somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিছু একটা অনুপস্থিত

২৩ শে জুন, ২০০৯ রাত ১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



হায় সুইটি... রিশিতা এভাবেই সম্বোধিত হয় তার ভার্সিটিতে। সব ছেলেরা তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মনে হয় যেনো হাজার মাইল হেটে বেড়ানো ক্লান্ত পথিকের দল মরুতে পানির সন্ধান পেয়েছে। পোষাকে আষকেও বেশ স্মার্ট বলা চলে। আর স্মার্টনেস মানেই তো ব্রিটনী কি পড়ছে এঞ্জোলিনা জলি কি পড়ছে তার অনুকরন করা। আর ছেলে মানে ব্যাকহাম অথবা ফিফটি সেন্ট টাইপের চাল চলন। এদেরকেই তার বেশ পছন্দ। চুলগুলো অবশ্যই স্পাইক করা থাকতে হবে অথবা আউলা ঝাউলা না থাকলে কি আর এ যুগের ছেলে? সামনের গুলো ছোট করে ছাটা আর পেছনের গুলো বেশ লম্বা। জেলতো লাগাতেই হবে। আজকাল অবশ্য অনেকেই কিপ্টেমি করে শর্ষে তেল বেশী করে মাখিয়ে বেশ জেল জেল একটা ভাব আনার চেষ্টা করে। তবে রিশিতার নাক অনেক পাওয়ার ফুল বলতে হয়। কারন এতো এতো ফ্রাইড খাবার খাওয়ার পরও সে বেশ বুঝতে পারে কোনটা তেল আর কোনটা জেল।

তেল জেল বাদ, এবার আসল কথায় আসি। ছোট বেলা থেকেই এক রাজপুত্রের স্বপ্ন দেখতো। কারন ছোট বেলা থেকে রুপকথার গল্প এতো শুনেছে যে তার মনে হয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তরে প্রান্তরে তার জন্য প্রিন্সেরা অপেক্ষা করছে। নিজেকে আপন রাজ্যের প্রিন্সেস ভাবতো।

ক্লাশের বইগুলো ভরপুর প্রেমের গল্প দিয়ে। সুতরাং তার ভাবনার ডানা এ জগত ছাড়া অন্য কোনো জগতে উড়তে শিখেনি। পড়েছে ইংলিশ মিডিয়ামে। জ্ঞান হয়ার শুরুতেই ক্লাশে পড়িয়েছে প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস, গ্রেট এক্সপেক্টেশন, ডেভিড কপারফিল্ড। সুতরাং মাথার ঘিলু গুলো ওই ধাচেই বেড়ে উঠেছে। ক্লাশে আলোচনা হতো রঙ্গীন সেলিব্রিটিদের নখ থেকে কানের ভেতোরের পাতলা পর্দা পর্যন্ত। প্রত্যেকেরই সর্বচ্চ প্রচেষ্টা কিভাবে ওদের হুবহু অনুকরন করা যায়।

মাঝে মাঝে ভাবে ইশ!!! প্রিয়াংকা চোপড়া হয়ে যদি জন্ম নিতাম। সাড়া বিশ্ব আমাকে নিয়ে মেতে থাকতো। ওম শান্তি ওম দেখে আর শাহরুখের সাথে নিজের নাচের দৃশ্য কল্পনা করে নিজের অজান্তেই হেসে উঠে। অথবা ভাবে ঐশ্বরিয়ার যায়গায় নিজেকে। নিজেকে মিশিয়ে দেয় কল্পনার মহা স্রোতে। আবার ভাবে তাদের গাড়ীর চেয়ে দামী গাড়ি কারা ইউজ করে? ক্লাশমেট সাবরিনা আসে BMW নিয়ে। আব্বু অবশ্য নিজে মার্সিডিজ ইউজ করে। ও যায় এলিয়নে। নাহ... আমাকেও মার্সিডিজ কিনে দিতে হবে। আমার একটা পেষ্ট্রিজ আছেনা? রাত তিনটা... তাতে কি? আব্বুকে এখনই বলতে হবে...

