আমার প্রিয় পোস্ট

বিদেশ যাত্রা ৩

০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:০৭

শেয়ারঃ
0 0 0

Click This Link

পাহাড়ের ওপরে ক্যাসিনোর শহর গ্যাংটিং হাইল্যান্ড

সকাল আটটার মধ্যে শান্তনু চলে গেলো সেমিনারে যোগ দিতে। আমি একা একা হোটেলে আর কী করবো ? ক্ষাণিকক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করে সকাল নটার মধ্যে বিছানা ছাড়লাম। ফ্রেশ হয়ে সাড়ে নটা নাগাদ ডাইনিং-এ যেয়ে বিনে পয়সার নাস্তা সেরে নিলাম। দশটায় চলে গেলাম পুডু রায়া বাস স্টেশনে। আমাদের হোটেলের খুব কাছেই। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম গ্যাংটিং যাবার বাস। ৮ টাকা ৫০ পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে বাসের অপেক্ষায় বসে আছি। ৩ টাকা ৫০ পয়সা বাস ভাড়া আর ৫ টাকা হচ্ছে ক্যাবল কারের ভাড়া। ঠিক দশটা ত্রিশ মিনিটে বাস ছাড়লো। বাসের ভেতরটা দারুন চমৎকার। আমার সিটটা জানালার পাশে। আন্ডার গ্রাউন্ড থেকে বাস উঠে এলো মূল রাস্তায়। তারপর শহরের মসৃন পথ ধরে কেবলি ছুটে চলা। মিনিট বিশেক চলার পর শহর ছেড়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় বাস। সাপের মতো এলেবেলে রাস্তা। আমাদের রাঙ্গামাটি বা বান্দরবানের মতো। এক ঘন্টা পরে বাস গিয়ে থামলো গ্যাংটিং স্কাইওয়ে স্টেশন, ঘটংজায়াতে।

লিফটে উঠে এলাম লেভেল ৩। তারপর সামনে দেখলাম সারি সারি কেবল কার। আসছে, আবার লোকজন ওঠার পর চলে যাচ্ছে। আমিও একটাতে উঠে পড়লাম। ক্যাবল কার চলা শুরু করলো। এরপরের ঘটনা ভয়াবহ ! শূণ্যে ভাসছি আমি। পাশ দিয়ে অন্য লাইনে ছুটে চলছে ক্যাবল কার। একবার ওপরে, আরেকবার নিচে...এভাবেই ক্যাবল কার চলছে। মাটি থেকে কমপক্ষে ৬০০০ ফুট ওপরে আমি। ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা ! পেটের নিচের দিকে অন্য রকোম এক অনুভূতি ! বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। কয়েকটা ছবি তুললাম। সামনে তাকিয়ে অবাক ! পেছনে বৃষ্টি, সামনে রোদ। আরেকটু এগিয়ে টাশকি খাবার দশা ! পুরো মেঘের মধ্যে ঢুকে গেছে ক্যাবল কার। মাত্র কয়েক মূহুর্ত্য। আবার ঝকঝকে রোদের মধ্যে এগিয়ে চলছে ক্যাবল কার। প্রিয় মানুষগুলোর মূখ ভেসে উঠলো। এটাই হয়তো শেষ যাত্রা আমার। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, ক্যাবল কারের দরজা খুলে গেছে। তারমানে পৌঁছে গেছি গ্যাংটিং হাইল্যান্ডে এবং জীবিত ! অন্য দুজনকে প্রায় ঠেলে নেমে পড়লাম। ব্যাগে রাখা বোতল থেকে পানি বের করে প্রায় পুরো বোতলই শেষ করলাম।

