যে দেশের মানুষ সব খায়, মানুষের মাংস ছাড়া এখন পর্যন্ত
Click This Link
Click This Link
রাজপথে আমার চলাচল সত্যিকারার্থে শুরু ১৯৮৭ সালে। বাসা থেকে অনেকদূরের স্কুলে ভর্তি হবার সুবাদে। আম্মা আব্বা যেদিন প্রথম সেই দূরের স্কুলে মানে মণিপুর স্কুলে যাচ্ছি সেদিন বলে দিয়েছিলেন রাস্তা পারাপারের নিয়ম কানুন। জেব্রা ক্রসিং দেখা। ডানে তাকানো, ফের বামে তাকানো। লাল সিগন্যাল পড়লে পার হওয়া, নিতান্ত রাস্তা পার হতে না পারলে কর্তব্যরত ট্রাফিককে বলা-আংকেল আমাকে একটু রাস্তাটা পার করে দেবেন?
টিভিতে চ্যানেল ছিল একটা, সেখানে এসব জনসচেতনতামূলক কথা তখন বলা হতো, জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়া, সিগন্যাল মেনে চলা।
আমরা বড় হতে হতে অনেক জায়গায় ওভার ব্রীজ তৈরী হয়েছে, এখনো হচ্ছে।নিতান্ত অপারগ না হলে আজ পর্যন্ত যেখানে ওভার ব্রীজ আছে সেখানে নীচে দিয়ে রাস্তা পার হই না। কারওয়ান বাজারের সেই ভয়ংকর আন্ডার পাস বা গুলিস্তানের আন্ডার পাস ও আমি ব্যবহার করেছি। আমি হয়তো শাসন মানি না কিন্তু আইনের প্রতি বরাবর শ্রদ্ধাশীল ছিলাম আজো আছি।
এটা হয়তো আমার ঢাকা শহর নিয়ে লেখা শেষ কিস্তি- এখন যে কথাটা বলব তাতে আমার শুভানুধ্যায়ীরা আমাকে জানি অনেকভাবে সতর্ক করবেন। দিনকাল কত খারাপ সে নিয়েও বলবেন।তথাপি আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্যে এর চাইতে ভালো আর কিছু মাথায় আসেনি।
আমি একটা গাড়ি নিয়ে অফিসে যাই। সেই গাড়ীতে যাত্রী বলতে দুজন এবং আমার ড্রাইভার। কখনো কখনো বাসার অন্য কেউ ক্বচিত আমাদের মতিঝিল টু উত্তরা যাত্রার সহযাত্রী হয়।
আমরা প্রতি সকালে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ নারীদের ২-৩জনকে লিফট দেই। কখনো কেউ অনেক ধন্যবাদ দেয়। অনেকে টাকা সাধে। কেউবা ভয়ে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু আমরা এ কাজটুকু করি। মানুষের যে ভয়ংকর কষ্ট প্রতিদিন রাস্তায় দেখি তা লাঘবের সাধ্য আমার নেই। আমি শুধু নিজের মনের কাছে দোষী হবার হাত থেকে বাঁচার জন্যে এ কাজটুকু করি।জানি যে কোনদিন যে কোন বিপদ ঘটতে পারে, তবু আমরা করি এ কাজটুকু।
পত্রিকান্তরে জানতে পেলাম ঢাকা শহরে সাড়ে ছ হাজার নতুন ট্যাক্সি ক্যাব নামানো হবে। ওগুলোর কি ডানা থাকবে? কেন সাড়ে ৬ হাজার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট দেয়া হবে না? পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থেকে তেমন করে দলীয় কর্মীদের পকেটে টাকা যাবে না সে কারণে?
