বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক ছিলেন সাধারণ ছাত্র ও জনতা। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের ভাষায় সরল নায়ক। যাঁরা কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠনের সদস্য ছিলেন না। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কী হবে না, সে নিয়ে রাজনীতিক ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। সিদ্ধান্ত ছিল ১০ জন করে একেকটি দল গঠন করে মিছিল বের করবে, যাতে পুলিশ একসঙ্গে সবাইকে পাকড়াও করতে না পারে। কিন্তু দ্বিতীয় বা তৃতীয় দলের মিছিল বের হতেই পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তাতে ছাত্ররা নিবৃত্ত না হলে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। ততক্ষণে আমতলা পরিণত হয়েছে জনারণ্যে। ছাত্রদের সঙ্গে এসে যোগ দেন পেশাজীবী শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। এরপর সমাবেশে পুলিশ গুলি ছুড়লে কয়েকটি তাজাপ্রাণ ঝরে যায়, রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ।
আমরা যদি একুশের শহীদদের তালিকা দেখি তাহলেও ধারণা করতে অসুবিধা হয় না, এটি ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বা গণবিদ্রোহ। তারা ছিলেন কৃষকের সন্তান। একমাত্র আবুল বরকত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, পড়তেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষে। বাকি সবাই বাইরের।
রফিক। পুরো নাম রফিক উদ্দিন আহমেদ। ছাপাখানার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাড়ি মানিকগঞ্জের সারিল গ্রামে। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনিও কলাভবনের সামনের মিছিলে যোগ দেন এবং পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
আবদুস সালাম ছিলেন শিল্প অধিদপ্তরের কর্মচারী। তাঁর বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞায়। আবদুল জব্বারের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের কমান্ডার ছিলেন। শাশুড়িকে চিকিত্সা করাতে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতাল গেটে মিছিল দেখতে গিয়ে তিনিও তাতে শামিল হন। তাঁর হাতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগানসংবলিত একটি ব্যানারও ছিল।
সফিউর রহমান ছিলেন হাইকোর্টের কর্মচারী, পাশাপাশি রাতে আইন বিষয়েও পড়াশোনা করতেন। তার পৈতৃক বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কন্যাঘরে। নবাবপুর রথখোলার কাছে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করলে তিনি শহীদ হন।
এ ছাড়াও অহিউল্লাহ, আবদুল আউয়াল ও অজ্ঞাতনামা তিনজন শহীদের উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন লেখায়। তবে অহিউল্লাহ নামে প্রকৃতই কেউ নিহত হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
দুই
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে বেশ কিছু বই লেখা হলেও সেসব বইয়ে প্রকৃত ইতিহাস বা ঘটনা উঠে আসেনি। এ অভিযোগ যদি পরবর্তী প্রজন্মের লেখকেরা করতেন, তাহলে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, জেল খেটেছেন—এ রকম কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা প্রশ্নটি উত্থাপন করলে তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে।
সঠিক ইতিহাস লেখার আগে জানা প্রয়োজন ভাষা আন্দোলনটি কী ছিল? কবে থেকে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল? বাংলা ভাষার সংগ্রামের শুরু ৫২ বা ৪৮ সালে নয়। যখন থেকে এ অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষি মানুষ কথা বলতে শিখেছে, তখন থেকেই ভাষার লড়াই শুরু হয়েছে। বাঁচার জন্য মানুষকে যেভাবে লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়, তেমনি ভাষাকেও প্রতি ক্ষণে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায়ও ভাষার জন্য মানুষ লড়াই করেছেন। ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরে মাতৃভাষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের বাড়তি গুরুত্ব হলো আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই একশ্রেণীর বাঙালি মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন। তাঁদের যুক্তি ছিল, মুসলমানদের আবাসভূমি পাকিস্তানে একটি রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত—উর্দু। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল কাসেম, আবুল মনসুর আহমদ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, মাওলানা আকবর খাঁ, ড. কুদরাত-এ-খুদা প্রমুখ এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তখনো পর্যন্ত বিতর্কটি পত্রিকার পাতায় সীমিত ছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের দুটি ঘটনা ভাষা বিতর্কটি দেশের ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে আলোড়িত করে। এক. পাকিস্তান গণপরিষদে কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষা প্রস্তাব নাকচ, দুই. ঢাকায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি ছিল, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তান গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। দুর্ভাগ্য, তাঁর এই প্রস্তাব গণপরিষদে বিল আকারে পেশ করতে যে-সংখ্যক সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন ছিল, তা পাওয়া যায়নি। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবার ঢাকায় এসে তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিতে গিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, Urdu and Urdu shall be the State language of Pakistan. ছাত্রসমাজ এ স্বৈরতান্ত্রিক ঘোষণা মানতে পারেনি। মানতে পারেনি পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষও।
তার আগেই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পালিত হয় ছাত্র ধর্মঘট। যাতে যুক্ত হয় তত্কালীন শাসক দল ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও ছাত্রসংগঠন। আন্দোলনের একপর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠী এর বাস্তবায়ন নিয়ে টালবাহানা করলে ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ’৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে ছাত্ররা কর্মসূচি পালন করেন, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে (বর্তমান মেডিকেল কলেজ) ছাত্রজমায়েত আহ্বান। আন্দোলন বানচাল করতে শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করলে ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সৃষ্টি হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র।
চলবে.....
[এই লেখাটি ২১ শে ফেব্রুয়ারী "দৈনিক প্রথম আলো" তে প্রকাশিত। লিখেছেন জনাব সোহরাব হাসান। সেখান থেকে হুবহু কপি করা হয়েছে।]
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


