ছোটবেলা থেকে তসলিমা নাসরিনকে জেনে এসেছি "মন্দ মেয়েমানুষ" হিসেবে। এতটাই মন্দ যে তার বইও পড়তে ইচ্ছে হয়নি কোনদিন। মানুষেরে সাইকোলজি আসলেই ভীষণ অদ্ভূত। বিনা কারনেই অনেক সময় অনেক কিছু ফিক্স করে ফেলে। যা হোক ৩ সপ্তাহ আগ পর্যন্তও তার কোন বই আমি পড়িনি। অনেক সময় একাডেমিক প্রয়োজনে তার বই পড়ার প্রয়োজন হয়েছে। সে সময় অপশন থাকায় এড়িয়ে গেছি। এই সেমিস্টারে অপশন না থাকায় বাধ্য হয়েই হাতে নিলাম "নির্বাচিত কলাম" ।জায়গায় জায়গায় রিতীমত ধান্দা খেলাম। মনে হল একটু অপ্রয়োজনীয় এবং বাড়াবাড়ি রকমের রেডিকাল স্যলুউশন দিয়েছেন তিনি। তখন পর্যন্ত আমার ধারনা সেই"মন্দ মেয়েতে"ই সীমাবদ্ধ ছিল! এবার আর আমার চিরায়ত "অতি উৎসাহ" কে দমন করতে পারলাম না। কিনে নিলাম "লজ্জা"। ব্যস্, আমি তার ভাষা বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে শুরু করলাম মূলভাবটাকে বোঝার।
যাইহোক "তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে" লাইন ধরে এগুচ্ছি। উফফ ভয়াবহ! আমার চোখ ভিজে আসে। শেষ করি পুরোটা বই। পহেলা বৈশাখের গান না শুনতে পারার কষ্ট নিয়ে.....................................................
সেই থেকে মাথায় ঘুরছে "কেন সে দেশে থাকতে পারবেনা?" এ দেশ যতখানি আমার ঠিক ততখানিই কি তার না?! আমরা কে তাকে দেশ থেকে তাড়ানোর, কিংবা সে দেশে থাকবে কি থাকবেনা সেটা নির্ধারণ করার? না, আমি মোটেও লেখিকা বা ব্যক্তি তসলিমার পক্ষে সাফাই গাইছি না। আমি আবারও রিপিট করছি, আমি মোটেও লেখিকা বা ব্যক্তি তসলিমার পক্ষে সাফাই গাইছি না, আমি স্রেফ "মানুষ" তসলিমার পক্ষে বলছি। মানুষ হিসেবে দেশের জন্য তারও মন কাঁদে! মানলাম সে অনেক বাজে ভাষায় লিখেছে, কিন্তু তার কলমের অপরাধের শাস্তিটা কি কলম দিয়ে দেয়া যেতনা? সে যদি কাউকে কলম দিয়ে আক্রমণ করে থাকে তাহলে সে আক্রমণের জবাব দিতে চাকু ব্যবহার করার অধিকার আমাদের কে দিল?! আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোন সাহিত্য পেলেই তাকে ভাষাগত দিক থেকে অপসাহিত্যের রূপ দিতে উঠে পড়ে লেগে যাই। তসলিমা নাসরিনের ভাষাগত উপস্থাপন হয়ত অনেক "মন্দ। কিন্তু অন্য কিছুতে তো ভাবের অভাব হয়না আমাদের তবে কেন এক্ষেত্রেই খালি ভাব বাদ দিয়ে ভাষা নিয়ে এত তোড়জোড়?!
আবারও আসি তার দেশত্যাগের বিষয়ে। অনেক সমাজসেবক(!!) বলেন তিনি নাকি চটি লেখক। সুযোগের অভাবে বলেন আর যে কারনে বলেন চটি পড়বার দূর্ভাগ্য আমার কোনদিন হয়নি। ক'দিন আগে আমার এক নিকটজনের কাছে জানতে চাইলাম এই বস্তুটির বিষয়ে। বর্ণনার এক পর্যায়ে জানলাম এতে নাকি এমনও কাহিনীও থাকে যেখানে মা এবং ছেলের যৌন সম্পর্কের বর্ণনা দেয়া থাকে তাও আবার অত্যন্ত অশালীন, কুরুচীপূর্ন ভাষায়। আমি বিশ্বাস করতে না পেরে তার কাছে জানতে চাইলাম "মা কি নিজের মা না সৎ মা (যদিও দুটোই অনৈতিক)?' সে আমাকে বললো নিজের মায়ের কথা। আমি রিতীমত আরেকটা ধাক্কা খেলাম। আমার প্রশ্ন হল এমন ভয়াবহ কিছু কি তসলিমা লিখেছেন? সেইসব সমাজপতিদের কাছে আমার বিনীত(!!) প্রশ্ন, "দাদারা উপরোক্ত চটিলেখকদের ক'জনকে দেশ ছাড়া করেছেন?! আপত্তিকর কিছু লিখলেই তাকেই দেশছাড়া করতে হবে? এ কেমন কথা? যদি ইসলামের দোহায় দেন তবে একটাই কথা বলতে হয় "" কণ্টকপূর্ণ জমিনেও কিন্তু সৃষ্টিকর্তা বৃষ্টির জল ঝরাতে এতটুকু কার্পণ্য করেন না" তাহলে তারই সৃষ্টি হয়ে এত ক্ষমতার বড়াই আপনার আসে কোথা থেকে? তার অন্যায় যদি হয় তো সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে হয়েছে। কই আল্লাহ তো তার মাথায় বাজ ফেলেননি, কিংবা গজব নাযিল করেননি। তিনি যদি তাঁর (আল্লাহ) প্রতি কৃত অপরাধে এত উদারতা দেখাতে পারেন তো আপনাকে এত দম্ভ দেখাতে হবে কেন?!!
সে লিখেছে, ছেলেরা শার্ট খুলে রাস্তায় হাঁটতে পারলে মেয়েরা কেন পারবেনা, ছেলেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পারলে মেয়েরা কেন পারবেনা। আমি নিজেও মানি এগুলো কথার কথা, কাজের কথা নয়। সে বললেই কি কোন মেয়ে উক্ত কাজ গুলো করবে?!!! এমনকি সে নিজেও কি করেছে? না, কখনও করবেওনা। অর্থ্যাৎ তার এই কথাগুলোর কোন স্যোশাল ইমপ্যাক্ট নেই। তাহলে ধর্মব্যবসায়ীদের দাঁড়ি টুপি আর পাঞ্জাবীর নীচে এত সুড়সুড়ি আসে কোথা থেকে? আমি জানি সে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের (বিশেষত হীন্দু সম্প্রদায়) নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন বা বলেছেন, কিন্তু একইভাবে ভারতেও যে সংখ্যালঘু (মুসলিম) রা নির্যাতিত হয় তা নিয়ে তিনি কোন উচ্চবাচ্য করেন নাই। কিংবা তিনি অনেক জায়গায় পুরুষকে ঢালাও ভাবে দোষারোপ করেছেন। সেই কারনে বুঝি আপনারা আপনাদের ক্ষমতার ষোলকলা প্রমাণ করছেন?!!! ধর্মদ্রোহীতার শাস্তি দিচ্ছেন? ইসলামে কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তির কথাও বলাও আছে। সেই সব নিমক হারাম নাজায়েজ জানোয়ারের বাচ্চারা কিন্তু এখনও বীরদর্পে এই দেশের মাটিতে ঘুরে বেড়ায়। প্রথমে নিজামী, মুজাহিদদের মত অস্পৃশ্যগুলোকে পুতে ফেলুন তারপর তসলিমার বিচার করবেন। বলতে পারেন মহানবী (স: ) কতজনকে ধর্মদ্রোহীতার কারনে দেশের মাটিছাড়া করেছিলেন?? একজনকেও না! আপনি কি তাঁর থেকেও বড় রক্ষক হয়েছেন ইসলামের?!!
আরেকটা ব্যাপার কখনও কি ভেবে দেখেছেন, তাসলিমা কে আপনারাই ফ্রন্টলাইনে নিয়ে এসেছেন। সে ভুল লিখুক বা সঠিক, আপনাদের অতি উৎসাহী শত্রুতার রেশ ধরে আমারই মত অনেকে তসলিমার বই খুলে বসছে। প্রতি ১০-২০ জনে ১ জন হলেও তার সমর্থক হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কী লাভ হল? নিজেরা না পারেন অন্তঃত আমরা যারা বুঝি তার স্বিদ্ধান্ত বা সমাধান অধিকাংশ ভুল তাদেরকে জবাব দইতে দেন। যাদের আমাকে গালাগালি করার ইচ্ছা আছে তারা এই লাইংুলো ২য় বার ভেবে দেখবেন।
তসলিমাকে ছেড়ে এবার চলুন ভীন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। আমাদের প্রয়োজন ইকুইটি, ইক্যুয়ালিটি নয়। কারন চাহিদা সবার এক না। নারী-পুরুষ, পাহাড়ি বাঙ্গালী,বড়_ছোট এক একজনের মৌলিক জৈবিক চাহিদাগুলো ভীন্ন ভীন্ন। যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন মায়েরা, কারন সেটা তাদের অবশ্য প্রয়োজন। অনেকে বলতে পারেন পুরুষও ছুটি নিয়ে প্রসূতির সেবা করতে পারে। হ্যা পারে। কিন্তু শারিরীক যন্ত্রনা আর সেবার নিমিত্তে কর্মবিরতি কী আলাদা নয়?
