ইংরেজিতে যার উচ্চারণ ডেঙ্গি কিন্তু বাংলাতে ডেঙ্গু নামেই অধিক পরিচিত। এটি একটি ভাইরাসজনিত জ্বর। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশার নাম এডিস মশা। অন্য ভাইরাস রোগের মতো এ রোগেরও কোনো প্রতিষেধক বা টিকা নেই। ভাইরাল ফিভারের মতো এ রোগও ৭ দিনের মধ্যে আপনাতেই সেরে যায়। তবে এর মুল সমস্যা হচ্ছে-পরবর্তীতে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। সময়মতো সঠিকভাবে মোকাবেলা করা না গেলে রোগীর শারীরিক অবনতি ঘটতে পারে। দেখা দিতে পারে ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী ডেঙ্গু জ্বর।
কীভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গু ভাইরাস সেই মশার দেহে প্রবেশ করে। ভাইরাস বহনকারী সেই এডিস মশা কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গু ভাইরাস তার দেহে ঢুকে পড়ে এবং ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ
চোখে, গায়ে আর কপালে প্রচন্ড ব্যথা হয়। হঠাৎ করেই জ্বর আসে। চোখেও ব্যথা করে। এদিক-সেদিক তাকানো মুশকিল হয়ে পড়ে। দাঁতের মাড়ির পাশাপাশি পায়খানা এবং প্রশ্রাবের সাথে রক্ত পড়ে। পায়খানার রং কালো বা কালচে কালো হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কেও রক্তক্ষরণ হয়। এ সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া উচিত।
ডেঙ্গু হেমারেজিক জ্বর বুঝার উপায়
রক্ত পরীক্ষায় যদি প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যায়, তবে বুঝতে হবে এটি হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণী জ্বর। রোগী অগ্যান হওয়া, শকে চলে যাওয়া, অবসন্নতা, অস্থিরতা, তীব্র পেট ব্যথা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, হাত পা ঠান্ডা হওয়া, অধিক পরিমানে প্রশ্রাব হওয়া- ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেশী রক্তক্ষরণ হলে ‘ফ্রেশফ্রোজেন প্লাজমা’ অথবা প্রয়োজনে পূর্ণ রক্ত পরিসন্চালনের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নেয়া গেলে ডেঙ্গু হেমারেজিক জ্বর সারিয়ে তোলা যায়
রোগীর যতœ
০ রোগীকে প্রচুর পরিমানে তরল খাবার খাওয়াতে হবে
০ প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করাতে হবে
০ প্রশ্রাবের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে
০ জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে বার বার গা মোছাতে হবে
ডেঙ্গু রোগীর রক্তের পরীক্ষা
সত্যি বলতে কী, ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্তনরণের অর্থাৎ জীবানু পৃথককরণের কোনো পরীক্ষা আমাদের এখানে নেই। রোগের লক্ষণ দেখে রক্তে বিশেষ অ্যান্টিবডি উপস্থিতি নির্ণয়ের মাধ্যমে সাধারণত ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়। তবে এটি কোনো নিশ্চিত পরীক্ষা নয়। সাধারণ জ্বর হলে এ পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এটি একটি ব্যয়বহুল পরীক্ষা। জ্বর ১০৩ ডিগ্রির বেশী হলে প্রথমে রক্তের একটি রুটিন টেস্ট করে পে¬টলেট কাউন্ট দেখে নেয়াটা জরুরি। প্লেটলেট কাউন্ট ১ লাখের কম হলে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য বিশেষগ্জ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ বরুন।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা
অধিকাংশ ডেঙ্গু জ্বরই আতংকিত হবার মতো তেমন ভয়াবহ নয়। ৭ দিনের মধ্যেই তা সেরে যায়। শুধু প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমানে পানি, তরল খাবার আর বিশ্রামের। সাথে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল। তবে, রোগীকে ব্যথানাশক হিসেবে এসপিরিন বা ক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ দেয়া যাবে না। এতে রোগীর রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে।
হেমারেজিক বা রক্তক্ষয়ী ডেঙ্গু (যা খুব কমই হয়ে থাকে) বেশি ভয়াবহ। তাই, জ্বরের পাশপাশি রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখ গেলে সাথে সাথেই রোগীকে বিশেষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
হেমারেজিক বা রক্তক্ষয়ী ডেঙ্গু জ্বরে প্লেটলেট, আর ডেঙ্গু শক সিনড্রমে দরকার রক্তরস বা প্লাজমা। এক ব্যাগ অর্থাৎ ২০০ মিলিলিটার প্লেটলেটের জন্য পুরো ৪ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। অবশ্য সেল সেপারেটর মেশিনের সাহায্যে একজন ডোনারের কাছ থেকেই সম পরিমাণ পে¬টলেট সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু সেল সেপারেটর মেশিন বেশি না থাকায় রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজ মেশিনে সাধারণত ৩ ব্যাগ ব্যবহার হরে রক্তের তিন ধরণের কম্পোনেন্ট আলাদা করা হয়ে থাকে। ডেঙ্গু হয়ে গেলে অনেক রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। এক ব্যাগ প্লেটলেটের জন্য ৪ ব্যাগ রক্ত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের করনীয়
০ পরিবেশ সম্পর্কে গণ সচেতনতা তৈরী
০ নিজের ঘর, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা
০ ফুলের টব, পুরোনো ক্যান,পাত্র, গামলা ইত্যাদিতে যাতে ৪/৫ দিন পানি জমতে না দেয়া
০ ছোট আবদ্ধ স্থানে যাতে বৃষ্টির পানি না জমে সে ব্যবস্থা নেয়া
০ আপনার এলাকাজুড়ে বাড়ি বাড়ি মশা মারার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে
০ এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে
০ বাড়ীতে কেউ আক্রান্ত হলে যথাযথ চিকিৎসা করানো
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



