নতুন একটি গল্পের প্লট মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ সময়ের সব্যসাচী লেখক হাসান চৌধুরী। এখন তাঁর চূড়ান্ত মৌসুম যাচ্ছে- এ কাগজ সে কাগজ থেকে ফোন আসতেই থাকে। তিনিও লিখে যাচ্ছেন দেদারে। চিন্তা-ভাবনা না করেই লিখছেন অনেক সময়। সমস্ত জনপ্রিয়তাকে সারাজীবন ঘৃণা করে আসলেও শেষমেশ তিনিও ঐ তকমা নিয়ে পাঠক-মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রতিদিনই কোন না কোন কাগজে বের হচ্ছে তার লেখা - কোথাও কবিতা, কোথাও গল্প, কোথাও বা ধারাবাহিক উপন্যাস। প্রতিদিনই এসব লিখতে হয় তাঁকে, ইচ্ছে না হলেও লিখতে হয়। তবে তিনি বিখ্যাত অন্য কারণে। সাহিত্য-জীবনের শুরুর দিকের লেখাগুলোই তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। হাসান চৌধুরী বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণত লেখেন না। তার লেখার বিষয় হচ্ছে মেটা-ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড। ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে কাজ করে বেশ কটি উপন্যাসে। বাংলা সাহিত্যে এই ভিন্ন ধারায় তার ধারে কাছে কেউ দাঁড়াতে পারেনি। তবে গত বছর পাঁচেক থেকে কি লিখছেন তিনি নিজেও তা জানেন না। এ নিয়ে বোদ্ধা-পাঠক মহলেও বেশ অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, চৌধুরী সাহেবের লেখালেখি বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। বিষয়টি নিয়ে যে হাসান চৌধুরী ভাবছেন না তা নই। তবে তিনি ঠিক করতে পারছেন না আগের সেই ধারায় ফিরে গিয়ে লেখালেখি করবেন নাকি এই পাঠটাই চুকিয়ে দিবেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মগজে আসা গল্পের প্লটটি বোধহয় তার রিটায়ার্ডের সময়টাতে বিলম্ব ঘটিয়েই ছাড়বে। হাসান চৌধুরীর ইচ্ছা গল্পটিকে অবলম্বন করে আস্ত একটা উপন্যাস ফেঁদে ফেলবেন। এতে করে যে কাজটা হবে, যে সকল সমালোচকরা তার লেখায় সমসাময়িক সময়ের অবক্ষয়, রূঢ়-কঠিন বাস্তবতার উপস্থিতির উপস্থিতি টের পাননি বলে এতদিন অভিযোগ করে এসেছেন তাদের মুখটা শেষঅব্দি বন্ধ করে রাখা যাবে।
হাসান চৌধুরী ঐ গল্পের প্লটটি নিয়েই পড়ে আছেন। ঐদিকে বৌয়ের দাবি, এই ঈদে তার নামে ঢাকায় একটা ফ্লাট কিনে দিতে হবে। আজকাল ঢাকায় নাকি নিজের নামে একটা ফ্লাট না থাকলে মেয়েদের নারী মহলে কদর থাকে না। হাসান চৌধুরী বৌয়ের এই কদরটা বোধহয় আর রক্ষা করতে পারবেন না। আবারও শুনতে হবে- ‘তোমাকে বিয়ে করে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল!’’ হাসান চৌধুরী এখন তার গল্পের প্লট নিয়েই পড়ে আছেন, আপাতত বৌয়ের প্লট নিয়ে ভাবছেন না তিনি। পত্রিকা অফিস থেকে ফোন এসে আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
হাসান চৌধুরীর বর্তমান গল্পের প্লট নষ্ট হয়ে যাওয়া মাঝ-বয়স্ক এক লোক। আমাদের সমাজে নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য যে গুণাবলীগুলো অনিবার্য তার সবটাই ঐ চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান। ইতিমধ্যে একটি নামও ঠিক করে ফেলেছেন ঐ চরিত্রের জন্য - রহমান। এই নামে তাঁর পরিচিত কেউ নেই, এমনিতেই মাথায় এসেছে নামটা। হাসান চৌধুরী এখন লিখবেন এমন একটি চরিত্রকে নিয়ে যে মদ-নারী-জুয়া ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারে না। অথচ তিনি নিজে এসবের একটিও ছুