somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন জননীর অকাল প্রয়াণ (উৎসর্গ বন্ধুবর ব্লগার সীমান্ত আহমেদ)

১৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ বিকাল ৩:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৫ সালের গোড়ার দিকে ছেলেটার সাথে আমার পরিচয় । ৭ বছর আগেই যে পরিচয় হতে পারতো ,হয়ে ওঠেনি, কেন হয়নি তাকেও কোনদিন বলা হয়ে উঠেনি । ৯৭ এ যখন আমি আইডিয়াল স্কুল প্রাঙ্গনে প্রথম পা রেখেছি , তার আগের বছরই এ প্রাঙ্গন ছেড়ে সে চলে গেছে মির্জাপুর ক্যাডেটের চৌহদ্দিতে ।

০২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পাতায় আমার একটা রঙিন ছবি ছাপা হয়েছিল । ঠিক একই দিন ভেতরের পাতায় মির্জাপুরের ৭/৮ জন ক্যাডেটের এক সারি পাসপোর্ট সাইজের সাদা কালো ছবি ছেপেছিল পত্রিকাটি , সে ছবি আমি পরে দেখেছি ।

ভার্সিটিতে এসে শান্ত, সৌম্য , ভদ্র চেহারার লম্বা করে ছেলেটির দেখা পেলাম , আমি সিএসই তে , সে ইলেকট্রিক্যাল এ । আমরা ভীষণ ফুটবল পাগল ছিলাম , সুযোগ পেলেই ০২ ব্যাচের সিএসই দের হৈচৈ এ ভার্সিটির মাঠটা জীবনের আভাস পেত । অন্য ডিপার্টমেন্টগুলোকেও মাঠে আনার চেষ্টা করতাম আমরা । সিভিলদের কিছুতেই পাওয়া যেত না , মেকানিক্যালরা হাতে গোনা । যা কয়েকটা পাওয়া যেত ইলেকট্রিক্যালদেরই । লম্বামতন ছেলেটা তাদের মাঝেই একজন । প্রথম যেদিন সে আমাদের সাথে খেলেছিল , আমি ৫/৬ বার তাকে ডজ দিয়েছিলাম , সেটা তার মনে আছে কিনা জানি না ।

০৫ সালের রশীদ হলে যখন একটা ঠিকানা হল , তখন তাকে পেলাম পড়শি হিসেবে । দু'তিন মাস ঘুরতেই রুম বদলে পুরোদস্তুর রুমমেট হয়ে গেলাম তার । সে আমার রুমমেট সীমান্ত আহমেদ , আমার জোরাজুরিতে ব্লগে যার পদচারণার সূচনা।

সীমান্তের সাথে আমার সম্পর্কটা আপাত দৃষ্টিতে অনেক ফরমাল ,এখনও তুমি-তুমির শেকল ভেঙে তুই-তোকারি তে যায়নি , কোনদিন যাবেও না। কিন্তু ফর্মালিটিজের মাঝে যে দূরত্ব থাকে , তার পুরোটাই অনুপস্থিত সেখানে ।গভীর আন্তরিক ফর্মালিটি বলতে যদি কিছু থেকে থাকে , সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার সাথে আমার সম্পর্ক ।আমার না বলা কথাগুলো পৃথিবীতে প্রথম যে কজন জানাতে ভালো লাগত , সে হয়ে উঠল। তাদের একজন ।

৩০১১ নম্বর রুমে আমরা ছিলাম ৩ জন , আমি , হাফিজ আর সীমান্ত । হলে আমি ভীষণ ইরেগুলার , টার্মের বেশির ভাগ সময়টা বাসায় কাটতো । আর তার নিবাস শেরে বাংলা হল । হাফিজও সারাদিন ব্যস্ত । ৩০১১ দিনের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে ঘুমিয়েই থাকতো । ৩ জনকে একসাথে পেতে রাত ৩ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত । পরীক্ষা পেছানোর জল্পনা- কল্পনা , রাজনীতি , খেলাধুলা , , প্রেম নিয়ে কত আলাপ করেছি । অবাক ব্যাপার , প্রায় সব কিছুতেই আমাদের মতের মিল হত । অপরিচিত লোকের সামনে আমরা দু'জনই ভীষণ মুখচোরা , পরিচিত জনদের সামনে ছোটাই কথার ফুলঝুরি ।

ঢাকার উপকন্ঠেই তার বাসা । সীমান্ত তার মায়ের কথা বলত খুব , উইকেন্ডে বাসায় গিয়ে মায়ের সাথে তার সবকথা শেয়ার করত । কোন মেয়েকে তার পছন্দ হলে , আমাদের আগে জানতো তার মা । উইকেন্ড ছাড়া যখন তাকে বাসায় যেতে দেখতাম , তখন বুঝতাম তার বাসায় ভালো কিছু রান্না হয়েছে , মা তাকে ডেকেছেন ।

