((সতর্কীকরণ: যারা বছরের পর বছর যত্ন করে নিজেদের চামড়াকে ত্বকের মর্যাদা দিয়েছেন ,তাদের জন্য শিক্ষণীয় কিছু নেই । আর যারা ত্বকের বদলে আমার মত চামড়া ধারণ করে চলেন , তাদেরও শিক্ষা পেয়েও কোন লাভ নেই , অদূর ভবিষ্যতে সহধর্মিনীর মন রক্ষায় আপনাদের সবটূকু শিক্ষাই জলাঞ্জলি দিতে হবে))
৭ জুলাই , সকাল ৯ টা বেজে ৪০ মিনিট।
গুলশান-১ সিগনালে বাস থেকে নেমে এলোমেলো পা ফেলে ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। হঠাৎ করেই বন্ধু কাম কলিগ সাকিবের ফোন .........."মেহরাব , তুমি কোথায় ? তাড়াতাড়ি অফিসে আসো , মতিঝিলে ব্যাংকে ডেমোনেস্ট্রেশন দিতে যেতে হবে"।
ফোনটা কেটে দিয়ে জোড়া কদমে পা চালালাম , অফিসে পৌছুতে লাগবে বড়জোর ৩/৪ মিনিট। উদয় টাওয়ারের পাশে "হাশ-পাপিস" এর গ্লাসে হঠাৎ করেই নিজের দিকে তাকানোর ফুসরৎ মিলল , নিজেকে দেখে সত্যি হতাশ হলাম ।
সফটওয়্যার ফার্মে পোশাক-আশাকের বালাই নেই , তাই বলে আজ আমার যে বেশভূষা সেটা মতিঝিলে ডেমোনেস্ট্রেশন দিতে যাবার একদমই অনুপযোগী । মনটা একদম ভাল নেই ,বেখেয়ালে সামনে যা পেয়েছি পড়ে এসেছি ।
সবচেয়ে রংচটা জিনসের প্যান্ট , পুরনো একটা টি-শার্ট , পুরনো আধা ছেঁড়া স্যান্ডেল , মাথা ভর্তি চুলের জংগল , আর শেভ না করা এবড়ো থেবড়ো চোয়াল ,এমন ভয়াবহ খারাপ কম্বিনেশন সম্ভবত অনেকদিন নিজেকে দেখিনি ।
হন্তদন্ত হয়ে অফিসে ঢুকতেই গুছিয়ে নিয়ে রওনা হওয়ার তাগাদা দিল সাকিব । একবার চোখ ফেরাল আমার দিকে , আমার বিধ্বস্ত বদন ওর চোখ এড়ায়নি ...."তাড়াতাড়ি কোথাও গিয়ে অন্তঃত শেভ করে আসো"
হুড়মুর করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম আবার । গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাঝে ভাগ্যদেবী মেঘ ফুঁড়ে ফিরে তাকাল না , আনাচে কানাচে কোথাও মিলল না সেলুনের খোঁজ। ২৩ নাম্বার রোডের চিপার সেলুনটা দৃষ্টি এড়াল। অনেকটা দৌড়াদৌড়ি শেষে একটা গুলশান মার্কেটের দোতলায় একটা সেলুন যেন জীবন ফিরিয়ে দিল ।
আমার রুপচর্চার ইতিহাসে বলতে কেবল এই শেভ করাটাই , তাও সপ্তাহে বড়জোড় দু'বার । ২০০২ থেকে শুরু করার পর মাত্র দ্বিতীয়বারের মত সেলুনে শেভ করতে ঢুকছি ।
সেলুনের বাইরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ঘোষনা জানিয়ে দিল ,শেভ করতে বাড়তি কিছু টাকা গুনতে হবে । মনে মনে ভাবছি "কতই বা বেশি , ১৫ টাকার বদলে না হয় ,৩৫ টাকাই নেবে , আমার এখন শেভ করাটা জরুরী" । ভেতরে পা রাখতেই বীভৎস ধরণের গুদাম-ঘরের হাওয়া যেন ধাক্কা দিল । ইলেকট্রিসিটি নেই , এসি অফ , শীত নিয়ন্ত্রণটা অকেজো হয়ে গেলেও তাপের প্রিজারভেশনটা ভাল করেই হচ্ছে।
ঝটপট একটা সিটে বসে গেলাম।শেভিং পর্বটা শেষ হতে খুব বেশিক্ষণ লাগল না । শেভ চলাকালীন নরসুন্দর মশাই দুয়েকটা কথা বলেছেন , আমাকে নাকি প্রচন্ড বিধ্বস্ত ক্লান্ত লাগছে । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । সন্দেহের বীজটা ততক্ষণে আমার মাঝে কিছুটা হলেও ঢুকে গেছে , "আসলেই তো রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি" ।
আমার সংশয়ে ভরা চোখ দেখেই যেন নরসুন্দর তার মোক্ষম অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিল , "স্যার, একটু ফেসটা ওয়াশ করে দিই?"। এক মুহুর্ত দ্বিধা করে জিজ্ঞেস করলাম "খুব বেশিক্ষণ লাগবে?"
