আনিসুল হক লিখলেন :
"তরুণ পাঠকেরা , যদি পার , থ্রি ইডিয়টস ছবিটা দেখে নিও । তাহলে তোমরাও ঐ চরণটা চিৎকার করে বলতে পারবে ...... আল ইজ ওয়েল"
ক্যারিয়ার চুজিং নিয়ে বিশাল বেসাতির শেষে যখন স্বনামধন্য লেখক আনিসুল হক এভাবে উপসংহার টানেন , তখন অবাক বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে থাকি । কোটি বেকার বা দিশাহারা তরুণ তবে অবশেষে দিশার সন্ধান পেল।
তবে কি আনিসুল হক এভাবে বলতে পারেন না ?
না পারেন না , কিছুতেই না।
আমরা থ্রি-ইডিয়টস দেখতে পারি , এটা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা জমিয়ে তুলতে পারি , কিন্তু আনিসুল হক্ব বললেই দোষ ?
হ্যাঁ , আমাদের বেলায় অপরাধটা লঘু , উনার বেলায় অপরাধটা অনেক বেশি গুরুতর । আমি , আপনি যে কারণেই হোক সমাজের ছোট্ট একটা অংশকে প্রভাবিত করতে পারি বড়জোর । আমি তীব্র হিন্দি প্রেম দেখাতে পারি , পাশের দেশের জন্য সুতীব্র ভালবাসাও প্রকাশ করতে পারি , কিন্তু আমার সেই প্রকাশ খুব অল্প মানুষকেই প্রভাবিত করবে । আনিসুল হক্ব যখন কথা বলেন , তখন পুরো তরুণ প্রজন্মের কাছে সে বার্তা পৌছে যায় , যাদের অনেকেই উনাদের আইডল মেনে তাদের কর্মকান্ড অনুসরণ করার ব্রতে আবদ্ধ হয়ে আছেন।
উনার দোষটা কোথায় , ফেব্রুয়ারি মাস বলেই কি ?
হ্যাঁ , সেটাও বলতে পারেন । ফেব্রুয়ারি মাসে আমি আলাদা করে ভাষার জন্য দু'টো কথা হয়ত বলব না , কিন্তু সেমিনার সিম্পোজিয়াম , মঞ্চ ময়দানে আনিসুল হক্বরা ভাষার নিয়ে অনেক আবেগ-ভরা কথাই বলবেন । যিনি এমন করে বলেন , তিনি যখন হিন্দি ভাষাকে প্রমোট করেন , সেটা অবশ্যই ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড ।
আমরা তাহলে কোন মুখে সমালোচনা করি , যেখানে আমরা নিজেরাই নীতি মেনে চলি না ? আনিসুল হক্বকে বলার আগে কি নিজের আগে সংশোধন হয়ে আসা উচিৎ না ?
অবশ্যই উচিৎ । কিন্তু এভাবে যদি সমালোচনা করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয় , সেটা নিঃসন্দেহে ব্ল্যাক-মেইলিং । একজন ডাক্তার অপারেশনে গাফিলতি করে রোগী মেরে ফেলেছেন , সেক্ষেত্রে ডাক্তারের সমালোচনা করার জন্য কি আমাকে আগে অপারেশন থিয়েটরে ঢুকে কয়েকটা অপারেশন পরিচালনা করতে হবে ? কাজেই , তিনি ভুল করলে আমরা খুঁত ধরতে পারব না , এমন কথাগুলো নিতান্তই দুর্বল ।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য , এখনকার চেতনার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ?
সম্ভবত দু'টোর মাঝের তফাৎটা এখন আকাশ পাতাল । পার্থক্যটা তখনই প্রকট হয়ে গেছে , যখন বাংলা ভাষার আবেদনটা বছরব্যাপি না হয়ে কেবলই ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে । কোন সূত্র ধরে না বললেও , স্পষ্টত যেটা দেখা যায় ফেব্রুয়ারী মাসে যারা ভাষার কথা বলে , সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা বেশি করে মুখ খুলছেন , তাদের অগ্রসেনানীদের সন্তানদের বেশির ভাগ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষিত , যেখানে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি নিয়ে অন্ধকারে রাখা হয় ।
তবে কি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে ব্যর্থতাই সব কিছুর মূলে ?
"সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন" --- এই কনসেপ্ট টায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে । ব্যাপারটা বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবী রাখে । সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের কথা যারা বলেন খুব বেশি বেশি করে (যাদের অনেকের সন্তান বাইরে পড়াশোনা করতে গিয়ে ঠিকমত বাংলা বলতে পারে না) , জনগণের জন্য তাদের কনসেপ্ট হল , ইংরেজি ভাষার মুলোৎপাটন করে সর্বত্র বাংলা প্রচলন করা । জাতি হিসেবে আমাদের পিছিয়ে যাবার পেছেনে এই মিসকনসেপশনটার অনেক ভূমিকা আছে , সেটা অস্বীকার করা যাবে না । এর ফলে :
১। বাঙালী এখন ঠিকমত বাংলা বলতে লিখতে জানে না
২। বাংলা ভাষায় এখনও পরিপূর্ণ শিক্ষার সুযোগ আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি ।
৩। ইংরেজি ভাষা দক্ষতায় বাঙালি মোটামুটি পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ।
আজ থেকে ৩০/৪০ বছর আগে সাধারণ ম্যাট্রিক পাশ করা ছাত্র যতটুকু ইংরেজিতে দক্ষ ছিল , এখন তার সিকিভাগও মেলে না একজন স্নাকোত্তর ছাত্রের মাঝে । অবাক ব্যাপার হল , সে সময়ের ম্যাট্রিক পাশ করা মানুষগুলোর একই সাথে বাংলাতেও এখনকার ছাত্রদের চেয়ে পিছিয়ে নেই ।
তাহলে গলদটা কোথায় ? আমরা কি শুধু বাংলার উপর দাঁড়াতে পারি না ? ফ্রান্স , জার্মানী , জাপান পারলে আমরা কেন পারি না ?
উত্তরটা হল ...... না পারি না , আমাদের সামনে জাপান , ফ্রান্স , ইরান উদাহরণ হতে পারে না , যারা নিজের উৎস থেকেই আভ্যন্তরিণ যাবতীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম । আমাদের উদাহরণ বরং ভারত , শ্রীলংকা হতে পারে , যাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড এখনো ওতপ্রতোভাবে বৈদেশিক ধারণা এবং বৈদেশিক জ্ঞানের আদান প্রদানের উপর নির্ভরশীল । পরের দেশগুলোর দিকে তাকালে বুঝা যাবে , ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার কারণে তারা কেন আমাদের চেয়ে যোজন যোজন দূরত্বে এগিয়ে গেছে । শুধু তারাই না , জাপানী , চীনা , ফরাসীরাও সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইংরেজিতে নিজেদের দক্ষ করে তুলছে ।
ইংরেজিই যদি এত কিছু হয় , তবে ইংলিশ মিডিয়াম নিয়ে এত ক্ষোভ কেন ?
সেই একই কথা , ইংরেজি -বাংলার সমন্বয়ের যে নিয়মটা থাকা উচিৎ ছিলে , তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে নেই । বাংলা ভাষায় আমরা দৃঢ় শক্ত ভিত্তি চাই , মানুষকে তার শেকড় আর মাটি চেনানোর জন্য । আর ইংরেজিতে শক্ত গাঁথুনি চাই , পারিপ্বার্শিকতা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণ করে সে শেকড়কে শক্ত করে , চারাগাছগুলোকে মহীরুহে পরিণত করার জন্য , যার কোনটিই এখন বাস্তবতার আলো দেখেনি। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যে মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কহীন শ্রেণীটি তৈরি করা হচ্ছে , তারা আদৌ দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে কিছু দিতে পেরেছে ? আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কনসেপ্টের গ্যাঁড়াকলে পড়ে , বাংলা মিডিয়াম থেকে যে ইংরেজি দক্ষতা বিহীন যে বিশাল শ্রেণীটির গড়ে তুলেছি , তার কতভাগই বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশকে গড়ে তোলার মত প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণের মত উপযোগী হয়ে উঠেছে ?
আমাদের প্রকৃত আইডল কারা ?
মুনীর চৌধুরী , শহীদুল্লাহ কায়সার রা , তাদের সমসাময়িক এবং পূর্ববর্তী যারা ইংরেজি সাহিত্যে এবং ভাষায় পড়াশোনা , দক্ষতার অপরিসীম পরিচয় দিয়ে নিজের মা , মাটি , ভাষাকে দু'হাত ভরে দিয়ে গেছেন , যারা হতে পারতেন বিশ্বের সাথে আমাদের সত্যিকার মেলবন্ধন ।
হিন্দি নিয়ে তাহলে এত অভিযোগ কেন ?
সোজা কথায় ..
১। গত ৪০ বছরে আমরা সর্বস্তরে প্রচলন করতে ব্যর্থ হয়েছি কোন ভাষা ? ------ বাংলা
২। গত ৪০ বছরে শিক্ষাব্যবস্থায় কোন ভাষা ভুলে যাবার কারণে আমরা বাকি বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে গেছি ক্রমাগতভাবে ? ----- ইংরেজি
৩। গত ৪০ বছরের জাতির অলস সময়গুলো কোন ভাষার দক্ষতা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ? কোন ভাষার দক্ষতা আমাদের সবচেয়ে বেশি বেড়ে যাওয়া সত্তেও আমরা ফলাফলে কেবল শূন্যই পেয়েছি ------- হিন্দি
হিন্দি ভারতীয় মানুষের শেকড় , কিন্তু তাদের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি , বিদেশী ভাষায় তাদের দক্ষতা । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দি কেবল একটা আগ্রাসনেরই নাম ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


