সহস্রাব্দ-প্রাচীন এই পেশাটি সমাজের কাছে প্রকাশ্যে নন্দিত হয়নি কখনো, কিন্তু সমাজেরই একাংশের প্রয়োজনে ও পরোক্ষ প্রণোদনায় এই পেশা নিয়ত বর্তমান। রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সময়ে পরাজিত প্রতিপক্ষের অসহায় নারী ও শিশুদের ধরে এনে এ পেশায় নিযুক্ত করা হতো। বিজিত শত্র“পক্ষের ছোট বালিকাদের নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বা বাড়িতে এনে তৈরী করা হতো এ পেশার উপযোগী করে। পুরুষের গোপন কামনা চরিতার্থের নিমিত্তে এদের লালন করা হতো। কিন্তু প্রকাশ্যে এই পেশাকে ধিক্কার জানাতো সবাই। সমাজের মূলস্রোত থেকে এদের বিচ্ছিন্ন রাখা হতো সকলভাবেই। মধ্যযুগে শহরের সীমানাদেয়ালের ভেতরে এদের কাজ করার অনুমতি দেয়া হতো না। তবে, শহর থেকে দূরে আলাদা নিজস্ব এলাকায় এই বৃত্তি চলতে পারতো। ফ্রান্স এবং জার্মানীর অনেক শহরে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা রাস্তায় এদের বিচরণ সরকারের কাছে সহনীয় ছিল, এর বাইরে নয়। পরবর্তীকালে দক্ষিণ ইউরোপে নির্দিষ্ট কিছু ব্রোথেল গড়ে ওঠে, যেখানে এই পেশাজীবীদের কাজে কেউ বিঘœ সৃষ্টি করতো না, তবে এর বাইরে পতিতাবৃত্তিকে আইনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। যদিও তখনো পতিতাবৃত্তি আইনত অবৈধই ছিল।
একটা সময় বাংলাদেশেও পতিতাবৃত্তি সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়। অনেক অঞ্চলেই যৌনকর্মীদের আলাদা একটি এলাকা ছিল। লোকজন জানত, অমুক পাড়া বা বাজার বা পট্টিতে পতিতাবৃত্তি চলে, প্রয়োজন অনুসারে পুরুষ সেখানে যেত বা ঐ এলাকা এড়িয়ে চলতো। কাউকে সেখানে ঢুকতে দেখলে মানুষ বুঝতো কেন সে সেখানে যাচ্ছে। ঐ এলাকায় একা বা দলবদ্ধভাবে বিচিত্রবেশে নারীদের দেখে মানুষ বুঝে নিত, এরা কারা। আইনত নিষিদ্ধ হলেও ‘ভদ্র সমাজ’ থেকে কিছুটা দূরে অথচ সবার গোচরেই চালু ছিল এ পেশা। বিচ্ছিন্নভাবে নগরের কিছু উদ্যানেও চলতো পতিতাবৃত্তি। কিন্তু বছর কয়েক আগে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এক দশক আগে নারায়ণগঞ্জের দেড়শ বছরের পুরনো দুটি পতিতালয়সহ দেশের বেশ কটি পতিতালয় উচ্ছেদ করা হয়। শুধু নারায়ণগঞ্জের ঐ দুটি পতিতালয়েই থাকতো প্রায় সাত হাজার যৌনকর্মী। উচ্ছেদ করা হলেও আলয়ের যৌনকর্মীদের যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। যৌনকর্মীরা আর ফিরেও যায়নি স্বাভাবিক জীবনে। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এরা ছড়িয়ে পড়ে শহরের ভেতরে, আনাচে কানাচে। পার্কে এদের আনাগোণা বাড়ে। ভীড় জমাতে শুরু করে হোটেলে। খদ্দেররা মূলত হোটেলমুখী হয়ে পড়ে। ফলে, হোটেলে এ ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে পুলিশ ও র্যাব এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে। ব্যাপক হারে হোটেল থেকে ধরা পড়ে যৌনকর্মী ও খদ্দেররা। ফলে, হোটেলের ব্যাপারে খদ্দেরদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। প্রয়োজন পড়ে হোটেলের বিকল্পের। এই ধারাতেই ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, বাসাবাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে পতিতাবৃত্তি। যদিও হোটেলে পতিতাবৃত্তি বন্ধ হয় নি। মাস দেড়েক আগেও রমনা থানা পুলিশ রাজধানীর মগবাজারের পাঁচটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে দশ দালালকে গ্রেফতার করে।
