somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদেশে ঈদ এবং কিছু ঝাপসা স্মৃতি........

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈদ আসতে খুব বেশিদিন নেই। না এটা নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেই। ছাব্বিশে এসে ঈদের আনন্দ বারো-তেরো বছরের তরুণের মত হয় না কিংবা তেমন একটা গুরুত্ব বহন করেনা। একটা বয়সে সবকিছুর আলাদা গুরুত্ব থাকে। তারপরও ঈদ নিয়ে কেন জানি কিছু লিখতে ইচ্ছে হলো।

এখানে ঈদ হবে খুব সম্ভবত বুধবার। যদি ঊনত্রিশে হয় তাইলে মঙ্গলবার। বুধবারে হলেই বাঁচি। মঙ্গলবার একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে, যেটা মোটেও মিস করা যাবে না। এখানের ঈদে আহামরি কিছু করি না। তারপরও ঈদ তো ঈদই। গত ছয়টি ঈদে কি করেছি একটু ভেবে দেখি।

এক.
২০০২: লন্ডনে আসার তিন মাস পরেই ঈদ। যে বাসায় উঠেছিলাম সেখানে দুজন বড় ভাই থাকতেন। উনারা প্রায় শখানেক মানুষকে
দাওয়াত করেছিলেন যার মধ্যে কমপক্ষে আশিজন এসেছিল। মুন্নাভাই কত ভালো রান্না করতে পারেন সেদিন দেখেছি। এখানে আসার পর এখন পর্যন্ত ওটাই আমার দেখা সবচে বড় গেট টুগেদার ছিল। আমি অবশ্য মন খারাপ করে রুমের এক কোণায় বসে গান শুনছিলাম। চোখের পানি ফেলছিলাম কিনা মনে নেই তবে,হ্যা ঈদের দিন যখন দেশে ফোন করেছিলাম, ওপাশ থেকে আমার পিচ্চি বোনটা 'ভাইয়া তুমি কি কিনেছ' জিগেস করলে আমি কেঁদেছি। এখনো মনে আছে পিচ্চিটা ওপাশ থেকে বারবার বলছিল' ভাইয়া তুমি কথা বলছ না কেন, কি হয়েছে?'

দুই.
২০০৩: ঈদের দিন সবাই কাজ থেকে অগ্রিম ছুটি নিয়ে রেখেছিলাম। সকালে নামাজ শেষে বাসায় এসে স্পেশাল কিছু রান্না করতে ব্যস্ত ছিলাম। তারপর বন্ধুদের নিয়ে খেয়ে দেয়ে বিকেলে 'বলিইন' এ গিয়ে হিন্দী সিনেমা 'বীর-জারা' দেখেছিলাম। পরেরদিন ঈদের আমেজ ধরে রাখতেই বন্ধুরা প্রায় পনেরজন মিলে অক্সফোর্ড ট্রিপে গিয়ে অনেক মজা করেছিলাম।

তিন.
২০০৪: ঈদের দিন ঘুম থেকে উঠতে উঠতে নামাজ শেষ। সেদিন মন মেজাজ খুব খারাপ হয়েছিল। বাসায় আমরা পাঁচজন থাকতাম। কারো নামাজ পড়তে যাওয়া হয় নি। মনে আছে সেবার অন্যান্যবারের মতো কাউকে 'ঈদ মোবারক' লিখে ম্যাসেজ পাঠানো হয় নি। বাসায় শুয়ে বসে কাটিয়ে দিয়েছি পুরো একটা দিন। পরেরদিন যথারীতি ক্লাস করেছি।

চার.
২০০৫: ঈদের আগের দিন ডিনার সেরে সবাই তাস খেলতে বসে রাত পার করে দিয়েছিলাম। সকাল আটটার দিকে ইষ্ট লন্ডন মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে বাসায় এসে সবাই যে যার রুমে সন্ধ্যানাগাদ একটানা ঘুমিয়ে ছিলাম। তারপর রাতে সবাই মিলে কি যেন একটা ম্যুভি দেখে ঈদকে বিদায় জানাই।

