somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আহলান সাহলান মাহে রমজান

০৪ ঠা আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৪:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি জিনিসের ওপর। তন্মধ্যে একটি রমজানের সিয়াম। আরবী সিয়াম শব্দের যথার্থ ভাব প্রকাশক শব্দ বাংলা ভাষায় নেই। যদিও কেউ কৃচ্ছ্রসাধনা ও উপবাস প্রভৃতি শব্দ দ্বারা সিয়ামের ভাব প্রকাশ করেন। সিয়ামের প্রতিশব্দ হিসেবে ফারসী ভাষাতে রোজা শব্দটি ব্যবহূত হয়, যদিও তা সিয়ামের সঠিক ভাব প্রকাশক শব্দ নয়। রোজা শব্দ দ্বারা সিয়ামের প্রকৃত ভাব প্রকাশ পাক বা না পাক, বাংলার মুসলিমগণ রোজা শব্দটি দ্বারা সিয়ামই বোঝে। কিন্তু সিয়াম বললে বেশীরভাগ লোকই বুঝতে পারেন না। তাই সিয়ামের বদলে রোজা শব্দটিই এখানে ব্যবহার করছি। আরবী সিয়াম শব্দের শাব্দিক অর্থ বিরত হওয়া এবং শরীয়াতের পরিভাষায় সিয়াম হল কতিপয় বিশেষ শর্তসাপেক্ষে বিশেষ বিষয় হতে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষভাবে বিরত থাকা (ফাতহুল বারী ৪র্থ খণ্ড পৃষ্ঠা ১০২।

এই রোজা কবে থেকে চালু হয়েছিল তার বিশদ বিবরণ পাওয়া খুবই মুশকিল। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হল যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল।” (সূরা বাকারা ২: ১৮৩)

এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, মুহাম্মদ (স.)-এর পূর্ববর্তী উম্মতগণের ওপরও রোজা ফরজ ছিল।

আদম (আ.)-এর রোজা :আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং তারপর তাওবাহ করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তাওবাহ কবুল হয়নি। ৩০ দিন পর তার তাওবাহ কবুল হয়। তারপর তাঁর সন্তানদের উপরে ৩০টি রোজা ফরজ করে দেয়া হয়। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খণ্ড ১০২-১০৩ পৃষ্ঠা)

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজা কে রেখেছিলেন এ ব্যাপারে সাধক চূড়ামণি শাইখ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, যির্র ইবনে হুবাইশ (রা.) বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে আইয়্যামে বীয (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে আইয়্যামে বীয বলে) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম (আ.)-কে একটি ফল খেতে মানা করেছিলেন। কিন্তু আদম (আ.) সেই ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সে সময় তাঁর দেহের রং কালো হয়ে যায়। ফলে তাঁর এ দুর্দশা দেখে ফেরেশতাগণ কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ! আদম তোমার প্রিয় সৃষ্টি!! তুমি তাঁকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলে, আমাদের দ্বারা তাকে সিজদাও করালেন, আর একটিমাত্র ভুলের জন্য তার গায়ের রং কালো করে দিলেন? তাদের জবাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম (আ.)-এর কাছে এ ওহী পাঠালেন, তুমি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখ। আদম (আ.) তা-ই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হল। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়্যামে বীয বা উজ্জ্বল দিন বলে (গুনইয়াতুন ত্ব-লেবীন বাংলা অনুবাদ ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৩০৭)। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলূল্লাহ (স.) ঘরে ও সফরে আইয়্যামে বীযে কখনো সিয়াম না করে থাকতেন না (নাসাঈ, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)।

নূহ (আ.)-এর রোজা :আদম (আ.)-এর পর নূহ (আ.) কে দ্বিতীয় আদম বলা হয়। তাঁর যুগেও সিয়াম ছিল। কারণ, রাসূলূল্লাহ (স.) বলেন: নূহ (আ.) ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন (ইবনে মাজাহ ১২৪ পৃষ্ঠা)। মুআয ইবন মাস’উদ, ইবনে আব্বাস, আতা, কাতাদাহ ও যাহ্হাক (রা.) থেকে বর্ণিত, নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে প্রত্যেক মাসে তিনটি করে সিয়াম ছিল। পরিশেষে রমাযানের এক মাস সিয়ামের দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তা রহিত করে দেন (তাফসীর ইবনে কাসীর, ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২১৪)।

