somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে রিক্সাওয়ালাকে খুঁজছিলাম ও তার কিছু কথন

২০ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ১১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বয়স আনুমানিক ৫০ হবে। নামটা জানা হয়নি। বাড়ী ঠাকুরগাঁও। পেশায় রিক্সাচালক। অস্থায়ী আবাস ঢাকার তেজগাঁও এর কোন এক বস্তিতে। তার চেহারা দেখে বোঝা যায়, কর্মজীবনের শুরু থেকে সে রিক্সাচালক নয়। একমাত্র ছেলেটি থাকে ঠাকুরগাঁতে।

অফিস থেকে বের হয়ে কিছু দূর হেঁটে গিয়ে রিক্সা খুঁজছিলাম। এক রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এসে বলল কোথায় যাবেন? বললাম, ফার্মগেট, ভাড়া কত? কোন উত্তর না পেয়ে আবারো জিজ্ঞাসা করলাম। তাও কোন উত্তর নেই। পাশ থেকে আরো একজন রিক্সাচালক বললেন, "ভাড়াটা কইয়া দেন, সমস্যা কি?" কে যেন পাশ থেকে বলল, এই লোক কখনও ভাড়া বলে না। আমার কাছে অনেকটা রহস্যজনক মনে হলো। উঠে বসলাম রিক্সায়। চলতে শুরু করলো।

জানতে চাইলাম, ভাড়া বললেন না কেন? সে বলল, "যা খুশি হয় দিয়েন, আমি ভাড়া চাই না, আমার দরকার প্যাসেঞ্জার।" আবারো তার কথা শুনে একটু খটকা লাগলো। যাই হোক পিছন থেকে তাকে বেশ অবজার্ভ করছিলাম। দুই তিন মিনিট রিক্সাটা চলার পরে সে যেন কি নিজের মনে বলতে শুরু করলো। কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু মাঝে মাঝে ডানে বামে তাকিয়ে কথা বলে চলছিল। আমি তখনও চেষ্টায় আছি কি বলে লোকটা শোনার জন্য। পুরো অস্পষ্ট ভাষা। শুধু মনে হচ্ছে সে কথা বলছে একেক সময়ে একেক ভয়েসে। অর্থাৎ তার কথা গুলো শুনলে মনে হবে তিন চারজন পাশাপাশি বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। আমার কাছে ইন্টারেষ্টিং লাগলো ব্যাপারটা। তবে সে নিজ মনে রিক্সা চালাচ্ছে। বেশ দক্ষতার সাথে অবশ্যই। যেখানে যেমন দরকার তেমন করেই চালাচ্ছে। যে সাইড চাইছে তাকে সাইড দিচ্ছে।

একসময় দেখলাম, সে একটা গানের মত গাইছে এবং আস্তে আস্তে গলার জোড় বাড়ছে। এক পর্যায়ে পুরো রাস্তা কাঁপিয়ে গান গাইছে। আশপাশ দিয়ে যাওয়া সব রিক্সাওয়ালারা তাকে দেখে হাসছে, আর প্যাসেঞ্জারগুলো তাকিয়ে আছে তার দিকে আশ্চর্য হয়ে। কোন কোন রিক্সাওয়ালা আবার তাকে পাস করে যাবার সময় বলছে, "কি কাগু, খবর কি?" কেউ আবার মামা সম্মোধন করছে। গানের এক পর্যায়ে সে হঠাৎ গান থামিয়ে বিকট শব্দে হাসতে লাগলো। আবার গান ধরলো। গান শেষ করে আবারো সেই নিচু ভয়েসে কথা বলছে।

আমার ঠিক তখন মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ এমনই এক রিক্সাওয়ালার কথা আগে শুনেছিলাম অফিস কলিগদের কাছে। কিন্তু আজই তাকে প্রথম দেখলাম। আমাদের অফিসের আসে পাশেই নাকি তাকে দেখা যায়। সত্যি মনে মনে তাকে খুঁজছিলাম। আজকে পেয়ে গেলাম। যাই হোক তখন কৌতুহলটা আরো জেঁকে বসলো আমার।

