তপ্ত যৌবনার মতো, আমার কিশোর চোখে
নেশা জাগিয়ে ভন ভন ঘুরছে..একটি কাঠরঙা লাটিম।
হাতের রেখার শিরশির থেকে উঠে আসছে , অনুভবে শৈশব।
আমার সবুজ শৈশব
আমার লাল মরিচে মাখানো কাঁচা আম
তুমি সময়ের স্রোতে কোথায় তলিয়ে গেলে ?
চোখ বুঝলেই দেখি..
সরিষা ক্ষেতের আল বরাবর মৌমাছিদের সাথে পাল্লা দেয়া দৌড় ..
দেবদারুর বনে..আরো গহীনে ঘুঘুর নিবিঢ় ডাক..
চালতা গাছের নুয়ে পড়া ডাল ছুঁয়ে দিতে চায় লাল শাপলার মুখ।
শাপলার ফাঁকে সাপের ছানাটির শান্ত সাতার।
স্মৃতির ভেতরে রঙিন ফানুষে মোড়া কতো কতো সুখ।
মাঝে মাঝে মোটা পাওয়ারের চশমা খুলে মুছতে মুছতে ভাবি-
হারিয়ে গেছে আমার মাটির পুতুল- হারিয়ে যাওয়াটাই সময়ের মূল দাবী।
লাটাইয়ের সাথে ঘুড়ির অবাক প্রেম।
সূর্যের বুকে পাঠিয়েছি কতো আমার রঙিন মন !!
বাংলার মাঠে মাঠে ছড়ানো আছে
আমার পায়ের দাগ।
আমার হাতের বন্ধ মুঠোর ভেতর দিয়ে মিহি কাঁচের চূড় নিয়ে যেভাবে
তুফান মেলের মতো ছুটেছে মাঞ্জা দেয়া সুতো..
সেভাবেই .. তার থেকে দ্রুত আমার জীবন থেকে
কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে
আমার অবাধ শৈশব রাঙা দিন।
কতবার...
শিবা'দের মাঁচা থেকে শশা চুরি করে খেয়েছি..
দেখেছি সেখানে রাতা মোরগের লাল ঝুটির নাচ।
ডিম পাড়বে বলে মুরগীর হঠাত উড়াল
কু কুরুক কু ডাক !!
সঙ্গীতের মতো সেই পবিত্র সকাল কোথায় হারিয়ে গেলো ?
আমার পৃথিবীতে ছিলো না তখন সাবমেরিনের এতো কলাকৌশল..
ছিলো না মর্টার , ছিলো না শেল , ছিলো না কোনো কামান, বেয়নেট।
ছিলো না ছিলো না সামরিক বিশারদ।
আমার পৃথিবী ছিলো
শীতের সকালে
একটি ভাঁপা পিঠার ধোঁয়ার মতো সরল।
ছিলো একটা ঝরনার মতো কোমল।
গেছো ভূত ছাড়া ছিলো না কিছুর ভয়।
আমার প্রতিটি শুক্রবার আমার জন্য এক মুঠো উজ্জ্বল রোদ্দুর নিয়ে আসতো।
আমার শরীর মধ্য দুপুরে শাপলার মতো পদ্ম-পুকুরে ভাসতো।
আমার যারা বন্ধু ছিলো , তারা আমাকে দেখলেই শুধূ ফিক ফিক করে হাসতো।
পুঁইয়ের মাঁচা ভরা ছিলো বেগুনি ডাঁট..
তিরতির ফড়িং এর গান।
প্রজাপতিদের রঙের মহড়া।
রাতের বেলায় থালার সমান চাঁন।
বড় হতে হতে মানুষেরা কি নিজেদের নিয়মে ছোট হয়ে যায় ?
ছোট হয়ে যায় তাদের মনের পৃথিবী ?
স্বার্থ কি গ্রাস করে ফেলে আমাদের হৃদয় ?
লোভ কি আমাদের পূর্ণ চন্দ্র ময় জোছনাকে গিলে খায় এক অদ্ভুদ আমাবস্যায় ?
আমার ভেতরে আমার শিশুটি কেন উঁকি মারে এই নষ্ট শহরে ?
এখনো কেন একটি ঘাসফুলের কাছে আমার এতো দায় ?
আমার বুকে, নাক ঘষে দেখো
হৃদয়ে পাবে সোঁদা মাটির আসল গন্ধ।
সেখানে পাবে হাসনা হেনা, দোলন চাঁপার ঘ্রান।
একটা ছোট টুনটুনি পাখির শরীরে নাচছে আমার প্রাণ।
সেদিন একটা কলা গাছের ভেলার ভেতরে..
সেদিন একটা ডাংগুলির বারিতে ডাটের ভেতরে..
সেদিন কয়েকটি মার্বেলে, রঙিন নেশার ভেতরে..
সেদিন একটি কচু পাতায় টলটল জলের ভেতরে.
সেদিন ছোট্ট ডোবাটিতে সোনা ব্যাঙের ফুলে যাওয়া গলার ভেতরে..
