Click This Link
চা নিয়ে আবার বারান্দায় বসলো লীনা। চায়ের কাপ থেক যখন ধোঁয়া ওড়ে লীনা তাকিয়ে থাকে সেদিকে, অপলক দৃষ্টিতে। কি যে আকাশ পাতাল ভাবে কে জানে!.......................
লীনার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েন। তার যত চিন্তা তখন লীনাকে নিয়ে। লিয়ন ছোট। তাঁর কিছু হয়ে গেলে মেয়েটার কি হবে, পরিবারের অভিভাবক হিসেবে কে থাকবে এই চিন্তায় মাথা খারাপ করেন তিনি। স্বাবলম্বী হওয়ার পর বিয়ে দিতে চাওয়া মেয়েটাকে তিনি তখনই বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগেন। আসিফ প্রথম লীনাকে দেখে লীনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ভাইভার দিন। লীনার মামাবাড়ি আর আসিফদের বাড়ি একই শহরে, একই এলাকায়। আসিফের ছোট ভাই লীনার ছোট মামার বন্ধু। মামার সাথেই ছিল লীনা। সে কথা লীনা ভুলেই গিয়েছিল। বিয়ের পর আসিফের মুখে শুনেছে। সেদিনই লীনাকে মনে ধরেছিল আসিফে। সে বছর ঈদে বাড়ি যায় লীনা। তখন লীনার বাবা মা ওদের দেশের বাড়িতেই থাকতো। লীনার খালুজানের কাছে টিউশন পড়ত আসিফ এস এস সির আগে। আসিফই লীনার খালামনির কাছে নিজের ভিজিটিং কার্ড রেখে আসে লীনাকে দেওয়ার জন্য। লীনার খালাতো বোন আফরোজা ওকে কার্ডটি দেয়। লীনা অযত্ন অবহেলায় ফেলে রাখে কার্ড টা, একসময় হারিয়েও ফেলে। এর মধ্যে লিয়ন এস এস সি পাশ করে। নটরডেম কলেজে ভর্তি হয়। লিয়ন যে হোস্টেলে থাকতো সেখানকার মালিকদের একজন ছিল আসিফের বন্ধু। ভাগ্য বোধ হয় একেই বলে। এবার যোগাযোগ হয় দু'জনে।
লীনা আসিফকে সুমনের কথা বলে। আসিফও মেনে নেয়। ভীষণ কেয়ার করতো আসিফ লীনাকে তখন। তারপর ২ মাস পর লীনার বিয়ে হয় আসিফের সাথে। সেদিন ছিল ২৭ ডিসেম্বর। লীনার জীবনে সে কখনও পরিবারের সবাইকে নিয়ে যে অনাবিল সুখ তা পায়নি। তাই ওর খুব সখ ছিল বড় পরিবারে বিয়ে করা। আসিফেরা তিন ভাই তিন বোন। লীনা যে যে কারনে আসিফকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছিল তার মধ্যে একটি হল আসিফের বড় পরিবার। কিন্তু বিধি বাম হলে ডান দিকটা বোধ হয় খালিই থাকে!!! বিয়ের দিন সারাটিক্ষন লীনা ওর সমস্ত স্বত্তা দিয়ে আসিফকে অনুভব করছিল। নিজেকে অন্যের কাছে সমর্পনে যে সুখ তা লীনা সেদিনই বুঝেছিল। আজও স্পষ্ট মনে পড়ে লীনার। বিয়ে পড়ানো শেষে যখন ওকে আর আসিফকে পাশাপাশি বসানো হয়, তখন লীনার কাধে লজ্জার পাহাড়। কিছুতেই মুখ তুলে চাইতে পারছিল না সে। আসিফের বন্ধুরা দুষ্টামি করছিল। যখন বর-বধূ একে অপরের মুখ-মিষ্টি করানোর পালা আসে, তখন লীনার মাথায় দূষ্টামি চাপে। সে ইচ্ছে করে চামিচ ভরে মিষ্টি তোলে। এত বেশি তোলে যে আসিফের মুখে ধরেনা। সবাই কি হাসি। আসিফও হেসে ফেলে, আস্তে করে বলে "পাগলী"!!
