ওকে আমি মাঝে মাঝে পোকা ডাকতাম। আমার মাথার ভেতরে, মনের গভীরে ঢুকে গিয়েছিল সে পোকার মতো, ঝিঁ ঝিঁ পোকার মতো। বেজে যেতো সারাদিন একটানা ঝিঁ ঝিঁ সুরে- আমার ভেতরে; হয়তোবা আমার কোন কাজ নেই- কিছুই করছিনা, হয়তোবা আমি ''এসেম্বলি ল্যাঙ্গুয়েজ'' ল্যাবে, হয়তো গান শুনছি, পড়ছি প্রিয় কোন বই, অথবা কিছুই পড়ছিনা, বাস কাউন্টারের সামনে অপেক্ষমান, নীলক্ষেতের ফুটপাতের দোকানগুলোর সামনে ঝুঁকে ঝুঁকে বই দেখছি, একই রাস্তার একই পাশ দিয়ে হেঁয়ে যাচ্ছি - মিলা থাকতোই আমার সাথে- ছায়ার মতো- পোকার মতো- অবিকল।
এমনিতে মিলার সাথে আমার কোন মিল নেই। ও ভীষণ ছটফটে, অস্থির- আমি মোটেই না। ও ভীতু হলেও এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, কৌতুহলী, সপ্রতিভ, অবশ্যই ইন্টেলিজেন্ট । একটা জায়গায় আমাদের মিল ছিল- আমরা পড়তে পছন্দ করতাম। হাতের কাছে একটা বই দুনিয়াতে সবচেয়ে প্রিয় মানুষের অভাবও ওকে ভুলিয়ে দিতো। এবং ও কথা বলতো খুব চমৎকার করে। ওর সাথে আমার পরিচয় নেটে, খুব সাদামাটা পরিচয়। নেটে অনেক কথা হতো ওর সাথে, অনেক কথা- যেগুলো কোনদিন আর কারো সাথে হয়নি। প্রায় প্রতিদিন, সেইসব দিনে, তিন-চার ঘণ্টা ওর সাথে কথা বলেই কাটিয়ে দিতাম। অথচ আমি বড় আমিশুক, অন্তর্গত স্বভাবের মানুষ। কেনো জানি কাউকে আমি বন্ধু ভাবতে পারিনা। সারাক্ষণই নিজের ভিতরে ঢুকে থাকা আমি ক্রমশ বদলে যেতে থাকলাম- মিলা আসার পরে। মিলার মধ্যে কেমন একটা ছোট মেয়ে আছে! ছোট মেয়েটা আমাকে ক্রমাগত আমার চারপাশের সীমানার বাহিরে নিয়ে আসলো। আমি প্রেমে পড়ে গেলাম, ভীষণভাবে।
অথচ তখনো ওকে দেখিনি আমি, ভালো করে চিনিওনা। ওর সাথে আমার পরিচয় বারো দিনের।
এরপর আমার মধ্যে একটা নতুন অনুভূতির জন্ম হলো- ভয়ানক ভয়। সারাটা সময় আমি ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে থাকতাম- কেবলি মনে হতো মিলাকে হারিয়ে ফেলবো। কী দুঃসহ সেই ভয়! মাঝে মাঝে মিলাকে বলতাম। বেশিরভাগ সময় ও বিরক্ত হতো (এইসব কি? আপনার সারাদিন এইসব চিন্তা করা ছাড়া আর কোন কাজ নাই?), কখনো হাসতো ( সত্যি সত্যি হারায়ে গেলে তখন কি করবেন?), কখনো হয়তো ওর কিছুটা মায়া হতো ( উহু, আমিতো আছি, মরে যাইনিতো, কেন এমন করেন? )।
সময় চলে গেলো পাখির ডানায় ভর করে। একটা সময় ওর সাথে যোগাযোগটা কমে আসলো। ওর কলেজ বন্ধ, টেষ্ট পরীক্ষা শেষ। ও না চাইলে ওর সাথে যোগাযোগের কোন উপায় থাকতোনা। বাসার ল্যান্ড ফোনে কল করা নিষেধ ছিল। ও ফোন করতো অনেক দিন পরপর। সে সময়টা ও প্রায় অসুস্থ থাকতো। অসুখটা ওকে ওর পরীক্ষা পর্যন্ত তাড়া করলো। আর আমার দিনগুলো একা একা হয়ে যেতে লাগলো। ও কেমন আছে, কি করছে, পরীক্ষা কেমন হচ্ছে- কিছুই জানতাম না। কেমন একটা অস্থিরতার মধ্যে পার করলাম সময়টা। ওর পরীক্ষা যেদিন শুরু হলো সেদিনই ওর সাথে শেষবার দেখা হলো ( তখনো জানতাম না- শেষ)। কিভাবে যেনো সেইসব দিনও পার করে ফেললাম। ওর পরীক্ষাও শেষ হলো। ভেবেছিলাম এরপর সে ফোন করবে। একদিন করলো- তারপর কিছুদিন আর নাই- যেন পৃথিবীর কোথাও কোন মিলা নাই। আমার সমস্ত প্রেম অভিমান হয়ে যায়। অভিমান। এরপর একটা দিন রাতে সে যখন ফোন করে- আমি কথা বলতে পারিনা। আমার সমস্ত অভিমান গলায় কাঁটার মত বিঁধে আছে, আশ্রু জমে গেছে- নিজেকে পরাজিত মনে হয়, বড় শুণ্য মনে হয়।
এরপর আর কখনো মিলাকে পাইনি।
____________________________________________________

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

