ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করেছি আমাদের চারপাশ সাফল্যের একটা মানদন্ড তৈরি করে দেয়। আর সেই মানদণ্ডের চাহিদাপূরণ করতে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের নিজেদের ‘ভালছাত্র’ হিসেবে সুচিহ্নিত করতে মরিয়া হয়ে উঠতে হয়।
এইসব ভালছাত্রদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা সুশীল হবে, মেধাবী হবে, পড়ুয়া হবে, ভালো রেজাল্ট করবে, ভালো বিতর্ক করবে, ভালো একটা ক্যারিয়ারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে।
সমাজ, অভিভাবক এবং শিক্ষক চাইবেন ওইসব ভালো ছাত্র অত্যন্ত সুবোধ আচরণ করবে। ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ তাদের জন্য গর্হিত অপরাধ এবং একরকম নিষিদ্ধ। সমাজের ধারণা ভালো ছাত্ররা খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশবে না। খারাপ ছাত্ররা রাজনীতি করবে এবং তারা ভাল ছাত্রদের টেনে হিঁচড়ে মিছিলে নিয়ে যেতে চাইলে শুভরা লুকিয়ে থাকবে।
নব্বুই এর দশকের শুরুতে মেধার ভিত্তিতে হলের সিট বণ্টনের উদ্যোগের সূত্র ধরে জহুরুল হক হলে আমি একটি সিঙ্গেল রুম পেয়েছিলাম। কক্ষ বরাদ্দের চিঠি নিয়ে হলের সেই কক্ষ দেখতে গিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়লো।
দরজার মৃদু নক শুনে বিরক্ত একজন ক্যাডার বেরিয়ে এলো লাল চোখ, ফেড জিন্সের ট্রাউজার, শীর্ণ শরীর আর পায়ের চেয়ে বড় মাপের বেইলী কেডস পরে। সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত থাকায় সম্ভবত জুতো পরে ঘুমাতে হতো ক্যাডারদের। বরিশালের লোকায়ত ভাষায় সে বুঝিয়ে দিলো সিট বরাদ্দ হওয়া মানেই দখল পাওয়া নয়। কারণ সিঙ্গেল ওই রুমটি বংশানুক্রমিকভাবে ক্যাডারদের হাওয়াখানা।
প্রায় কাপুরুষের মত সমাজের মনপছন্দ একজন ভাল ছাত্র সেদিন হল থেকে মাথা নীচু করে বেরিয়ে এসেছিল। জাতীয় টেলিভিশন বিতর্কে জহুরুল হক হলের জন্য চ্যাম্পিয়নশীপ এনে দেওয়ার পর আবার মাথা উঁচু করে হলে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ ভালছাত্রের মীথ ভেঙ্গে দিয়ে মিছিলে নেমেছে, সক্রিয় রাজনীতি করেছে। কিন্তু ততদিনে আরও একটা মীথ চালু হয়ে গেছে। ভালো ছাত্র রাজনীতি করলেও তার জন্য বরাদ্দ সামাজিক আপ্যায়ন কিংবা সাহিত্য সম্পাদকের মতো অপেক্ষাকৃত কোমল পদগুলো।
সমাজকে খুশী রাখতে গেলে ভাল ছাত্রদের কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। সিভিল সার্ভেন্ট হতে না পারলে কুল রক্ষা হয় না। সুশীল সেবকের পৈতে পরে সরকারী চাকরীতে যোগ দেওয়ার পর একজন মন্ত্রীর সমভিব্যহারে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে গিয়ে ভিআইপি রুমে দেখলাম আরেক নয়নাভিরাম দৃশ্য। কক্ষের সোফাগুলো আলো করে বসে আছে একদল ক্যাডার। তারা জেলা কমিটি তৈরি করতে ঢাকা থেকে পাহাড়ে এসেছে।
তারা আমাকে চিনতে পেরে মন্ত্রীর সামনে সার্টিফিকেট দিল, উনি ভাল ছাত্র ছিলেন, ভাল ডিবেটর ছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ তাহাদের কাছে। এমন সার্টিফিকেট আমার জীবনে এমন ব্রাত্য মুহূর্তে নিশ্চয়ই জরুরী ছিল।
মন্ত্রী বনাম সচিব টম অ্যান্ড জেরী খেলায় একজন সিভিল সার্ভেন্ট হয়েও মন্ত্রীর পক্ষ নিতে হলো। সচিব সিএসপি হওয়ায় তার ভাল ছাত্রত্ব প্রশ্নাতীত। আর মন্ত্রীর ছাত্রত্ব নিয়ে কথা বলার সাহস আমার নেই। কিন্তু ততক্ষনে বুঝে গেছি আমার সর্বোচ্চ অর্জন হতে পারে পদে পদে খারাপ ছাত্রদের হাতে অপদস্থ হওয়া।
সিভিল সার্ভিসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের শেষে আমরা শপথ নিলাম দেশের জন্য সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবো। অথচ সরকারী দপ্তরে দাম্ভিক ক্ষমতাধর ক্যাডারেরা এসে আমাকে প্রশ্ন করেছে আপনি কী আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপি। আমি তাৎক্ষনিকভাবে সে উত্তর না দিলেও মনে মনে বলতাম একদিন নিশ্চয়ই সে কথা স্পষ্ট করে বলতে পারবো।
তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মাঝে চরম নৈরাশ্য নিয়ে দেশান্তরী হলাম। সিভিল সার্ভিসের পাট চুকিয়ে ‘সাংবাদিকতা’কে পেশা হিসেবে নিলাম। কারণ বিতর্ক যে ধরনের মুক্তির আগ্রহ তৈরি করে তা আমাকে অপেক্ষাকৃত মুক্ত একটা পেশা খুঁজতে বাধ্য করেছে।
জার্মানীতে বছর পাঁচেক সাংবাদিকতার সূত্রে ইউরোপের নানা দেশে রিপোর্টিং-এর জন্য যেতে হয়েছে। আমি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশে দেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রচলিত তা পর্যবেক্ষণ করতে চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষতঃ ডিবেটিং ক্লাবগুলোতে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি।
ভালো ছাত্র এবং বিতার্কিকদের দেশের ভবিষ্যত রাজনৈতিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ওখানে মাঝারি আর খারাপ ছাত্ররা সিভিল সার্ভিস কিংবা কর্পোরেট সার্ভিসের বামন নিরাপত্তা খোঁজে। আর ছাল ছাত্ররা স্বপ্ন দেখে পৃথিবী বদলে দেবার। ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে মোমবাতি মিছিল, জি-এইট কিংবা দাভোস সম্মেলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, শোষণের বিরুদ্ধে, অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরন্তর ব্লগ বিতর্কে সক্রিয় এমনকি গোলাপ কিংবা মখমল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখে পশ্চিমের ভালছাত্ররা। রাজনীতি সচেতনতা মেধা, পড়াশোনা, নেতৃত্বের গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত সেটা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্টুডেন্ট ফোরামে গেলে টের পাওয়া যায়।
বিশ্বায়নের অভিঘাতে বাংলাদেশের ভালছাত্রদের মনোভঙ্গি বদলে ফেলার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে তবে দেরী হয়ে যায়নি।
মেধার সঙ্গে সাহসের যোগসূত্র, সাফল্যের সঙ্গে নিঃস্বার্থ মনোভাবের মিশেল, স্বপ্নের সঙ্গে দেশপ্রেমের যূথবদ্ধতা, বিতর্কের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গীকার-- বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


