http://www.shamokal.com/details.php?nid=97607
সমকাল পত্রিকায় আমার লিখার লিংক দিলাম যা আংশিক পরিবর্তিত।
নীচে আমার মূল লিখা :
আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির পথ ধরে আবারও রোজা চলে এসেছে বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের সামনে। এসময়ে জীবন যাত্রার সময়টা একটু পরিবর্তিত হয়ে যায়, পরিবর্তন ঘটে খাদ্যাভাসেও। ভেতো বাংলাদেশীরা বিভিন্ন খাবারের খোঁজে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী নোলা ঝুলিয়ে ছোঁকছোঁক করতে থাকে। যদিও রোজার অপর নাম সংযম কিন্তু জনগোষ্ঠী সারাদিনের না খাওয়াটা ইফতারীতে পুষিয়ে নেবার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারপরনাই। রসুইঘরে যাদের জীবনচক্র ঘুরে সেই নারীদের নানা কেতাকায়দায় বাড়ীর সবার রসনা তৃপ্তির জন্য অন্যরকম মনোযোগে কাজে নেমে পড়তে হয়।
বাজার ঘুরে বুঝে এলাম
’আমি জানি না মানুষ কেন এমন উন্মাদ হয়ে উঠে, খাদ্য আহরণে! মানুষের উন্মাদনা বাজারে সবকিছুর দাম বাড়িয়ে তোলে অনেকখানি।’ নুসরাত আমাকে বলছিলেন একটি সুপারস্টোরে রোযা শুরুর আগেরদিনের অভিজ্ঞতা। তিনি গিয়েছিলেন টুকটাক কিছু জিনিস কিনতে। নুসরাতের মেয়েটা খেজুর পছন্দ করে। ভাবলেন এক কেজি ভালো খেজুর কিনে নিয়ে যাবেন। একসাথে অনেক বাজার করার মতো অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নেই। তাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গেই সারা মাসের জিনিস কিনতে হবে। খেজুরের র্যাকের সামনে গিয়ে নুসরাতের মাথা সামান্য ঘুরে উঠলো। তিনি ঐখানেই দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন খেজুর কেনাটা আবশ্যক কি না। এককেজি ভালো খেজুরের দাম মাত্র সাতশ টাকা! নুসরাত যখন ভাবছেন নেবেন কি নেবেন না তখন তার পাশে দাঁড়ানো মহিলা শপিং ট্রলিতে মাত্র তিন কেজি খেজুর তুলে নিলেন। নুসরাত হাফ কেজির একটা প্যাকেট নিয়ে ঐ মহিলা এবং সুপারস্টোরে শপিংরত আরও মানুষদের লক্ষ্য করতে থাকলেন। কেনার যেন শেষ নেই। বিশ লিটার সয়াবিন তেল, তিন কেজি খেজুর, শসেজ, জুস, কলা, টমেটো, দই ইত্যাদি ইত্যাদি এসব নিয়ে মানুষ ছুটছে। যেন কারও খাবারে কোন কম না পড়ে। কে বলে মানুষ কষ্টে আছে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে! যে গোষ্ঠীর বড়লোক থাকার কথা তারা আরও বড়লোক হয়েছে। তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত ক্রয় যে কোন দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি। নুসরাত সাতটা সাগর কলা কিনলেন চুয়ান্ন টাকা দিয়ে এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন এবার রোজায় তিনি ইফতারী নামক কোন বস্তু আসলে বানাবেন না। এক গ্লাস শরবত খেয়ে রোজা ভেঙ্গে, মাগরিবের নামাযটা আদায় করে সরাসরি ভাত খাইয়ে দিবেন সবাইকে। হাফ কেজি টক দইয়ের দাম চল্লিশ টাকা। তাও শেষ হয়ে গেছে, বুভুক্ষু বড়লোক ক্রেতাদের চাহিদার কারণে।
রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা
সেহরী খেতে বাসার সবাই পৌনে চারটায় উঠলেও জোবেদা খাতুনকে ঠিক তিনটায় উঠতে হয়। তা না হলে তরিতরকারী গরম করে টেবিল রেডি করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফজরের নামায পড়ে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গেলেও পাঁচটা। তারপর অফিসের জন্যে ঠিক সাড়ে সাতটায় বের হয়ে পড়তে হয়। ন’টার অফিস ধরতে। সাড়ে তিনটায় অফিস ছুটির কথা থাকলেও বের হতে হতে মিনিমাম চারটা। তারপর ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক জ্যাম ও যানবাহনের অপ্রতুলতা। গলদঘর্ম হয়ে বাসায় ঢুকে কোনরকমে ইফতারীটা কাজের মেয়ের সহায়তায় তৈরী করে একটু অবসর মেলে কি মেলে না, তারপর সন্ধ্যা রাতের রান্না ঠিকঠাক, ভোররাতেরটাও। জোবেদা ভাবেন রোজাতে আসলে উর্দ্ধশ্বাসে কাজ করার গতি ছাড়া তার আর কোন প্রাপ্তি নেই। অফিসে আট ঘন্টার কাজ ৬ ঘন্টায় শেষ করতে হবে। বাসায় যেখানে এমনি সময়ে চারবেলা খাওয়া হয় সেখানে তিনবেলা খাওয়া এই তো। তারউপর যেখানে বিকেলের নাশতায় একটা আইটেম করলে চলতো সেখানে ইফতারীর নামে হরেক আইটেমের মহড়া দেয়া। তিনি তো তেমন কোন সংযম দেখেন না! বরং তার মনে হয় ঝামেলা আরও বাড়ে। কমে রাতে ঘুমের ঘন্টা। বাড়ে রাস্তায় জ্যামের বহর। জিনিসের অহেতুক দাম, খরচের দেড়া হাত। জোবেদা এগুলো কাউকে বলেন না। নিজের মুন্ডুপাত করেন নীরবে। কত বাহানা! এ দইবড়া খাবে তো, সে শামি কাবাব, তার হালিম-মাঝে মাঝে মনে হয় গলা টিপে ধরেন প্রত্যেকের এত খাই খাই কেন? দেশের কোটি মানুষ যেখানে অর্ধাহারে সেখানে সীমিত কিছু মানুষের খাদ্য নিয়ে বিলাসিতা বিশেষত এই সংযমের মাসে তাকে মাঝে মাঝে বিচলিত করে তোলে। বাসার সবাই বলবে তিনি রান্নার ঝামেলা এড়াতে চান বিধায় এসব সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন, এই ভয়ে মনের কথা মনেই রাখেন।
আমাদের তো সারা বছরই রোযা
গ্রামের বাড়ী সবারই একটা আছে যারা ঢাকা শহরে বস্তি নামক বস্তুতে বসবাস করে। তাদের আয়ের স্তর নিুে বলেই জীবনযাত্রার মানও নিু। অনেকেই রিকশা চালায়, কায়িক শ্রমের কাজ করে, বাসাবাড়িতে ঠিকা ঝি’র ভূমিকা পালন করে। কোনমতে আয়ুটুকু পার করতেই এদের প্রাণান্ত। কোন অভিযোগ নেই, মেনে নিয়েছে তারা তাদের দরিদ্রতা ভবিতব্য হিসেবে। বেশিরভাগ দিনই সত্যিকারার্থে এরা দু’বেলা খায় শুধু ভাতে ভাতে।
সুরেনের বাড়ি ময়মনসিংহ, আমি তার রিকশায়। কথায় কথায় বলে বসে ”আপা, আপনি বলেন দেশটা কি শুধু মুসলমানদের? সারাদিন রিকশা চালাই, আমি তার উপরে হিন্দু। এক গ্লাস পানি খামু রমযান মাসে সারাদিনে সেই উপায় নাই। ছোট, বড়, ইটালিয়ান যে কোন পদের খাবার দোকান বন্ধ। আমরা তো আপা সারা বছরই আধপেটা খাইয়া রোযা থাকি, আমরারে জোর কইরে রোজা না রাখাইলে আর চলতেছে না! দশ বছর আগেও এমন আছিলো না। নিজের দেশে আমারে লুকায়ে থাকতে হয়।”
রোযা আসবে রোযা যাবে। আমরা কি সত্যিই সংযমী হয়ে উঠব? বাসার সবার সহযোগীতা পেলে বাসার নারী খাদ্যাভ্যাস আদপেই পাল্টে দিতে পারেন। রোজার মাসে আপনার বাসার নারীর জন্য ও তো কোরআন পড়ার সময় দরকার, ইফতার শেষে দরকার একটু শোবার অবকাশ। কারণ এই বিশ্রামটুকু না পেলে তার জন্যে দীর্ঘ তারাবি আদায় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আপনি রোজা পালন করছেন খুব ভালো, আপনার যেমন রোজা পালনের অধিকার আছে তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীর অধিকার আছে তার প্রাত্যহিক খাদ্য গ্রহণের। আচার আচরণ, খাওয়া, অন্যের প্রতি সহিষ্ণুতা না থাকলে রোজা একটা পোশাকী আচারেই পরিণত হবে, অন্য কোন কাজে আসবে না; ধর্মীয় পরিচয়ও থেকে যাবে গরু খাওয়া মুসলমান, দাঁড়ি রাখা টুপি পরা, বোরকা পরা, শুধু রোজার মাসে টিভিতে খবর পাঠকালীন সময়ে মাথায় ঘোমটা দেয়া মুসলমানের পর্যায়েই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