নারীকে শেখান হয় তার ভার্জিনিটি চলে গেলে তার আর মূল্য নেই। প্রতিনিয়ত সে সিনেমা নাটকে দেখচে সতিত্ব চলে গেলে কীভাবে মেয়েটা সমাজ সংসারে অস্পৃশ্য হয়ে যায়। কোনদিন কোন সিনেমা নাটক বা অন্য কোথাও কী দেখিয়েছে বা শিখিয়েছে সতীত্ব(প্রকান্তরে সততা) পুরুষেরও থাকতে পারে? সেটা চলে গেলে পুরুষরাও মুষড়ে পড়ে? তাহলে কী হবে জানেন? নারীর নারীত্বের প্রতি অপমানকর বুলি ছুড়ে দিয়ে যে পুরুষরা পাশবিক আনন্দ পায় তারা অনেকখানি দমে যাবে। কারন সতীত্বের ভাবনা তখন তাদেরকেও ভাবাবে।
ভীড়ের মধ্যে নারীর শরীর নিয়ে পুরুষ পাশবিকতায় মেতে ওঠে, ঐ একই মানসিকতার পুরুষরা সুন্দরী প্রতিযোগীতার নামে সেই একই শরীরের লীলাখেলায় মেতে ওঠে। শুলামিথ ফায়ারস্টোন,কেইট মিলেট, বুভ্যুয়ার,কমলা ভাসিন, বীনা আগারওয়াল কে কবে এসবের পক্ষে কথা বলেছেন?তবে নারীবাদীদের দোষ কেন দেন আপনারা? কিছু পুরুষ বলেন "সবাই যদি মা বোন হয় তো শোব কার সাথে?!"বুঝলাম। কিন্তু যার সাথে শোবেন থাকবেন তাকেই াপমান করছেন? এ কেমন কথা!
মোল্লারা নারীর শরীর ঢাকলো কী খুলল সে নিয়ে যত সময় ব্যয় করে তার ১০০ভাগের ১ ভাগ যদি দেশের চিন্তায় করতো তাহলে কতই না ভাল হত! তারা ধর্মের দোহায় দেয়, দেয় মানবতার দোহা্য। কোথায় থাকে তাদের মানবতা যখন একটা মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়? কোথায় থাকে ধর্ম যখন ধর্মের নামে একটা মেয়ের জীবনকে নষ্ট করা হয়?সম্পত্তিতে সমানাধিকারের কথা শুনে আপনাদের মাথায় রক্ত উঠে যায়।কেন? ামার বাবা আমাকে জন্ম দিয়েছেন আমার ভাইকেও।আমাকে অর্ধেক দিলে সমস্যা কি? দেন মোহরের কথা বলবেন তো। দেন মোহর যদি না থাকতো আল্লাহর কসম আপনারা কাঠমোল্লারাই রোজ একটা করে ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করতেন। দেনমোহর আছে বলেই আপনারা ক্ষ্যন্ত এখনও! নয়ত আপনাদের একটা বৃহৎ অংশ দেনমোহরের পরিমান এমন ভাবে নির্দিষ্ট করে যাতে দুদিন পর ডীভোর্সের সময় কম টাকায় দফারফা হয়। তারা কী জানেনা ইসলামে তালাক হল আল্লাহর চরম অপছ্ন্দের ব্যাপার?ইসলামে হিল্লা বিয়ে এক প্রকার শাস্তি যাতে তালাকের আগে মানুষ ভেবে নেয় একবার!
দেলোয়ার হোসেন সাঈদি অনেক ওয়াজে বলেছে যে নারী হল খোলা খাবার/মিষ্টি! তাকে ঢেকে না রাখলে মাছি বসবেই।নারীকে না হয় সে খাবার বানালো মেনে নিলাম, নিজেকেও যে ইতর মাছির সাথে তুলনা করলো এই বুদ্ধিটুকুও কী তার নেই?!!!!
এভাবে আসলে চলেনা। এনই দ্বন্দ্ব চলতে থাকলে শুধু ধ্বংসই হবে সব। নারীরা ফুঁসে উঠলে হয়ত তৈরী হবে আরেকটি তন্ত্র, নারীতন্ত্র। যেখানে পুরুষনা হবে নির্যাতিত।হয়ত কোন পুরুষ আমার মত নিজেদের কষ্টের বঞ্চনার কথা লিখতে বসবে। কোন তন্ত্রই আমাদের কাম্য নয়। সমতাও সাম্যের কোন বিকল্প নেই
বি:দ্র:এই পোষ্ট টি ডারউইন-মতবাদের লেজ খোয়া দের জন্য নয়, সৃষ্টির সেরাজীব মানুষের জন্য। কারও বুঝতে অসুবিধা হলে প্রশ্ন করুন অশ্রাব্য ভাষা ব্যভার করবেননা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

