হঠাৎ করে একটা ব্যাপার আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলল: কি হবে আর আর কয়েকটা দিন পরে? প্রায় সব পেশাতেই একটা নির্ধারিত পথ (রোডম্যাপ) আছে। যে লেকচারার হয়ে জয়েন করেছে, সে একসময় প্রফেসর হবে; যে ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হয়ে ঢুকেছে, সে একসময় ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হবে, যে বিসিএস দিয়েছে সে আমলা হবে। আমি কি হব আর ৫ বছর, ১০ বছর বা ১৫ বছর পর? অনেককে প্রশ্ন করেছি, জবাব পাইনি।
এক বড় ভাই অবশ্য একটা জবাব দিয়েছিলেন আমার এই প্রশ্নের। তিনি বলেছিলেন, "দেখ তুমি যেসব সেক্টরের কথা বললা এইগুলাতে মানুষ অনেক আগের থেকেই কাজ করতেছে। যেমন, অনেকের বাপ ব্যাংকে চাকরি করে রিটায়ার করছে। কাজেই একজন ব্যাংকারের জীবনচক্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই জানি। আর তুমি যেই দুনিয়াতে কাজ করতেছে এইটা নতুন। এইখানে কেউ পথ তৈরি কইরা রাইখা যায় নাই। তুমি আমি যেইদিক দিয়া হাঁটব, ঐটাই হবে পথ..."
আর একটা জিনিস সত্য, সেটা হল টেলিকমের মার্কেট স্যাচুরেটেড। এখন আর আগের মত গ্রোথ নাই। আজ যদি কম্পানি আমাকে রাখতে না চায় আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? এই কম্পানিতেই যাঁরা সেলস, মার্কেটিং, এইচ আর বা ফাইনান্সে কাজ করছেন তাদের জন্য এখানকার কাজের এক্সপেরিয়েন্স বিরাট একটা প্লাস পয়েন্ট। তারা এই এক্সপেরিয়েন্স দেখিয়ে আরো ভালো চাকরি পাবেন অন্য কম্পানিতে; সেটা যদি প্রসাধন বা ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানিও হয় তবু তাঁরা সেখানে যোগ্য হিসাবে দাঁড়াতে পারবেন। কিন্তু টেলিকম এন্জিনিয়ারদের সে সুযোগ নেই। মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা জায়গা ছাড়া তাদের কাজের সুযোগ নেই। তার উপর টেলিকম চাকরির মার্কেটে স্যাচুরেশন চলে এসেছে, খুব একটা রিক্রুটমেন্ট এখন হয়না। (মার্কেট কথাটা এখানে খুব খাটে, এখানে মার্কেটের মতই পণ্যের দাম ওঠা নামা করে) আবার এই কাজটা (টেলিকম) এতবেশি এক বিষয়ে ফোকাসড (বা স্পেশালাইজড) যে যে যেটা করে তাকে সেটাই খুঁজতে হবে, অন্য বিষয়ের সাধারণ কাজটাও করা সম্ভব না। কেউ হয়ত বিটিএস(সাধারণ বাংলায় বাসার ছাদের টাওয়ারের নিচে বা মাঠের মাঝের ঘরের মধ্যে আলমারির মত যা থাকে) এর বিষয়ে বিরাট এক্সপার্ট কিন্ত তিনি সুইচ (যেটা কল আদান প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে/ এক্সচেন্জ ) এর ব্যাপারে হয়ত তেমন কিছুই জানেন না। হয়ত তিনি ৫/৬ বছর কাজ করেছেন টেলিকম লাইনে। এটা এখানে দোষের কিছু না। এটা এমন যে তোমার যে কাজ তোমাকে সেটা খুব ভাল করে জানতে হবে, অন্য বিষয়ে জানার সুযোগ নেই বলব না, তবে সেটা খুব সীমিত।
ব্যাপারটা এরকম যে আমি ফুটবল খেলতে পারি, নিয়ম কানুনও জানি। আমার যদি ক্রিকেটের প্রতি খুব আগ্রহ থাকে তাহলে আমাকে একটা টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ম্যাচ একটা দেখতে দেয়া হল। আমি ব্যাট/ বল কোন হাতে ধরতে পারব, কিন্তু বল করতে দেয়া হবে না বা ক্রিজে ও দাঁড়াতে দেয়া হবে না। কাজেই এখানে মাল্টিফাংশনাল এক্সপার্টাইজ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। তাই এখানে জবের নিরাপত্তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।
শেষমেশ একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম, (যদিও অনেক দেরিতে) এরকম টেলিকম দুনিয়াতে কোন কম্পানিতেই ৩০ বছর চাকরি করে ৫৭ বছর বয়সে রিটায়ার করা সম্ভব না। কম্পানি সুইচ করে কেউ কেউ, কেউ আবার ক্ষ্যাপে যায়(মানে হঠাৎ করে বিদেশে চাকরি)। আর বাকিদের বেশিরভাগ আছে অস্ট্রেলিয়া (বা কানাডায়) পারমানেন্ট রেসিডেন্সির (PR) চিন্তায়। আমার আশেপাশের প্রায় ৪০% লোকের IELTS (PR এর জন্য) পরীক্ষা দেয়া হয়ে গিয়েছে, অনেকে PR অ্যাপ্লাই করে অপেক্ষা করছে। তারমানে, সবাই আছে কিন্তু সবাই সরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমার ভাবনার জগতে বড় ধরনের নাড়া লাগল। আমি বুঝলাম আমাকেও সরে যেতে হবে, আজ অথবা কাল, আর নাহলে পরশু...
(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১০ বিকাল ৩:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



