গত বিশ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নারী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। গবেষকরা নিরস স্যাম্পলিং করতে গিয়ে স্যাম্পলএর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আচরণের কারণে সব সত্যের দেখা পাননা।তাই তার পরিসংখ্যান বাস্তব থেকে বেশ দূরে। সাম্প্রতিক রিপোর্টসমূহে অবশ্য নারী বিপলবের মৃদু ঈঙ্গিত আছে।
বৃটিশ পার্লামেন্টে দক্ষিণ এশীয় নারীর দাপট শুরু হয়েছে। ব্যারণেস পলা হতাশ করেছেন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাজনীতিবিদদের স্ত্রী-বান্ধবী-কন্যার অবদান ট্র্যান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টে কখনো আসবে না।
কারণ যে জার্মান পরিদর্শক ঢাকা,দিল্লী,ইসলামাবাদ পরিদর্শন করবেন, সেই বিশামিত্রের ধ্যান ভাঙ্গাতে উনিশ থেকে পঞ্চাশের যে কোন দক্ষিণ এশীয়নি সক্ষম। আজকাল ইন্টার্ণ রাই সাদা দূত সামলাতে পারে।আজকাল পুরুষকে বাকরা বানানো মডেলিং কোর্সের বা রান্নার কোর্সের নথিভুক্ত।
দক্ষিণ এশিয়াবর্তিনীরা ফরাসী সারকোজির বউ, সাবেক জার্মান চ্যাঞ্চেলর শ্রোয়েডারের চার বউয়ের চেয়ে বুদ্ধিমতী কখনো একটু বেশী চালাক। সাবেক জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইয়শকা ফিশারের সবচেয়ে জটিল বান্ধবী ছিলো চেন্নাইয়ের।দুর্নীতির অভিযোগ তাদের নাই বা কম আছে।ফিশারের পতনের কারণ কইয়াদিমুর জার্মান প্রতিবেদকরা জানে। আমি জানিনা।
বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান এই তিন দেশের মধ্যে ভারত অপেক্ষাকৃত গণতন্ত্র সফল। সোনিয়া গান্ধী ইটালীর মেয়ে বলেই সভানেত্রী হয়ে কংগ্রেস চালাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরটি মনমোহনকে ছেড়ে দিয়েছেন। মেয়ে প্রিয়াংকাকে শিখিয়েছেন ক্ষমতা থেকে দূরে থাকো। দেশের জন্য কাজ করো।
আপনি যদি সিইও হন, সম্ভবত যে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো ড্রাফট করতে পারে, সে একটি মেয়ে, আপনি যদি সম্পাদক হন, যে রিপোর্টার দাপটের সঙ্গে ঢাকা ইউনিভার্সিটির উত্তাল পরিস্থিতি সামলায় সেও একটি মেয়ে, যে সবচেয়ে গুছিয়ে ইন্টারভিউ করতে পারে সেও মেয়ে, আপনি যদি ডিসি হন, যে ম্যাজিস্ট্রেট অবশ্যই সৎ সে মেয়ে।আপনি যদি শিক্ষক হন, নিশ্চিত থাকতে পারেন ফার্স্ট হবে একটা মেয়ে।
আপনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন আপনার প্রধান মন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী,সরাষ্ট্রমন্ত্রী,পররাষ্ট্র মন্ত্রী,টায়ার্ড লাগে নারীর ক্ষমতায়নের তালিকা লিখতে।আশ্চর্যের ব্যাপার এদের কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। নারী কখনো দুর্নীতির প্রমাণ রাখেনা। ইন্টারপোলের নারী পুলিশ কর্মকর্তা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হলে দেখবেন আলোচনা শেষে শাড়ি পরে উনার ভক্ত হয়ে বেরুবে।খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হলে উনার কাছ থেকে মেক আপ টিপস নেবে,ভারতের প্রিয়াংকা গান্ধীর কাছে গেলে সে সন্তান পালন শেখবে, বেনজীর ভুট্টোর মেয়ের কাছে গেলে হাতে মেহেদী দিয়ে দেবে।
