কলমের খোঁচায় খচখচ করে ঢাকায় বসে ইসলাম সাহেব বা স্টকহোমের সভেনসন কোটি টাকার চুক্তিটা চুকিয়ে ফেলেন , কিন্তু ইরানীরা খোঁচা আর খচখচ শব্দ দু'টো যতটা সম্ভব এড়িয়েই চলেন । মোলায়েম স্পর্শের ছোঁয়ায় সিগনেচার করার অজুহাতে ইরানীদের হালকা শিল্পকর্ম সেরে নেয়ার তাগিদটা সম্ভবত তাদের ঐতিহ্য থেকেই এসেছে ।
এরপর .......
রোজরোজ আব্বুর ডেস্কে গিয়ে সিগনেচার তথা ইরানীদের ক্যালিওগ্রাফীর ক্যারিশমা দেখে , আমার মনে সিগনেচার করার ভয়ঙ্কর শখ দানা বাঁধতে থাকে । সবে স্কুলে পড়ার বয়স আমার , দু'পয়সা মূল্যও নেই আমার সিগনেচারের । কিন্তু কে বোঝাবে সে কথা ?মনে মনে সিগনেচারের লে-আউট করে ফেলি । সফেদ ক্যানভাসে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটাই । ইংরেজি হরফে লেখা আমার নামটার সাথে যত্নে জুড়ে দেই ক্যালিওগ্রাফীর আবহ ।
নিজের সৃষ্টিতে নিজেই বিভোর হয়ে পড়ি , ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে দেয়ালে সিগনেচার আঁকাই , গাড়িতে উঠে মনে মনে সিগনেচার হাকাই । সিগনেচার চলে খাঁতার বাঁকে বাঁকে , নামতার ফাঁকে ফাঁকে ।
কিছুদিন না যেতেই নিজের একটা সীল মোহরের খায়েশ হয় । অনেক ভাবনা শেষে বের করে ফেলি এক আদি এবং অকৃত্রিম পদ্ধতি ।
আব্বুর কাছে ডাকযোগে ইউকে এবং ইউএসএ থেকে আসে বেশ কিছু মেডিকাল জার্নাল।চমৎকার পিচ্ছিল কাগজের জার্নালগুলো হাতে পেয়ে প্রথমে প্রাণভরে নতুন কাগজের গন্ধ নিই।পাশাপাশি সবার চোখের আড়ালে চলতে থাকে আমার সীল মোহর প্রকল্প । উপকরণ হিসেবে বেশি বেশি কালি বের হওয়া ফ্রান্সের BIC বলপয়েন্ট কলম , জার্নালের পিচ্ছিল কাগজ , আর সাদা ধবধবে প্যাড । প্রথমে কলম দিয়ে গাঢ় করে উল্টা করে নিজের নাম লিখি , তারপর সাবধানে উল্টো সিগনেচার । এরপর প্যাডের পাতার নিচের দিকটা পিচ্ছিল কাগজের উপর রেখে শক্ত করে ছাপ দিই । ঝাপসা ঝাপসা ছাপে প্রস্তুত হয়ে উঠে আমার নাম আর স্বাক্ষরের মোহর সম্বলিত পূর্নাঙ্গ একটি প্যাড ................
অনেকদিন সে প্যাড পড়ে থাকে , কিন্তু সীলমোহরের উপরে কোন শাহী ফরমান জারি হয় না। একসময় ইরান ছেড়ে পুরো পরিবার দেশে ফিরে আসি ।
এরপর একটা যুগ কাটে স্বাক্ষর বিহীন অবস্থায় । ছোটবেলার সে রাজকীয় সিগনেচার করা যাবে না বলে নিজের নাম বোল্ড হরফে লিখে প্রয়োজনে কাজ চালাই ।
স্কুল পেরোই, কলেজ পার হয়ে ভার্সিটিতে ঢুকি , তাও একটা সিগনেচার রপ্ত করা হয়ে উঠে না । ভার্সিটির শেষ পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করি , সাথে শুরু করি দু'একটা জায়গায় চাকরীর জন্য অ্যাপ্লিকেশন ।
খুব তাড়াতাড়ি একটা ডাক আসে রিটেন টেস্টের । ভাইভাতে টিকে যাই । ২৬ ডিসেম্বর ,২০০৭ একটা ফোনকল আসে , ২৭ তারিখ অফিসে যাই।অপ্রস্তুত অবস্থায় হাতে পাই অ্যিপয়েন্টমেন্ট লেটার , তার নিচে একটা সিগনেচার করার জায়গা । সিগনেচারটা হঠাৎ করে অনেক ভারী মনে হতে থাকে , মাথায় কোন সিগনেচার খেলে না , ছোটবেলার ক্যালিওগ্রাফিক অ্যাডভেন্চার করার সাহসও পাই না । গোটা গোটা হরফে নিজের নামটা লিখে ফেলি । হিউম্যান রিসোস অফিসার বড় বড় চোখ করে তাকান ...
"এমন করে আপনি সিগনেচার করেন ?"
"জ্বী , এমন করেই করি" ।
"দয়া করে ব্যাঙ্কের জন্য একটা জেনুইন সিগনেচার বানিয়ে নেবেন"
বাড়ি ফিরে ব্যাঙ্কের ফর্ম ফিলাপ করি । সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে বাংলায় খুব স্পর্শকাতর একটা সিগনেচার দাঁড় করাই,কিছুতেই সে সিগনেচার সাবলীল হয় না ।
ভুল হওয়ার আশঙ্কায় সময় নিয়ে যত্ন করে নিজের সাথে লড়াই করে এখন যখন সিগনেচার দিই ছোট্ট হাতে দেয়া দেড়যুগ আগের সেই সিগনেচারের কথা মনে পড়তে থাকে ....
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



