somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গরু আন্দোলন-২০১০(ফানি পোস্ট)

১৮ ই নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খাজা সাহেব আজ গরুর হাটে যাবেন। প্রত্যেক বছর কুরবানীর সময় তিনি মিরপুরের মধ্যে গরু কিনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। গাবতলী মাঠের সবচেয়ে বড় গরুটা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই সংরক্ষিত থাকে। এজন্য সেখানকার কমিশনার ব্যাক্তিগতভাবে খাজা সাহেবকে সাহায্য করেন। খাজা সাহেবের সাথে কমিশনার সাহেবের বলতে গেলে একেবারে মাখামাখি অবস্থা।

খাজা সাহেব তিনবার হজ্ব করেছেন। হজ্ব করার পিছনে বড়লোক ও নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। খাজা সাহেবের তেমন কোন উদ্দেশ্য ছিল না। শুধু হাজ্বি থেকে আলহাজ্ব হওয়ার জন্য তিনি হজ্বে গিয়েছিলেন। প্রথমবার হজ্বে যাবার আগে তিনি পাইকপাড়ার সমস্ত লোকদের খাওইয়ে মিলাদ পড়িয়ে গিয়েছিলেন। আসা মাত্র এলাকার লোকজন বলে উঠল-হাজ্বি খাজা সাহেব এসেছেন, হাজ্বি খাজা সাহেব এসেছেন।

খাজা সাহেব মহা উৎসাহ ও আগ্রহ সহকারে আরো দুইবার হজ্বে গেলেন। অবশ্যই এলাকার লোকদের ভালমত মিলাদ-মাহফিলের মাধ্যমে ভোজন করিয়ে। কিন্তু লোকেরা তাঁকে হাজ্বি খাজা সাহেব ছাড়া অন্য কিছু বলল না। তিনি রাস্তা-ঘাটে ছবিসহ পোষ্টার লাগিয়ে বিরাট উরশের আয়োজন করলেন। পোষ্টারে তাঁর নামের আগে আলহাজ্ব খাজা সাহেব লাগানো হল। আশ্চর্যের বিষয় হল উরশে যে পীর সাহেব এলেন, তিনি মঞ্চে উঠেই প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে হাজ্বি সাহেব নামে সম্বোধন করে খাজা সাহেবের প্রশংসা করতে লাগলেন। আলহাজ্ব খাজা সাহেব বলে সম্বোধন করলেন না পীর সাহেব। দুঃখে খাজা সাহেবের কলিজা বিদীর্ণ হয়ে আসতে চাইল। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন যে আল্লাহর মর্জি না হলে কেউ কোন কিছু অধিকার বা ভোগ-দখল করতে পারে না।

সেই খাজা সাহেব কুরবানীর গরু কিনতে গাবতলীর হাটে যাচ্ছেন। সঙ্গে গাড়ির বদলে তাঁর ট্রান্সপোর্টের বিশাল পাঁচটনি ট্রাক নেওয়ার কথা, কিন্তু তাতে রাস্তার লোকজন গরুর দাম জিজ্ঞ্যেস করার সুযোগ পাবে না। আর তিনিও আগ্রহ সহকারে দাম বলতে পারবেন না।
তাই তিনি একটু সকাল সকাল বাসে করেই রওনা দিলেন। সঙ্গে তাঁর ম্যানেজার আশরাফ উদ্দিন, পিএ হুমায়ুন আহমেদ আর পনের বছরের নাতি আছে।

নাতির নাম মরিজা। মরিজা পড়াশোনাতে খুবই ব্রিলিয়ান্ট একজন ছাত্র। গত বছর ক্লাস এইটে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। মরিজাদের বাসা উত্তরায়। সেখানে মরিজার বাবা ষোল কাঠা জায়গার উপর আলিশান এক ছয়তলা বাড়ি বানিয়েছেন। তিনি চিটাগাং-এ শিপিং এর ব্যাবসা করেন। বছরের দুই ঈদের সময় মরিজাকে নিয়ে তার আম্মা মিরপুরে খাজা সাহেবের বাড়িতে এসে পড়েন। কুরবানী ঈদ বাপের বাড়িতে করেই অভ্যস্ত মরিজার আম্মা লারিসা বেগম।


গাবতলী গরুর হাটে এইবার গরুর সংখ্যা যেন অন্যাবারের চেয়ে কম। গেল বছরও গরু-ছাগল আর দুম্বায় ঠাসাঠাসি-ঘেষাঘেষি অবস্থা ছিল হাটে। এইবার তার তুলনায় হাট বড় ঠান্ডা। অর্থনৈতিক মন্দা আর এনথ্রাক্স রোগের মহাকল্যাণে এই অবস্থা হয়েছে তা অবশ্য বুঝতে পারেন খাজা সাহেব। টেকনিক্যাল রোড থেকে গাবতলী পর্যন্ত সকাল থেকেই একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। রোজার ঈদে যাওয়া হোক বা না হোক, কুরবানীর ঈদে ঢাকার বাইরের অধিকাংশরাই চলে যাবে। এই বাইরের অধিবাসীরা শহরটাকে জঞ্জাল বানিয়ে ফেলল। ক্ষোভ মাঝে মাঝে উথলে উঠে খাজা সাহেবের। কিন্তু কিছু করার নেই। এদের ঘনঘন নড়াচড়ার (ট্রান্সপোর্ট) ফলেই আজ তিনি কোটিপতি।

গাবতলীর হাটে পৌছতেই কমিশনার সাহেব নিজস্ব এলিয়েন গাড়ি থেকে নেমে খাজা সাহেবকে সালাম দিলেন। খাজা সাহেব তৎক্ষনাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বড্ড বোকামী হয়ে গেছে। তিনিও তো তার বি.এম.ডব্লিউ কিংবা মার্সিডিজ গাড়িটা নিয়ে আসতে পারতেন। এখন আর মান-সম্মান ঠিক রইল না। কমিশনার সাহেব অবশ্য গাড়ি বিষয়ক কোন কথাই বললেন না।
-ভাইসাহেব, আপনার স্বাস্থ্য এখন কেমন? গরু কিনতে এসেছেন, পথে কোন সমস্যা হয়নি তো?

