একটি কবরের অপেক্ষায় : চৌত্রিশ বছর
”মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস লয়ে আমরাও প’ড়ে থাকি ” - জীবনানন্দ ঠিক কোন অনুভূতি নিয়ে এ লাইন উচ্চারণ করেছিলেন তা আজ আর বুঝবার কোন উপায় নেই। কিন্তু নিজেদের সামগ্রিক অবস্থান থেকে মনে হয় তিনি আমাদের স্থবির বিবেকবর্জিত আধুনিকতা দেখেই এমনভাবে ভেবেছিলেন।
আগস্ট মাস শুরু হয়ে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্বে আসার সুবাদে এখন ”কাঁদো বাঙ্গালী কাঁদো” ব্যানারের ছড়াছড়ি। চ্যানেলে চ্যানেলে শোকাবহ আগস্ট নিয়ে নানা মাতম হবে। তারপর আবার যে যার ব্যক্তিগত হিসাবের বলয়ে ঢুকে যাবো। কেউ বা স্রেফ একটা রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘুমিয়ে বা বেড়িয়ে দিন পার করে দেব। কেউ বা জন্মদিনের কেক কাটবো জন্মের ঠিক না থাকলেও। অনেকে টিভিতে খোমা দেখিয়ে নিরপেক্ষতার ভাবে অবগাহন করে বলবে - ”বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু বা জিয়া কাউকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবস যদি রাষ্ট্রীয় ছুটি হয় তাহলে হুঁ হুঁ জিয়া হত্যার দিনও কাজে কাজেই ছুটি হওয়া উচিত।” আমাদের মতো কলমজীবিরা ঝাঁপিয়ে পড়বে কলাম লিখতে।
১৫ ই আগস্ট ১৯৭৫ এ কি হয়েছিলো? কি আর হবে! ঐ যে বঙ্গবন্ধু ( অনেকে আবার শুধু শেখ মুজিব বলবে) তাঁর পরিবারসহ নিহত হয়েছিলেন কতিপয় উচ্ছৃংখল সেনা সদস্যের হাতে। আর মরবেই না ই বা কেন বলেন? বাকশাল তৈরী করে, নিজের ছেলেদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দিয়ে তাঁর পতন তো ছিল সময়ের ব্যাপার। আচ্ছা, আচ্ছা বেড়ে বলেছেন। বাক্শাল তৈরী করেই তাহলে উনি মরেছেন? কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষুদ্রজ্ঞানে তো আমরা জানতাম, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গেলে একদলের উপস্থিতি ই দরকার। বহুদল থাকার দরকার নেই।
ছেলেদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দিয়েছিলেন? কিন্তু ইতিহাস তো বলে তাঁর পুত্র শেখ জামাল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে লেফট্যানেন্ট হয়েছিলেন এবং তাঁকে ১৪ই আগস্ট রাতে তদানন্তীন ইস্ট বেঙ্গলের টু আই সি শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। কে জানে বাপু তোমাদের আওয়ামী লীগ ঘেঁষা ইতিহাস, তোমরা তো একদমই নিরপেক্ষ নও।
এভাবেই চলছে পঁচাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের ইতিহাস চর্চা। নিজের দেশের ইতিহাস তারা এভাবেই জেনে আসছে। তারা জানে (বঙ্গবন্ধু) শেখ মুজিব একনায়কতন্ত্র এবং পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মারা গেছেন। গগলস পরা স্মার্ট মেজর দেশ স্বাধীন করেছে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী। শেখ মুজিবের ছেলেরা ব্যাংকে ডাকাতি করেছে। মেয়েদের না কি বেইজ্জত করেছে। তুলে এনে বিয়ে করেছে। এসব প্রপাগান্ডাই আমাদের তরুণ তরুণীরা সাদরে গলধঃকরণ করছে। দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর অংশ হয়ে সাদা চামড়ার মোহে এন্টি আওয়ামী লীগার হতে যেয়ে হচ্ছে চরম ডানপন্থী রাজনীতির তোষণকারী কর্মী।
সহজ ইতিহাস ১৫ ই আগস্টের
১৯৭১ এর আমেরিকার নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি কখনোই তাদের প্রাণের দোসর পাকিস্তানের ভাঙ্গনকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি। তার উপর তাদের ছিল তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি তীব্র অবজ্ঞা। কারণ ইন্দিরা ছিলেন পন্ডিত নেহরুর কন্যা। নেহরু ছিলেন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং ন্যাম বা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন ছিল আমেরিকার তষনকার পররাষ্ট্রনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও কিসিঞ্জাররা খন্দকার মোশতাকের সহায়তায় চেষ্টা চালায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ঠেকাতে। কিন্তু তখনকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন এবং অন্যান্য নেতাদের দূরদর্শীতার কারণে সেই ষড়যন্ত্র আলোর মুখ দেখতে পারেনি। সকল বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশ জন্ম নেয় ঠিকই। কিন্তু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে গড়ে তুলবার জন্য যে ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা ও আন্তরিকতার প্রয়োজন হয় তার সবক’টি থেকেই বঞ্চিত হয় বঙ্গবন্ধুর সরকার। একদিকে আমেরিকার মতো দেশের অসহযোগীতা, তথাকথিতক ইসলামের ধ্বজাধারী সৌদি আরবের বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান না করা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীতে অবস্থানরত পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন সেনাদের বহুমুখী ততপরতা সরকারের অবস্থা নাজুক করে তোলে। তার সাথে যোগ হয় ভারতবিরোধী রাজনীতির ধুয়ো। এমনসব ডামাডোলে বঙ্গবন্ধু দুঃসময়ের পরীক্ষিত বন্ধু তাজউদ্দীনকে ভুল বোঝেন এবং তাজউদ্দীনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় বঙ্গবন্ধুর ক্ষয়িষ্ণুতার মিটার।
