somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি, একুশের চেতনার সংজ্ঞা, জায়েজ আর নাজায়েজ প্রসঙ্গ

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আনিসুল হক লিখলেন :

"তরুণ পাঠকেরা , যদি পার , থ্রি ইডিয়টস ছবিটা দেখে নিও । তাহলে তোমরাও ঐ চরণটা চিৎকার করে বলতে পারবে ...... আল ইজ ওয়েল"

ক্যারিয়ার চুজিং নিয়ে বিশাল বেসাতির শেষে যখন স্বনামধন্য লেখক আনিসুল হক এভাবে উপসংহার টানেন , তখন অবাক বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে থাকি । কোটি বেকার বা দিশাহারা তরুণ তবে অবশেষে দিশার সন্ধান পেল।

তবে কি আনিসুল হক এভাবে বলতে পারেন না ?
না পারেন না , কিছুতেই না।

আমরা থ্রি-ইডিয়টস দেখতে পারি , এটা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা জমিয়ে তুলতে পারি , কিন্তু আনিসুল হক্ব বললেই দোষ ?
হ্যাঁ , আমাদের বেলায় অপরাধটা লঘু , উনার বেলায় অপরাধটা অনেক বেশি গুরুতর । আমি , আপনি যে কারণেই হোক সমাজের ছোট্ট একটা অংশকে প্রভাবিত করতে পারি বড়জোর । আমি তীব্র হিন্দি প্রেম দেখাতে পারি , পাশের দেশের জন্য সুতীব্র ভালবাসাও প্রকাশ করতে পারি , কিন্তু আমার সেই প্রকাশ খুব অল্প মানুষকেই প্রভাবিত করবে । আনিসুল হক্ব যখন কথা বলেন , তখন পুরো তরুণ প্রজন্মের কাছে সে বার্তা পৌছে যায় , যাদের অনেকেই উনাদের আইডল মেনে তাদের কর্মকান্ড অনুসরণ করার ব্রতে আবদ্ধ হয়ে আছেন।

উনার দোষটা কোথায় , ফেব্রুয়ারি মাস বলেই কি ?
হ্যাঁ , সেটাও বলতে পারেন । ফেব্রুয়ারি মাসে আমি আলাদা করে ভাষার জন্য দু'টো কথা হয়ত বলব না , কিন্তু সেমিনার সিম্পোজিয়াম , মঞ্চ ময়দানে আনিসুল হক্বরা ভাষার নিয়ে অনেক আবেগ-ভরা কথাই বলবেন । যিনি এমন করে বলেন , তিনি যখন হিন্দি ভাষাকে প্রমোট করেন , সেটা অবশ্যই ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড ।

আমরা তাহলে কোন মুখে সমালোচনা করি , যেখানে আমরা নিজেরাই নীতি মেনে চলি না ? আনিসুল হক্বকে বলার আগে কি নিজের আগে সংশোধন হয়ে আসা উচিৎ না ?
অবশ্যই উচিৎ । কিন্তু এভাবে যদি সমালোচনা করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয় , সেটা নিঃসন্দেহে ব্ল্যাক-মেইলিং । একজন ডাক্তার অপারেশনে গাফিলতি করে রোগী মেরে ফেলেছেন , সেক্ষেত্রে ডাক্তারের সমালোচনা করার জন্য কি আমাকে আগে অপারেশন থিয়েটরে ঢুকে কয়েকটা অপারেশন পরিচালনা করতে হবে ? কাজেই , তিনি ভুল করলে আমরা খুঁত ধরতে পারব না , এমন কথাগুলো নিতান্তই দুর্বল ।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্য , এখনকার চেতনার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ?
সম্ভবত দু'টোর মাঝের তফাৎটা এখন আকাশ পাতাল । পার্থক্যটা তখনই প্রকট হয়ে গেছে , যখন বাংলা ভাষার আবেদনটা বছরব্যাপি না হয়ে কেবলই ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে । কোন সূত্র ধরে না বললেও , স্পষ্টত যেটা দেখা যায় ফেব্রুয়ারী মাসে যারা ভাষার কথা বলে , সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা বেশি করে মুখ খুলছেন , তাদের অগ্রসেনানীদের সন্তানদের বেশির ভাগ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষিত , যেখানে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি নিয়ে অন্ধকারে রাখা হয় ।

তবে কি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে ব্যর্থতাই সব কিছুর মূলে ?
"সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন" --- এই কনসেপ্ট টায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে । ব্যাপারটা বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবী রাখে । সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের কথা যারা বলেন খুব বেশি বেশি করে (যাদের অনেকের সন্তান বাইরে পড়াশোনা করতে গিয়ে ঠিকমত বাংলা বলতে পারে না) , জনগণের জন্য তাদের কনসেপ্ট হল , ইংরেজি ভাষার মুলোৎপাটন করে সর্বত্র বাংলা প্রচলন করা । জাতি হিসেবে আমাদের পিছিয়ে যাবার পেছেনে এই মিসকনসেপশনটার অনেক ভূমিকা আছে , সেটা অস্বীকার করা যাবে না । এর ফলে :
১। বাঙালী এখন ঠিকমত বাংলা বলতে লিখতে জানে না
২। বাংলা ভাষায় এখনও পরিপূর্ণ শিক্ষার সুযোগ আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি ।
৩। ইংরেজি ভাষা দক্ষতায় বাঙালি মোটামুটি পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ।