খাজা সাহেব প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তাঁর গা একপ্রকার রাগে ফেটে যাচ্ছে। গরু কিনতে এসে আবার পথে কিসের সমস্যা হবে? তিনি কোন জবাব না দিয়ে গটমট করে হাটের প্রবেশ পথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তার আগে নাতি মরিজাকে কমিশনারের গাড়িতে রেখে আসলেন ম্যানেজারের দায়িত্বে। হাটের ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতে কোথা থেকে যেন উড়ে এল একটা গরু। দুজন লোক সমানে চেচাচ্ছে- ওই পাগলা গরু পাগলা গরু, সরেন ভাইয়েরা জলদি সরেন!

খাজা সাহেব জীবনেও যে কাজ করেন নি তাই করলেন আজ। প্রচন্ড শক্তিতে লাফ দিলেন কমিশনারের গায়ের উপর। তাঁকে জড়িয়ে ধরে রাস্তার পাশে গড়িয়ে একেবারে গায়ে ধূলা লাগিয়ে ফেললেন। কমিশনার সাহেব তৎক্ষণাৎ খাজা সাহেবকে উঠিয়ে বললেন,
-ভাইসাহেবের কাপড়ে দেখি ধূলা লেগে গেছে। এই হুমায়ুন, জলদি এক প্যাকেট মিনি সার্ফ এক্সেল নিয়ে এস।
খাজা সাহেব লজ্জা আর অপমানে থরথর করে কাঁপাকাঁপি শুরু করতে গিয়েও থেমে গেলেন। এখন হাটের অনেক লোকই তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। এই মূহুর্তে অপমানকে হেসে উড়িয়ে না দিলে অস্তত্বির কোন সীমা থাকবে না। মান-সম্মান তো অর্ধেক গেছেই। অগত্যা ফিক করে হেসে ফেললেন খাজা সাহেব। কমিশনার সাহেবও একই ভঙ্গিতে হেসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ফেললেন। এই গুণটি আছে বলেই আজ তিনি ১০নং ওয়ার্ডের কমিশনার পদে প্রতিষ্ঠিত।

হাটের ভিতর প্রথম সাড়িতে অনেকগুলো বড় বড় গরু কমিশনার সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তিনি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। খাজা সাহেব কমিশনার সাহেবের পাঞ্জাবীর কোনা টেনে ধরলেন।
-কি আশ্চর্য! তুমি কালো গরুর দিকে এগোচ্ছ কেন?
-ভাইসাহেব, গরুগুলো বিশেষ স্বাস্থ্যবান আর বলশালী। দেখতে অসুবিধা কি?
-অবশ্যই অসুবিধা আছে। আমি কি নিগ্রো প্রকৃতির গরু কিনতে হাটে এসেছি? এই গরু কিনে নিয়ে গেলে লোকে বলবে “আলহাজ্ব খাজা সাহেব আফ্রিকার জঙ্গলের বান্দর ধরে এনেছে কুরবানী দেওয়ার জন্য।”
কমিশনার সাহেব বলতে নিলেন “আলহাজ্ব নয়, বলবে হাজ্বি খাজা সাহেব।” কিন্তু তিনি বলার সাহস করতে পারলেন না। অতি সত্যি কথা কখনোই বিশেষ কাউকে বলা যায় না।

কমিশনার সাহেব ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে খাজা সাহেবের সাথে হাটের ভিতরে এগিয়ে চললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে খাজা সাহেব ভুলে গেলেন যে তিনি কোরবানীর গরু কিনতে এসেছেন। তাঁর কাছে মনে হল তিনি শিশুকালের মেলায় চলে এসেছেন। মেলায় রঙ-বেরঙের পশু আছে যাদের পিঠে চড়তে চার আনা পয়সা লাগবে। শুধুই পশু নয়, সার্কাস পার্টিও আছে। তারা এসব ভয়ঙ্কর পশুদের অদ্ভুত দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করে। ভাবতে ভাবতে রাখাল,গরুর মালিক আর ব্যাপারীদেরকে সার্কাস পার্টির লোক বলে মনে হল খাজা সাহেবের কাছে।

চারিদিকে লোকজনের হৈ-হট্টগোল, গরু কিনার ব্যস্ততা, দামাদামি আর মাঝে মাঝে ওই গরু-ওই গরু বলে চিৎকার করতে থাকা গরুর রাখালদের চিৎকারে সচকিত লোকজনের লাফিয়ে উঠা দেখতে দেখতে বিমোহিত হয়ে গেলেন খাজা সাহেব। গরুর পালের মাঝে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তাঁর কাছে মনে হচ্ছে তিনি যেন দুই পাশে হাঙ্গর আর কুমিরের খালের পাশ দিয়ে পার হচ্ছেন। গরুর পিছন দিয়ে যাওয়ার সময়ও উত্তেজনায় তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসার যোগাড় হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি গরু লাথি মেরে বসল। গরুর মোটা গলার হাম্বা ডাক শুনতে শুনতে ছাগলগুলোর ম্যা ম্যা শব্দ কারো কানেই পৌছাচ্ছে না। খাজা সাহেব গভীর মমতা নিয়ে এককোণে জড়সড় হয়ে থাকা ছাগল আর খাসীগুলো দেখতে লাগলেন। আহহারে! দেশে এমন লোকও আছে যারা ছাগল কোরবানী দেয়!

