আমার একটি অসুখ আছে। যতটুকু মনে পড়ে ছেলেবেলা থেকেই আমি এই অসুখে অসু্স্থ। আজ আমি আপনাদের 'স্বপ্ন' নামের সেই অসুখের কথা বলব। যে অসুখটি এখনো সারেনি। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে বরং এটি একটি স্বপ্ন থেকে অনেকগুলো স্বপ্নে সংক্রমিত হচ্ছে।
অনেক ছোটবেলা থেকেই আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যেস। দুঃখী মানুষদের নিয়ে কোন লেখা চোখে পড়লে কষ্টে মন খারাপ হতো। আর্থিক অসচ্ছলতার সাথে যুদ্ধ করে পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হওয়া পরীক্ষার্থীদের খবরে জলে চোখ ভিজে যেত। কলেজে উঠার পরে আমি মেধাবী গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি ফান্ড গড়ে তুলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। পাড়ার কিছু বন্ধুদের সংগঠিত ও করেছিলাম। সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছিলাম 'ষ্টুডেন্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল'। কোচিং সেন্টার, লাইব্রেরী, বিনামূল্যে বই বিতরণ দিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুন্দর শুরু ও হয়েছিল। কিন্তু সেটা বেশিদিন ধরে রাখতে পারি নি। তবে, হ্যা এটা এখনো বুকে ধারণ করি।
আমার একটিমাত্র বোন। যাকে নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখেছি। যে নিজেও বড় ভাইয়ের মতো স্বপ্ন নামের অসুখে আক্রান্ত। ও যখন ক্লাস সেভেন এ পড়ে আমার কাছ থেকেই স্বপ্নের ভাইরাস ওকে পেয়ে বসে। আমাদের এলাকায় সিরাজ ডাক্তার নামের এক ভদ্রলোক বিনামূল্যে গরীব মানুষদের চিকিৎসা সেবা দিতেন। এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগত। এতো ভালো লাগত যে, ভাবতাম ইস আমি যদি সেই মানুষটি হতে পারতাম। তখন থেকে আমার বোনকে মেডিক্যাল পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে শুরু করি। একদিন সে আমাকে বলে ' ভাইয়া আমি তো মেয়ে, আমি ডাক্তার হয়ে কি করব'। সেদিন আমি তাকে বলেছিলাম তুমি ডাক্তার হয়ে গরীব মানুষদের সেবা করছ ভাবতে কেমন লাগবে তোমার? এ কথা বলার পরে সেদিন আমি স্পষ্ট দেখেছি, বিষয়টি এই ছোট্ট মানুষটির কোমল হৃদয়ে খুব নাড়া দিয়েছিল। সেই থেকে শুরু। ভাইয়ের কথায় সাঁয় দিয়ে সে সিরিয়াস হয়ে পড়ালেখা শুরু করে। আমিও স্বপ্ন দেখতে থাকি একদিন সে ডাক্তার হয়ে বের হবে। তারপর ভাইবোন মিলে একটি ক্লিনিক গড়ে তুলবো। যেখানে বিনামূল্যে গরীব মানুষের চিকিৎসা হবে। এবারের এসএসসিতে শুধুমাত্র বাংলা দ্বিতীয়ের জন্য বোনের গোল্ডেন এ+ প্লাস পাওয়া হয়নি। কিন্তু তখনও বুঝতে পারেনি স্বপ্নটি অধরা হয়ে দুরে সরে যাচ্ছে। গতকাল বাসায় ফোন করে জানতে পারি যে দুটি কলেজে সে ভর্তি হতে চেয়েছিল সে দুটোর প্রাথমিক তালিকায় আসে নি। অভিমান করে আর পড়বে না বলে বইখাতা ও নাকি ছিড়ে ফেলেছে। অথচ দুদিন আগেও সে ছিল হাসিখুশী, প্রাণবন্ত। এই প্রথমবারের মতো সে তার বড় ভাইটির সাথে কথা বলেনি। হ্যালো পর্যন্ত বলেনি। যে ভাইকে সে অনেক অনেক ভালোবাসে। যে ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য সে বাবা মার সাথে কাড়াকাড়ি করে ফোন হাতে নেয়। এটা শুনার পর বুকের মধ্যে এক ধরণের ব্যথা অনুভব করলাম। আমার কান্না পাচ্ছে সেটা আমার মা বুঝতে পারার আগে ফোন রেখে দিই। সব কিছু কেমন যেন অস্পষ্ট মনে হচ্ছে। কষ্টকর অনেক কথায় বুকের গভীরে ভারী হতে থাকে। আমার কোন কিছু ভালো লাগছে না। একমাত্র বোনকে নাকি নিজেকে সান্তনা দিবো সেটা বুঝতে পারছি না। জীবনের কাছে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে। যে বোনকে সারাটি জীবন আকাশের চাঁদ পেড়ে দেবো বলে এসেছি অথচ সেই আমি এখন কিছু করতে পারছি না। বুকের বাঁ পাশে অস্ফুট কান্নার ব্যথায় চোখে রাতজাগা ক্লান্তি নিয়েও ঘুমুতে পারছি না। কতোটা বিষণ্ণ হলে এতো কথা নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকি। ভাবি, এইতো জীবন! ব্যথিত আমি বসে থাকি নগ্ন অন্ধকারে। বিধাতাকে বলি, আমাকে আরো ব্যথিত হতে দাও। আমাকে আরো মাতাল হতে দাও। এবার আমাকে স্বপ্ন নামের অসুখ থেকে মুক্তি দাও।
(গতকালের লেখা। লেখাটি পড়ে কারো মন খারাপ হলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আসলে বোনের জন্য ভীষণ মন খারাপ। কাউকে বলতেও পারছি না। লিখে কিংবা আপনাদের সাথে শেয়ার করে যদি কিছুটা মন ভালো হয় সেই উদ্দেশ্যে এই পোষ্টের অবতারণা।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