আজ থেকে ৩০/৪০ বছর আগে সাধারণ ম্যাট্রিক পাশ করা ছাত্র যতটুকু ইংরেজিতে দক্ষ ছিল , এখন তার সিকিভাগও মেলে না একজন স্নাকোত্তর ছাত্রের মাঝে । অবাক ব্যাপার হল , সে সময়ের ম্যাট্রিক পাশ করা মানুষগুলোর একই সাথে বাংলাতেও এখনকার ছাত্রদের চেয়ে পিছিয়ে নেই ।


তাহলে গলদটা কোথায় ? আমরা কি শুধু বাংলার উপর দাঁড়াতে পারি না ? ফ্রান্স , জার্মানী , জাপান পারলে আমরা কেন পারি না ?
উত্তরটা হল ...... না পারি না , আমাদের সামনে জাপান , ফ্রান্স , ইরান উদাহরণ হতে পারে না , যারা নিজের উৎস থেকেই আভ্যন্তরিণ যাবতীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম । আমাদের উদাহরণ বরং ভারত , শ্রীলংকা হতে পারে , যাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড এখনো ওতপ্রতোভাবে বৈদেশিক ধারণা এবং বৈদেশিক জ্ঞানের আদান প্রদানের উপর নির্ভরশীল । পরের দেশগুলোর দিকে তাকালে বুঝা যাবে , ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার কারণে তারা কেন আমাদের চেয়ে যোজন যোজন দূরত্বে এগিয়ে গেছে । শুধু তারাই না , জাপানী , চীনা , ফরাসীরাও সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইংরেজিতে নিজেদের দক্ষ করে তুলছে ।

ইংরেজিই যদি এত কিছু হয় , তবে ইংলিশ মিডিয়াম নিয়ে এত ক্ষোভ কেন ?
সেই একই কথা , ইংরেজি -বাংলার সমন্বয়ের যে নিয়মটা থাকা উচিৎ ছিলে , তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে নেই । বাংলা ভাষায় আমরা দৃঢ় শক্ত ভিত্তি চাই , মানুষকে তার শেকড় আর মাটি চেনানোর জন্য । আর ইংরেজিতে শক্ত গাঁথুনি চাই , পারিপ্বার্শিকতা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণ করে সে শেকড়কে শক্ত করে , চারাগাছগুলোকে মহীরুহে পরিণত করার জন্য , যার কোনটিই এখন বাস্তবতার আলো দেখেনি। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যে মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কহীন শ্রেণীটি তৈরি করা হচ্ছে , তারা আদৌ দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে কিছু দিতে পেরেছে ? আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কনসেপ্টের গ্যাঁড়াকলে পড়ে , বাংলা মিডিয়াম থেকে যে ইংরেজি দক্ষতা বিহীন যে বিশাল শ্রেণীটির গড়ে তুলেছি , তার কতভাগই বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশকে গড়ে তোলার মত প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণের মত উপযোগী হয়ে উঠেছে ?

আমাদের প্রকৃত আইডল কারা ?
মুনীর চৌধুরী , শহীদুল্লাহ কায়সার রা , তাদের সমসাময়িক এবং পূর্ববর্তী যারা ইংরেজি সাহিত্যে এবং ভাষায় পড়াশোনা , দক্ষতার অপরিসীম পরিচয় দিয়ে নিজের মা , মাটি , ভাষাকে দু'হাত ভরে দিয়ে গেছেন , যারা হতে পারতেন বিশ্বের সাথে আমাদের সত্যিকার মেলবন্ধন ।

হিন্দি নিয়ে তাহলে এত অভিযোগ কেন ?
সোজা কথায় ..
১। গত ৪০ বছরে আমরা সর্বস্তরে প্রচলন করতে ব্যর্থ হয়েছি কোন ভাষা ? ------ বাংলা
২। গত ৪০ বছরে শিক্ষাব্যবস্থায় কোন ভাষা ভুলে যাবার কারণে আমরা বাকি বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে গেছি ক্রমাগতভাবে ? ----- ইংরেজি
৩। গত ৪০ বছরের জাতির অলস সময়গুলো কোন ভাষার দক্ষতা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ? কোন ভাষার দক্ষতা আমাদের সবচেয়ে বেশি বেড়ে যাওয়া সত্তেও আমরা ফলাফলে কেবল শূন্যই পেয়েছি ------- হিন্দি

হিন্দি ভারতীয় মানুষের শেকড় , কিন্তু তাদের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি , বিদেশী ভাষায় তাদের দক্ষতা । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দি কেবল একটা আগ্রাসনেরই নাম ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৪০
৩৫টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×