বিষয়টা মোটেও হাসির নয়। জয়নাল হাজারী বা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী স্ত্রীকে ভয় পান। আমি সাংবাদিকতা সূত্রে টেলিফোন ইন্টারভিউ করি গত দশবছর। মন্ত্রীর বাসায় ফোন করে যে ছবি পেয়েছি,উনারা স্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ভয় পান। একি ছবি আমার বাসায়,আপনার বাসায়। মা ছড়ি ঘুরিয়েছেন সংসারে, আব্বা এখনো সত্তুর বছর বয়সে আম্মাকে লুকিয়ে সিগ্রেট খান।
নারী সমাজের এই বিপ্লব সহজ হয়েছে রবীঠাকুরের কারণে। উনি আমাদের ভাগ্যে ভারতীয় লাবণ্য চাপিয়ে দিয়ে নিজে এখন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসে এস্রাজ বাজাচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে ছোট ছোট গল্পের মধ্যে নারী বিদ্রোহের উস্কানি দিয়েছেন।আর হিন্দী-উর্দু ভাষা কবিতা মানেই প্রেমের কবিতা। ওখানে মীর্জাগালিবরা অনেক আগেই আত্মসমর্পণ করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় তিন ধরণের নারী আছেন। কর্মজীবী সচ্ছল নারী, মধ্যবিত্ত লড়াকু নারী,প্রান্তিক যোদ্ধা নারী। এরা একটা জায়গায় ঐক্যবদ্ধ মন দিয়ে বাচ্চা মানুষ করা, পুরুষের সমালোচনা করা, আর ধীরে ধীরে পুরুষকে ওএসডি করে পরিবারের সর্বাসের্বা হয়ে ওঠা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শাশুড়িদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা আবশ্যক। বাংলাদেশের আধুনিকতম পুরুষেরা ছেলে সন্তানের জন্য দরগায় মানত করে,মন্দিরে পূজো দেয়, বা ডারুইনকে নারকেল উপহার দেয়। অথচ যাদের মেয়ে অনেকগুলো তারা জানেন না এক একটা মেয়ে একটা ইনসিওরেন্স পলিসির মত।মেয়েরা মাবাবাকে নিজের চেয়ে বা অপদার্থ বয়ফ্রেন্ডের চেয়েও ভালোবাসে।
ক্যান্ডল লাইট ডিনারে যার চোখের আয়নায় আপনার প্রতিবিম্ব, হৃদি সরসিজ,প্রেম উদ্দাম আমি ধন্যি। আপনি রোবনাথ পড়া, উনি ডলস হাউজ পড়া,অবরোধ বাসিনী পড়া, আপনি যখন ভাবছেন এই আমার গন্তব্য,এইতো ভালোবাসা,পারলে ঠিকাদারো কবি হয়ে ওঠে উনার সামনে।
পুরুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মা-স্ত্রী-কন্যার সিসিটিভিতে ধরা পড়ে। পুরুষজীবনের কারাগারে একমাত্র বন্ধু হয় ছেলেরা।সেই ছেলেদের মধ্যে দোস্ত দুশমন খেলা খেলে নারী।সিনেমায় দেখি আরকি।
বাংলাদেশে প্রতিটি পরিবারে বউ-শাশুড়ী ক্ষমতার লড়াই আওয়ামী-বিএনপি-ব্যবসায়ী-সেনা-আমলা ভূমি দখল লড়াইয়ের মতোই। বিনাযুদ্ধে নাহি দেবো সূচাগ্র মেদিনী।ভারত পাকিস্তানে একি অবস্থা, ইন্দিরা গান্ধী সোনিয়াকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন,ইতালীর মেয়ে চেপে গেছেন। মানেকা দেশী মেয়ে, দেখিয়ে দিয়েছে একহাত।পাকিস্তানের নাতনী ফাতেমা ভুট্টো এক বই লিখে অপর নাত বিলাওয়ালের দফার রফা ফিশ্রোল করে দিয়েছে।এর পেছনে ভুট্টোর ছেলের বউ আর বেনজীরের ভাবী-ননদ কাইজ্জা।
