছে। সে শেখানো মতো শহরের নাম বললো। শহরের নাম শুনেই গার্ড সন্তুষ্ট থাকলো। রনির আর জ্ঞানের পরীক্ষা নেয়া হলো না। আমি আরও ঝুঁকিহীন থাকার জন্য পকেটের ক্যামেরাটা হাতে নিলাম। গার্ডের সামনে দাঁড়ালাম। গার্ড আমার শার্টের পকেট বরাবর হাত দিল, প্যান্টের পকেটগুলোর উপর হাত রাখলো। কিছুই তো নেই, পাবে আর কি? হাত ইশারায় ভিতরে যেতে বললো।
শেষ? আমি বিস্মিত!
ভিতরে ঢুকে খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এত সহজে ! কিছুই তো জিজ্ঞেস করলো না! একদম কোন প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে ঢুকে গেলাম তাজমহলের গেট দিয়ে! তাদের কোনই সন্দেহ হলো না? এত প্রস্তুতি, এত টেনশন - বৃথাই? একদিকে বিনা ঝামেলায় ভিতরে ঢুকতে পেরে যেমন আনন্দে উৎফুল্ল, তেমনি অন্য দিকে গার্ডদের উপর কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণও হলাম। কিরে বাপ! এত কষ্ট করে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করলাম, একটু পরীক্ষাও নিবি না!
রওয়ানা দিলাম এবার মূল ভবনের দিকে।
............................
সবাই কিন্তু আমার মতো এতো সহজে পার পায়নি সেদিন। অনেককেই জ্ঞানের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তবে মেয়েদেরকেই তেমন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। এমনকি জুটিরা যারা ছেলেমেয়ে একসাথে গেছে, তারাও ঢুকেছে বিনা বাধায়। নাদিম প্রশ্নোত্তর পারা সত্ত্বেও প্রথমে তাকে ঢুকতে দেয়নি গার্ড। খানিক পরে সে শার্ট বের করে প্যান্টের উপর দিয়ে ঝুলিয়ে, চুলটা খানিক এলোমলো করে ভারতীয় এক পরিবারের পিছে পিছে ঢুকেছে। ইমতিয়াজ ধরাই পড়েছে। কিন্তু সে উল্টো গার্ডের সাথে গলাবাজি করে, আমি ঢাকা মেডিক্যালে পড়ি,কলকাতা মেডিক্যালে আমার ফ্রেন্ড পড়ে, আমি ওর আমন্ত্রণে এসেছি, আমি তো বাঙালী, আমি কেন ঢুকতে পারবো না ইত্যাদি বলে ঢুকেছে। হাসানকে ভারতীয় বলে মানতে চায়নি গার্ড। অবশেষে সে বলেছে, সে থাকে আমেরিকায়, 'ওকলাহামা' ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, ভারতে নানা বাড়ি তার, বেড়াতে এসেছে। হাসান বিদেশীদের মতো ফর্সা, চালচলনে স্মার্ট আর ফটর ফটর ইংরেজী বলায় গার্ড শেষ পর্যন্ত ভিরমি খেয়ে তাকে ঢুকতে দিয়েছে। ধরা খেয়েছেন আমাদের একমাত্র শিক্ষকও। তবে তিনিও তাজমহল দর্শন থেকে বঞ্চিত হননি। শুধু গার্ডদের হাতে উপরি দুইশ রূপী ধরিয়ে দিতে হয়েছে।
ঘুষ জিন্দাবাদ!
ইন্ডিয়া ট্যুর ৩: যেদিন আগে রেডি হলাম, ইন্ডিয়া ট্যুর ২ : রমণীগণ.., ইন্ডিয়া ট্যুর - ১ : ভিনদেশে হিজড়ার খপ্পরে
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



