আগের পর্ব
পূর্ব প্রকাশের পর:
শিউলি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর অনেক দিন চলে যায়। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ তারপরও স্কুলে যেতে তার খুব ভালো লাগে। সে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করছে।
১৮.
মাসুদ আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ক্লাস শেষ করে চারটায় হুমায়ুন স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়। তাই অনেক সময়ই দুপুরে বাসায় আসা হয় না। যে কারণে তার বাবা তাকে প্রতিদিন বাড়তি কিছু টাকা দেয়। ছেলেটা দুপুরে না খেয়ে থাকবে সেটা বাবার মোটেও ভালো লাগার কথা না। সে এই বাড়তি টাকা দিয়ে বার্গার খেত আর বন্ধুদের সাথে শেয়ার করত। কিন্তু এখন সে আর বার্গার খায় না। এ বাড়তি টাকা দিয়ে যদি কারো উপকার হয় তবে বার্গারে তার অরুচি হবে না কেন?
বলাবাহুল্য ইতিমধ্যে সে সুজন, আরাফাত, নজরুল সবার কাছ থেকে ধার করেছে। কিন্ত সবাইকে তো শোধ করতে হবে। সে কখনো টিউশনি করে নি। একবার করতে চেয়েও বাবার অনিচ্ছার কারণে করেনি। টিউশনি করাতে সে মন্দের কিছু দেখছে না। তাছাড়া বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্র বলে টিউশনি পেতে খুব একটা কষ্ট হবেনা বলে তার বিশ্বাস। বাবার অনিচ্ছার কারণ অবশ্য অন্যখানে। বাবার ধারণা সে টিউশনি করলে পড়ালেখায় সময় দিতে পারবে না।
বাবুল স্যারের 'টিচিং হোম' কোচিং সেন্টারে পড়ানোর জন্য তাকে অনেক আগেই বলা হয়েছিল। এমনকি না বলে তার নামটা কোচিং সেন্টার এর লিফলেটে ছাপানো হয়েছিল। সেটা দেখে রাগ হলেও সে কিছু বলতে পারেনি। কারণ সে একসময় বাবুল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ত। যাইহোক, তিনি যখন বলেছেন সেখানে পড়ালেই মনে হয় ভালো হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। পরের দিনই সে বাবুল স্যারকে ক্লাস নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানায়। ক্লাস প্রতি একশ টাকা করে পাওয়া যাবে। মাস শেষে যা পাবে তার সবই তুলে দেবে শিউলির বাবার হাতে এমনটা ভাবতেই মাসুদের ভাল লাগে।
১৯.
সময় থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে অনেকদিনই গত হয়। শিউলিকে আর ফুল বেঁচতে রাস্তায় যেতে হয়না। সে স্কুলে যাচ্ছে, পড়ালেখা করছে। তার অনেক নতুন নতুন বন্ধুও হয়েছে। চাচা শিউলিকে স্কুলে যেতে দেখে খুব খুশী হয়। তবে এটা মাসুদই সম্ভব করেছে। চাচা মাসুদের কথা ভেবে অবাক না হয়ে পারেন না। রক্তের সম্পর্কের মানুষেরাই স্বার্থপর যে পৃথিবীতে সেখানে এই মাসুদ নিজের ছেলের মত তাদের খোঁজখবর রাখছে। এখনো যে ভালো মানুষরা হারিয়ে যায় নি এটাই তার বড় প্রমান। শিউলির বাবা মা তাকে অনেক পছন্দ করে। তবে সবচেয়ে বেশী পছন্দ শিউলির। মাসুদকে সে ভাই বলেই জানে।
এখন মাসুদের চিন্তা কিভাবে পরিবারটিকে আগের মত দাঁড় করানো যায়। সাহায্য করতে তার মোটেও আপত্তি নেই। তারপরও তার উপর যাতে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে সেটার চিন্তায় সে করছে।
'নতুনপাড়া' এলাকায় তার এক বন্ধু আছে। হাসান। একসাথে ক্রিকেট খেলতে গিয়েই ওদের বন্ধুত্ব। সে একটা চায়ের দোকান চালাতো। এখন ডিশ এন্টেনা'র রমরমা ব্যবসা করছে বলে চায়ের দোকানটা বন্ধ রেখেছে। তার সাথে দেখা করা দরকার। কোনভাবে যদি চায়ের দোকানটা ম্যানেজ করা যায় তাহলে চাচাকে বসিয়ে দেয়া যাবে। এতে চাচা কোন আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না।
কিন্তু এখন সে হাসান হারামজাদা'কে কই পায়। তার সাথে দেখা হয়েছিল সেই কবে।
২০.