......"একদম না স্যার , জাস্ট বসবেন , হয়ে যাবে"
পকেটের কথাটা একবার ভাবলাম , মানিব্যাগ আনতে ভুলে গেছি । জিন্সের পকেটের মাঝে কিছু টাকা দলা পাকিয়ে আছে, যার সঠিক পরিমাণটা অজ্ঞাত ।"শুধু একটা বার ওয়াশই তো, বেশি করে ধরলেও ৫০ , ৩৫ আর ৫০ = ৮৫ , নাহ পকেটে এর চেয়ে ঢের বেশি টাকা আছে, ফ্রেশ হয়ে ডেমনস্ট্রেশন দিতে যাওয়াটা জরুরী"।
"এই শসাটা দে তো".......পিচ্চি অ্যাসিসটেন্টকে দেয়া নরসুন্দরের এই নির্দেশে হঠাৎ করেই যেন আতঙ্ক অনুভব করলাম। পত্র-পত্রিকা আর টিভিতে চাকা চাকা শসা দিয়ে চোখ ঢাকা মেয়েদের কতবার দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই , সেই আজাব কি আমার উপর নাজিল হতে চলেছে? সালাদ হিসেবে শসা খাওয়ায় আমি সিদ্ধহস্ত হতে পারি , কিন্তু চাকা চাকা শসা চোখে দেয়া আমার সাধ্যে কুলোবে তো ? পরক্ষণেই বুঝলাম আমার আশঙ্কা অমূলক , নরসুন্দরের হাতে একটা ক্রিম ,ক্রিমের প্লাস্টিক টিউবে শসার লোগো। দু'হাতে শসা ক্রিম নিয়ে মিনিটখানেক আমার মুখে ঘষাঘষি চলল ।
ক্রিম ঘষা শেষ হলে চোখ বুজে পড়ে থাকলাম আরও মিনিট খানেক। সাড়া শব্দ না পেয়ে বোজা চোখটা একটু খুলে আয়নার দিকে তাকালাম , নিজেকে দেখে মুকাভিনেতা পার্থ-প্রতীম মজুমদারের মত লাগছে।
হঠাৎ করেই চুলে ভীষণ টান অনুভব করলাম , আমার চুলের মুঠো ধরে কে যেন সজোরে ঝাকাচ্ছে। আরাম দেয়ার নামে চুল ধরে টানা হেঁচড়া , কপালের চামড়া টানা ,আর ভলিবল খেলার স্টাইলে দু'হাত জোড়া করে মাথায় দু'চার ঘা বসিয়ে দেয়া বাংলাদেশী নাপিতদের কমন ট্রেন্ড । সেলুনে চুল কাটতে গেলে এই বিপদে আমি কতবার যে পড়েছি , তার হিসাবটা অজানা।চুলের মুঠো ধরে টেনে হিচড়ে দলাই মলাই করার মাঝে লোকে যে কি সুখ পায় কে জানে , আমার বেলায় অন্তত মস্তিষ্কের নিউরণশুদ্ধ টনটন করে ওঠে । চুল কাটার পর তাই আমি সবসময় তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পড়ি ।
কিন্তু আজ সে সুযোগ নেই ।নিজেকে অসহায় লাগছে , আমাকে মুকাভিনেতা সাজিয়ে মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে চুল টানাটানি করে তীব্র মাথা-ব্যাথার পাকাপাকি বন্দোবস্ত যে শুধু করা হচ্ছে তা না , এই নিপীড়নের বিনিময়ে আমাকে কিছু কড়িও ঢালতে হবে । ৮৫ এর সাথে মনে মনে আরও ২০ টা টাকা যোগ করে নিই।
চুল টানা হেচড়া খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না , নরসুন্দর লেগে গেলেন আমার হাত নিয়ে । আমার হাফ হাতা টি-শার্ট কাঁধ পর্যন্ত সরিয়ে মহা-আনন্দে টেপাটেপি তে লেগে গেলেন। এই টেপাটেপির ব্যাপারটা আমার কাছে আরেক রহস্য । টেপাটেপি পেয়ে লোকে কি স্বর্গসুখ পায় কে জানে , আমার বেলায় তো মনে হয় , আমার সুবিনস্ত মাংসপেশীগুলোর বিন্যাসই কেবল এলোমেলো হয়ে যায়। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে টেপাটেপি বন্ধ করার ফন্দি আঁটছি , ঠিক তখনই হাত তার কাঁধে টেনে নিয়ে নরসুন্দর মশাই আমার পাঁচটা আঙ্গুল পটপট শব্দ করে ফুটিয়ে দেয়। সারাটা জীবন আমার আঙ্গুলগুলোকে ফোটার হাত থেকে হেফাজত করেছি , আর ব্যাটা পটাশ পটাশ আওয়াজে সবক'টা ফুটিয়ে দিল ? আমার অস্বস্তি কাটানোর কোন সুযোগই মিলল না , এবার যখন তিনি আমার জামা গলিয়ে হাত ঢুকিয়ে কাঁধ আর ঘাড় টেপাটপির প্রস্তুতি নিচ্ছেন , নিজের সবটুকু বিরক্তি সঞ্চয় করে বলেই ফেললাম ........."আর কতক্ষণ?"