এক প্রান্তে গলা লম্বা করে উটদের খাবার খাওয়া দেখা যাচ্ছে। সেদিকে আবার দুইটা বিখ্যাত টিভি চ্যানেল এসেছে। টিভি চ্যানেলের লোকেরা উটদের মালিকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। উট আর দুম্বা কুরবানী খুব কম লোক দেয়। বেশীরভাগই গরু কোরবানী দিতে পছন্দ করে।

খাজা সাহেব পাশ ফিরে কমিশনার সাহেবকে দেখতে পেলেন না। ব্যাটা মহা ধড়িবাজ! কোথায় গিয়েছে কে জানে। খানিকদূরে একটা বিশাল লাল রঙের গরুর সামনে লোকজনদের ভীড় দেখে সেদিকে এগোলেন খাজা সাহেব। সেখানে সেই টিভি চ্যানেল দুটো এসে পড়েছে। গাবতলীর বাজারে সবচেয়ে বড় আর দামী গরু নাকি সেটিই।

দাম উঠেছে পঁচিশ লাখ টাকা মাত্র। শুনে খাজা সাহেব ভাবলেন কবে যে দেশে পঞ্চাশ লাখের উপরে গরুর দাম পড়বে! ভাবতে ভাবতে কমিশনার সাহেবকেও দেখতে পেলেন খাজা সাহেব। কি আশ্চর্য! ব্যাটা দেখি টিভিতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে! তাঁকে একা রেখে ভেগে যাওয়ার মতলব তাহলে এই। একা একা তুমি টিভিতে নিজেকে প্রদর্শন করছ! এবার আমি আমার খেলা দেখাব। খাজা সাহেব ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন। বিশাল লাল রঙের গরুটা শুধু দেখতেই জব্বর নয়, অতিকায় হাতির মত আকৃতিও বটে। অনেকখানি অস্ট্রেলিয়ান টাইপের। তবে মনে হচ্ছে এ গরুটি নেপালিয়ান বা সিংহলী হবে। বড় আকৃতির গরুর ব্যাপারীরাও বিশাল দেহের অধিকারী হয়। দেখা গেল বাস্তবেও তাই। গরুর পাশে V চিহ্নু দেখিয়ে ক্যামেরায় তাকিয়ে আছে গরুর ব্যাপারী। মনে হচ্ছে এই বয়সেই কোন পরীক্ষায় গোল্ডেন জি.পি.এ-৫ পেয়ে সে মহা খুশী। খাজা সাহেব যখন এই গরু কিনবেন, তখন তিনিও V চিহ্নু দেখাবেন।
-ভাইসাহেবরা সবাই সরুন দেখি। এই যে ব্যাপারী সাহেব, এটার চেয়ে বড় আর দামী গরু থাকলে দেখান দেখি।
খাজা সাহেবের মুখে এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার ল্যান্স কমিশনার সাহেবের মুখ থেকে সরে খাজা সাহেবের মুখে ফোকাস মারল। ক্যামেরাম্যানরা সাধারনত সবকিছু ক্যামেরার ভিতর দিয়েই দেখতে পছন্দ করে। অতি সিরিয়াস ধরনের কিছু ঘটলেও তারা সরাসরি তাকায় না। ক্যামেরার ভিতর দিয়েই তাকিয়ে থেকে ভিডিও তুলে ফেলে। এমনও শোনা গেছে বিয়ের রাতে বউয়ের কাছে যাবার আগে তারা ক্যামেরা দিয়ে বউকে দেখার চেষ্টা করে।

সাংবাদিক সাহেব অবশ্য কৌতুহল মার্কা দৃষ্টিতে খাজা সাহেবকে দেখছেন। কমিশনার সাহেবের মুখে খানিকটা বিরক্তি দেখতে পেয়ে হৃৎপিন্ডের কোন অংশে যেন খুব সূক্ষ্ণ একটা সুখ অনুভব করলেন খাজা সাহেব। গরুর ব্যাপারী V চিহ্নু হাতের মুঠোয় বন্ধ করে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে খাজা সাহেবকে দেখল।
-জ্বি না ভাইসাহেব, এরচেয়ে বড় আর দামী গরু অত্র হাটে আর দ্বিতীয়টি নাই। তাছাড়া প্রতি বছরই আমি বড় বড় গরু নিয়া বিভিন্ন হাটে যাই।
-তা এখন পঁচিশ লাখ চেয়েছেন, পঁচিশ লাখই কি দিতে হবে?
ব্যাপারী জ্বিহ্বায় কামড় দিয়ে কানে ধরে বলল- তওবা তওবা, আপনেরা যদি বলেন যে এই বছর গরু নিয়ে আগামী বছর গরুর দাম দিবেন, তাও সই।
খাজা সাহেব শক্ত মুখ করে বললেন- ফাজলামী মার্কা কথা বলবেন না। আমি এক কথার মানুষ। কত হলে গরু আপনি দিতে পারবেন বলেন, আমি গরু নিয়ে চলে যাই। বেশী ঘোরাঘোরি আমি পছন্দ করি না। আর আমি প্রতি বছর এই হাট হতেই একদামে সবচেয়ে বড় গরু কিনি।
ব্যাপারী খাজা সাহেবের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কোক-পেপসী,দই,মিষ্টি প্রভৃতি আনার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। খাজা সাহেব ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললেন।
-আপনি যদি আরেকবার খাবারের কথা উচ্চারণ করেন, তাহলে আমি গরু না কিনেই চলে যাব।
-জ্বি জনাব, ঠিকই বলেছেন। এসব বাইরের খাবার খেয়ে খেয়েই আমাদের দেশের মানুষের আয়ু কমে গেছে। সব জাঙ্ক ফুড, এই যে গরুদের দেখেন, তারা শুধু ঘাস খেয়ে খড়-পানি খেয়ে কত স্বাস্থ্যবান আর দীর্ঘায়ু লাভ করছে।
-তাহলে আপনিও ঘাস আর খড় খেয়ে দেখতে পারেন দীর্ঘায়ু লাভ করা যায় কিনা।
ব্যাপারী কথা বন্ধ করে সরু চোখে খাজা সাহেবের দিকে তাকাল। সে বোধহয় কাজের কথা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
-ইয়ে, ভাইজ্বান, গরু যখন আপনি দেখেছেন তখন আপনাকেই দিয়ে দিতে হবে। এর উপর এখন আর আমার কোন হক-দাবী নাই।