তবু মাঝে মাঝে পৃথিবীটা অচেনা মনে হয়। মনে হয় কি যেনো একটা অনুপস্থিত। কিন্তু সেই অনুপস্থিতি শুধু অনুভবই করা সম্ভব। নির্ণয় করা যায়না। খোলা পাথুরে বারান্দার ঠান্ডা মর্মরে দাড়িয়ে অনেক দিন সন্ধ্যার আকাশে তাকিয়ে অস্থির হয়ে খুজেছে। কোনো একটা কিছু। কিন্তু আকাশ কোনো জবাব ছাড়াই অন্ধকারে ডুবে যায়।

আবদার ধরার বয়স এখনো পেড়িয়ে যায়নি। ছোট মামা যতই বলুকঃ একটু বাস্তব পৃথিবীকে চেনার চেষ্টা করো। কে শোনে কার কথা? আজ এটা কিনে দিতে হবে কাল ওটা। টাকার নোট গুলো যেনো ময়লা পানি। আর বাবাও কোতো মহান। উদার হাতে বুড়িগঙ্গার পানিতে যেভাবে ক্যমিকেল নিসৃত হয় সেভাবেই ঐ টাকা নামক ময়লা পানি তার আদুরে মেয়ের হাতে ঢেলে দেয়। যারা টাকার উপর বড় হয় তারা ভবিষ্যত সম্পর্কে খুব কমই ভাবে।

আজকে বিকেলেই সবাই মিলে ধরলো বুমার্সে খেতে যাবে। আর বিলের ব্যাপারটা অবশ্যই রিশিত সামলাবে। যেভাবে সে দক্ষ হাতে প্রতিবার সামলে থাকে। আসিফ ওদের সাথেই পড়ে। বেশ স্মার্ট একটা ছেলে। সবাই ওকে কম বেশী ভালোবাসে। কমবেশী এজন্য যে সবার ভালোবাসার পরিমানটা কখনোই এক থাকেনা। তাকে বললো আজকে বুমার্সে খাবো চল... আসিফ ক্যমোন অসামাজিক। ও সরাসরি না বলে দিলো। কারন জানতে চাইলে বললো সে দামী খাবার খায় না। কি এক আজিব চিজ রে ভাই? তোমাকে তো বিল দিতে হবেনা। তবুও সে খাবেনা। শুধু খাবেনা বলেই খ্যান্ত দেয় নি... এ বিষয়ে লম্বা একটা বক্তৃতা দিয়ে দিলো।

সাড়া বিশ্বে 102 কোটি মানুষ না খেয়ে থাকে। কেনো জানিস? আমাদের কারনে। আমরা যারা খাবার খাইনা খাবার নিয়ে খেলা করি সেই সব মহা পুরুষ আর নারীদের জন্য। আর আমরা দোষ দেই স্রষ্টাকে। তিনিতো পরিমান মতো খাবার পাঠান। আমরাইতো তা পরিবেশন করতে গিয়ে দূর্নীতি করি। তোরাকি মনে করিস খালি সূদ আর ঘুষ খেলেই দূর্নীতি হয়ে যায়?... ক্ষুধা কি জিনিস জানিস? জানবি কিভাবে? তোদেরকে তো কোনোদিন উপোস থাকতে হয়নি। যদি চেয়েছিস স্যন্ডুইচ পেয়েছিস পিত্জা। চেয়েছিস ভাত পেয়েছিস ফ্রাইড রাইস, চেয়েছিস মুরগী পেয়েছিস ফ্রাইড চিকেন...

কালো গ্লাস ঢাকা গাড়ীতে ঢেকে রেখেছিস নিজেদের নিষ্ঠুর চেহারা। দেখেছিস রাস্তার পাশে কতো মানুষ খাবারের অভাবে কংকালসাড় দেহ নিয়ে কিভাবে অশ্রু সজল চোখে দুটো টাকা ভিক্ষা চাইছে? ইন্টারনেটে দেখিসনি সুদানের দূর্ভিক্ষ পিড়িত অঞ্চলের অসহায় মানুষদের ছবি? তোদের তো বিনোদোন করেই সময় হয়না এসব দেখবি কখন?