মনে হল অবশেষে মুক্তি মিলল , মুখে গরম পানিতে ভেজানো একটা রুমালের ছোঁয়া পেলাম , আমার ওয়াশিং বুঝি শুরু হয়েছে । আধা মিনিট মত গরম পানির ফিলিংসটা পেলাম , এরপর আমার ঘাড় আবার সটান করে দেয়া হল ।
হঠাৎ করেই গলা বরাবর ভীষণ গরম অনুভব করলাম । আমার চোখ তখনও শসার মন্ডে বুজে আছে , সেকেন্ডের দশমাংশে আমি অনুভূত তাপের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছি । একবার মনে হলে মুখে ছোঁয়ানো সেই গরম পানি মুখ থেকে গড়িয়ে গলায় পৌছুল কিনা । কিন্তু গড়াতে গড়াতে শীতল হয়ে যাওয়া পানি হঠাৎ করে গন্ডদেশে গিয়ে তাপ-উৎপাদন শুরু করবে , এমন যুক্তি ধোপে টিকল না । সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর মত ছোট্ট চোখে পৃথিবীর আলোর দিকে তাকালাম । যা দেখলাম ছোট একটা যন্ত্র আমার দিকে ধেয়ে আসা গরম স্টীমের প্রবাহ দিয়ে আমাকে ভাপ দেয়া হচ্ছে ।ছোটবেলায় ঘরে বয়েল করা পানি থেকে উৎপন্ন অনেক জলীয় বাষ্পই মুফতে গায়ে লাগিয়েছি , কিন্তু ছোট্ট এই মেশিন থেকে গলার দিকে ধেয়ে আসা বাষ্পের ঋণ শোধ করার সামর্থ সত্যিই বুঝি আমার নেই ।
পেছন থেকে দু'হাতে নতুন একটা মন্ড ঘষাঘষির কাজ শুরু হল , এবারের টা ভীষণ রুক্ষ আর শক্ত ধারাল কণায় ভর্তি । মুখে অবিরাম খোঁচা সহ্য করে ঝিম মেরে পড়ে থাকলাম । আমার বেয়াড়া চুলগুলো বারবার কপালে এসে পড়ছে বলে মেয়েদের একটা ব্যান্ড চুলে সেঁটে দেয়া হল।
পুরনো খোঁচাল সফট টাইপের আরেকটা পেস্ট মুখে ঘষা শুরু হল, এবারেরটা বিকট গন্ধের , খাঁটি ঘাস বেঁটে যেন বানানো । নাক বন্ধ করে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে গিয়ে খানিকটা ক্রিমের স্বাদ জিভে লেগে গেল , স্বাদে-গন্ধে বীভৎস ক্রিমের আজাব থেকে রেহাই পেতে যখন আমার দেহমন বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে , ঠিক তখনই গগনবিদারী শব্দে আমার মোবাইল বাজতে শুরু করল । টাওয়েলের নিচে রাখা জোড়া দু'হাত বের করে মোবাইল বের করা সম্ভব না , উপরন্তু আমার কান পর্যন্ত ক্রিমে ঢাকা , তাই মোবাইল রিসিভ করতে পারছি না । কিন্তু বুঝতে বাকি রইল না অফিস থেকে খোঁজাখুঁজি চলছে । এবার বলেই ফেললাম , "আমাকে যেতে হবে" ।
ঝটপট আমার চেয়ার টেনে একটা বেসিনের সামনে আমাকে বসানো হল , আচানক ঘাড়-ধাক্কা খেয়ে বেসিনের উপরে মুখ বাড়িয়ে দিলাম । গরম পানিতে মুখ ধোয়ানো হল , টাওয়েলে মুখ মুছে একবার আয়নায় তাকালাম । খালি চোখে কোন পরিবর্তন ধরতে পারলাম না ।কে জানে , জহুরীর চোখ হয়ত ঠিকই ঠিকরে পড়া রুপ-লাবণ্যের সন্ধান পেত। আব-জাব না ভেবে সোজা ক্যাশ কাউন্টারের দিকে রওনা হলাম।