খাজা সাহেব দেখতে পেলেন ক্যামেরাম্যান তখনো ক্যামেরা ধরে আছে। উঁহু, বেশী দাম কমানো যাবে না। তাঁর অবশ্য ইচ্ছে করছে পঁচিশ লাখ টাকা দিয়েই গরু কিনতে। কিন্তু কেউ যদি বলে খাজা সাহেবকে হাঁদারাম পেয়ে গরুর দাম পঁচিশ লাখ রেখেছে, তাহলে তো আর সম্মান বজায় রইল না। ফর্মালিটির জন্য একটু মূলামূলি তো করতেই হবে। ব্যাপারী খানিকক্ষণ হাতে গুণে গুণে কি যেন হিসাব করল। তারপর লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিল। মনে হচ্ছে সে দাম বলতে খুবই ভয় পাচ্ছে।
-ইয়ে, আপনি যখন নিবেন, তখন ভাইসাব বেশী বড় দাম বলে আল্লাহর কাছে ঠেকা থাকতে চাই না। আমার গরু নিশ্চয়ই আপনার ভাগ্যে কোরবানী হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। ইয়ে, আপনার সাথে কোন মূলামূলি নাই। আপনি বিশলাখ টাকা দিবেন।

বলেই এমন একটা ভঙ্গি করল ব্যাপারী যেন সে তার জীবনে এই মূহুর্তে মহা একটা পাপ করে ফেলেছে। খাজা সাহেব ক্ষমা না করলে সে এই পাপ হতে মুক্তি পাবে না। খাজা সাহেব মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শুনেছিলেন ছাগলের ব্যাপারীরা নাকি ছাগল প্রকৃতির হয়। কিন্তু গরুর ব্যাপারীরা যে একেবারে জাত ছাগল তা এই প্রথম নিজ চোখে দেখলেন তিনি। ব্যাটা কি আরো দুই-তিন লাখ টাকা বাড়িয়ে বলতে পারত না? তিনি বিষন্ন মনে পিএ হুমায়ুনকে বললেন গাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসতে।

সাংবাদিক এতক্ষণ গরু কেনার সমস্ত নাটক দেখছিলেন। কথা পাকাপাকি হওয়ার পরই তিনি সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন- বয়াতী, ক্যামেরা চালু কর্‌ জলদি!

খাজা সাহেব নিজেকে আরেকবার বেকুব হিসেবে আবিস্কার করলেন। এতক্ষণ তাহলে ক্যামেরা অফ ছিল। তাহলে কমিশনার ব্যাটা কি করে সাক্ষাৎকার দিল?
সাংবাদিক সাহেব ততক্ষণে মাইক্রোফোন রেডি করে ফেলেছেন। ক্যামেরার ক্যাবলে কানেকশন লাগিয়ে তিনি খাজা সাহেবের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করলেন।

সাংবাদিকঃ আসসালামু আলাইকুম। আপনাকে আঙ্কেল বলেই সম্বোধন করলাম। আপনার নামটা জানতে পারি?
খাজা সাহেবঃ অবশ্যই, আমি অত্র মিরপুর এক নম্বরের বাসিন্দা আলহাজ্ব খাজা সাহেব বি.কম।
সাংবাদিকঃ আচ্ছা আঙ্কেল, এই যে এত বড় একটা গরু কিনে ফেললেন আপনি, তাও বিশ লাখ টাকা দিয়ে। আপনার অনুভূতি কেমন এখন?
খাজা সাহেবঃ খুবই সুন্দর অনুভূতি পাচ্ছি আমি। গরু কিনার অনুভূতিই অন্যরকম, নিজেকে গরুর মত ফ্রেশ ফ্রেশ মনে হয়। তবে গরু কিনার বাজেট এবার ফেল করেছে আমার।
সাংবাদিকঃ বাজেট ফেল কি রকম? বিষয়টা পরিস্কার করে বলুন।
খাজা সাহেবঃ এবার চাচ্ছিলাম চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে সেরকম একটা গরু কোরবানী দিব। কিন্তু বাজারের যা অবস্থা! দেখলেনই তো, বিশ লাখ টাকার উপরে কোন গরুই নেই।
সাংবাদিকঃ আপনার কি মনে হয়? দেশে দামী গরু না থাকার কারণ কি?
খাজা সাহেবঃ আসলে গরু তো আর এমনিতে মূল্যবান হয় না। গরুর যত্ন নিতে হয়। ওই যে শুনলেন না ব্যাপারী সাহেবের কথা। আমরা জাঙ্ক ফুড খেয়ে খেয়ে আয়ু কমিয়ে ফেলেছি। শুধু তাই নয়, বন-জঙ্গল আর গাছ-পালাও ধ্বংস করছি। যে কারণে গরুরা আগেকার মত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ঘাস-খড় পাচ্ছে না। যা পাচ্ছে, তাও আবার বেশীরভাগই খামাড়ে সার দিয়ে বানানো। যে কারণে তাদের খাদ্যও জাঙ্ক ফুডে রূপান্তরিত হচ্ছে।
সাংবাদিকঃ এজন্য কি করা উচিত বলে আপনার মনে হয়?
খাজা সাহেবঃ এ জন্য বিশাল বড় সরকারী উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কারণ গরুরা One kinds of part-and-parcel আমাদের জীবনে। আমরা একটি মূহুর্তও গরু ছাড়া কল্পনা করতে পারিনা।
সাংবাদিকঃ আপনি কি খুশী আপনার গরু কিনে?
খাজা সাহেবঃ খুশী বলতে কিছুটা দোটানায় আছি। কখনো খুশী লাগছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে কোরবানীটা যেন অপূর্ণ রয়ে গেল।
সাংবাদিকঃ এরকম কেন মনে হচ্ছে আপনার?
খাজা সাহেবঃ আমার মনে হয়, কোরবানীর পশু কিনার সময় আমাদের সবার মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে কত বেশী দাম দিয়ে কিনে এগিয়ে থাকব। আসলে কোরবানীর পশু দামের উপর নির্ভর করে না, বরং এর মাধ্যমে একজন মুসলমান কতটুকু আত্নত্যাগ করছে আল্লাহর প্রতি- সেই বিশ্বাস ও চিন্তা নির্ভর করে। আর আমি মনে করি প্রতিটি মুসলমানের চিন্তাধারা তাই হওয়া উচিত।

