somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কষ্টের রংধনু

২৬ শে অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শুভ্র'র বয়স খুব বেশী নয়, মাত্র ১২ বছর বয়স ওর। খুব সুন্দর ছিল ছেলেটা, খুব সুন্দর করে কথা বলতো ও। মাঝেমধ্যেই ওর সাথে গল্প করে সময় কাটাতাম আমি। গল্প করতাম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কখনো ওর কথা বলতো ও, কখনো আমার কথা বলতাম আমি। কথা হতো প্রতিদিন।
কোনো এক জোছনা ভেজা রাতে আমি বসে আছি, চুপচাপ বসে থেকে জোছনা দেখছি। গাছের পাতার আড়াল থেকে অপূর্ব চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে। এক টুকরো মেঘ এসে ঢেকে দিয়েছে চাঁদের খানিকটা অংশ। রূপালী জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক, ভেসে যাচ্ছে অপূর্ব এ পৃথিবীটা! শুভ্র আমার কাছে এলো, পাশে এসে একদম খুব কাছ ঘেসে বসলো ও। ওর মুখে খেলা করছে বিচিত্র এক ধরনের হাসি, চিকচিক করছে ওর চোখ দুটোও। খুব কৌতুহল নিয়ে ও কিছু প্রশ্ন করলো আমাকে।
“আচ্ছা ভাইয়া তুমি জানো কী, আমাদের দেশে ঠিক কতোজন মানুষ বাস করে ?”
আমি মাথা নেড়ে হেসে বললাম, “খুব যদি বেশী হয় তবে ১৩ কোটি।”
“আচ্ছা এই ১৩ কোটি মানুষের প্রত্যেকে যদি ১ টাকা করে দান করে তবে তো ১৩ কোটি টাকা জমা হবে, তাই না ?”
আমি ওর কথা শুনে মৃদু হাসলাম এবং তারপর বললাম, “ তাই তো হবার কথা। ”
“ঠিক আছে, ১ টাকা নয়, সবাই যদি ৫০ পয়সা করেও দান করে তবে তো সাড়ে ছয় কোটি টাকা হবে, কী হবে না ?”
আমি ওর কথা শুনে কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম, তারপর বললাম, “তা তো হবেই, কিন্তু কেন বলোতো ?”
আমার কথা শুনে মৃদু হাসলো ও। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “কারণ আছে।”
শুভ্র'র চোখ দুটো চিকচিক করছে এখনো। জোছনার মৃদু রূপালী আলোয় তার চোখ দুটো আরও একটু বেশী চিকচিক করে উঠলো যেন! শুভ্র চুপ করে আছে, চুপ করে আছি আমিও। কোনো কথা বলছি না। এভাবে কাটলো আরও কিছুক্ষণ, তারপর ও আবারো বলতে শুরু করলো- “আচ্ছা ভাইয়া, আমাদের এই ১৩ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে তো ৫ লক্ষ মানুষ সিগারেট খায়, খুব কম করে হলেও তো তারা দিনে ১টি সিগারেট খায়। আর যদি খুব কম দামেরও হয় তবে তো তারা ১ টাকা দামের সিগারেট খায়, তাই না ?”
আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম, তারপর বললাম, “হ্যাঁ, তো কী হয়েছে ?”
আমার কথা শুনে হেসে ফেললো শুভ্রও, হেসে হেসে বললো, “কারণ আছে, খুব ভয়ংকর একটা কারণ আছে ভাইয়া!”