তবে ধীরে ধীরে ফ্ল্যাট বা বাড়িভিত্তিক পতিতাবৃত্তি বাড়ছে। বহুতল ভবনের কয়েক রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে কেউ কেউ শুরু করেছে ‘সেক্স ট্রেড’। বাড়ির কর্ত্রী সাধারণত বিগত যৌবনা কোন যৌনকর্মী। সেখানে তার আত্মীয়া পরিচয়ে আরো কয়েকটি মেয়ে থাকে, যাদের কাছে আত্মীয় পরিচয়েই আসে খদ্দের। অনেকে আবার বাইরে থেকে যৌনকর্মী নিয়ে এসে ঘন্টাভিত্তিতে রুম ভাড়া নেয়। রাজধানীর অনেক এলাকাতেই গড়ে উঠছে এ রকম মিনি পতিতালয়, পতিতাবৃত্তি ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে। এভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের আশংকা আরো বেশী বাড়ছে, বাড়ছে যৌনরোগের আশংকাও। আগে পতিতাবৃত্তি একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকার কারণে অনেক পুরুষ ইচ্ছে থাকলেও হয়তো লোকলজ্জা বা অন্য কোন কারণে সেখানে যেতে ভয় পেত। কিন্তু এখন আগ্রহী পুরুষদের জন্য যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মোঃ জহির উদ্দিন এ প্রসংগে বলেন, কোন ফ্ল্যাট বা বাসাবাড়িতে যৌনকর্মীর কাছে কেউ গেলেও আশপাশের মানুষ তা বুঝতে পারছে না, ফলে লোকলজ্জার ব্যাপারটি আর থাকছে না। এই সহজগম্যতার কারণেও অনেক বেশী মানুষ যৌনকর্মীর কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে।
এই সহজগম্যতা খদ্দেরদের জন্য হলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যাপারটি দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে। মোঃ জহির উদ্দিন বলেন, আগে যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, যৌনরোগ বিষয়ে জ্ঞান দান, কনডম ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ প্রভৃতি কর্মসূচী হাতে নেয়া সরকারী বা বেসরকারী সংস্থার জন্য কিছুটা সহজ ছিল। কারণ, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অনেক যৌনকর্মী একসাথে পাওয়া যেত এবং তাদের জন্য সমন্বিত কোন কর্মসূচী হাতে নেয়া যেত। কিন্তু এই ফ্ল্যাটভিত্তিক মিনি পতিতালয়ের কারণে এ ধরণের কর্মসূচীর মুখ থুবড়ে পড়ার আশংকা দেখা দিচ্ছে। ফলশ্র“তিতে বাড়ছে এইডস, সিফিলিস, গণোরিয়াসহ মারাতœক যৌনরোগ ছড়ানোর আশংকা।
নারী কেন পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়? এ ব্যাপারে যুগ যুগ ধরে নানা ধরণের তত্ত্ব ও মতবাদ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের মতবাদ অনুসারে, শৈশবে নানা ধরণের শারীরিক-মানসিক বা যৌন নির্যাতন অথবা বাবা-মার উপেক্ষার শিকার মেয়েরা ঝুঁকিপূর্ণ। এর সাথে যদি যুক্ত হয় বেকারত্ব, উচ্চাভিলাষ বা প্রাচুর্যপূর্ণ জীবনের আকাঙ্খা, অথবা বাইরের কোন চাপ বা প্রলোভন, তাহলে নারী জড়াতে পারে এই পেশায়। নারীবাদীদের মতবাদ, পতিতাবৃত্তি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফল। যে সমাজে নারী-পুরুষের লিঙ্গ বৈষম্য প্রকট, সেখানেই পতিতাবৃত্তি বেশী দেখা যায়। তারা বলেন, নারীর মূল্য পুরুষের চেয়ে কম এবং নারীকে কেনা সম্ভব- পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এই ধারণার জঠরেই পতিতাবৃত্তির জন্ম।