সেদিন আমার আলাম ছিপাড়ার পুরোনো একটা ঝলসে যাওয়া ছবির ভেতরে
উঁকি মেরে নিমিষেই পালিয়ে গেলো অবাক শৈশব।
আমি তাকে মূহুর্তের জন্য গোপন জানালায় দেখে ফেলেছি।
ধরতে পারি নি।
আমি তার পায়ের শব্দ হৃদয়ের গোপন রাডারে এঁকে ফেলেছি।
কিন্তু , হারিয়ে যাওয়া সেই সুর আমি আর নতুন করে গাইতে পারি নি।
ফুটেবলে ভর করে আমার কাঁদা মাখা ছোট্ট শরীর
কতবার দিয়েছে পুকুর পাড়ি-
ডুমুরের চাকা দিয়ে বানিয়েছি আমার
রেলগাড়ি।
তোমরা কোথায় আমার শৈশবের বন্ধুরা ?
ঝাল জলপাই আচার নিয়ে দেখা করতে আবার কবে আসবে ?
কবে আবার এক সাথে শীতল পাটিতে বসে খাবো
খেজুরের রসে বানানো পায়েস ?
হারিয়ে যায় নি আমার শৈশব।
চেতনায় আছে সমুজ্জ্বল।
বুকের গোপন ড্রয়ারে এখনো আছে
আকাশ থেকে যে তারা গুলো আমি
দু আঙুলের চিমটিতে ধরেছিলাম।
কোনো একদিন কাউকে দেবো
আমার এ গুপ্তধন ..
সত্যি কি আমি তা জানতাম ?
পাকা জামের রসে রঙিন মুখের ছবি-এখনো ভুলি নি।
জাম গাছের পাশেই ছিলো দুটো জামরুল গাছ।
একটি শিম গাছ লতিয়ে উঠেছিলো তার শরীর বেঁয়ে।
বড় হয়ে আমি শিখেছিলাম - এই জড়িয়ে ধরাটাকে
কখনো কখনো প্রেম বলে।
একবার গুলতি দিয়ে মেরেছিলাম একটি শালিক।
নিজের তাক দেখে , নিজেই হয়েছিলাম অবাক।
মনে হয়ে ছিলো , আমি এই পৃথিবীর মালিক।
তখনও আমি হিজলের পাতায়, শালিকের পশমে
জন্মগ্রহণ করি নি।
আমার বিষ্ময় সীমাবদ্ধ ছিলো গাছের ফাঁকে ছেড়া ছেড়া রোদ্দুরের তীব্র ঝাঁঝে।
আমার আবিষ্কার তুফান তুলতো ছোট ছোট স্বপ্নের উন্মোচনে।
আমার পৃথিবীর মানে ছিলো অনেকগুলো শাদা শাদা কাশফুল।
আমার জং ধরা মনে পুরোনো শাদাকালো ছবির মতো ফিরে এসো আমার শৈশব।
আমার অসুস্থতায় আরোগ্য হয়ে ফিরে এসো আমার সবুজ শৈশব।
মায়ের কোলের আপন গন্ধের মতো আমাকে আমার দুলিয়ে যাও আমার শৈশব।
নতুন করে আবার আমাকে একটি অন্য জীবনে ফিরিয়ে নাও আমার শৈশব।
আমার চাওয়া গুলোকে পাওয়াতে ঘুরিয়ে দাও আমার শৈশব।
আমার স্বপ্ন গুলোতে সত্যির কংক্রিটে নিয়ে এসো আমার শৈশব।
ভদলেয়ার, আন্ত চেখভের চোখের সূর্য়ে ..
নতুন একটি সূর্য সেন এর পরিভাষায় আমাকে
রুপান্তর করো আমার শৈশব।
ঈর্ষাহীন মহান জীবন আমাকে দাও আমার শৈশব।
দুখের পাহাড় ভেঙে সুখের আগ্নেয়গিরিতে আমাকে
জাগিয়ে তোলো আমার শৈশব।
মহাকাশের সব রহস্য
আমার হাতের কাছে লিচুর কোয়ার তুলে ধরো আমার শৈশব।
মহাজীবনের যে সঙ্গীত আমি এড়িয়ে এসেছি-
মোহাম্মদের যে স্বপ্ন আমি হৃদয়ে নেই নি..
মাদার তেরেসার যে প্রেম আমি দেখেও দেখি নি..
যীশুর যে যন্ত্রনা -আমি কখনো ভাবি নি..
কৃষ্ণের যে লীলা আমি গভীরে খুঁজি নি..
শিবের যে যোগ আমি আমল করি নি..
ঈশ্বরের যে দুঃখ আমি ঘুচিয়ে দেই নি..
অপূর্ন সে বাসনাগুলো পূর্ণ হতে দাও।
আমাকে আমার ভেতর থেকে
নতুন করে জন্ম দাও আমার সরল রঙিন
হারানো শৈশব।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১২:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