ধীরে ধীরে শুভ্র মাথাটা উঁচু করলো তার। তারপর দৃষ্টি মেলে দিল দিগন্ত বরাবর। দেখতে থাকলো চাঁদটাকে, যেটা এখনো এক টুকরো মেঘের নিচে লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে লুকিয়ে স্নিগ্ধ জোছনাটাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে, আমাদের চারপাশটাতে! জোছনায় ধুয়ে যাচ্ছে সমস্ত পৃথিবী। সে জোছনার অপূর্ব আলোয় আমরা বসে আছি, শুধু আমরা দু’জন বসে আছি। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে শুভ্র বলতে শুরু করলো তার কথাগুলো- “জানো ভাইয়া, আমার ১৩ কোটি টাকার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই সাড়ে ছয় কোটি টাকারও। আমি একটু বাঁচতে চাই। খুব জানো, খু-ব বাঁচতে ইচ্ছে করে আমার। ঠিক তোমাদের যেমন বাঁচতে ইচ্ছে করে। তোমাদের মতো করে নীল আকাশটাকে দেখতে ইচ্ছে করে, পূর্ণিমার অপূর্ব ঐ চাঁদটাকে দেখতে ইচ্ছে করে! ঐ যে নীল ধ্র“ব তারাটাকে দেখছো, যেটার সাথে একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলে তুমি, সেই নীল ধ্র“ব তারাটাকেও দেখতে ইচ্ছে করে আমার। দু’চোখ ভরে মুগ্ধ হয়ে দেখতে ইচ্ছে করে! রঙিন একটা প্রজাপতি দেখতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে একটু ছুঁয়ে দেখতেও! জানো ? আমি বেশী কিছু চাইনি, চাইও না। শুধু একটু বাঁচতে চাই আমি! জানো ভাইয়া, আমার দুটো কিডনির প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু গরীব ঘরে জন্মেছি বলে তোমাদের কাছে হাত পাততে হচ্ছে আজ। বেশী না ভাইয়া, খুব যে বেশী চাইছি তাও না। মাত্র ৫০ পয়সা! তোমাদের মধ্যে থেকে মাত্র ৪ লক্ষ মানুষ যদি আমাকে ৫০ পয়সা করে দান করে, তবে জমা হবে ২ লক্ষ টাকা। আর সেই ২ লক্ষ টাকা হলে আমি চিকিৎসা করাতে পারবো। বাঁচতে পারবো তোমাদের মতো করে। আমি আবারো হাসতে পারবো, কাঁদতে পারবো, তোমার সাথে কথা বলতে পারবো, নীল আকাশটাকে দেখতে পারবো, রূপালী জোছনাকে গায়ে মেখে আবারো আমি মুগ্ধ হয়ে বসে গল্প করতে পারবো তোমাদের সাথে। রঙিন একটা প্রজাপতিকে হয়তো একদিন ছুঁয়েও দেখতে পারবো, অনুভব করতে পারবো তার কোমলতা, অবলোকন করতে পারবো তার সৌন্দর্যও! আমাদের দেশের মাত্র ৪ লক্ষ মানুষ, মাত্র ৪ লক্ষ মানুষ যদি ৫০ পয়সা করে দান করে, যদি তারা একদিন একটা সিগারেটও না খায়, আর সে একদিনের একটা সিগারেটের টাকাটা যদি আমাকে দান করে, তাহলে আমি বাঁচবো ভাইয়া, আমি বেঁচে থাকতে পারবো তোমাদের মাঝেই!”
চোখ দুটো চিকচিক করছে শুভ্র’র, আর সে চিকচিক করা অংশটা ধীরে ধীরে জল হয়ে গড়িয়ে পড়ছে তার গাল দুটো বেঁয়ে, তপ্ত নোনা জল। ভিজে যাচ্ছে সে, ভিজে যাচ্ছে তার কোমল গাল দুটো। যে গালে হয়তো এক সময় তার বাবা চুমু খেয়েছিলেন, বা পরম স্নেহ নিয়ে তার মা তাকে আদর করে দিয়েছিলেন একদিন, সেই গালটা ভিজে যাচ্ছে আজ! হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমার চোখ দুটোও ভিজে যাচ্ছে যেন, আর সে ভেজা অংশটা জল হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমার গাল দুটো বেঁয়ে।
মাথাটা নিচু করে ছিল শুভ্র, এবার মাথাটা একটু উঁচু করলো সে। অপলক দৃষ্টি মেলে দিল ঐ বিশাল আকাশটার দিকে, যে আকাশটা এখন আর নীল নেই। অপূর্ব রূপালী জোছনায় রূপালী হয়ে গেছে এখন সেটাও। হঠাৎ একটা রংধনু চোখে পড়লো তার। সাত রঙ দিয়ে রাঙানো রংধনু নয়, রূপালী একটা রংধনু দেখলো সে, কষ্টের রংধনু!
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×