আমি আর হাফিজ স্মৃতি হাতড়ে প্রথম শ্রেণী থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত পড়া গল্প কবিতাগুলোর নাম খুঁজে বের করতাম । অন্তত চারটি বা আটটি লাইন সে মুখস্ত বলে দিত , আমাদের বিস্ময়ের রেশ কাটতো না । হাফিজ খেলাধুলার আলাপগুলোতে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতো , সেটা বেশি জমতো যেদিন ফারহান আমাদের রুমে আসতো । আমি আর সীমান্ত আর্জেন্টিনাকে তুলোধুনো করতাম । ২০ বছর আগের পরিসংখ্যান হুবুহু মনে রাখার ব্যাপারে তার জুড়ি ছিল না ।

এমন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির রুপকার সীমান্তের মা , ছোটবেলাতেই যিনি ছেলেকে বাংলাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন । পেশাগত জীবনেও যিনি ঢাকার শীর্ষ একটি সরকারী কলেজের বাংলার বিভাগীয় প্রধান । সীমান্তের কথায় বুঝি জীবনে তিনি ছেলের সবচেয়ে বড় বন্ধু , যার আবেশে আজ আমি মাকে সাহস করে অনেক কথা বলি, আমার মাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি ।

এ বছরটার প্রারম্ভে আমি আর সীমান্ত Ericsson এ একসাথে টিকে গেলাম । আমি ছাড়লাম Grameenphone আর ও teletalk এর অফার । নতুন এ জীবনের প্রথম দিনে ওকে দেখেছি অন্য রুপে । সীমান্তের মায়ের চোখে সেদিনের স্বপ্নটা কত বেশি রঙিন ছিল , সেটা হয়তো কেবল অনুভবই করে যাবো , কোনদিন স্পর্শ করতে পারবো না ।

আমার ক্রমাগত চাপাচাপিতে ব্লগ লিখতে শুরু করল সীমান্ত । সীমান্ত বলতো তার ব্লগের প্রথম পাঠক তার মা , তার লেখালেখির উৎসাহদাতাও সেই মা , ওর সবচাইতে ভালো বন্ধু ।

আগস্টে আমি এরিকসন ছেড়েছি । সীমান্ত ছেড়েছে সেপ্টেম্বরের । ৫ তারিখে ছিল তার দিন বদলের দিন , বাংলালিংক তার নতুন ঠিকানা । আমি জানি , সীমান্তের মা' ই ছেলেকে নতুন পথ দেখিয়েছেন , নতুন পথ চলার সাহস যুগিয়েছেন।

পরের প্রহরগুলো রক্ত ঝরা, দিনবদলের একদিন আগেই মায়ের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ । ৩ দিন পাঞ্জা লড়েছেন , তারপর আত্মসমর্পন। এর মাঝেই আমার বাবা ভীষণ অসুস্থ , একটি বারও বন্ধুর পাশে যেতে পারিনি । আক্ষেপটা অনেকদিন আমাকে পোড়াবে ।

এবার ঈদে হঠাৎ করেই মনে হয়েছিল ওদের বাসায় যাই , কেন যে ওকে ফোনে পাচ্ছিলাম না জানিনা । হয়তো ভাগ্য বিধাতা শেষ মুহুর্তের আগে বাস্তবতার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাননি । ডিসেম্বরের ঈদের কথা ভেবে রেখেছিলাম , কিন্তু সে ঈদ সীমান্তদের জন্য শোক বয়ে আনবে , একবারও ভাবিনি।


রশীদ হলের হয়ে সীমান্ত যেবার ভার্সিটি অ্যাথলেটিকস মিটে অল্পের জন্য হেরে গেল , সেবার তার মুখে যে গভীর বিষাদের ছায়া দেখেছিলাম সেটা কোনদিন ভুলবো না । জানিনা বিন্দু শোকে নিথর হওয়া সীমান্ত কি করে সাগরের উত্তাল তরঙ্গ সামলে নিয়েছে । সীমান্ত হারেনি । ৩ দিন আগে তার সাথে দেখা হয়েছে , আমার বাবাকে হাসপাতালে সে দেখতে এসেছিল । নতুন পথ চলাটা নতুন করে শুরু করার সংগ্রাম শুরু হয়েছে তার ।

তাকে দেখে আমার মায়ের চোখের কোনে চিকচিক করে ওঠা অশ্রুবিন্দু দেখে ক্ষণিকের জন্য আমার ঠোঁটটাও কেঁপে উঠে , চুপ করে থাকি , মুখটা ঘুরিয়ে নিই।

কিছু বলতে চাই , বলতে পারি না ........................

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ বিকাল ৩:২৫
৩৯টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×