এ পর্যায়ে কমিশনার সাহেব প্রায় হামলে পড়লেন মাইক্রোফোনের উপর।
-আমি এই ১০নং ওয়ার্ডের কমিশনার সফদার আলী খান এবং মাননীয় সরকারের একজন অত্যন্ত বাধ্যগত,অনুগত ও বিশ্বস্ত স্নেহভাজন ব্যাক্তি। আমার এলাকার গাবতলীর হাটে আমি ক্ষমতায় থাকার পর একজন চাঁদাবাজও চাঁদা তুলতে পারেনি। তবে এই হাটের জায়গা অত্যন্ত অপ্রতুল। আমি মাননীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাব যেন হাটের পার্শস্থ তুরাগ নদীর কিয়দঅংশ ভরাট করে হাটকে আরো সুন্দর ও বড় করে তোলা হয়। তাছাড়া হাটে আসা লোকজনকে সবসময় রৌদ্রের তাপ সইতে হয়। এজন্য উপরে তাবু সহ সিলিং ফ্যান আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য হাটের অভ্যন্তরে কিছু নার্সারী ও বাগান স্থাপন করা অতিব জরুরী। এ বিষয়টা আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গোচরে আনলাম।

এ সময় কোথেকে একটা গরু দৌড়ে এসে কমিশনার সাহেবকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। কমিশনার সাহেব মাইক্রোফোন ছেড়ে দিয়ে সদ্য কেনা খাজা সাহেবের গরুর পিঠের উপরে অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়লেন। লাল রঙের গরুটা কমিশনারের তুলতুলে দেহের ওজন সইয়েও তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়াল। তারপর হ্যাচকা টান দিয়ে দঁড়ি ছিড়ে দৌড়ে সামনের একজন লোককে গুতো দেওয়ার চেষ্টা করল। ভাগ্যিস লাগেনি, লাগলে লোকটার দফারফা সেখানেই হয়ে যেত।
গরুর ব্যাপারীরা আবার এসব গরুকে খুব ভালো করে জানে। তাই সামলাতে বেশী সময় লাগল না। লম্বা লম্বা পাঁচ-ছয়টা কঞ্চি বেতের ছড়াৎ ছড়াৎ বাড়ি খেয়ে মূহুর্তে নেতিয়ে পড়ল গরুটা। ব্যাপারী নিজের হাতে গরুটাকে বেঁধে আগের জায়গায় রাখল। কমিশনার সাহেবের ব্যাথা ভালই লেগেছে। তবে তিনি ব্যাথার চেয়ে বেশী চিন্তিত ক্যামেরায় তার হেনস্থা হওয়ার দৃশ্য নিয়ে। আজকাল এসব ভিডিও লোকে বেশ আগ্রহ সহকারে দেখে। অনেকে মোবাইলে ভরে ব্লুটুথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেয়।

খাজা সাহেব কমিশনারের কানে কানে বললেন- ভালই হল, তোমাকে এতদিন মিরপুরের বাইরে তেমন কেউ চিনত না। এখন তোমাকে বিভিন্ন মন্ত্রী,এমপি আর বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গরা চিনে ফেলবেন। এই চান্সে তুমি কমিশনার থেকে এমপি হয়ে যাবে।
কমিশনার সাহেব রাগতে যেয়েও বিদ্যুৎ চমকের মত বুঝতে পারলেন ঘটনা সত্যি। আসলেই তো, এই ভিডিও চিত্র প্রকাশ হলে তাঁর পরিচিতি বৃদ্ধি পাবে। তিনি হাইলাইটস হয়ে যাবেন।
ক্যামেরাম্যান ঠিক তখন বলে উঠল- স্যার, আপনার সাক্ষাৎকার রেখে বাকী অপ্রয়োজনীয় ভিডিও চিত্র এডিটিং করে ফেলেছি।

কমিশনার সাহেব ব্যাপারীর হাত হতে বেত নিয়ে আচ্ছা করে কয়েক ঘা লাগালেন খাজা সাহেবের গরুকে। খাজা সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন- আহা, করো কি তুমি! অবলা জীবকে এভাবে মারছ কেন?
-এসব গরুকে ঠিকমত শায়েস্তা না করলে পাগলামী করতে চায়। ওই যে ওদিকে তাকালেই দেখতে পাবেন সবাই গরুকে ইচ্ছেমত বেতাচ্ছে।