৭০ থেকে পচাত্তরের মধ্যে যাদের ছেলে বা মেয়ে হয়েছিল
ছেলের মায়েরা ছেলের বাবাকে ও শাশুড়িকে যুদ্ধে হারিয়ে বৌমার কাছে যুদ্ধে হেরে এখন রেজওয়ানা চোধুরীর কন্ঠে ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে শুনছেন, আর সৎ হাজব্যান্ডকে বকাঝকা করছেন, উনি সফল দুর্নীতিগ্রস্ত ধরা খাওয়া হলে বলছেন লুকিয়ে কাজটা করার বুদ্ধি নাই তোমার।এই বুদ্ধি পুরুষমানুষের থাকলে ক্লিনটন কিংবা বুশ প্রেম বা যুদ্ধদুর্নীতি লুকাতে পারতো।
মেয়ের মায়েরা মেয়েকে দিয়ে তার শাশুড়ীকে খন্দকের বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে হারিয়ে এখন বিজ্ঞাপনের ইন্সিওরেন্স কোম্পানীর মডেল হয়ে বসে আছেন। উনি তার হাজব্যান্ডকে মাতৃভক্ত হনুমান জ্ঞান করেন, ষাটের দশকে,সত্তুরে উনি শাশুড়ির নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
এতক্ষণের কাহিনীতে স্টারপ্লাস মশলা পাওয়া গেছে। গেম থিওরীটা চোখে পড়েনি।
সবচেয়ে পতিপরায়ণা নারী হাজব্যান্ডের ডানা ছেঁটে দিয়ে ক্ষমতায়িত। সবচেয়ে লাস্যময়ী নারী বসকে বোকা বানাচ্ছে।সবচেয়ে আদর্শ নারী তার ভালোবাসার ইন্দ্রজালে পুরুষকে বিপলবে যেতে বাধা দিচ্ছে।কৌশলী নারী হ্যারাসমেন্ট কেস দাখিলের ক্ষমতা অপব্যবহার করছে।ধর্মগুরুরা নারীকে গণিমতের মাল বলার স্পর্ধা দেখালে নারী প্রতিশোধ নেবেই।
সত্যজিত রায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিতে নিরাপত্তার জন্য ভালোবাসা নাকি ভালোবাসা থেকে নিরাপত্তা? এই প্রশ্নটা জুড়ে দিয়েছেন।
এর উত্তর আমি জানিনা।
ডলসহাউজের নোরা বা আমার মা সারাজীবন ব্যাগার খেটে যাওয়া পরাজিত খালাম্মাকূল বা এসিডে ঝলসে যাওয়া নারী বা ইভটিজিং এ অভিমান নিয়ে আত্মহত্যা করা নারী, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নারী, রবি ঠাকুরের একরাত্রির ভালোবাসা পাওয়া হতভাগ্য স্ত্রী বা শরতচন্দ্রের চন্দ্রমুখীর বেদনা জোয়ান অব আর্কের একটু একটু করে পুড়ে যাওয়া বা জীবনসঙ্গীর নির্লিপ্ততায় ইউনিভার্সিটিতে লেখা কবিতার পুরোনো খাতাটা পুড়িয়ে ফেলার নিয়তিই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার নারীর বিংশ শতকের ইতিহাস।
কিন্তু একবিংশের ইতিহাস নারী নিজেই লিখেছে।একটা একুশ বছরের মেয়ে যখন লাইব্রেরীতে,ক্লাসরুমে,ঘরে,মিডিয়ায় একবিংশের নোহাউটা শিখছে। নিজেকে তৈরী করছে, একুশ বছরের ছেলেটি তখন টেন্ডার সন্ত্রাসে,কিংবা প্রেম সন্ত্রাসে বা বা আই কুইটের স্ট্যাটাসে।হতাশা তারুণ্যের ফ্যাশন। হতাশ মেয়ে জীবনে একজনো দেখিনি।