পুরুষ তার নিজের প্রয়োজনে পতিতাবৃত্তিকে লালন করে এসেছে প্রাচীনকাল থেকে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অতীতে মেয়েদেরকে যেভাবে পতিতাবৃত্তিতে জড়ানো হতো, তার ধরণে কিছুটা নতুনত্ব ও পরিবর্তন এসেছে।
চাকরীর নাম করে অথবা প্রেমের বা বিয়ের প্রলোভনে মেয়েটিকে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট কোন পতিতালয়ে অথবা পাচার করা হচ্ছে দেশের বাইরে। পরিবার থেকে অনেক দূরে সেখানেই বন্দী থেকে যাচ্ছে মেয়েটি। বাইরে বেরুনোর সুযোগ নেই। ধর্ষণ-নির্যাতন করে, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে পতিতাবৃত্তিতে। অসহায় মেয়েটিকে আজীবন থেকে যেতে হচ্ছে সেই পেশাতেই। পতিতালয়েই হয়তো পিতৃপরিচয়বিহীন সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। সেই সন্তান মেয়ে হলে তাকেও জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে একই চক্রে। অতীতকাল থেকেই এই পেশায় আসতে বাধ্য হওয়া অধিকাংশ মেয়ের দীর্ঘশ্বাসের এই একই কাহিনী।
প্রলোভন এখনও রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা সরাসরি গৃহবন্দী না হয়ে বন্দী থেকে যাচ্ছে অন্যভাবে।
বিয়ের বা প্রেমের দোহাই দিয়ে বাইরে এনে বিক্রির বদলে মেয়েদের এখন আটকানো হয় ‘মোবিক্যামে’র জালে। কথিত প্রেমিক মেয়েটির অজান্তে তাদের অন্তরঙ্গ দৃশ্য গোপনে ধারণ করে মোবাইল ক্যামেরা বা লুকানো ভিডিও ক্যামেরাতে। অনেক সময় সরল বিশ্বাসে স্বেচ্ছায়ই ক্যামেরায় এরকম দৃশ্য ধারণে সহযোগিতা করে মেয়েটি। পরবর্তীতে এই ভিডিওচিত্র দিয়েই ব্ল্যাক মেইল করা হয় মেয়েটিকে, বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে। সেই ‘প্রেমিক’ তখন হয়ে যায় ‘দালাল’। কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোহিত কামাল এ প্রসংগে বলেন, পতিতাবৃত্তির সাথে জড়িত চক্র অনেক সময় একটি মেয়েকে টার্গেট করে। চক্রের একটি ছেলে ঐ মেয়ের সাথে ভালবাসার অভিনয় করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় মেয়েটির বিশ্বাস অর্জন করে তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছেলে। ধীরে ধীরে মেয়েটি এই চক্রের ভেতর জড়িয়ে যায়। ছেলের হাতে নিজের অজান্তেই তুলে দেয় ব্ল্যাকমেইলিংয়ের রসদ। যখন বুঝতে পারে, তখন ফেরার পথ রুদ্ধ। ঐ চক্রের কথামতো কাজ করে যেতে হয়। চার দেয়ালে বন্দী না হয়েও পরের ইচ্ছা-অনিচ্ছার পুতুলে পরিণত হয় সে।
মডেলিং, মিউজিক ভিডিও, সিনেমার নাম করেও মেয়েদেরকে আনা হচ্ছে পতিতাবৃত্তিতে। মডেলিং বা অভিনয়ের সুযোগ দেয়ার নাম করে অখ্যাত কিছু প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন দেয়। রূপালী জগতে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন নিয়ে অনেক মেয়েই আসে সেসব প্রতিষ্ঠানে। স্ক্রিন টেস্ট বা প্রশিক্ষণের নামে তাদের নগ্ন ছবি তোলা হয়, জড়তা কাটানোর অজুহাতে প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোন পুরুষের সাথে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে ছবি তোলা হয়। পরে সেই ছবি দিয়েই ব্ল্যাকমেইল করা হয় মেয়েদের। রূপালী জগতে পা দেবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়, ঐ মেয়েরা হারিয়ে যায় অন্ধকার জগতে, পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয় পতিতাবৃত্তিকেই।
কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট কিছু চাকুরীর অলিখিত শর্তই হচ্ছে পতিতাবৃত্তি। বিশেষত বিজনেস ডিলে ক্লায়েন্ট জোটাতে বা ক্লায়েন্টকে খুশী রাখতে এসব মেয়েদের ব্যবহার করা হয়। চাকরী রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে কিছু মেয়ে জড়িয়ে পড়ে এ কাজে। ২০০৭ এ ইয়াবাবিরোধী অভিযানের সময় আটক কয়েক নারী শিল্পপতি ও বিদেশী ব্যবসায়ীদের সাথে হোটেল, গেস্ট হাউস বা ফ্ল্যাটে গিয়ে শারীরিকভাবে মিলিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
মাদকাসক্তি হাল আমলে অনেক মেয়ের পতিতাবৃত্তির অন্যতম কারণ। ডাঃ মোহিত কামাল বলেন, নারীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষত নেশার উপকরণ হিসেবে ইয়াবা হাল আমলের তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মাদকাসক্ত পুরুষরা তাদের নেশার টাকা যোগাড়ের জন্য জড়িয়ে পড়ে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি প্রভৃতি অপরাধের সাথে। অপরদিকে মাদকাসক্ত অনেক মেয়েই নেশার টাকা যোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে বেছে নিচ্ছে পতিতাবৃত্তির পথ। অনেকেই আছে, যারা শুধু নেশার টাকা জোটাতেই অপর পুরুষের সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয়। কেউ কেউ আবার শয্যাসঙ্গী হওয়ার বদলে টাকা নয়, হেরোইন, কোকেন বা ইয়াবার মতো মাদক উপকরণই সরাসরি নেয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, তথাকথিত প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির দুজনই মাদকাসক্ত; প্রেমিক মাদক বা মাদকের টাকা যোগাড়ের জন্য প্রেমিকাকে ঠেলে দেয় পতিতাবৃত্তিতে।
এদের জন্য সুযোগ হয়ে এসেছে বিভিন্ন ক্লাবের রাতের পার্টি। ‘নাইট ক্লাব’, ‘ডি-জে পার্টি’ প্রভৃতি গালÑভরা নামের আড়ালে কিছু পার্টিতে চলে দেহ ব্যবসা। রাত দশটার পর শুরু হওয়া এসব পার্টিতে মেয়েরা বয়ফ্রেন্ডের সাথে আসে, মিউজিকের তালে তালে নাচ-গানের ফাঁকে পরিচিত কারো মাধ্যমে জোটে খদ্দের। সেই পার্টিতেই অথবা পার্টি শেষে নির্দিষ্ট কোন স্থানে- ফ্ল্যাট, বাসা বা হোটেলে খদ্দেরের সাথে মিলিত হয় মেয়েটি। ছেলেটি হয়তো তার সাথে গিয়েই অন্য রুমে অপেক্ষা করে কিংবা নির্দিষ্ট সময় পরে তাকে গিয়ে নিয়ে আসে। অনেক সময় খদ্দেরই মেয়েটিকে পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট স্থানে।
কিছু মেয়ে স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তিতে আসছে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের লোভে। এদের বেশীরভাগই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রী। সমাজ-মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামগ্রিকভাবেই আমাদের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমান সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছে তেলস্নিগ্ধতনুসর্বস্ব জীবনচর্চা। আমরা যতটুকু পাচ্ছি, ততটুকুতে সন্তুষ্ট নই। ‘স্ট্যাটাস’ বজায় রাখার জন্য আমাদের প্রয়োজন স্বাভাবিক আয়ের বাইরে ব্যতিক্রমী উৎস, উপরি প্রাপ্তি, সাইড বিজনেস। বিত্তবান সহপাঠী বা সহকর্মীর সাথে নিজেকে একই কাতারে অন্তত বাহ্যিকভাবে দেখানোর প্রয়াস আমাদেরকে অস্থির, অসহিষ্ণু করে তোলে। এই প্রজন্মের তরুণীরাও এই মনোজাগতিক আলোড়নের বাইরে নন। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েরা স্বেচ্ছায় পতিতাবৃত্তিতে কতটা আসছে, তা যথাযথ গবেষণা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সার্বিক চাহিদা বৃদ্ধির এই যুগে নৈতিকতার প্রতি পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে সহজ আয়ের এই হাতছানি উপেক্ষা করাও কারো কারো পক্ষে অসম্ভব হতে পারে- এ বিষয়টি তারা অস্বীকার করেন না।
যারা স্বেচ্ছায় আসছেন, তাদের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে ফ্ল্যাটভিত্তিক দেহব্যবসা। ফ্ল্যাটভিত্তিক পতিতাবৃত্তিতে ধরা পড়ার বা পরিচিত লোকজনের মাঝে জানাজানির সম্ভাবনা কম থাকায় কেউ কেউ সহজেই এ পেশায় জড়াচ্ছেন। স্বেচ্ছায় জড়ানো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অথবা প্রবাসীর স্ত্রীরা সাধারণত পার্টটাইম যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিচিত জন বা আবাসিক দালালের মাধ্যমে তাদের কাছে প্রস্তাব আসে। সাপ্তাহিক ২০০০ এ-ই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই শিক্ষিত তরুণীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল (বর্ষ ১১ সংখ্যা ১৫) যাদের একজন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আরেকজন সরকারী একটি কলেজের ছাত্রী। তারা দুজনেই প্রতিবেদকের কাছে বলেছিলেন, অর্থ সংকট মেটাতেই তারা এ পথে এসেছেন, একজন তার রুমমেটের সহযোগিতায়, আরেকজন তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিনিয়র এক আপুর হাত ধরে।
দালাল-প্রথাতেও আসছে পরিবর্তন। একজন দালালের কাছে যৌনকর্মীদের ছবি থাকে, তা দেখে খদ্দেররা পছন্দ করেন। অথবা অনেক ক্ষেত্রে খদ্দেররা সরাসরি যৌনকর্মীদের দেখে পছন্দ করেন। কিছু গেস্ট হাউস বা হোটেলে ছবিসহ তালিকা থাকে যৌনকর্মীদের। খদ্দেরদের পছন্দমতো তাদের ফোন করে আনানো হয়। এখন এই প্রথাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তথ্য মহাসড়কে যুক্ত হচ্ছে যৌনকর্মীদের নাম। কিছু ওয়েবসাইট আছে যাতে যৌনকর্মীদের নাম, যোগ্যতা, যোগাযোগের ফোন নম্বর থাকে। খদ্দেররা সেখান থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
আমাদের সমাজ পেশা হিসেবে পতিতাবৃত্তিকে আইনগত কোন স্বীকৃতি দেয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে এই পেশাজীবীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। নানা সময়ে এই পেশা ও পেশাজীবীদের নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সমাজ-ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সময়ের প্রেক্ষাপটে এর পরিবর্তন হয়তো হয়েছে নানা দিক দিয়ে, কিন্তু এই পেশাটিকে উচ্ছেদ করা যায়নি কখনো।
..... সাপ্তাহিক ২০০০ বর্ষ ১২ সংখ্যা ২৭ (১৩ নভেম্বর, ২০০৯) এ প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