পাঁচ.
২০০৬: যতটুকু মনে আছে সকালে নামাজ শেষে ক্লাসে যেতে হয়েছিল। বিকেলে এসে তেমন কিছু করিনি। ঈদে কিছু না করাতে ধীরে ধীরে অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছি।

ছয়.
২০০৭: ঈদের দিন নামাজ শেষে শপিং করেছিলাম বাসায় এসে ভালো কিছু রান্না করব ভেবে। বাসায় এসে দু ঘন্টার জন্য শুয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর কেঁপে কেঁপে ঘুম ভাঙে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল। পাশের রুমে বাবর ভাই ছিলেন। যতটুকু মনে আছে বাবর ভাইকে কল দিয়ে বলেছিলাম 'আমাকে বাঁচান'। বাবার ভাই রুমে এসে দেখে আমি জ্বরে কাঁপছি। কোন কথা বলতে পারছিলাম না। কেন্ট থেকে বেড়াতে আসা রাসেল আমার মাথায় জ্বরপট্টি দিতে ব্যস্ত ছিল। ট্যাবলেট খেয়ে রাসেল আর বাবর ভাইয়ের সেবায় রাতের দিকে আমি বিছানা থেকে উঠতে সক্ষম হই। ঈদের পরেরদিন 'ড্রিম থিয়েটার' এর কনসার্ট দেখতে অনেক আগে টিকেট কিনেছিলাম। কনসার্টে যেতে পারব কিনা এটা নিয়ে বন্ধুরা সংশয়ে ছিল। পরেরদিন বিকেলে তিন-চারটা প্যারাসিটামল খেয়ে কনসার্টে গিয়ে বন্ধুদের সংশয় দূর করি।
এখানে আসার পর এখন পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে আমার ঈদ। এবার ও তেমনি কাটবে।

কিছু ঝাপসা স্মৃতি:

ঈদ নিয়ে এমন কিছু স্মৃতি আছে যা বারবার মনে করতে ইচ্ছে করে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেসব সহজ সরল বালকের দিনগুলোতে।
ছোট থাকতে ঈদের শপিং এ যাওয়াতে অনেক আনন্দ পেতাম। প্রথম রোযা শুরু হওয়ার পর থেকেই দিন গুণতাম, কখন বিশটার মতো হবে কিংবা কবে বাবা ঈদের শপিং এ নিয়ে যাবে। ছেলেদের নিয়ে ঈদের শপিং করতে যাবার সময় তার কাছে খুব একটা ছিল না বললেই চলে, মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তাদের সাধারণত যা হয়। রোযা আসলে অন্যান্য অনেক কাজের মত আমাদের শপিং এ নিয়ে যাবার দায়িত্ব ছিল ছোটমামার কাঁধে। মনে আছে বাবা অনেক সময় সামনের দোকান থেকে ঈদের কাপড় কিনে দিতে চাইতেন। এটা কখনো মেনে নিতে পারতাম না, খুব মন খারাপ হত। যদিও ঈদের দিন সব ভুলে যেতাম। পাড়ার কিংবা স্কুলের সব বন্ধুরা যখন নিউমার্কেট, মিমিসুপার মার্কেট, রেয়াজুদ্দিন বাজার এ গিয়ে ঈদের শপিং করে আসত, সামনের দোকান থেকে কেনাটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হতো না, গরিব হয়ে গেছি মনে হত। মামার সাথে যেতে পারলে আমরা খুশিই হতাম। কারণ নিজের পছন্দ মতো যেকোন কিছু কিনতে পারতাম। ছোট মামা এমন ছিলেন যে কখনো তিনি বকেছেন কিনা মনে করতে পারছি না। সবসময় আমাদের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। অবশ্য এটার কারণে তার নিজের পকেটের বারোটা বেজে যেত।

