somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন স্পোর্টস ,পলিটিক্স এন্ড নিউজপেপার অবসেসড বালকের ডায়েরি (১৯৮৯ সাল)

১০ ই মে, ২০০৮ রাত ১০:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সিকি শতাব্দী না পেড়ুনো এ জীবনে ১৯৮৯ সাল এসেছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ।৮৯ আমাকে খাতা ভরে অ,আ,ক,খ লিখতে শিখিয়েছিল, বছর শেষে ২ এর সাথে ২ যোগ করতে শিখিয়েছিল । ৮৯ এ আমার বিশ্ব চেনার হাতেখড়ি,ইচ্ছামত কার্টুন না দেখতে পারার তীব্র কষ্টে বড় হওয়ার তীব্র আকুতি। বাবার সাথে ৮৯ তেই আমার ভার্চুয়াল বিশ্বভ্রমণ , তীব্র ফুটবল প্রেমের হালখাতা ।

৮৯ সালে আমাদের এলাকায় প্রথম ইরান টেলিভিশনের সম্প্রচারের সূচনা । সবে মাত্র বছর খানেক আগে ইরাক ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে । তার ধারাবাহিকতায় পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে সিগনাল পৌছে দেবার জন্য টেলিভিশন ট্রান্সমিশনের সুউচ্চ টাওয়ার বসানো শুরু হলো । ইরাক সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এতদিন ইরাক টেলিভিশন ছাড়া অন্য কোন সিগনাল পাওয়া যেত না ।

যতটা মনে আছে ইরাক টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোর সিংহভাগ জুড়েই থাকতো সাদ্দাম বন্দনা । খবরে দেখতাম ,সাদ্দাম সারাদেশ সফর করছেন , আর শিশুরা , নারীরা রাস্তার দু'পাশে তালি দিয়ে গান গাইছে । সঙ্গীতানুষ্ঠানগুলো জুড়ে থাকতো সাদ্দাম স্তুতি করে গাওয়া গান । প্রতি সপ্তাহে দেখানো হতো ২/৩ টি করে বলিউডের হিন্দি সিনেমা । বিকালের দিকে কার্টুন দেখানো হতো , কিন্তু আরবি ভাষার কারণে সেসবের কিছুই বুঝতাম না । টেলিভিশন দেখবার সময়টা আমার জন্য ছিল নির্দিষ্ট , মিনি স্কার্ট পড়া শিল্পীদের যেন না দেখি সে জন্যই কিনা , বাবা মা অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখতেন ।

ইরান টেলিভিশন আমার সামনে যেন দিগন্ত খুলে দিল । হিন্দী সিনেমার বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে প্রচারিত হতে লাগলো ফারসি ভাষায় ডাব করা জাপানি , ইতালিয়ান বা হলিউডের মুভি , ডাব করা জাপানি কার্টুন।


জাপানী মুভিগুলো ছিল মূলত সামাজিক আর পারিবারিক বন্ধনের উপর নির্মিত,ইরানী মুভিগুলোর সাথে খুব মিল রেখেই সম্ভবত মুভিগুলো সিলেকশন করা হতো । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন একটি স্কুলের ছাত্রদের আর তাদের মমতাময়ী ম্যাডামের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন জীবন কাহিনী নিয়ে একটা মুভির কথা আবছা মনে আছে । শিশু বয়সেই সেটার প্রভাব এত বেশি ছিল বলে , এখনও মুভির কিছু কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠার সাথে সাথে মনটা দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে উঠে ।

ফরাসী , ইতালিয়ান আর জার্মান মুভিগুলো সিলেকশনে মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা খেয়াল রাখা হত । সোভিয়েত বা মার্কিন দুই পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক প্রচন্ড খারাপ হওয়ার কারণে খুব সুচারুভাবে দুই দেশের খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা হতো ।

ফরাসী একটি মুভিতে দেখেছিলাম চেকোস্লাভাকিয়াতে সোভিয়েত আগ্রাসনের ইতিহাস । একটি দৃশ্যের কথা মনে আছে যেখানে প্রেসিডেন্ট ডুপচেক(নামটা ভালো করে মনে নেই) কে সোভিয়েত সেনারা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় ।