খাজা সাহেব দেখলেন আসলেই লোকেরা আসতে-যেতে, কারণে-অকারণে গরুদেরকে বেতাচ্ছে। এটা মনে হয় মানুষের অভ্যাস হয়ে গেছে। খাজা সাহেব দুঃখিত চোখে নিজের গরুর দিকে চাইতেই সেটি নড়ে উঠল। অমনি গরুর পা গিয়ে পড়ল খাজা সাহেবের পায়ে। গগণ-বিদারী আর্তনাদ করে উঠলেন খাজা সাহেব। কমিশনার সাহেব খানিকক্ষণ বুঝতে পারলেন না কি হয়েছে। ব্যাপারী প্রথমে বুঝে উঠে গরুকে কিছুক্ষণ ছড়াৎ ছড়াৎ শব্দে বেতাল। গরুটি ভয় পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। একটু স্বাভাবিক হয়ে খাজা সাহেবও বেত হাতে নিয়ে মনের সুখে পেটাতে লাগলেন গরুকে।
আশ্চর্য! এত মজা তিনি কোনদিনও পাননি। গরু পেটানোতে আসলেই মজা আছে। এজন্যই মানুষের অভ্যাস হয়ে যায় বেত দিয়ে কথায় কথায় বেতানো।

গরু কিনা শেষ করে হাটের বাইরে এসে দাঁড়ালেন খাজা সাহেব, কমিশনার সাহেব আর তাঁদের লোকজন। খাজা সাহেবের পা ব্যাথায় ফেটে যাচ্ছে। বিশ লাখ টাকার গরুর ওজন না থাকলেও টাকার ওজনেই দম বন্ধ হয়ে আসার কথা। ফার্মেসীর সামনে দাঁড়িয়ে ঔষধ কিনলেন খাজা সাহেব। তাঁর খুব কাহিল আর পরিশ্রান্ত লাগছে নিজেকে। খানিকটা বিশ্রামের জন্য কমিশনারের গাড়িতে বসলেন তিনি। ঠিক তখনই শুনতে পেলেন তাঁর লাল গরুটা চিৎকার করে বলছে,

-গ্রাম বাংলার সমস্ত গরু আর গাভী ভাই-বোনেরা, এখুনি তোমরা একত্র হও। আমাদের সময় এসে গেছে মানুষের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার। আমি তোমাদের অনির্দিষ্ট নেতা সালমান ফারসি লাল্লু। এই মূহুর্ত হতে সমগ্র গরু সম্প্রদায়ের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা করা হল।

বলেই খাজা সাহেবের গরু লাল্লু চোখের নিমিষে ঝড় তুলে দড়ির বাঁধন ছুটে হাটের ভিতর ঢুকে গেল। ভিতর হতে ততক্ষণে গরু-গাভীদের সমগ্র হট্টগোল আর মানুষের ভীত আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোন একটা অনর্থ ঘটে গেছে। খানিকবাদে গরুদের সমগ্র কন্ঠের মিলিত আওয়াজ শোনা গেল।


-লাল্লু ভাই এর আগমন,
শুভেচ্ছা স্বাগতম।
-লাল্লু ভাই জিন্দাবাদ,
মনুষ্যরা নিপাত যাক।
-লাল্লু ভাই মোবারক,
মনুষ্যরা ভাত খেয়ে মরুক।


লাল্লু ভাই তখন হাসিল ঘরের কাছের উঁচু মতন একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানুষের হতচকিত ভাব তখনও কাটেনি বলে অনেকে হা করেই দাঁড়িয়ে আছে। যারা হা করে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরকে গরুর লেজের গোছার বাড়ি দিয়ে দিয়ে খেদানো হচ্ছে। কাউকে কাউকে অবশ্য দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হচ্ছে আগে যেখানে গরু বাঁধা থাকত সেখানে। লাল্লু ভাইয়ের বক্তৃতা শুরু হল।
-মানুষরা কি আমাদের ছাগল পেয়েছে যে যখন-তখন বেত দিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতন পিটাবে? আমরা কি তাদের গোলাম হিসেবে তৈরি হয়েছি নাকি? আমরা হলাম আল্লাহ তা’আলার সৃষ্ট জীব। আমরা তাদের দুধ-মাংস দিব, বিনিময়ে তারা আমাদের আদর-সোহাগ করবে। কয়দিন পরে হব আল্লাহর নামে কুরবানী, ওদের উচিত আমাদের সাথে নম্র-ভদ্র ব্যাবহার করা, আমাদের কদমবুসি নেয়া, আসতে-যেতে শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দেয়া। তা তো করেই না, বরং তারা আমাদের সাথে ছাগলের মত আচরণ করে। তারা কাউকে অপমান করতে হলে সবচেয়ে বেশী গরু কিংবা গাধা নাম ব্যাবহার করে। তোমাদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তারা কি কোনদিন গাছের পাতায় এমন কোন লেখা দেখেছ যেখানে গরুদিগকে গালির উপকরণ হিসেবে বলা হয়েছে?

সমগ্র গরুরা সোল্লাসে চেঁচিয়ে বলে উঠল- না, নাআ, না!

-সুতরাং, এ সমস্ত অন্যায় এবং অবিচার কোনভাবেই সহ্য করা যাবে না। আমাদের দুধ খেয়ে শক্তি গ্রহণ করে আবার আমাদেরকেই কিনা চিকন ছিবা দিয়ে পিটায়! মানুষ জাতির আক্কেলের প্রশংসা করতে হয়। তাদের আক্কেল ছাগ সম্প্রদায় হতেও নিচু। আমি কি ঠিক বলেছি?