আমি ছোট থাকতে অনেক গাধা টাইপের ছিলাম,এখনো মনে হয় আছি। জীবনের এতোটা বছর গেল অনেকের মত স্বার্থপর হতে পারিনি। স্বার্থপর না হলে নাকি বড় হওয়া যায় না, কিছু স্বার্থপর বন্ধুরা বলে। তো আমি নাকি অনেক বড় হওয়ার পর ও টাকা চিনতাম না। ছোট থাকতে বাবা যখন সাইকেল নিয়ে কর্তার দায়িত্ব পালনে বের হতেন, আমি ভ্যা করে কাঁদতাম। বাবা আমাকে তার পকেট থেকে পুরনো কোন কিছুর রশিদ বের করে দিতেন। আমি সেই কাগজকে টাকা ভেবে খুশি হয়ে যেতাম। মা এখনো মাঝে মাঝে বলে আমি নাকি অনেক বড় হওয়ার পর ও টাকা চিনতাম না। মাকে বলি টাকা না চিনলেই মনে হয় ভালো হত, বাবার পকেটের বারোটা বাজত না।

হাইস্কুলে উঠার পর কোন এক ঈদে জাম্প কেডস কিনতে চেয়েছিলাম, যেটার পিছন দিকে বাতি ছিল। অনেকদিন ধরে বাসায় বলে আসছি আমি বাতিওয়ালা জুতো কিনব। যেদিন ঈদের শপিং এ গিয়েছিলাম সাথে ছিল আমার ভাই। বাবা আমাকে বাতিওয়ালা জুতো কিনে না দিয়ে কিনে দিয়েছেন আমার ভাইকে। এটাতে আমার অনেক মন খারাপ হয়েছিল। যতটুকু মনে আছে আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলাম। পরে বাবা আমাকে বুঝালেন আমি তো অনেক বড় হয়ে গেছি তাই এবার আমার ভাইকে কিনে দিয়েছেন, পরেরবার আমাকে কিনে দিবেন। আমি কিনলে যদি আমার ভাই কিনতে না পারে এটা ভেবে আর মন খারাপ করিনি।
ঈদের শপিং শেষে বাসায় আসামাত্র চাচাতো ভাইবোনরা কেউ দেখে ফেলার আগেই সবকিছু লুকিয়ে ফেলতাম। ঈদের জামা ঈদের আগে দেখে ফেলবে এমন তো হয় না।

ঈদের আগেরদিন 'চাঁদ দেখা গেছে' এমন ঘোষণা পাওয়ার পর মার সাথে ঘর গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে যেতাম। সকাল হতেই কার আগে কে গোসলে যাবে এ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি লেগে যেত। নতুন সাবানের সুবাস আগে পেতে ভাইদের মধ্যে কাড়াকাড়ি কে না করেছে।
নামাজ শেষে বাসায় ফিরে বাবা মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করে চকচকে টাকার নতুন নোট পকেটে চালান দিতাম, ছোটভাই দেখার আগেই। তারপর সব চাচাতো ভাইবোন মিলে সবার আত্নীয়স্বজনদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। দিনের শেষে যখন বাসায় আসতাম ঈদ শেষ হয়ে গেল ভেবে খুব খারাপ লাগত। তখন ভাবতাম ইশ, প্রতিটি দিনই যদি ঈদ হত, কি মজাই না হত।

ছোটবেলার ঈদ নিয়ে লিখে শেষ করা যায় না। যত বেশি বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি, তত বেশি ইচ্ছে করে সেসব দিনে ফিরে যেতে। যখন একটা ঈদের জন্য পুরোটা বছর অধীর আগ্রহে দিন গুণতাম। মাঝে মাঝে ভাবি মানুষকে বড় হতে হয় কেন? শুধু শুধু সোনার হরিণের পেছনে পাগলের মত ছুটতে হত না।

সবাইকে ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা। ভালো থাকুন সবাই। ঈদ মোবারক।

(ছবিটি গুগল থেকে নেয়া।)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২১
৩৭টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×