লিফটে করে লেভেল ১। এ গলি সে গলি হয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে। বিশাল আকারের দুটো হোটেল দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কী সুন্দর ফুলের বাগান ! পরে জানলাম, প্রচুর পর্যটক এই দুই হোটেলে রাতে থাকে। তারমধ্যে বিত্তবান বাংলাদেশিদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এখানে বাচ্চাদের জন্য রয়েছে নানা ধরণের ফ্যান্টাসি আর গেম। বড়দের জন্য ক্যাসিনো। বিভিন্ন গেম দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। নানা দেশের নানান বর্ণের মানুষ ! হাজার হাজার পর্যটক। বিভিন্ন সব রাইড, খেলনা আর পর্যটকদের পাশ কাটিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। ছবি তুলি। এক সময় অজান্তেই চলে আসি ক্যাসিনোর গেটে। লোকজন লাইন ধরে টিকিট কাটছে। ক্যাসিনোতে ঢুকার জন্য না, জুয়া খেলার জন্য। ক্যাসিনোর ভেতরটা দেখার কৌতুহল নিয়ে উঁকি দিলাম। দুপাশ থেকে দুই সিকিউরিটি কঠোর চেহারার সাথে হাসি মুখে জানালো, আমি ভেতরে যেতে পারবো। তবে, আমার হাতের ক্যামেরা এবং কাঁধের ব্যাগটা রেখে যেতে হবে। মনে মনে বললাম, মাফ চাই দোয়াও চাই ! জুয়া খেলার মতো অতো টাকা আমার কাছে নাই, আগ্রহও নাই। বেরিয়ে এলাম ক্যাসিনো এলাকা থেকে। ঘুরতে ঘুরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। খাবারের সন্ধানে ঘুরি। সব দোকানে চায়নিজদের খাবার। এক দোকানে এসে চিকেন বার্গার পেলাম। সাথে এক ক্যান কোক। এই আমার লাঞ্চ। এবার ফেরার পালা...

আবার ক্যাবল কারে করে ২০ মিনিটে চলে এলাম স্কাইওয়ে স্টেশনে। এবার আর আগের মতো ভয় লাগেনি। তারপরও কোথায় যেনো অন্য রকোম এক অনুভূতি ! স্টেশনে নেমে বাসের টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছি। ৩০/৩২ বছরের একটা ছেলে আমার পাশে এসে বসলো। সংকোচ নিয়ে জানতে চাইলো, ভাই আপনি কী বাংলাদেশ থেকে এসেছেন ? অবাক হলাম। ও বুঝলো কী করে ? বললাম- হ্যাঁ। তারপর একথা, সেকথা। ছেলেটির নাম হাসান। পাবনায় বাড়ি। ৭ বছর ধরে এখানে কাজ করছে। একবারও বাড়ি যেতে পারেনি। ৩ ভাই আর ২ বোনের মধ্যে হাসান তৃতীয়। ছোট দুবোনের বিয়ে হয়েছে। বড় দুভাইও বিয়ে করেছে। সবার বিয়েতে সাধ্যমতো টাকা পাঠিয়েছে সে। এর মধ্যে গত বছর বাবা মরে গেছেন...যেতে পারেনি। বলতে গিয়ে হাসানের গলাটা ধরে আসে। চোখ দুটো ভিজে উঠে। আমার বাসও সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে বাসে গিয়ে উঠি। বাস চলতে শুরু করে কুয়ালা লামপুরের পথে। হাসান পলকহীন তাকিয়ে থাকে আমার দিকে...। আমি বাইরে তাকাই। আকাশ থেকে পানি ঝরছে...। এ পানির কিছুটা হয়তো হাসানের কিংবা আমার !!!

 

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:৪৮ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:১৭
ক্যামেরাম্যান বলেছেন: ৪র্থ লাইনের ২য় ছবিটা - এটা কি ক্যাবল কার থেকে তোলা ?
২. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:২১
মেসবাহ য়াযাদ বলেছেন: ৪র্থ লাইনের প্রথম যে ছবিটা, সেখান থেকে তোলা...
৩. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:২২
মুহিব বলেছেন: জমে উঠছে। লিখতে থাকুন বস।
০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:২৮

লেখক বলেছেন: থ্যাংকু

৪. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:২৩
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বলেছেন: কোন নারীর ফটুক নাই ক্যান?
মাইনাচ
০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:৩০

লেখক বলেছেন: আইসপে, আইসপে। নারীর ফটুক আইসপে, কাহানী আইসপে...

৫. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:২৫
মিলটন বলেছেন: হাসানের জন্য খুব খারাপ লাগলো।
০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১১:৩১

লেখক বলেছেন: এ রকোম অন্তত ১০ জন হাসানের কাহিনী শুনেছি আমি...