গত কিছুদিন পরীক্ষার কারণে সে শিউলিদের খোঁজখবর নিতে পারেনি। যাই হোক, এখন আপাতত পরীক্ষার ঝামেলা শেষ। এদিকে হাসানের সাথে দেখা করে সে দোকানটা ম্যানেজ করতে পেরেছে। দোকানে চেয়ার টেবিল যা লাগে সবই আছে। তারপরও শুরু করতে কিছু অর্থের দরকার।
পরেরদিন সে দেলোয়ারের সাথে দেখা করতে যায়। চিটাগং শপিং মলে ওদের 'নিউ লাভলী টেইলার্স এন্ড ফেব্রিক্স' নামে একটা দোকান আছে। মাঝে মাঝে সে দোকানে বসে। তার কাছ থেকে সব বন্ধুরাই ধার করে। মাসুদ ওর কাছে ধার চাওয়াতে দেলোয়ার খুবই অবাক হয়। সে অবশ্য কিছু বলে নি। সে কিছুদিনের মধ্যেই শোধ করে দেবে এমন আশ্বাস দেয়।
সব কিছুর ঠিক আছে। এখন চাচাকে রাজী করাতে হবে। সেদিনই সে চাচার সাথে দেখা করতে যায়। মাসুদের মুখে এমন কথা শুনে চাচা তার দিকে বেশ কিছুক্ষণ থাকিয়ে থাকেন। চাচা অবশ্যই কিছু করতে চান। ভিক্ষাবৃত্তি তার মোটেও পছন্দ না। খেটে খাওয়ার মধ্যে একটা সুখ আছে। দুর্ঘটনায় চাচার একটা পা অবশ হয়ে যাওয়াতে আগের মত ট্যাক্সী চালাতে পারেন না। চায়ের দোকান করতে তার কোন আপত্তি নেই। তাছাড়া এভাবে তো আর সংসার চালানো যায় না।
২১.
মাসুদ ও হাসানের সহযোগীতায় চাচা চায়ের দোকান শুরু করে দেন। ল্যাবরেটরীতে প্রতিদিন অনেক মানুষই আসেন। কাছে আর কোন দোকান না থাকাতে চাচার দোকান ভালোই চলছে। আস্তে আস্তে সবার সাথে চাচার পরিচয় হচ্ছে। অনেকে মাঝে মাঝে বাকীতেও চা টা খেয়ে যান। সবার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে একটু আধটু বাকী তো দিতেই হবে। চাচা কখনো ভাবেন নি চায়ের দোকান করবেন। কিন্তু এখন তার অনেক ভালো লাগছে। চায়ের দোকান ভালো চলতেছে দেখে চাচা পাশাপাশি মুদির দোকানের টুকিটাকি কিছু আইটেম রাখার চিন্তা করেন।
চাচা এখন আর আগের মত মনমরা হয়ে বসে থাকেন না। যেদিন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন সেদিনই তার জীবনের মোড় পাল্টে যায়। একটি নিছক দুর্ঘটনায় তাকে এবং তার পরিবারকে নিয়ে গিয়েছিল জটিল আবর্তে। সেই জটিলতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তার ছোট্ট মেয়েটিকে কত কষ্টই না করতে হয়েছিল। সে সময়টাতে যেসব চিন্তাভাবনা চাচার মাথায় ছটপট করত সেগুলো এখন অন্য চেহারা নিয়েছে। সেসব চিন্তা এখন আর করতে চান না।
আস্তে আস্তে চাচার আর্থিক স্বচ্ছলতাও আসতে শুরু করে।
চাচা আগের মত দুই রুমের একটা ভাড়া বাসায় চলে যাবার কথা চিন্তা করছেন। তবে মাসুদের সাথে কথা বলেই উঠবেন। মাসুদকে ছাড়া চাচা এখন কোন কিছুই চিন্তাই করতে পারেন না। অথচ এই ছেলেকে যেদিন প্রথম দেখেছেন সেদিন কথাই বলতে চান নি। এখন পর্যন্ত মাসুদের বাবা মার সাথে তার কথা হয়নি।
২২.
আজ মাসুদ বেশ কিছুদিন পরেই চাচার সাথে দেখা করতে এসেছে। সামনে তার এইচ.এস.সি'র পরীক্ষা। তাই পড়ালেখার চাপে এদিকে আসতে পারে না। মাসুদ আসার পরে চাচা তার বাবা মার কথা জিগ্গেস করেন। চাচা ওদের বাসায় যাবার কথা বলেন।
মাসুদ হেসে বলে 'চাচা আপনি আমার বাসায় যেকোন সময় যেতে পারেন।'
তারপর সে চাচী ও শিউলির খোঁজখবর নেয়। আলাপচারিতার ফাঁকে চাচা বাসায় উঠার কথাটা বলেন।
মাসুদ শুনে অনেক খুশী হয়।
এরপর মাসুদ নিজেই 'নতুনপাড়া' এলাকার কাছেই দেখে ছোট্ট একটা বাসা ঠিক করে দেয়।
মাসুদ বাসায় ফিরে যাওয়ার পথে স্পষ্ট চোখ তুলে সন্ধ্যার দিকে, আর ভাবে কতদিন অপেক্ষার পরে আজ আকাশের থেকে শান্তি ঝরে। অবসাদ নেই আর শূন্যের ভিতরে।
চলবে.....
(আগামী পর্বেই এই অধমের লেখটি শেষ হবে বলে আশা রাখছি। যারা এই লেখাটি প্রথম পর্ব থেকে পড়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন তাদের কাছে কৃতগ্গতা রইল। )
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৮ ভোর ৬:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