পশ্চিম জার্মান একটি মুভিতে প্রথম চিনেছিলাম বার্লিন প্রাচীর কে । প্রাচীর পার হওয়ার প্রচেষ্টায় পূর্ব জার্মান এক তরুণের সুদীর্ঘ সাধনা , আর শেষ দৃশ্যে পূর্ব জার্মান সীমানা প্রহরীদের গুলিতে ছেলেটির খুলি ফেটে রক্ত বের হওয়া আজ এতগুলো বছর পরেও আমাকে আলোড়িত করে ।

হলিউডের মুভিগুলো সিলেকশনে রাজনৈতিক মুভির পাশাপাশি সায়েন্স ফিকশন মুভিগুলোকে রাখা হত । সোভিয়েত মার্কিন শীতল যুদ্ধের সাথে প্রথম পরিচয় এমনই এক মুভিতে । ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিকস কাভার করতে যাওয়া ৩ ব্রিটিশ , আর ১ এক সুইডিশ সাংবাদিক কে বিনা কারণেই আটক করে সোভিয়েত কেজিবি । প্রহসনমূলক বিচার শেষে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় সাইবেরিয়ার বন্দী শিবিরে । তারপর বরফের প্রান্তর দিয়ে ট্রেনের সুদীর্ঘ যাত্রা , ৪ সাংবাদিকের ট্রেন থেকে পালিয়ে হাজার মাইলের যাত্রা । পথে প্রাণ হারায় দু'জন । তাদের মাংস খেয়েই বেঁচে যায় অন্য দু'জন । শেষ দৃশ্যে মৃতপ্রায় দু'জন নরওয়ে সীমান্তে এসে পৌছে যখন চিৎকার করে হেসে ফেলে , প্রবল উৎকন্ঠার মাঝেও আমার শিশুমন সাড়া দেয় , সম্ভবত আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হেসে উঠি।

একই সাথে দেখানো হতো কমিউনিস্ট দেশগুলোতে নির্মিত মুভি , সেসব ব্যবহার হত এন্টি-মার্কিন এজেন্ডা হিসেবে । এমন একটি মুভিতে দেখেছিলাম চিলির বামপন্থী সংগ্রামী প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আয়েন্দেকে । মার্কিন বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ১৯৭৩ সালে জেনারেল পিনোশের মিলিটারি ক্যু এর মাধ্যমে আয়েন্দেকে উৎখাত , বিশ্বস্ত সঙ্গীদের অনুরোধ সত্ত্বেও দেশ ছাড়তে আয়েন্দের অস্বীকৃতি , জাতির উদ্দেশ্যে শেষ ভাষণ , সান্টিয়গোর রাস্তায় অসংখ্য বিপ্লবীকে চোখ বেঁধে হত্যা , আয়েন্দের প্রয়াণ পরে আমাকে এতটাই ভাবিয়েছিল বলে শৈশবের একটা বড় অংশ জুড়ে আয়েন্দে আমার জীবনের নায়কের স্থানটি দখল করে রেখেছিলেন।

ইরানি মুভি প্রচার হত যেদিন , কান্না লুকোনোর প্রস্তুতি নিয়ে বসতাম , আমার ধারণা ছিল ৩/৪ বছরের বেশি বয়সের কারও কান্না করা রীতিমত লজ্জার ব্যাপার , কান্না ঠেকানোর সংগ্রামটা সত্যি খুব কঠিন লাগতো।

বিশ্ব নিয়ে আমার এ আগ্রহের জন্মদাতা আমার বাবা । খাওয়া দাওয়া করতে চাইতাম না বাবা নতুন এক কৌশল আবিষ্কার করলেন । টোনা আর টুনি নামের দু'টো ছোট্ট পাখিকে জাপানের ওসাকা বন্দর থেকে যাত্রীবাহী জাহাজে চড়ালেন । তারপর কাহিনী স্ফীত থেকে স্ফীততর হয়ে সৃষ্টি হলো বিপদসঙ্কুল যাত্রাপথ । বছরকালের বেশি সময়ের দীর্ঘ এ যাত্রাপথে টোনাটুনি পার হলো সাংহাই , জাকার্তা , চট্টগ্রাম , কলম্বো , এডেন হয়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের দার-আস-সালাম , দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন , ফ্রিটাউন , আবিদজান সহ সমগ্র আফ্রিকার পূর্ব উপকূল । গল্পের লোভে রুদ্ধশ্বাসে আমি বাবার হাত থেকে প্রতিটি খাবারের লোকমা বিনা বাক্য ব্যয়ে মুখে তুলে নিতাম । বছর শেষে পৃথিবীর অনেকটা অংশের নাম আমার চেনা জানার মাঝে এসে গেলো ।

