দেশের পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক করার জন্য সরকার গুচ্ছ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এর তেমন ইতিবাচক প্রভাব বাজারের ওপর পড়েনি; তবে বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই আশা করছেন এর প্রভাব ধীরে ধীরে পড়বে। সরকারের শীর্ষ নির্বাহী তথা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে পুঁজিবাজারের সংকট নিরসনের জন্য হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। অথচ কাজটি করার দায়িত্ব ছিল অর্থমন্ত্রী এবং অর্থ উপদেষ্টার। তারা দুজনই ব্যর্থ হয়েছেন বললে ভুল হবে। ব্যর্থ হওয়া বলতে বোঝায়, চেষ্টা করেও সফল না হওয়া। তারা দুজনে পুঁজিবাজারের সংকট নিরসনে প্রচেষ্টা নিয়েছেন বলে দৃশ্যমান হয়নি। উপরন্তু পুঁজিবাজার নিয়ে তারা দুজনে এমনসব মন্তব্য করেছেন_ যা অসময়োপযোগী, অপরিণামদর্শী, রাজনৈতিক বিবেচনাশূন্য এবং অনভিপ্রেত। বিভিন্ন সময় তাদের দেয়া বক্তব্য বাজারকে উল্টোমুখী করেছে। সময়ে যেটা করতে এক ফোঁড় লাগত, অনেকাংশে তাদের কারণে তা এখন করতে দশ ফোঁড়েও সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলি_ এক জ্যোতিষী এসেছেন রাজ দরবারে রাজার হস্তরেখা দেখে ভবিষ্যৎ বলার জন্য। জ্যোতিষী রাজার হাত দেখে বললেন, 'রাজামশাই, আপনার হাতের সবই তো ভালো, কেবল আপনার পরিবারের সব লোকজন আপনার জীবদ্দশায় মারা যাবে।' রাজামশাই জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে যারপরনাই অখুশি হলেন এবং তাকে কোন পারিশ্রমিক না দিয়েই বিদায় করলেন। ডাকা হলো আরেক জ্যোতিষীকে। তিনি রাজার হস্তরেখা দেখে বললেন, 'রাজামশাই, আপনি খুবই ভাগ্যবান এবং দীর্ঘজীবীও বটে।' জ্যোতিষীর কথায় রাজা আনন্দিত হলেন এবং তাকে যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় করলেন। দুই জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীর মর্মার্থ একই। কিন্তু পরিবেশনের কৌশল ছিল ভিন্ন। একই কথা পরিবেশনের গুণে ভিন্ন তাৎপর্য লাভ করে। আমাদের অর্থমন্ত্রী এবং অর্থ উপদেষ্টা প্রায় সময়ই শেয়ারবাজার সম্পর্কে প্রথম জ্যোতিষীর মতো করে বক্তব্য দিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী এবং অর্থ উপদেষ্টার ওপর পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিরাট সংকট তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণোদনা ঘোষণার পরও কিন্তু বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সরকার কিংবা সরকারপ্রধানের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব কিন্তু ছিল না। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সব সময়ই প্রধানমন্ত্রীকে মাতৃরূপে অধিষ্ঠিত করে বাজারের সংকট কাটাতে তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। এতদিন হয়তো পুঁজিবাজারের বাস্তব চিত্র এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়নি। আমরা সাধারণ নাগরিকরা আশঙ্কিত এই ভেবে যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সম্ভবত দেশের অন্যান্য সেক্টরের অবস্থাও এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসইসি ২৩ নভেম্বর তারিখে প্রণোদনার প্যাকেজগুলো ঘোষণা করেছে। এর আগে এনবিআর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করা হবে না মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এসইসি বা সরকারের স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের নূন্যতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা। প্রিন্ট মিডিয়ার খবরে দেখা যাচ্ছে, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ৩০ শতাংশের উপরে রয়েছে। অল্পসংখ্যক কোম্পানি এর ব্যতিক্রম। এ ব্যবস্থা অবলম্বনে পুঁজিবাজারে সামগ্রিকভাবে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। প্রণোদনার মধ্যে আরও রয়েছে শেয়ার ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকৃত মূলধন মূল প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আইনি সীমা বা 'ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার' হিসেবে গণ্য না করা। একই সঙ্গে কোন কোম্পানির শেয়ারে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মূলধনী বিনিয়োগকে ওই ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমার বাইরে রাখা। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে অন্যদের সঙ্গে এগুলোর কথা বলা হয়েছে। পদক্ষেপগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়াবে ঠিক, কিন্তু দ্রুত তারল্য প্রবাহ বাড়াবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।
এসইসির নির্দেশানুযায়ী সব তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে একজন করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়ার কথা। বর্তমানে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে, তা নিয়ম রক্ষা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশের মানুষের (বিশেষ করে যাদের অর্থসম্পদ আছে) নির্বাচনের দিকে প্রবল ঝোঁক রয়েছে। কোম্পানিগুলোর স্বতন্ত্র পরিচালক ইস্যুটি নির্বাচনমুখী করে সাধারণের এই ঝোঁকটিকে শেয়ারবাজারের বর্তমান তারল্য সংকট নিরসনে কাজে লাগানো যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন কিছু ব্যবস্থা নেয়ার। সে রকমই কিছু ব্যবস্থা নিচে প্রস্তাব করা হলো_
১. স্বতন্ত্র পরিচালক নির্বাচিত হবেন। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্য থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভোটের মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হবেন।
২. কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকরা এই নির্বাচনে ভোট প্রদান করতে পারবেন না।
৩. নির্বাচিত স্বতন্ত্র পরিচালকের মেয়াদ স্বল্পকাল হবে (বড় জোর দুই বছর)। মেয়াদান্তে স্বতন্ত্র পরিচালক নির্বাচিত হবেন কোম্পানির সাধারণ সভার মাধ্যমে।
কোম্পানিগুলোর আগামী সাধারণ সভাতেই উপরোক্ত ব্যবস্থায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচালক নির্বাচিত করার পদক্ষেপ নেয়া গেলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমি মনে করি। বাজার সম্পর্কে অনাস্থার পুঞ্জীভূত যে ভাব এত দিনে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন কারণে, তা কাটানোর জন্য জরুরিভাবে প্রয়োজন অনুকূল আবহ সৃষ্টির। আমি আশাবাদী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা দ্রুত অবলম্বন করা গেলে এই বাজারে সে রকমই একটি আবহ অবিলম্বে তৈরি করতে সহায়ক হবে এবং বাজারে যে সমূহ তারল্য সংকট রয়েছে তারও সমাধান হবে। এসইসির চেয়ারম্যান বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন।
প্রদীপ সেন
[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা]
বন্ধু সুহৃদয়েষু প্রদীপ সেনের এই লেখাটা আজ (০৮-১৩-২০১১) দৈনিক সংবাদে ছাপা হয়েছে। লেখকের অনুরোধে সময় উপোযেগী এই লেখাটা কপি পেস্ট করলাম। যারা কপি পেস্ট পোষ্ট দেখে বিরক্ত হন তাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