বিদায়ের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল লীনা। বাবাকে জড়িয়ে কাঁদতে গিয়ে কোথা থেকে যেন এক অসহনীয় অসহায়ত্ব ওকে পেয়ে বসেছিল তখন। সারা রাস্তা আসিফের কাঁধে মাথা রেখে বসেছিল লীনা আর ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। আসিফদের বাড়িতে পৌছানোর পর হাজার রকমের আচার প্রথা শুরু হল। লীনার তখন কনকনে মাথা ব্যাথা। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো। সবাই ঘুমাতে গেল। লীনা সারাদিন ধরে ভেবেছে অনেক কথা বলবে আসিফকে। ওর অনেক জমানো কথা আছে যা ও কখনও বলেনি, কাউকে বলেনি। কিন্তু আসিফ ঘরের দরজা আটকে দিয়ে লীনার কাছে এসেই শারীরবৃত্তীয় অতি জরুরী (!!!!) কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো! সেখানেই আসিফের মস্ত বোকামি হয়েছিল সেদিন। অন্তঃত দশটি মিনিটও যদি সে লীনার সাথে কথা বলতো!!! লজ্জায় অপমানে সেদিন লীনার চোখ ফেটে জল আসছিল!! একটা বারের জন্য বলতে পারেনি "আজ রাতটা থাকনা আসিফ!! এস আজ আমরা একটু গল্প করি।"" তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে আসিফ, লীনার ঘুম হয়না। অস্বস্তিতে কাটে সারাটা রাত। নিজেকে সেদিন অশুচি লাগছিল তার। ছি!! ওর মনে হচ্ছিল তখনি গিয়ে ঐ শীতের রাতে গোসল করে আসে! কাগজের একটা টুকরা আর তাতে করা একটা স্বাক্ষর বোধ হয় সম্পর্কের বৈধতা দিতে পারেনা। তাই যদি পারবে তবে নিজেকে অস্পৃশ্য লাগবে কেন লীনার, পরিবার সমাজ সবার চোখে তো তাদের সম্পর্ক বৈধ!!!!! সম্পর্কের বৈধতা আসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি, ত্যাগ আর ভালবাসা থেকে। সম্পর্ক বৈধ হয় আত্মা থেকে, মন থেকে। কাগজের টুকরোটা খালি তাকে স্বীকৃতি দেয় সমাজের কাছে।
তবুও পাগলের মত ভালবেসেছে লীনা আসিফকে। আসিফের কাছে এসব ভাববাদী ভালবাসার কোন মূল্য নেই। সে বোঝে স্রেফ বস্তুগত প্রেম!! পরদিন ওদের বউভাত ছিল। লীনার বাবা থাকতে না পেরে বউভাতে আসেন কেঁদে পাগল হওয়া মেয়েটাকে নিজে এসে নিয়ে যেতে। সেই ভরা মজলিশেই আসিফের মেজো দূলাভাই চরম অপমান করে লীনার বাবাকে। অতি ভদ্র মানুষ আহসান সাহেব কথা ঘুরিয়ে পরিস্থিতি হালকা করে ফেললেও দাগ কেটে থাকে লীনার মনে! হাজার হোক বাবা তো!!!!! লীনা বিয়ের দু'তিন দিন আগে থেকেই অসূস্থ ছিল, জ্বর। ওরা কিছুতেই সেদিন যেতে দেয়নি লীনাকে। আসিফের মায়ের কথা ছিল "তোমার বাবা মেয়ের বাবা, আমরা ছেলে পক্ষ। আমাদের কাছে তাকে নীচু থাকতেই হবে" লীনা হতবাক হয়ে যায়। একবিংশ শতকেও কেউ এভাবে ভাবে!!!!!!
হঠাৎ বেল বাজলো। লীনার ভাবনায় ছেদ পড়ে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। আসিফ এসেছে। আজ তো ফোন করেনি লীনা আসিফকে---- "বাসায় আসবে নাকি অন্য কোন কাজ আছে?""""!!!!
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