বড় হতে চাইতাম প্রতিনিয়ত । ছোট ছিলাম বলে মনে হতো আমি তীব্র অবহেলার শিকার , সব ব্যথার উৎস ছিল কার্টুন দেখাকে কেন্দ্র করে । দিনে দু'ঘন্টা সময় বরাদ্দ ছিল কার্টুন দেখার জন্য , কিন্তু আমার মন চাইতো সারাটা দিন কার্টুন দেখতে । এ সময়টা বরাদ্দ করতো আমার মা , দু'ঘন্টা যখন শেষ হওয়ার পথে তখন কেবলই মনে হত , কবে বড় হয়ে সকাল সন্ধ্যা দু'বেলা কার্টুন দেখতে পারবো ।

কার্টুনগুলোর অধিকাংশ ছিল জাপানি । অসংখ্য শিক্ষামূলক অ্যানিমেশন কার্টুনের মাঝে আমার প্রিয় ছিল "একিয়ো সান"।ছোট্ট বালক "একিয়ো সান" , সামুরাইদের মোকাবেলার জন্য বেছে নিয়েছিল গণিত আর ধাধা ।
জার্মান একটি কার্টুন ছিল "উরুজ্যাক" । এ ফিল্মের সবগুলো চরিত্র ছিল বাস্তব , কেবল উরুজ্যাক ছিল কাগজে আঁকা অ্যানিমেশন । অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ক্ষমতার অধিকারী উরুজ্যাক তার কাঠমিস্ত্রী মনিবকে সাহায্য করতে গিয়ে অনেক মজার দৃশ্যের জন্মদিত ।

জাপানিজ আরেকটি কার্টুন খুব প্রিয় ছিল আমার , "ডক্টর সিমসন" । ব্রিটেন থেকে অস্ট্রেলিয়া যাবার পথে জাহাজডুবির পর বেঁচে যায় কেবল ড্ক্টর সিমসন এবং তার পরিবার । নির্জন দ্বীপে উদ্ধারের আশায় কেটে যায় অনেকগুলো বছর , চলতে থাকে কঠিন জীবন সংগ্রাম ।

সেবছরই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখা , কাকতালীয়ভাবে ম্যাচটি ছিল ব্রাজিল আর্জেন্টিনার ম্যাচ । চোখ বন্ধ করে যখন ম্যাচটির কমেন্ট্রির শুনার চেষ্টা করি , উত্তেজিত কন্ঠের এক অচেনা ভাষা শুনি , বুঝতে বাকি থাকে না , সেদিনের ধারাভাষ্য ছিল স্প্যানিশে । ম্যাচটি ১-১ এ শেষ হয় । চারিদিকে তখন আর্জেন্টিনা জোয়ার , সেসবের ঢেউ এসে লেগেছিল আমাদের শিশুদের মাঝেও । আমার মাঝে একটা প্রবল ধরণের রিপালসিভ ফোর্স মাঝে মাঝে দানা বাধে , স্রোতের বিপরীতে আমি ব্রাজিলকে ভালোবেসে ফেললাম , আমার আরেক বন্ধুকেও ব্রাজিল সমর্থক বানিয়ে ফেললাম । ৯১ সালে যখন একটু খেলা বুঝতে শিখে গেছি , তখন বুঝতে বাকি রইলো না , ব্রাজিলই নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সেরা ফুটবলটি খেলে । একদিন আব্বু ম্যারাডোনা লেখা একটি আর্জেন্টিনার জার্সি এনে দিলেন । নানা অজুহাতে সে জার্সিটি কখনো গায়ে দিতাম না ।


৮৯ জন্ম দিলো খেলাধুলা আর রাজনীতি সচেতন এক জ্যাক অব সাম ট্রেডস , বাট মাস্টার অব নান এর ।

চলবে ...........................

পরবর্তী পর্ব (১৯৯০-১৯৯২)

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০০৮ রাত ১০:৫৪
৫৩টি মন্তব্য ৫৬টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×