somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভদ্রলোক

০৮ ই জুলাই, ২০১০ রাত ১:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভদ্রলোক

ট্রেন ছেড়ে দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে লোকটি আমার সামনের সিটে এসে বসল। আজ সকালে ওর সাথে আমার খুব সামান্য একটা বিষয়ে ভীষণ রাগারাগি হয়ে গেছে। বিষয়টা সমান্য বলেই আমার উত্তেজনাটা বেড়ে গিয়েছিল। জীবনে ছোটখাট সমস্যা হতেই পারে, এ নিয়ে এত মাতামাতি করার কোন কারণ দেখি না; ওকে এটা বোঝাতে গিয়েই আমার রাগ মাথার ওপর চড়ে গেল; ব্যাস, যা না বলার তাও বলে দিলাম। মেজাজটা তখন থেকেই বিগড়ে আছে। লোকটির দিকে একবার তাকাতেই আমার অশান্ত মনে খুব শীতল একটা শিহরন বয়ে গেল। অপূর্ব! মানুষ এতটা সুন্দর হয় কি করে? একটা মাঝবয়সী মানুষ যে শিশুদের মতন নিষ্পাপ হতে পারে আজই তা প্রথম উপলব্ধি করলাম। ট্রেন আপন মেজাজে চলতে শুরু করেছে। ভদ্রলোক সিটের এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে আছেন। আদর্শ উচ্চতা, তীক্ষ্ণ নাক, চাপা ফর্সা গায়ের রঙ, ছিপছিপে গড়ন। এরকম মায়াবী চোখ যে মানুষের হতে পারে আমার তা জানা ছিল না। মুখে চাপ দাঁড়ি: ধর্মপ্রাণ মুসলিম হবে হয়ত। খুবই সাদামাটা গোছের পোশাক, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল: বোঝা যাচ্ছে জাগতিক ব্যপারে খুব একটা মাথা ব্যঁথা নেই ভদ্রলোকের। এই ভোগের সংসারকে যাঁরা উপেক্ষা করতে পারে, তাঁদের থেকে নমস্য আর কেই বা হতে পারে? পৃথিবীর সকল মহামানবেরা এ ভোগের পৃথিবীকে ত্যাগের পৃথিবী রুপে গ্রহন করেছেন বলেই না তাঁরা মহামানব!

অন্যান্য দিন জানালার ফাঁক দিয়ে প্রকৃতির সাথে ফিসফাস করতে করতে আলসে সময় ঠিকই পার হয়ে যায়। আজ ভদ্রলোকের চোখে চোখ রেখে কখন যে পাক্শি পেরিয়ে এসেছি একটি বারের জন্য হলেও টের পাইনি। ভদ্রলোকের এদিকওদিক তাকানো দেখে মনে হচ্ছে বেশ অস্বস্তিতে আছেন। নিজেকে আড়াল করার একটা প্রয়াশ তাঁর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। খুবই স্বাভাবিক। পাপের জগতে ভালো মানুষের সংখ্যা যে বড্ড কম!

মাগরিবের আযান শেষ হয়ে এলো প্রায়-“লা ইলাহা ইল্লাললাহু মুহাম্মাদুর রাসূলউল্লাহ”। লোকটি উঠে দাঁড়াল। বোধহয় নামায পড়তে যাবে। কাপড়ের ব্যাগটা মাথার ওপর থেকে নামিয়ে আবার বসে পড়ল। সিটের ওপর পা তুলে বসে ব্যাগটা কোলে রেখে কি যেন একটা হাতড়াতে থাকলো: টুপি হবে নিশ্চয়। আমি সামনে থেকে কিঞ্চিৎ সরে বসলাম। কারও নামাযের মুহূর্তে এভাবে সামনে বসা ঠিক হবে না। সৃষ্টিকর্তাকে যাঁরা সন্দেহাতীত ভাবে বিশ্বাস করেন তাঁদের চেহারায় একটা অদ্ভূদ প্রশান্তির ছাপ জুড়ে থাকে, ভদ্রলোককে দেখলে সেটা বোঝা যায়। ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে সিগারেট বের করে আগুন দিলেন। আমি একটু ধাক্কা খেলাম বটে তবে এ আর এমন দোষের কী? জগৎ জুড়ে বহু সম্মানিত মানুষ আছেন যাঁরা ধূমপান করেন। সিগারেটের ধোয়া খুবই সতর্কতার সাথে বাইরের দিকে ছেড়ে দিচ্ছিলেন, এক সচেতন মানুষের যা করা উচিৎ আর কি! সিগারেটের ফিল্টারটা পায়ের কাছে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, ব্যাগটি যথান্থানে রেখে আবার পূর্বের ভঙ্গিমায় বসে পড়লেন। “ট্রেন কি আব্দুলপুরে থামবে?” এই প্রথম কথা বললেন তিনি। খুবই ভরাট কন্ঠ। আমার মনের অলিগলিতে শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। আমি কিছু একটা বলতে যাবো এমন সময় আমার পাশের জনটি বললেন, “কোন বিশেষ কারণ ছাড়া মধুমতি ওখানে থামে না।”