ঠিক, ঠিক।

পরমূহুর্তে শোনা গেল- না ঠিক না।
লাল্লু ভাই চেয়ে দেখল যে ছাগলগুলোও এবার দলবেঁধে প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু করেছে। সেদিকের একটা ছাগল আবার সাইজে-সুইজে বেশ তাগড়া মতন। সে মঞ্চে উঠে লাল্লু ভাইয়ের পাশে এসে বলতে লাগল,
-গরু মহাশয় বড় ভাইজ্বানেরা, আমি ছাল্লু বলছি। আপনারা আমাদের চেয়ে এক ডিগ্রি বেশী শিক্ষিত। তাই বলে কি আমাদের ছোট বলে অবহেলা করা উচিত হচ্ছে? আপনারাই তো আমাদের মাঝে মাঝে বলে থাকেন যে ব্যাক্তি ছোটদের অবজ্ঞার চোখে দেখে সে নিজেও একজন অবজ্ঞার পাত্র। আমরা তো সর্বদাই আপনাদের আশ্রয়ে থাকি, আপনারা আমাদের সুখ-দুঃখের সাথি। সুতরাং আমার দাবি আপনারা ছাগ সম্প্রদায়কে নিয়ে কোনরূপ কটুক্তি করবেন না। গালি হিসেবে মানুষ কিংবা গাধাদের নাম রাখার জন্য আমি বিনীত অনুরোধ করছি।

ছাল্লুর বক্তৃতা শেষ হতেই সমগ্র ছাগলরা তুমুল ম্যা ম্যা ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। লাল্লু ভাই গলা খাঁকাড়ি দিয়ে পুনরায় বলা শুরু করল,
-ছাল্লুর কথা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। আমরা তাদের জ্ঞানকেও ছোট করে দেখতে পারি না। ছাগ সম্প্রদায় কিন্তু মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান। তারা প্রায়শই মানুষদের সূক্ষ্ণভাবে ফাঁকি দিয়ে চাষের গাছ-গাছরা খেয়ে ফেলে। মানুষ মোটেও বুঝতে পারে না। যাই হোক, তাদের প্রস্তাব অনুমোদন করা হল। তবে আজ থেকে আমরা সমগ্র মানব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঘোষণা দিলাম। এ ঘোষণার পিছনে আমাদের পাঁচ দফা দাবী আছে। দাবীগুলো হল-


১ গরুদেরকে এখন থেকে আর কুরবানীর হাটে আনা যাবে না। বরং কুরবানীর সময় মানুষরা হাটে দাঁড়িয়ে থাকবে। গরুরা নিজ উদ্যোগে দূর-দূরান্ত হতে এসে পছন্দসই লোকের কাছে কুরবানী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে।
২ হাটের মধ্যে মানুষরা কোন প্রকার বেত কিংবা গাছের ডাল রাখতে পারবে না। যদি রাখে, তবে মানুষদেরকে গরুর লেজের বাড়ি খেতে হবে এবং “মানুষের বাচ্চা” বলে গালি শুনতে হবে।
৩ শহরের শিক্ষিত গরু সম্প্রদায়দের জন্য উত্তরা মডেল টাউনের মত বিশিষ্ট কোন নির্দিষ্ট মডেল টাউন বানিয়ে দিতে হবে। যেখানে গরুদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘাসের উদ্যোন, টাইলস লাগানো সুইমিং পুলে সাঁতার ও পানি খাবার ব্যবস্থা, ভাতের মাড় তৈরি করার জন্য তিতাস গ্যাস, রাতে বিনোদনের জন্য গোলযোগহীন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং লিফট ও জেনারেটর সহ বহুতল বিশিষ্ট অফিস বিল্ডিং থাকবে।
৪ গরুদের প্রতি সবচেয়ে অবিচার করা হয় পোষাকহীন রেখে। মানুষরা রঙ-বেরঙের পোষাক পড়ে ঈদের দিন ঘুরতে যায়। যেসব গরুরা ভাগ্য চক্রে দুই-চারটা ঈদ পায়, তাদের জন্য অবশ্যই সুন্দর সুন্দর কাপড় সাপ্লাই দিতে হবে। তা নাহলে গোবরের গন্ধে সমগ্র শহর ভাসিয়ে ফেলতে বাধ্য হব আমরা।
৫ কুরবানীতে আমাদের কিনার পর লোকেরা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমাদের মালিককে বারবার জিজ্ঞ্যেস করে- “ওই ভাই, গরু কত নিল?” এমনটা জিজ্ঞ্যেস করা চলবে না। আমাদের ক্রয় মূল্য কাগজে লিখে মালিকের পিঠে সাটিয়ে দিতে হবে। কারণ লোকেরা আমাদের গরু সম্প্রদায়কে দাম জিজ্ঞ্যেস করে না, জিজ্ঞ্যেস করে মনুষ্যদেরকে। তাই তাদের পিঠেই কাগজ লাগানো হবে।

গরু ভাইসাবেরা, আমরা এই পাঁচ দফা দাবী আজই সরকারের কাছে উপস্থাপন করব। প্রয়োজনে হরতাল ডাকব। কারণ হরতাল ছাড়া নাকি এ দেশে কোন কিছুই বিবেচনা করা হয় না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করার কারণেও হরতাল ডাকা হয়। ভাগ্যিস তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। যদি এমন করা হত যে তাঁর বাড়িতে তিনি থাকতে পারবেন, কিন্তু সেই বাড়ির টয়লেট ব্যাবহার করতে পারবেন না। তাহলে তো হরতাল শুধু একদিনের জন্যই হত না, হয়তো অনির্দিষ্ট কালের জন্য চলত। আমাদেরকেও সেইরূপ অনির্দিষ্ট কালের জন্য হরতাল ডাকতে হবে।

