মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি মরে গেলে কি হবে!
মৃত্যুচিন্তার জন্য সাতাশ বৎসর খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। তাও আমি প্রায় সময় ভাবি আমি যদি সত্যি আজকেই মরে যাই কেমন হবে। মনে হয় তেমন কিছুই হবে না। আমি খুব বিশেষ কেউ না। প্রায় গুরুত্বহীন, ঘটনাহীন প্রাত্যাহিকতায় জীবনটা বয়ে বেড়াচ্ছি। মাঝে মধ্যেই একটা নিসঙ্গতায় ভুগি। কী একটা দুঃসহ বন্ধুহীন জীবন! আবার যখন মানুষের ভীড় হয়- বারবার মনে হয় কোন আড়ালে নিজেকে লুকাবো।
এই যে এইমাত্র বললাম বন্ধুহীন জীবনের কথা- আসলে সত্যি না। এই যে নিসঙ্গতা আর নিজেকে সবসময় আড়াল করতে চাওয়ার চেষ্টা- তাও সত্যি না। আমি জানিনা আসলে আমি কাকে বিভ্রান্ত করছি।
কেন আমার মধ্যে এই মৃত্যুচিন্তা আসে তার একটা কারণ আমার জানা আছে। আমার খুব দেখার ইচ্ছা আমার চারপাশের মানুষের কাছে আমার হঠাৎ অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়াটা কেমন লাগে। সম্ভবত মরে গেলে মানুষ অনেক দামী হয়ে যায়।
আমি খুব ভারী চশমা পড়ি। মাইনাস এইটিন পাওয়ারের গ্লাস। এই চশমার কারণে আমার চেহারায় একটা ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রের ছাপ পড়ে গেছে। খুব সম্ভবত এটাই আমার বড় পরিচয়। আমি মরে গেলে সবাই হয়তো বলবে- আহারে! কী ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিল! অবশ্য আমার স্কুলজীবন, কলেজজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টায় যে সিব সহপাঠীদের পেয়েছি প্রায় কারো সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় নি।
আম্মা ভীষণ কষ্ট পাবে। এই ছেলের উপর তার আশা ছিল।
পরিবার-পরিজন?
বন্ধুরা?
মিলা?
আমি বুঝতে পারি এই মৃত্যুচিন্তা আসলে আমার এক ধরণের রোমান্টিক বিলাসিতা। প্রতিটা মৃত্যু মানুষকে ভীষণভাবে আঘাত দেয়। কত মৃত্যু দেখলাম!
আমাদের কলোনীতে একটা আপু ছিল- সোনিয়া। সোনিয়া আপুদের বাসা ছিল তিন তলায়। বিকেলে সোনিয়া আপু ব্যালকনিতে আসত। খেলার মাঠ থেকে- দেখতাম নোবেল ভাইয়াকে- ক্রিকেট খেলার ফাঁকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতো। সেই ছোটবেলায়ও বুঝতাম তাদের মধ্যে প্রেম চলছে। হায়! কী দ্রুতই না সময় চলে গেল! সোনিয়া আপুরা কলোনী থেকে চলে। নোবেল ভাইয়ারাও। সেই সোনিয়া আপুর খোঁজ পেলাম অনেক অনেক দিন পর। পত্রিকার পাতায়। কী বীভৎস সেই মৃত্যু! সোনিয়া আপুর স্বামী তার স্ত্রীকে খুন করলেন। টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দী করলেন।
একটা বন্ধু ছিল আমার- নিসঙ্গ দুঃখী একটা মেয়ে। একদিন তুলি জোর করে আমাকে ওর বাসায় নিয়ে যায়। আগে আমি জানতাম না- ওর মা ওকে ছোটবেলায় ফেলে রেখে চলে যায়। এক জার্মান প্রফেসরকে বিয়ে করে জার্মানীতে। ওর মায়ের প্রতি ওর প্রচন্ড ঘৃণা। মায়ের সাথে ওর কোন যোগাযোগ ছিলনা। খুঁজতে খুঁজতে আমি একদিন ওর মাকে পেয়ে যাই। সেই বেদনার কাহিনী আমারও জানা হয়ে যায়। ঊনাদের বিয়েটা প্রেমের ছিল। তুলির বাবা ছিল ওর মায়ের প্রাইভেট টিউটর। এ বিয়েটা তুলির নানাদের পরিবার মেনে নেয়নি। তুলির মা নিজের ঐশ্বর্যের পরিবার ছেড়ে দরিদ্র স্বামীর ঘরে আসলেন। কী সংগ্রামই না করলেন! এর মধ্যে তুলির জন্ম হল। পড়াশোনা শেষ করলেন। সংসারের খরচ মেটাতে দুজনে মিলে চাকরি করলেন। কষ্টের আর আনন্দের কিছুদিন। একটা সময় রঙীন আলো ঝাপসা হয়ে আসে। তুলির বাবা জড়িয়ে পড়েন অন্য সম্পর্কের সুতায়। দূঃখে-হতাশায় ভেবেছিলেন আত্নহত্যা করবেন। ভাগ্য তাকে এক জার্মানের সাথে জার্মানী নিয়ে গেল। আমি যখন তুলিকে এই কাহিনী বলি তুলি তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার দু সপ্তাহ পর তুলি আত্নহত্যা করে।
অনেক ছোটবেলায় এক ঈদের দিনে আমি আর আমার বন্ধু রুবাইয়াত খেলছিলাম আমাদের স্কুলের সামনের মাঠে। স্কুলের নতুন দালান উঠছিল তখন। মাঠে তখন অনেক ডোবার মত ছিল। খুব একটা গভীর না। ঈদের আগেরদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছিল। ডোবাগুলি সব পানিতে ভর্তি। সেই ছোট ডোবাতেই আমার সামনেই আমি মরে যেতে দেখলাম আমার বন্ধুকে।
ভাইয়ার বন্ধু রুমন ভাই। খুব ভাল ফুটবল খেলতেন। একদিন বিকেলে খেলা শেষে বাসায় এসে অসুস্থ বোধ করলেন। সেই রাতে রুমন ভাই মারা যান।
ছিয়ানব্বইতে আমি ছিলাম ক্লাস সেভেনে। পূজার ছুটি চলছিল। আব্বা কেমন যেন অসুস্থ-রোগা হয়ে যাচ্ছেন দিনদিন। ডাক্তার দেখানোর পর অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। আব্বাকে জিইসির মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করানো হল। তখন আব্বার টিবির চিকিৎসা চলছিল। অবস্থা ভালো না হওয়ায় মামা এক প্রকার ডাক্তারদের ঝগড়া করে আব্বাকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। সেখান থেকে ইন্ডিয়া। মাত্র আড়াই মাস অসুস্থ থেকে আব্বা মারা যান। আব্বার মারা যাওয়ার আটদিন পর আমার একমাত্র চাচাও মারা যান।
এতসব দুঃখজনক মৃত্যু দেখেও কতোটা নির্বিকারভাবে বেঁচে আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