৭. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ দুপুর ১২:০৩
ম. রহমান বলেছেন: ২০০১ সালে প্রথম যে দিন গ্যাংটিং যাই ঠিক এরকমই অনুভূতি হয়েছিলো...তারপরে ও গিয়েছি বহুবার কিন্তু রাতের গ্যাংটিং টা একটু অন্যরকম...জুয়া খেলার নেশা না থাকলেও নেশায় চেপে ধরে...

আপনি তো চায়না টাউনের আশে পাশেই ছিলেন, তাহলে তো মজার ঘটনা না থেকে পারে না...!!! রাতের বুকিং বিনতাং নিয়ে পর্ব কই...???

''এ পানির কিছুটা হয়তো হাসানের কিংবা আমার !!!''-
০৪ ঠা মে, ২০০৯ দুপুর ১:৩৬

লেখক বলেছেন: চায়না টাউনের পাশে মানেই কি মজার ঘটনা ? হবে হয়তো !!!

৮. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৩
আইরিন সুলতানা বলেছেন: আমি যেবার গেলাম, তখন ফিরতি পথে ক্যাবল কার আটকায় গিয়েছিল ....:( তারপর শূণ্যে ভয়াবহ ভাবে উপরে-নীচে দুলে উঠল ...যাক শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে ফিরেছি...জীবনের প্রথম ক্যাবল কার অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর ছিল সেটা নি:সন্দেহে

ছোটদের-বড়দের কোন রাইডেই চড়া হয়নাই ...

তবে টানেল থেকে দেখেছি..মানে আপনার ৪র্থ লাইনের প্রথম ছবি থেকে দ্বিতীয ছবির তোলার মত আরকি ...

একটা থ্রি-ডি শো দেখেছিলাম...কিছু দূর্দান্ত এক্রোব্যাট শো-ও দেখেছিলাম ...আগে তো টিভিতেই খালি সার্কাস দেখে অভ্যস্ত ছিলাম :(


সিনেমা ছাড়া এখনও ক্যাসিনো দেখা হয়নাই ...আপনি ভেতরে গেলে নিশ্চয়ই জেমস বন্ড স্টাইলে পরিচয় দিতেন....মাই নেম ইজ য়াযাদ...মেসবাহ য়াযাদ....

০৪ ঠা মে, ২০০৯ দুপুর ১:২৯

লেখক বলেছেন: চমৎকার মন্তব্যের জন্য আপনাকে অনেক থ্যাংকু।

৯. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ বিকাল ৫:১৩
জুল ভার্ন বলেছেন: তিন কিস্তি লেখার মধ্যে এই পর্ব সব চাইতে সুন্দর হয়েছে।পাঠকরা পড়ে মুগ্ধ হচ্ছেন। আশা করি বাকি পর্বগুলো আরো আকর্ষনীয় হবে। যথার্থ মন্তব্য লিখতে পারছিনা কিছু টেকনিক্যাল কারনে।
১০. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৬
তানভীর আহমেদ সজীব বলেছেন: গ্যানটিং হাইল্যান্ডের কথা বিভিন্ন জনের কাছে অনেক শুনেছি। আপনার প্রাঞ্জল বর্ণনায় মনে হলো যেনো আপনার সাথেই ঘুরে এলাম...ছবিগুলো দারুন হয়েছে...পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। ইচ্ছে আছে আগামী আগষ্টে একটা ট্যুর দেবার...আপনার অভিজ্ঞতা নি:সন্দেহে কাজে লাগবে...

শেষ প্যারাটা মন খারাপ করে দিল...এরকম আমাদের কত ভাই একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য প্রবাসে অবর্ননীয় কষ্ট করছে...

দারুন লেখাটার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে....এবং অবশ্যই বিশাল +
১১. ০৫ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৬
নাজনীন১ বলেছেন: মেঘের ভিতরের ছবি কই??

একবার আমিও দেখেছি , আমাদের বাসার পূর্বপাশে কালোমেঘ থেকে বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমপাশে ঝলমলে রোদ, সময়টা দুপুরের পরে ছিল।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৮১২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
দেশটাকে অনেক ভালবাসি আমি। ভালবাসি বউ আর আমার ছেলে ‌‌ রোদ্দুর কে।
ঘেন্না করি রাজাকার, কুত্তা আর সাপকে। ঘোরা, আড্ডা আর...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