পূর্ব প্রকাশের পর:
৪.
পুলিশ মাসুদকে রীতিমত জেরা করতে শুরু করে। সে আগে কখনো এরকম অবস্থায় পড়েনি। তাই কিছুটা নার্ভাস। প্রচন্ড শীতের মধ্যেও সে ঘামছে। সে ইতিমধ্যে তাদের বেশ কবার বলেছে মেয়েটাকে সে চেনেনা। যত যাই বলুক পুলিশ বেটারা তাকে কিছুতেই এখন বাসায় যেতে দিবে না। এমতাবস্থায় তার মোবাইল বেজে উঠে।
: কিরে দোস্ত তুই কই?
: দোস্ত আমি হসপিটালে আছি। অনেক প্যাঁচালের মধ্যে আছি। বাসায় এসে বলব বলে সে ফোন রেখে দেয়।
সাধারনত সে দেরী করে বাসায় ফেরে না। তাই আজকে অনেক দেরী হয়ে যাওয়ায় রাসেল ফোন করেছে।
পরিশেষে পাক্কা দুই ঘন্টা পর পুলিশ বেটাদের কৃপা হল। তবে, কাজের এড্রেস, বাসার এড্রেস নিয়ে ইউনিভার্সিটির আইডি রেখে তারা তাকে বাসায় যেতে দেয়।
৫.
পরেরদিন সকালে মোবাইলের ট্যা ট্যা আওয়াজ শুনে মাসুদের ঘুম ভাঙ্গে। হাসপাতাল থেকে কেউ একজন কল করে জানায় মেয়েটা এখন কিছুটা সুস্থ্য। সে তার সাথে কথা বলতে চাই। সে এক ঘন্টার মধ্যে সেখানে পৌছুবে বলে ফোন রেখে দেয়। তারপর একলাফে বিছানা থেকে উঠে কাপড় চেন্জ করে দৌড় দেয়।
মেয়েটি ইতিমধ্যে পুলিশকে জানিয়েছে গতরাতে কি হয়েছিল। তাই পুলিশ মাসুদকে দেখামাত্র 'উই আর স্যরি' এবং হেল্প করার জন্য 'থ্যাংকস' বলে চলে যায়। তারপর তার (ক্রিস্টিনা) সাথে সে আলাপ শুরু করে। আগের রাতের ঘটনার জন্য সে মাসুদের কাছে কৃতগ্গতা প্রকাশ করে। সেদিনের মত মেয়েটি সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরে যায়। কিন্তু মেয়েটি অচেতন হয়ে কেন পড়েছিল সেটা মাসুদের অজানা থেকে যায়। কৃতগ্গতা স্বরুপ মেয়েটি মাসুদের মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নিয়েছিল।
৬.
এভাবে অনেক দিন চলে যায়। ক্রিস্টিনার সাথে সে মাঝে মাঝে দেখা করা শুরু করে। আস্তে আস্তে ওদের ঘনিষ্টতা বাড়ে। ওরা দুজন দুজনের ভালো বন্ধু হয়ে উঠে। তারপর কোন একদিন সে জানতে পারে মেয়েটি মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকতে থাকতে সে নিজেই মাদকাসক্ত হয়ে যায়। এই আসক্তির কারণে সে ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ার থেকে ড্রপ আউট করে। ফার্স্ট ইয়ারে তার ওভারঅল রেজাল্ট ছিল ৭০%। বাবা মার কাছ থেকে আলাদা থাকে বলে তারা তেমন কিছু জানেও না। মেয়েটির কথা শুনে মাসুদের খুব খারাপ লাগে। মাদকাসক্তির কারণে ওর মত মেধাবী তরুনীর ক্যারিয়ার ধ্বংসের পথে কিংবা ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই মাদকাসক্তির কারণে বাংলাদেশের কত মেধাবী তরুন তরুনী অকালে ঝরে যাচ্ছে। অন্ধকার পৃথিবীতে তলিয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটা দেখতে পরীর মত। সুন্দর করে কথাও বলতে পারে। মাদকাসক্ত না হলে হয়ত এতদিনে সে কোন বড় কোম্পানীর সিইও হত।
৭.