ট্রেন এসে ঈশ্বরদীতে ভিড়ল। হঠাৎ-ই আমার মোবাইল বেজে ওঠাতে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি মোবাইল বন্ধ করে ফেললাম। ভদ্রলোক আবার সিগারেট ধরালেন। ট্রেন এখানে মিনিট বিশেক থামবে। সাধারণত আমি এ সময়টাতে এখানে নেমে চা পান করি। কিন্তু আজ আর নামলাম না। ভদ্রলোককে দেখার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারলাম না। আর তাছাড়া এ ধরনের মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যথেষ্ট ভাগ্যের ব্যাপার। হঠাৎ করে কার যেন মোবাইল বেজে উঠল: ‘চল ছ্যাইয়া ছ্যাইয়া, চল...!’ এই ধরনের পরিবেশে বড্ড বেমানান রিংটোন। ভদ্রলোক কি যে ভাববেন! আমি উৎস খোজার জন্য উদগ্রিব হয়ে উঠলাম। ভদ্রলোক ফোন রিসিভ করলেন, “হারামখোর, শুঁয়ারের বাচ্চা, তোকে না বললাম মালটা জায়গা মতন পৌঁছায়ে দিতে। খানকির পোলা ফোন রাখ, তোর বাপ আইতেছে।” ফোনটা রেখে দিলেন। ভদ্রলোকটি যাকে গালি দিলেন সে নিশ্চয় খুবই জঘন্য প্রকৃতির মানুষ না হলে তিনি কখনই এমন বিশ্রি ভাষায় কথা বলতে পারতেন না! মানুষ এত খারাপ হয় কি করে, আমি ভেবে পাই না। এমন মানুষের সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করতে পারে? ভদ্রলোক যার সাথে কটু কথায় কথা বললেন তার আরও শাস্তি পাওয়া উচিৎ। ভদ্রলোকের মুখ দেখে বোঝা গেল তিনি এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত না। ভালো মানুষদের চেহারাই বলে দেয় তাঁদের ভেতরের কথা। ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে আমার প্রচন্ড মায়া হল। মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। মানুষের চোখ দেখেই বলে দিতে পারি তার ভেতরের ইতিহাস, আত্মীয় মহলে আমার এ গুণের যথেষ্ট প্রশংসা আছে। বন্ধুরা প্রায়ই এই গুনটিকে কাজে লাগায়। পাঠক মহলে বলতে শোনা যায়, আমার গল্পে নাকি জীবনের স্বচ্ছ রুপটা অনায়াশে পাঠ করা যায়। ভদ্রলোককে আমি যত দেখি আমার আগ্রহ এবং শ্রদ্ধা তত বেড়ে যায়।
ট্রেন চলতে শুরু করেছে। আজ সময় এত দ্রুত চলে যাচ্ছে যে আমি কোন হিসাব মেলাতে পারছি না। রাতের অন্ধকারে ভদ্রলোকের চেহারা যেন নূরের মতন জ্বলে উঠছে। তাঁর পবিত্রতাই আমার সমস্ত চেতনা যেন বিলীন হয়ে গেছে শূন্যে। যেন এই মাত্র ‘rever of forgetfulness’ এ ডুব দিয়ে আসলাম। থেকে থেকে আমি আপনা আপনিই শিশুর মতন হেসে উঠছি। এ যেন মানুষ নয় সাক্ষাৎ দেবতা!

ট্রেন এসে আব্দুলপুরে থামল। ভদ্রলোকের হাবভাব নিমিষে পাল্টে গেল। দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন, এদিক ওদিক একবার দেখে নিয়ে জানালা দিয়ে লাফাতে যাবেন এমন সময় ভেতরে এবং বাইরে থেকে পুলিশে ঘিরে ফেলল। পুলিশের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল,- অনেক হয়েছে কসাই মাসুদ; তোর খেল আজ খতম।

কসাই মাসুদ!? দেশের কুখ্যাত এই খুনীকে এত কাছ থেকে দেখতে পাবো ভাবতেই পারিনি। তবে স্বীকার করতেই হবে, লোকটির চেহারায় কি যেন একটা যাদু আছে!
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×