যে কোন শুভ উদ্যোগের টুঁটি চেপে মেরে ফেলতে আমরা বেশ দক্ষ। আমরা জমি দখল জানি, নদী দখল জানি, খাল, মানুষ সব দখল জানি। শুধু জানি না দখল কিভাবে মুক্ত করা যায়। আমরা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে জানি। আমরা ভয়াবহভাবে ধুঁকতে থাকা ঢাকায় আবার নতুন করে চীনের তৈরী ব্যাটারী চালিত কিছু খেলনা ছেড়ে দিতে জানি। আমরা সাইকেল চলার জন্য লেন করতে জানি না। আমরা জানি না এমন ব্যবস্থা করতে যেন রামকৃষ্ণ মিশন লেনের বাচ্চাটাকে বসুন্ধরার নর্থসাউথে পড়তে আসতে না হয়।
আমাদের দুটা রুম হলে একটা ইউনিভার্সিটি হয়, সেসব থেকে ১০লাখের উপর টাকা দিয়ে আমাদের গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয় কিন্তু নিজের নাম লিখতে গেলেও আমার ভাবি বানানটা কি হবে। আমাদের সমান্তরালে অসমতার শিক্ষা ব্যবস্থা চলে - আমার দেশে দিল্লী পাবলিক স্কুলের শাখা হয়। আমার ঢাকা শহরের মুনি ঋষিরা অফিস টাইম চেঞ্জ করে জ্যাম কমানোর কথা ভাবেন। একবারো বলেন না যে যেখানে আছেন সেখানেই কাজের ব্যবস্থা করা যাবে। কাউকে খুলনা থেকে এসে ঢাকার কলেজে পড়তে হবে না।
আমাদের মুনি ঋষিরা বলেন না আমাদের মূল এবং একমাত্র সমস্যা আসলে জনসংখ্যার বেসুমার বেড়ে যাওয়া। জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত করার দিন ও শেষ। কারণ এখন সবকিছুতে আমাদের আবার ইমপোর্ট করা ধর্মটা বেশ জোরালো কি না!তিন পুরুষ আগেও পুরো ব-দ্বীপ ছিল সনাতন ধর্মানুসারী, এখন তারা এমন ইসলাম পসন্দ হয়েছে যে বড্ড হাসি পায়। সংস্কৃতি মানুষের প্রথম পরিচয় ধর্ম নয় এটা বুঝেই না। তোমার বাঁচার জায়গা নেই। খাদ্য নেই। তোমার একজন অতিরিক্ত সন্তান অন্য আরো দশজনের জন্য বোঝা- তুমি অন্যের স্বার্থে হলেও ২টার বেশি বাচ্চা নিও না বলা যাবে না- কারণ এটা ধর্ম এর বিরুদ্ধে যায়। হায় মানুষ!
ঢাকার মৃত্যু এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধর্ম এ মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না। আমার দেশের পরিচালকরা তেল দিতে দিতে বঙ্গোপসাগরের নীচে থাকা তেল ও মনে হয় শেষ করে ফেলবেন কিন্তু যা করলে আমরা জনগণ তাদের ভালোবাসব তা তারা করবেন না। এয়ারপোর্টের নাম পরিবর্তন হবে এয়ারপোর্টের সেবার মান অপরিবর্তিত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি তৈরী হবে – আমরা বলি অন্তত মুখমন্ডলটা স্ক্রু সিস্টেম করেন তা হলে আগামীতে শুধু মাথাটা নামিয়ে ফেললে খরচ কমবে।আরেকজনের মাথা বসিয়ে দিলেই হবে।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন ট্রেন সিগন্যালের কারণে সর্বমোট ৭ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। আবক্ষ মূর্তি পরে বানান আপা, প্রতিটা রেল ক্রসিং এ ওভার পাস দেন। একটু বাচিঁ।ডুলাহাজরা সাফারী পার্কের নাম কেন বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক করতে হবে? বঙ্গবন্ধু কি সাফারী পার্কে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন? এ মানুষটাকে আর কত নীচে নামাবে চাটুকাররা? কবে বুঝবেন আমাদের আপা? তার এসব নষ্ট লোকদের কবে লাথ্থি মেরে বের করবেন?