আমেরিকা, আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র, পাকিস্তানী আদর্শে গড়ে উঠা সেনা সদস্য, নাটের গুরু মোশতাক, নেপথ্যের জিয়া ১৫ ই আগস্ট ১৯৭৫ এর রাত থেকে ভোরে তাই চালিয়ে যায় ইতিহাসের নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকান্ড।
হত্যার টুকরো বিবরণী
নৃশংসতার মাপকাঠি, কি কি করলে কত ডিগ্রী মার্ডার হিসেবে কোনটাকে আখ্যায়িত করা যায় তা আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি - কোন মানুষ গর্ভবতী বিড়ালকেও মারবে না। আমাদের তথাকথিত দেশপ্রেমিক সেনারা তা করেছেন - বঙ্গবন্ধুর বড় পুত্রবধূ ছিলেন পাঁচমাসের অন্তঃসত্তা। বেঙ্গলের এক হাবিলদার এই তথ্য জানার পর একদম সই করে রাজিয়া সুলতানার পেটেই গুলি করে।
পাকিস্তানীরা ৯মাসের যুদ্ধে এ কাজ করেনি আমি আপনাদের হলফ করে বলতে পারি। রশীদ, ডালিম, জিয়া গং - আমাদের ইনডেমনিটি জড়ানো জারজরা যা করেছে - শেখ মনির স্ত্রীকে কিভাবে মেরেছে জানেন তো! - গুলি, হ্যাঁ গুলি করে তো বটেই, গুলি কোথায় করেছে সেটা জানবেন না ? সেনারা যখন শেখ মনির বাড়ি আক্রমণ করে তখন তার স্ত্রীর গুলিতে আর্টিলারির এক ছেলে মারা গিয়েছিলো। তাই শেখ মনির স্ত্রীর, জননাঙ্গে থ্রি ও ্েরবানিং মেশিনগানের ব্যারেল ঢুকিয়ে ৫/৬ জনে ধরে কমপক্ষে ৬০/৭০ রাউন্ড গুলি করে।
কি ভাই এন্টি আওয়ামী লীগাররা এখনো বলবেন যা হয়েছে ভালো হয়েছে? কোন বিচারের প্রয়োজন নেই? সপরিবারে মুজিব হত্যা ছিল সময়ের দাবী? বলুন। তাতে করে শেখ মুজিবের মতো মানুষের কিছু যাবে আসবে না। যাচ্ছে আসছে এই অভাগা জাতির। ছোট ছোট অপরাধ মানুষকে বড় অপরাধী করে তোলে। বঙ্গবন্ধুকে নির্বিঘেœ হত্যা করার পর আবারো আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় গগলস পরা জেনারেল জেলে রাখা চার নেতাকে মেরে ফেলে। হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নির্দ্বিধায় বিনা বিচারে ফাঁসীতে ঝোলায়। এভাবেই চলে আসছে আমাদের রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের রামায়ণ। খুনীরা কি আশ্চর্য - রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যায় বহির্বিশ্বে।
একটি কবরের অপেক্ষায় : চৌত্রিশ বছর
খুনীরা বিলক্ষণ জানতো জীবিত মুজিবের চাইতে মৃত মুজিব আরো বেশি বলীয়ান। তাই তারা বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় কবরস্থ করেনি। করেছে সেই টুঙ্গীপাড়ায়। যেন সহজে মানুষ যেতে না পারে। দেখতে না পারে। গগলস মেজরের মাজার হয় আমার ঢাকায়, বঙ্গবন্ধুর কবর হয় না। শুধু আওয়াজ শুনি - ”বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনীদের বিচার চাই”; বিচার আর হয় না। এত শুনানির কি আছে? আত্মস্বীকৃত খুনীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কেন দিতে হবে সেটাও আমার বোধগম্য নয়। কেন এইসব খুনীদের ডাইরেক্ট গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে দেয়া হবে না তা জাতি জানতে চায়। ৯৬-২০০১ দিয়েছি শেখ হাসিনাকে, দিয়েছি ২০০৮ এর বিজয়। আমরা জনগণ আর কি দিতে পারি? কেন বঙ্গবন্ধুর বিচার আমাদের আজো দাবী করতে হয়? কেন চার নেতার হত্যার বিচার দাবী করতে হয়? ২১ শে আগস্ট ২০০৪, গ্রেনেডের স্পিন্টারের বিষক্রিয়ায় পরবর্তীতে নিহত মেয়র হানিফের হত্যার সুরাহা, আহসানউল্লাহ মাস্টারের মৃত্যু, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হত্যার বিচার আমাদের কেন দাবী করতে হবে? নিজামী গংদের ফাঁসী দাবীর বিষয় হবে কেন? এগুলো যদি না করতে পারলো তাহলে কেন আমরা ২০০৮ এর বিজয় দিয়েছি আওয়ামী লীগকে?
নেপোলিয়নের মৃত্যুর একশ বছর পর ফরাসীরা তার কবর নিজ দেশে নিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর কবর ঢাকায় আনার জন্য চৌত্রিশ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। কবে শেষ হবে এই অপেক্ষা? এ কি শুধু কবর না কি জাতীয় প্রেরণার উতস? সহজগম্য কোনস্থান হোক বুকে রাখা বঙ্গবন্ধুর ঘুমের জায়গা। বঙ্গবন্ধুর সাথে ”কবর" কথাটা যায় না, হতে পারে বিশ্রামস্থল।
আমি তোমার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করি হে পিতা চৌত্রিশ বছর ধরে, দু'ফোঁটা উষ্ণ জল আমি ফেলতে চাই তোমার বিশ্রামস্থানের সন্নিকটে।
#### সূত্র : উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া সহ বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