এভাবে একসময়ে ফার্মগেটের কাছে চলে আসলাম। যা ন্যায্য ভাড়া তাকে তাই দিলাম, প্রতিদিন যা সবাইকে দেই। সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। বললাম, "আচ্ছা এতক্ষণ আপনি কি বলছিলেন?" প্রায় দশ মিনিট তার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বললাম। তার কথাবার্তা কিছুটা অসংলগ্ন। কিছু মতিভ্রম হয়েছে হয়ত সঙ্গত কারণে। জানলাম অনেক কিছুই। আপনাদের সাথে সেটা শেয়ার করছি।

তার ছিল ৩২ বিঘা সম্পত্তি। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া। একসময়ে সব ছিল তার। কোন নিকট আত্মীয় তার কাছ থেকে দুই দফায় এই টোটাল সম্পত্তি কবজা করে নেয়। তাকে রাস্তার ফকির বানিয়ে দেয়। সে একে একে তার বাড়ী ঘর, হাল, বলদ, জমি সহ সব কিছু হারায়। নিঃস্ব পথের ভিখারী হয়ে যায়। এরই কোন এক পর্যায়ে তাকে তার শত্রুরা শত্রুতা করে একটা ঔষধ খাওয়ায় এবং বলে সেটা খেলে নাকি সে সুস্থ্য হয়ে যাবে। রিক্সাচালকটি বিশ্বাস করে সেটা খায়। তারপর থেকেই তার শুরু হয় আরেক কষ্ট। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন থেকেই বুকে প্রচন্ড ব্যথা। এ পর্যায়ে সে আমাকে শার্ট সরিয়ে বুকটা দেখালো। সেটা দেখে আমি কিছুটা ভয় পেলাম। কেমন যেন লাগছিল। তার বুকের একটা অংশ কালো হয়ে পুড়ে গেছে। ঐ জায়গার চামড়াটি কালো হয়ে মোটা হয়ে গেছে। অনেকটা ব্যাঙের পিঠের চামড়ার মত। সেখানে ভিতরে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে সে এখনও। ওখানটায় নাকি হাত দেওয়া যায় না। সত্যিই জায়গাটি দেখতে খুবই বিভৎস। আমি বললাম, "ঢাকেন শার্ট দিয়ে।"

সে বলল, আমি সবাইকে আমার এই অবস্থার কথা শুনাই রিক্সায় উঠলে। কিন্তু আপনেই প্রথম আমার কাছ থেকে সব কিছু জানতে চাইলেন। আমার একটা হাত ধরে সে বলল, আমার জন্য দোয়া করবেন। এই পর্যায়ে মনে হলো, তার মতিভ্রম হয়নি। তবে তার কথা বোঝা খুব কষ্টদায়ক কারণ সবই অষ্পষ্ট।

আমি বললাম, "কেইস করেন নাই?" জানলাম, অনেক কেইস হয়েছে, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। সে নিজের মনকে সান্তনা দিতে এভাবে আচরন করে। আমি তাকে বললাম, "আপনার একটা ছবি তুলতে চাই।" সে চট করে রিক্সার সিটে উঠে বসে আমাকে ছবি তোলার জন্য পোজ দিলো। আমি তার একটি ছবি তুললাম। আসার সময় বললাম, "সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।"

এর চেয়ে বলার আর বেশী কিছু আমার কাছে নেই। তারপর চলে আসলাম। এভাবেই সে হয়ত আবারো কোন প্যাসেঞ্জার তুলবে। তাকেও হয়ত একই কথা বলবে। জানিনা, সে সবাইকে এগুলো জানিয়ে কি করতে চায়? আমরা সাধারন মানুষ কিই বা করতে পারবো তার জন্য?
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ১১:৫১
১৬টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×