ভার্জিনিয়া উলফের মিসেস ড্যালওয়ের দুখ বিলাস দেখেছি।পোস্ট ইমানসিপেশন সিন্ড্রোম।কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নারী ভার্জিনিয়া উলফের ড্যালওয়ে হতে চায় বেগম রোকেয়ার অন্তকরণ বজায় রেখে। এই ফিউশন কাজে আসবে কিনা জানিনা।
আধনিক এটিক রুমে বিষণ্ণ দক্ষিণ এশীয় ড্যালওয়ে অরুন্ধতী রায় হয়ে কাষ্মীর কাঁপাচ্ছেন। মহাশেতা দেবী নন্দীগ্রাম কাঁপিয়েছেন,আসমা জাহাঙ্গীর পাকিস্তান কাঁপাচ্ছেন।বাংলাদেশে কাঁপাকাঁপিটা হাসিনা-খালেদার হাতে। পুরুষেরা উপচরিত্র।আশরাফুল,দেলোয়ার,খন্দকার মাহবুব সব গেস্ট এপিয়ারেন্স। পরাজিত পুরুষদল।
বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী নারী, ভারতের শীর্ষ নারী ইতালীর মেয়ে,কিন্তু ভারতীয় হয়ে গেছেন শাশুড়ীর চাপে। তিনি মনমোহন বাবুকে বাজার সরকার করেছেন। টেন পার্সেন্ট জারদারী স্ত্রীসুত্রে পাকিস্তানের মসনদে। বক্তৃতা শুরু করতে হয় বেনজিরের নামে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শাসন আরো পাকাপোক্ত হবে। পুরুষ সমাজ যারা মডেল কন্যার সঙ্গে খাজুরাহ হয়ে ভাবছেন, নারী ভোগ্য,হয়তো জানেন না কে কাকে বধিবে শেষে। এমনকি শরীর ব্যবসার সমাজচ্যুত নারী ভাবনাও, ছেলের টিউশন ফি জোগাড় করতে ভোগবাদের বাজারে পণ্য হয়।ছেলে মানুষ করাটাই বা নিজে একটু খেয়ে পরে ভালোভাবে বাঁচাটাই তার জিতে যাওয়া।
ঢাকার আসে পাশে জমি দখল করে লাভ নাই। অপ্রতিরোধ্য নারী দন্ডমুন্ডের কর্তা। রাজনীতিবিদ,সেনাকর্মকর্তা-আমলা-ব্যবসায়ী-সাংবাদিক-শিক্ষকদের জমি কিনে বাড়ি করার চাপ বউয়ের কাছ থেকে আসে। বউ ঘুষ খেতে বলেনা। কিন্তু এমন এলিট বাতাবরণ তৈরী করেন,যেখানে প্রত্যেক পুরুষ একটা লাইফস্টাইল মেইন টেইন করতে বাধ্য হয়।বড়লোক,মধ্যবিত্ত,প্রান্তিক,ধার্মিক প্রতিটি সমাজে নারী এখন ডোমেস্টিক চিফ ফাইনানশিয়াল অফিসার।
এই নারী সমাজের সন্তানকে বা ছাত্রকে নির্লোভ করে তোলার সম্ভাবনা প্রবল। বঞ্চিত নারী নিজে পরিশ্রম করে,পতিকে চাপ দিয়ে পারিবারিক পর্যায়ে সচ্ছল জীবন ভোগ করে যদি মাসলোর হায়ার্কি অব নিড পূরণ করে থাকে, তাহলে সে নিশ্চয়ি পরাজিত পুরুষদের শেষ অনুরোধটা রাখবে। ছেলেমেয়েগুলোকে নির্লোভ করে গড়ে তুলবে,শেখাবে তুমি বার্গার খাবে আর ট্রাফিক বাতির বাবুটা না খেয়ে থাকবে তাইকি হয়,তুমিওতো বস্তিতে জন্মাতে পারতে। তাই নিজে বাঁচো সমবয়েসীদের বাঁচাও। অন্যেরটা কেড়ে খেওনা,বরং যতটুকু আছে স্কুলের টিফিন বেলায় ভাগ করে খাও। অর্ধেকটা বার্গার গাড়ির জানালা দিয়ে ট্র্যাফিক বাতির নিয়তিতে আটকে যাওয়া বাবুটাকে হাত বাড়িয়ে দাও। খেলনা ভাগ করে খেলতে শেখালে বড় হয়ে জমি দখল করবে না। অন্যকে দেবার ক্ষমতাই আসল। নেবার মধ্যে খরগোশের আপাত জিতে যাওয়া থাকে। দেবার মধ্যে কচ্ছপের শ্লথ গতি।সাইপ্রাসে একজন ধর্মযাজক একটি হীরকবাক্য উপহার দিয়েছিলেন,
টেক ইওর হ্যান্ডস উইল বি ফুল, গিভ ইওর সোল উইল বি ফুল।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