একদিন ওরা কফি খেতে খেতে অনেক কথা বলে। অনেক কথার ফাঁকে সে তাকে মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললে সে বুঝতে পারে মেয়েটি নিজেও আসক্তি কাটিয়ে উঠতে চাচ্ছে। সে চাই ইউনিভার্সিটিতে ফিরে গিয়ে ডিগ্রীটা কমপ্লিট করতে। কিন্তু সে পারছে না। তার বয়ফ্রেন্ডের কারণে পারছে না। যার কারণে সে আসক্ত সে কিভাবে চাইতে পারে। এবার মাসুদ অবাক না হয়ে পারে না। বড় অদ্ভুদ এই পৃথিবী। হায়রে মাদক ! মানুষ কেন যে মাদকের নেশায় পতিত হয়। সে কখনো এসব ছেঁকে দেখেনি। বাসায় অন্য বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ মাঝে সাজে ভদকা, জেডি এসব খায়। এসব ব্যাপারে তার কখনো কৌতুহল হয় নি। টুটুল আবার সপ্তাহে একদিন রুটিন করে গাঁজা সেবন করে। এটা দেখে সে তাকে এসব ছাঁইপাশ খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিল। কে শোনে কার কথা। তার কথায় টুটুল বলেছিল 'ইটস এ পার্ট অফ লাইফ মাইট'। এটা শোনার পর থেকে মাসুদ তাকে আর কিছু বলেনি। পরে সে(টুটুল) নিজেই বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
যাইহোক, মানুষের মধ্যে সদিচ্ছা থাকলে সহযোগীতা করার প্রশ্ন আসে। এই মেয়েটি সত্যিই মাদক থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছে। তাই সে তাকে কিভাবে হেল্প করা যায় সেটা ভাবছে। কারো অন্ধকার জীবন দেখতে মাসুদের মোটেও ভালো লাগে না। তো একদিন সে মেয়েটিকে রিহ্যাবে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। সেদিন ওর কথা শুনে সে হ্যা কিংবা না কোনটাই বলেনি।
তারপর বেশ কিছুদিন ভেবে চিন্তে সে রিহ্যাবে যাওয়ার জন্য রাজী হয়। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে রিহ্যাবে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলে নাকি ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
৮.
দীর্ঘ ছয় মাস রিহ্যাবে থেকে সে সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অন্ধকার জীবনে থেকে বহুদিন সে আলোর দেখা পায় নি। এখন সে জীবন থেকে সে মুক্ত। এই সময়টাতে মাসুদ তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে। যে কারণে মাসুদকে সে খুবই পছন্দ করে। সে ভাবতেও পারেনি একজন বিদেশী হয়ে মাসুদ তাকে এতটুকু সাপোর্ট দেবে। মাসুদকে সে ভালবেসে ফেলে। একদিন সে বিষয়টি মাসুদকে বললে মাসুদ এড়িয়ে যায়।
তারপর কোন একদিন সে তার ভালোবাসার মানুষ নওশীনের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। পরে এ নিয়ে আর কখনো কথা হয় নি। সে নিজেই এখন মাদকাসক্ত তরুণ তরুনীদের সহযোগীতা করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
লেখকের কথা: এই গল্পটিতে কিছু সত্যের সাথে কিছু কল্পনাকে একত্রে রুপ দিয়েছি। আমি অনেকের মত ভালো লিখতে পারি না। তারপরও যে বিষয়টি নিয়ে লিখেছি সেটা পাঠকদের অনুধাবন করাতে পারলে আমার লেখার সার্থকতা। বাংলাদেশে আনুমানিক ১.৭ মিলিয়ন মাদকাসক্ত আছে (গুগলে সার্চ করে তথ্যটি এখানে পেয়েছি)। যাদের বেশীর ভাগই তরুণ। যারা জীবনকে উপভোগ করার আগেই অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। এদের কেউ আমাদের ভাইবোন, বন্ধু কিংবা পরিচিত। এদের মধ্য থেকে কেউ হতে পারে কবি, লেখক, সায়েন্টিষ্ট, আমাদের দেশের ভবিষ্যত। অনেকের সাথে কথা বললে বুঝতে পারবেন তারা এ জীবন থেকে মুক্তি পেতে চাই। কিন্তু সহযোগীতার অভাবে সেটা পারছে না। আমরা ওদের শুধু ঘৃণা না করে ভাই কিংবা বন্ধু হয়ে সহযোগীতার হাত কি বাড়িয়ে দিতে পারি না? অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরাতে পারি না? একজন মায়ের সুবোধ বালক কিংবা স্নেহের সন্তানকে তার বুকে ফিরিয়ে দিতে কি পারি না? একজন বাবা যিনি তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন লালন করেছিলেন সেটা কি ফিরিয়ে দিতে পারি না?
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