বনে কাসীরের (রহ.) এ বর্ণনা প্রমাণ করে যে, নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে মুহাম্মদ (স.)-এর যুগ পর্যন্ত রমজানের সিয়াম ফরজ হবার আগে কমপক্ষে তিনটি করে সিয়াম ফরজ ছিল।

ইবরাহীম (আ.) ও বিভিন্ন জাতির রোজা :নূহ (আ.)-এর পরে নামকরা নবী ছিলেন ইবরাহীম (আ.)। তাঁর যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন। ইব্রাহীম (আ.)-এর কিছু পরের যুগ বৈদিক যুগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাত্ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দী মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের উপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসেবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোন কোন ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবারে উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন।

হযরত মূসা (আ.)-এর রোজা :ইবরাহীম (আ.)-এর পর কিতাবধারী প্রসিদ্ধ নবী মূসা (আ.) তাঁর যুগেও সিয়াম ছিল। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) মাদীনায় (হিজরত করে) এসে ইয়াহুদীদেরকে আশুরার দিনে (মুহাররম মাসের ১০ তারিখে) রোজা অবস্থায় পেলেন। তাই তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা করছো? তারা বলল, এটা সেই মহান দিন যেদিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার জাতিকে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মূসা (আ.) ঐদিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরা আজকে ঐ রোজা করছি (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)।

ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তওরাতে আছে, মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে কাটিয়েছিলেন। তাই ইয়াহুদীরা সাধারণভাবে মূসা (আ.)-এর অনুসরণে ৪০টি সিয়াম রাখা ভাল মনে করতো। কিন্তু এর মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের উপর রোজা রাখা ফরজ ছিল। এ জন্য ঐদিনটিকে আশুরাহ বা ১০ম দিন বলা হয়। এ আশুরার দিনে মূসা (আ.) তাওরাতের ১০টি বিধান পেয়েছিলেন। এ কারণেই তাওরাতে ঐদিনের রোজার অত্যন্ত তাগিদ এসেছে। এছাড়াও ইয়াহুদী সহীফতে অন্যান্য রোজারও স্পষ্ট হুকুম রয়েছে। (সীরাতুন নাবী ৫ম খণ্ড, ২৮৬ পৃষ্ঠা) দাউদ (আ.)-এর রোজা মূসা (আ.)-এর পর কিতাবধারী বিখ্যাত নবী ছিলেন দাউদ (আ.)। তাঁর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। আল্লাহর রাসূল বলেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোজা দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোজায় থাকতেন (নাসাঈ ১ম খণ্ড ২৫০ পৃষ্ঠা, বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১৭৯ পৃষ্ঠা)। অর্থাত্ দাউদ (আ.) অর্ধেক বছর রোজা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোজা থাকতেন। ঈসা (আ.)-এর রোজা দাউদ (আ.)-এর পর কিতাবধারী বিশিষ্ট নবী হলেন ঈসা (আ.)। তাঁর যুগে এবং তাঁর জন্মের আগেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআনে আছে, ঈসা (আ.) এর যখন জন্ম হয় তখন লোকেরা তাঁর মা মারইয়ামকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমি করুণাময়ের উদ্দেশ্যে মানতের রোজা রেখেছি। সুতরাং আজকে আমি কোন মানুষের সাথে মোটেই কথা বলব না।” (সূরা মারইয়াম ১৯ : ২৬ আয়াত)

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ.) ও তাঁর উম্মত (অনুসারী সম্প্রদায়) রোজা রাখতেন। ঈসা (আ.) জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম রেখেছিলেন। একদা ঈসা (আ.)-কে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করেন যে, আমরা অপবিত্র আত্মাকে কি করে বের করব? জবাবে তিনি বলেন, তা দু’আ ও রোজা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বের হতে পারে না (মথি ৭-৬৬, সীরাতুন নবী ৫ম খণ্ড ২৮৭-২৮৮ পৃষ্ঠা)।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×