সেলুনের ভেতরার ইন্টেরিয়রটা দেখলাম , বেশ পুরনো ,দুয়েক জায়গায় পলেস্তরা খসে গেছে । ভয়ের কথা হল , জায়গাটা গুলশান আর সেলুনে এয়ার কন্ডিশনার আছে । আর আশার কথা হল , ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না , এসি অফ, আমি দরদর করে ঘেমেছি, আমার পাশের জনকে কেবল যখন বাষ্প মারার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে , ততক্ষণে আমি সবগুলো পর্ব সাঙ্গ করে ফেলেছি, নরসুন্দরের এই অল্প পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছুটা কৃপা হয়ত পাব।
সব মিলিয়ে ১৫ মিনিটের এপিসোড, পজিটিভ নেগেটিভ সব ফ্যাক্টর মিলিয়ে ১ সেকেন্ডের একটা ঝড়ো হিসাব করলাম , তারপরও বুঝলাম মহা ধরা খেয়েই গেছি । ৩০ টাকা খরচ করতে এসে হয়ত ২০০ টাকা বিল তুলে ফেলেছি । পকেটে অন্তঃত দু'শ টাকা আছে , মান ইজ্জত বেঁচে গেছে এতটুকু ভেবে কেবল একটু স্বস্তি লাগছে ।
"কত বিল হয়েছে ?.........."
"৪১০ টাকা স্যার"
গুলশান মার্কেটের ভেতরে পুরনো সে সেলুনের ভেতরে আমার মাথায় দিব্যি বজ্রপাত হল । মনে মনে বলছি , কোন কুক্ষণে যে কুকুর হয়ে ঘি খেতে গিয়েছিলাম ??
পুরনো দিনের অলি-আউলিয়ারা আল্লাহর উপর ভরসা রেখে থলের ভেতর থেকে অবিরতভাবে রুটি-খোর্মা বের করতেন। একমাত্র এমন কোন মিরাকলই আমাকে বাঁচাতে পারে । অন্যদিন ফজরের নামাজটা অন্তত পড়ি , আজ তাও পড়িনি , এমন গুনাহগার বান্দার আউলিয়া লেভেলের মাগফিরাত আর বারকাত কামনা করাও তো গুনাহ !! তবুও আল্লাহ-রাসুলের নাম নিয়ে জিন্সের দু'পকেটে দু'হাত ঢুকিয়ে দিলাম। গভীর করে পকেট সেচে দু'টো মুঠোয় সব ক'টা কাগজের নোট আর কয়েন বের করে আনলাম।
দলা পাকিয়ে থাকা টাকাগুলোর প্রাথমিক ট্রেন্ড বলে দিচ্ছে আমার শর্ট পড়ে গেছে , সাথে এটিএম কার্ডও নেই। চোয়াল শক্ত করে বললাম ...."আমার কাছে টাকা নেই"
লোকের মনে দয়া হল , "টাকা নেই ? কি আর করা , এখন ৩৫০ দিন , এরপর সময় করে বাকিটা দিয়ে যাবেন।" আমি তখন ব্যস্ত টাকার গণনা-পুনর্গণায় । ফলাফল ৩৪২ টাকা । পকেটে দু'টাকা রেখে অবশিষ্টাংশ বিসর্জন দিয়ে অফিসের দিকে ছুটে গেলাম।
হন্ত-দন্ত হয়ে অফিসে ঢুকলাম , আমার কোন পরিবর্তনই সম্ভবত কারও চোখে আটকালো না , দূর থেকে সাকিব হাঁক দিল ....."মেহরাব, প্রেজেন্টেশন ক্যানসেলড , কাল আমরা মতিঝিল যাচ্ছি

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