স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিগুলোকে বাধ্য করেন নিজস্ব বাস ব্যবহার করতে।
ন্যূনতম কিছু মৌলিক অবকাঠামো ছাড়া প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির অনুমোদন দেয়া যাবে না।
সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। ভোকেশনাল পড়াশোনা বাড়াতে হবে।
এই মুহূর্তে থেকে ফ্ল্যাট বানানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা দরকার।
ক্যান্টনমেন্ট এর নিরাপত্তার নামে যেসব রাস্তা জোরপূর্বক বন্ধ সেগুলো খুলে দিতে হবে। ক্যান্টনমেন্ট এর মাটির উপরের রাস্তা দিয়ে যেতে না দিলে মাটির নীচ দিয়ে যেতে দেন। এতবছর বয়সে দেখিনি ক্যান্টনমেন্ট এ ঢোকার সময় যে অহেতুক চেক করে সেই চেকিং এ কিছু আজ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। জলপাইদের ফালতু সুবিধা দেয়া বন্ধ করতে হবে।কেন ওদের কে জমি দিতে হবে?জলপাইরা দেশটাকে আজ এ অবস্থায় এনেছে তাদের শুধু শুধু এত সুবিধা দিয়ে লাভ নেই। পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকীকরণ এর কোন বিকল্প নেই। রাস্তায় যে ট্রাফিক দাঁড়ানো তাকে আট হাজার টাকা বেতন দিবেন আর জলপাইকে বাংলাদেশ লিখে দিবেন এসব বৈষম্য ভালো না।
মাটির নীচ হতে পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নৌপথ এবং রেলপথের সমন্বিত ব্যবহার পারে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে।
সড়ক পথে যান চলা মানে দলীয় পান্ডাদের পকেট ভারী হওয়া, ৫বছর আমি পরের ৫বছর তুমি করতে করতে ঢাকা একটা সিটি অব হররে পরিণত হয়েছে। কি করবেন সেইসব কথা আর শুনবার ধৈর্য্য নেই এখন ফলাফল দেখতে চাই।
আমার দেশে এখন ১৭কোটি লোক। ১০টাকা করে দিলেও ১৭০ কোটি টাকা। আমরা সবাই দিচ্ছি। সরকারের সব ট্যাক্স ঠিকমতো দেই, আমার কোন কালো টাকা নেই। আমি যাকাত দেই। আমি উতসে কর দেই। সবকিছুর বিনিময়ে আমি শুধু আমার পরিবার পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকতে চাই। তেমন মেডিক্যাল পাশ করা ডাক্তারের আমার প্রয়োজন নেই যে পেটে ব্যথা হলে এপেনডিক্স কেটে ফেলবে ১০হাজার টাকা অপারেশন চার্জ পাবে বলে। এসব তেলাপোকার বাচ্চার মতো আগাড়ে বাগাড়ে গড়ে উঠা স্কুল কলেজ হাসপাতাল ইউনিভার্সিটি এই মুহূর্তে বন্ধ করা হোক। অনেক শুনেছি স্বপ্নের কথা – a vision without a task is a dream, এ অবস্থার অবসান চাই।
ঢাকাকে বাঁচানো মানে এখন আসলে বাংলাদেশকে বাঁচানো, আমার দেশের প্রাণ ভোমরা তো রাজধানীতেই। স্যাটেলাইট শহর নয়, জলপাই আবাসন নয়, সাড়ে ছ হাজার ট্যাক্সি নয়, উড়াল সেতু, পাতাল রেল নয়, রাজউকের যত্রতত্র গড়ে তোলা মডেল টাউন নয়, ভূমিদস্যুদের অযাচিত আস্ফালন ও পরবর্তীতে দলীয় কোষাগারে জমা দেয়া উতকোচ নয়-ঢাকাকে বাঁচাতে বুকের গভীরে একটু ভালোবাসা দরকার।
আমাদের এ শহরে এখন সব পাওয়া যায় “ভালোবাসা” পাওয়া যায় না।
আপনার আমার বৃদ্ধ পিতামাতা যেমন জীবনের শেষ প্রান্তে সেবা চান, যে সেবা পেলে তাদের আয়ু বেড়ে যেতে পারে তেমনি ঢাকার এখন গভীর অসুখ মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ভারে, তার বড্ড সেবা প্রয়োজন।
কে দেবে?
আমি দেব, ব্যর্থ হলে পরাজয় মেনে নিয়ে পালাবো। ধরবেন আমার হাতটা, আপনি ধরলেই ঢাকার “আমি” “আমরা” হয়ে যাব।
তবে তাই হোক, “ভালোবাসা”র গান গাই সাদা গোলাপের উপর রক্ত ঢালা নাইটিংগেল পাখিটির মতো – তবু আমাদের ঢাকা বাঁচুক।
(শেষ)
আফসানা কিশোয়ার
***ব্যক্তিগত ক্ষমা প্রার্থনা – একদম নিজের কথা লিখেছি, নিজের বিশ্বাসের কথা। অনেকের সাথে নাও মিলতে পারে। মনের গভীর থেকে বক্তব্য এসেছে কোন দল মত বিবেচনায় এ লিখা নয়। কেউ যদি কোন বক্তব্যে আহত হন, সে দায় একান্ত আমার।
রাস্তায় বসে থাকতে থাকতে বাসায় ফিরতে এত দেরী হয়ে যায় যে গুছিয়ে সময় নিয়ে কিছুই লিখা হলো না।
আমার এই এলোমেলো লিখা যারা পড়েছেন তাদের ধন্যবাদ জানাই।
একটাই অনুরোধ আপনার মতামত জানান, আমরা কি করতে পারি তা নিয়ে সম্ভব হলে যার যার অবস্থান থেকে চলুন আগামীকালই কাজ শুরু করি।
আবারো ধন্যবাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



