somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চৌদ্দ ডিসেম্বরের অপারেশন পে ব্যাক

১২ ই ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরাজিত পশ্চিম পাকিস্তান শক্তি মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যত যাত্রাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মেধা হত্যা করেছে। বাঙ্গালীর মেধা সম্পর্কে দিল্লী এবং করাচী উভয় শহরে একধরণের আশংকা ও প্রশস্তি ওই শহরের বুদ্ধিজীবী ও ক্ষমতা কাঠামোর লোকজনের মাঝে প্রায়শই চোখে পড়েছে। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় তিরিশ থেকে সত্তরের মাঝে বাঙ্গালী তার উতকর্ষের আসন লাভ করেছিলো ভারতবর্ষে।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র শুনলে এখনো পাকিস্তানের টপ গানরা অনুভব করে এই প্রতিষ্ঠানের শক্তি, সাংবাদিকতা,চলচ্চিত্র,শিক্ষা এবং শিল্পকলা ও সংগীতে, সিভিল ও মিলিটারী সার্ভিস সবজায়গায় পূর্ব পাকিস্তানের শক্তির কাছে ৫২ র ভাষা আন্দোলনের পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা সমীহের সঙ্গে পরাজয় মেনে নেন। পাকিস্তানের ডন পত্রিকাটি গড়ে ওঠে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংরেজী সাহিত্যের কয়েকজনের হাতে। ঢাকার ইংরেজী পশ্চিম পাকিস্তানের ইংরেজী চর্চার রোলমডেল সেই ষাটের দশক থেকে।করাচী আই বিএর তুখোড় ছাত্ররা ঢাকার তাদের পশ্চিম পাকিস্তানী ক্লাসমেটরা এই মিথের প্রত্যক্ষ দর্শী। বলা প্রয়োজন যারা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ পেতনা,পাকিস্তান আমলে তারা করাচী ইউনিভার্সিটিতে পড়তো। এতে বোঝা যায় ৪৭ এর পর থেকেই বাঙ্গালী পুরোপুরি অপেক্ষাকৃত অশিক্ষিত বা দুর্বল শিক্ষিত লোকের শাসনে অবরুদ্ধ। পূর্ব বাংলার সত্যজিত রায় বা জীবনানন্দ কলকাতায় গিয়ে যে সুসংস্কৃতির শুভ সূচনা করেছেন আর জ্যোতি বসু বাম শাসনের কাস্ত্রো হয়েছেন সেটা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাঙ্গাল ভালোবাসা এবং ঈর্ষা উভয়ি উদ্রেক করেছে।

বাঙ্গালীর মেধাকে ভয় পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা মার্কিন সমর্থন নিয়ে ১৪ ডিসেম্বর ইনটেল্লেকচুয়াল হলোকস্ট ঘটায়। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা বাংলা মেধার সঙ্গে পদে পদে পরাজিত হয়ে পাশবিক প্রতিহিংসায় ঢাকা ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জিসি দেব বা সাংবাদিক সিরাজুদ্দীনের মতো ডাকসাইটে সাংবাদিককে হত্যা করে। শহীদুল্লাহ কায়সার,জহির রায়হান সাহিত্য-চলচ্চিত্রের দুই প্রবাদ পুরুষকে সরিয়ে দেওয়াতে আজ আমরা সাহিত্য-চলচ্চিত্রে বনসাই হয়ে আছি। ৩৯ বছর ধরে যে মিডিওক্র্যাসি বাংলাদেশের সৃজনশীল অঙ্গণে বিরাজ করছে তা ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী গণহত্যার ডমিনো এফেক্ট, এবিষয়ে কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী উদাহরণ এনে তাই সময় নষ্টের কারণ দেখছি না। পাকিস্তান চেয়েছিল বাংলাদেশের শিক্ষা এবং সৃজন শীলতাকে বন্ধ্যা করে দিতে।

বাংলাদেশের ডিসেম্বর উড়ালের দুই সুপারম্যান মুজিব-তাজের ছবি আর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ছবি পাশাপাশি দেখলে তাদের চেহারাতেই মেধা ও সাংস্কৃতিক মানের পার্থক্য স্পষ্ট।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের অভ্যুদয় ঘটে,পাকিস্তানে ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝোলাতে সেনাশাসক জিয়াউল হকের অভ্যুদয় ঘটে। ঢাকা জিয়া ইসলামাবাদের জিয়ার চেয়ে অনেক মেধাবী ও স্মার্ট ছিলেন অফিসার হিসেবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের মেধা ও সংস্কৃতির হীনমন্যতা শান্তিপ্রবণ বাংলাদেশ বুদ্ধিনেতাদের ওপর তাদের এই আদিম হামলা ও মানবাধিকার লংঘনে মরিয়া করে তোলে।

শেখ মুজিবের ৭ই মার্চ ভাষণের যে ইন্টেলেকচুয়াল হাইট এবং অন্তর্শক্তি তা গান্ধী-জিন্নাহ বা নেহেরুর বক্তৃতায় খুঁজে পাইনি। মুজিবের ভাষণ তাজমহলের মতো মৌলিক। ভারত মুক্তির অন্য শীর্ষ নেতাদের ভাষণ ইট দিয়ে তৈরী তাজমহলের মতো সুন্দর অথচ অমৌলিক।

তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধকালীন কূটনীতিতে এমেরিকা,চীন, রাশিয়া সবাইকে হ্যান্ডেল করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কৌশলী বন্ধুতা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধকে লক্ষ্যে নিয়ে গেছেন। ঢাকার মানুষকে কাজে বিরক্ত ঢাকার মানুষ ছাড়া কেউ করেনা। তাই ভাসানীর অভিমান আর মুশতাকের কূটচালের কাঁটা তাঁকে সরাতে হয়েছে সার্বক্ষণিক ভাবে।

মুক্তিযুদ্ধের পরে তাজউদ্দীনকে মুজিবের ব্যাটিং পার্টনারশীপ থেকে সরিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের অনুরূপ অশিক্ষিত ও নির্বোধ রাষ্ট্র কায়েম করা হয়। মুজিব বাঙ্গালীর মুক্তির পতাকা ভূগোল জিতে দেবার পর সময়-সুযোগ-বাতাবরণ পেলেন না বাঙ্গালীকে সভ্যতার পথে নিয়ে যেতে। রক্ষীবাহিনীর পান্ডারা তাজউদ্দীনকে একঘরে করার পর দেশ জুড়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো মুক্ত মানুষদের তাদের অশিক্ষিত নির্বোধ আদিম উতপীড়নের শিকার করলো। মুজিব একা হয়ে যাওয়ায় আর বিপর্যয় ঠেকাতে পারেননি সমাজ এবং রাষ্ট্রে। জীবন দিয়ে উপলব্ধি করলেন সৎ মানুষ মূলত একা। উনি যখন জীবনে প্রথম ফোন ঘুরাচ্ছেন তার নিরাপত্তার জন্য বাইরে একদল ইন্টারমিডিয়েট পাশ খুনী, সাহায্য চাচ্ছেন বিএ ফেলদের কাছে বা আরো দূরে ৭২ সালে পাশ করা বাকশালীদের কারো সাহস নেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে বাঁচাতে আসার। মৃত্যুর মুহূর্তে জিসি দেব বা শহীদুল্লাহ কায়সারের মতোই অসহায় ছিলেন ৭ই মার্চ কবিতার কবি মুজিব। যেমন অসহায় ছিলেন তাজউদ্দীন, হুমায়ুন কবির, হুমায়ুন আজাদ,গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী বা অধ্যাপক ইউনুস কিংবা সম্প্রতি লোকমানপুরে দলীয় ক্যাডারদের হাতে প্রাণ হারানো শিক্ষক মিজান।

শাহরিয়ার কবির থেকে সেলিম রেজা নিউটন, রাষ্ট্র দল মত নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক লিবেরেল মানুষদের কষ্ট দিয়েছে, প্রতিটি নির্বিরোধ ছাত্রকে দলীয় ক্যাডাররা জিজ্ঞেস করেছে তুই কি ছাত্র লীগ না ছাত্র দল। প্রতিটি নির্বিরোধ আমমানুষকে ফেনসিডিল মানিকেরা এসে জিজ্ঞেস করে তুই কী আওয়ামী লীগ না কি বি এনপি। বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের এখন ত্রিশংকু অবস্থা, একদিকে আওয়ামী লীগ অন্যদিকে বিএনপি জামাত অন্যদিকে ঘরের বন্ধু বিভীষণ দলীয় সাংবাদিক-শিক্ষক-কবি-টিভি উপস্থাপক।

কিন্তু মুজিব-তাজের মৃত্যুর পর ডা। মিলন বা হুমায়ূন আজাদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নিষ্ক্রিয়তা ফেলে পথে নেমেছে। পড়ে পড়ে মার খাবে সরদার ফজলুল করিম- পলান সরকারেরা আর প্রাডো হাঁকাবে দেলোয়ার-নতুন হানিফ, এর ওষুধ হিসেবে এই ১৪ ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে তথ্যমুক্তিযুদ্ধ। রাষ্ট্রের অপকর্মের ও দুর্নীতির তথ্য আসতে শুরু করবে অনলাইনে। বাংলা ব্লগ চর্চায় সত্য উন্মোচনের আগুণ রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ জুলিয়ান এসাঞ্জের সত্যবিপ্লবের সূত্র ধরে বাংলাদেশের অনুন্নয়ন ও অনগ্রসরতার ছবি উন্মোচনের এক সুনামী এসেছে। বাংলাব্লগাররা উইকীলিক্সের সঙ্গে যুগপত নাগরিক ব্লগ সহ নানাব্লগে এর শুভসূচনা আগেই করেছে। শিক্ষিত মানুষকে উত্তরীয় পরিয়ে শাখামৃগদের শোবিজ শোবিজ খেলার গ্রাম্য যাত্রাটিকে যখন শাহরুখ রাণীর আলকাপের নৃত্য তাসের ঘরের মতো উড়িয়ে নিয়ে যায়, তখন অল্টারনেটিভ মিডিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরী হয়, কিভাবে ঢাকাকে দেলু-নতুন হানিফের শহর পরিচিতি থেকে আবার মুজিব তাজ বা জিসি দেবের শহরের পূর্ব পরিচয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এটাই চৌদ্দ ডিসেম্বরের অপারেশন পে ব্যাক।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:৩২
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×