মাঝখান থেকে এক জ্ঞানী গরু বলে উঠল- হরতাল ডাকলে তো সামরিক বাহিণীর লোকজন আমাদেরকে ধরে ধরে হাজতে পুরবে। এজন্য কি করা যায়?
-নো টেনশন, ডু ফুর্তি! আমরা অত্র এলাকার কমিশনার আর তার বিশিষ্ট গুণধর ব্যাক্তি যে কিনা আমাকে কিনেছে তাদের কিডন্যাপ করে তারপর আমাদের দাবী উপস্থাপন করব।
সমগ্র গরুরা তুমুল হাম্বা হাম্বা ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। লাল্লু ভাই মঞ্চে হতে নেমে গরু বাহিণী নিয়ে এগিয়ে গেল। কমিশনার সফদার আলী খান এবং খাজা সাহেবকে গরুদের মত করে গলায় রশি বেঁধে নিয়ে আসা হল মঞ্চের উপর। খাজা সাহেব চোখ পিটপিট করে তাকাতে লাগলেন গরুদের পালের উপর। ঘটনাটি তাঁর ঠিক বিশ্বাস হতে চাইছে না। এ কি করে সম্ভব?

ঘন্টাখানেকের ভিতর সমগ্র দেশ জেনে গেল গরুরা আন্দোলনে নেমেছে। দলে দলে আরো গরুরা এসে সেই হাটের আন্দোলনে যোগ দিল। পথে পুলিশের সাথে লড়াইয়ে দুইজন বীর যোদ্ধা গরু শাহাদাত বরণ করল। গাবতলীর পথ দিয়ে মানুষের কুরবানী ঈদের ছুটি কাটানো বন্ধ হয়ে রইল। টেকনিক্যাল থেকে আমিনবাজার পুরোটাই ব্যারিকেড দিয়ে রাখল গরুরা। খানিকবাদে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে দেশে কারফু জারি করল সরকার। এবার সামরিক বাহিণী নামল এ্যাকশনে। সাজোয়া গাড়ি আর কামান নিয়ে তারা এগিয়ে এল গাবতলীর দিকে। আকাশ পথে উড়ল পাঁচটি হেলিকপ্টার আর দুইটি ফাইটার প্লেন। সামরিক বাহিণীরা গরুদের আক্রমণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু গরুরা বোকা নয়, তারা অনেক মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। যে কারণে এই মূহুর্তে আক্রমণ চালানো যাচ্ছে না।

খাজা সাহেব মোবাইল বের করে নৌ পরিবহণ মন্ত্রীর কাছে ফোন দিলেন।
-হ্যালো ভাইসাব, আমি যে জানে-প্রাণে মারা গেলাম বলে!
-খাজা সাহেব, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। গরুদের আন্দোলন আমরা ব্যার্থ করে দিব। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তবে আমার মনে হয় এর সাথে রাজনৈতিক দলের কারো গোপন সম্পর্ক আছে। প্রধানমন্ত্রী আপাকে আপনার কথা বলেছি। তিনি এ ঘটনায় বিশেষভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। পাশাপাশি আমিও এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। শীঘ্রই আপনাদের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়ে যাবে। আল্লাহকে ডাকতে থাকুন।
-ভাইসাব, আমার তো কোন চিন্তা নেই। আমার বয়স হয়ে এসেছে। যত চিন্তা নাতিটাকে নিয়ে। কেন যে ছেলেটাকে নিয়ে কুরবানীর হাটে এলাম!

এ সময় লাল্লু ভাই খাজা সাহেবের হাত হতে মোবাইল কেড়ে নিল। গরুদের পাঁচ দফা দাবী সে উপস্থাপন করল নৌ পরিবহণ মন্ত্রীর কাছে। এও বলল যে সামরিক বাহিণীদের সরিয়ে না নিলে সমস্ত মানুষদের হত্যা করা হবে।
ঘন্টাখানেক পর সামরিক বাহিণীদের সরিয়ে নেয়া হল। গরুরা দলবেঁধে নেমে পড়ল রাস্তায় হরতাল পালনের জন্য।

আমাদের দাবি মানতে হবে,
গরুদের কথা শুনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী এলেন অবশেষে। তিনি লাল্লু ভাইয়ের সাথে বিশেষ গোপনীয় বৈঠকে বসলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল গরুদের পাঁচদফা আন্দোলনের মধ্যে তিনটি চলতি সাল নাগাদ কার্যকর হবে। লাল্লু ভাইকে ঘাসের মালা দিয়ে বরণ করল গরু সম্প্রদায়। খাজা সাহেবকে করুণ ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দেখানো হচ্ছে টেলিভিষনে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে তিনি দুর্ঘটনার শিকার একজন দুর্ভাগা মাত্র। দুঃখে আর অপমানে খাজা সাহেবের চোখে পানি বেরিয়ে এল। তিনি ক্যামেরার সামনেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।

ধড়মড় করে উঠে বসে চোখ কচলেন খাজা সাহেব। কমিশনারের গাড়িতেই তিনি ব্যাথার চোটে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বাইরে তাঁর কুরবানীর গরু লাল্লুকে দেখা যাচ্ছে। কমিশনার সাহেব শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন আর মাঝে মাঝেই বেত দিয়ে পিটিয়ে গরুকে সোজা পথে দাঁড় করিয়ে রাখছেন। তাঁর নাতি কোথেকে যেন গরুর জন্য একগাদা কাগজের মালা আর শিঙের টুপি কিনে এনেছে।
খাজা সাহেব একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে গরুর রশি ধরলেন। তবে ভুলেও বেত হাতে নিলেন না। হাট হতে বেরোতে না বেরোতে এক লোক প্রশ্ন করল- ভাইসাব, কত দিয়া নিলেন গরু?
-বিশ লাখ।
- মাশাআল্লাহ, গরুর চেহারাটা সুন্দর আছে।

খাজা সাহেব অবাক বিস্ময়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এবারের বিস্ময়ে কোন প্রকার খাদ নেই।





৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×