পুরো ক্লাশ নিশ্চুপ... প্রত্যেকের ভারি নিশ্বাস কানে আসছে। দু একজনের চোখে পানি টলমল করছে। প্রত্যেকের ভেতর দ্বিতীয় সত্ত্বার জাগরনী অনুভব করা যাচ্ছে। সবাই এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেনো অসহায় সেই মানুষগুলো চোখের সামনে হাটছে। এমন সময় সাবিত দৌড়ে বের হয়ে যায়। নৈস্বব্দের খেলাঘরে হঠাত নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিলো শাকিলের ফোন। লিঙ্কিংপার্কের কান ফাটানো গলাফাটানো সুরে ফোনটা চিত্কার করে উঠে। তাকিয়ে দেখে সাবিত ফোন করেছে। কি ব্যাপার? এইমাত্র না দৌড়ে বের হয়ে গেলো?? কোনো বিপদ হলোনা তো?? সবাই উতকন্ঠায় তাকিয়ে আছে শাকিলের দিকে।

শাকিল বললো সাবিত সবাইকে নিচে নামতে বলেছে। চল সবাই দেখি কি হলো?

নিচে নেমে সবাই হতবাক হয়ে দাড়িয়ে দেখলো শাকিল... এও কি সম্ভব??? ধনীর দূলাল একি করছে? অন্য কোন সময় হলে সবাই ছি ছি করতো। কিন্তু আজ কি হলো কিজানি? সবাই মিলে হাত তালি দিয়ে উঠলো। ধিরে এগিয়ে আসছে দুজন মানুষ। একজনের গায় বসুন্ধরার রিচ ম্যান থেকে কেনা বহুমূল্য শার্ট আর অন্য জনের? খুবই সাধারন... শতচ্ছিন্ন একটি গেঞ্জি আর ময়লা ছেড়া লুঙ্গী। এলোমেলো বেড়ে উঠা পাকা দাড়ি গোফের বুড়ো লোকটিকে দেখে রিশিতা ছুটে গিয়ে আপনজনের মত হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে আসে। সবাই এগিয়ে আসে। মুখের উজ্জলতা বৃদ্ধি পায় দূপুরের চমকানো সূর্যের আলোয়। এক স্বর্গীয় আভায় প্রবেশ করে সবগুলো ছেলেমেয়।

সবাই মিলে ঠিক করলো বুড়োকে পেট পুরে খাওয়াবে। কিন্তু সমস্যা হলো তাকে কোনো রকমেই রাজি করানো যাচ্ছেনা। সে শুধু বলছে মা আমারে কিছু ট্যাকা দেন আমি যাইগা। অবশেষে রহস্য উদ্ধার হলো। সে আসলে একা খেতে চাইছেনা। তার ভালোবাসার টুকরো টি যে বস্তি্র ছোট একটি মুরগীর খোপের মত ছাউনিতে বসে কাতরাচ্ছে। সেই বুড়িকে রেখে সে কিভাবে খাবে? জোয়ান সময়ে সে কতো দেখেছে আমেনা বিবি তার জন্য রাতের পর রাত না খেয়ে কাটাতো, কাজ করে ফিরতে দেরী হলে না খেয়ে নির্ঘুম বসে থাকতো। নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়াতো। পুরোনো সুখের সেই দিন গুলো গলে গলে বুড়োর দুটি চোখের কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

একটি ছোট্ট দীর্ঘ শ্বাস বেড়িয়ে আসলো রিশিতের বুকের গহীন থেকে। বুড়োর ভালোবাসায় অনেক কিছু শেখার আছে।



(চলবে)

সনাতন
23/06/09

রাত 2.10
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৩৮
১৫টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×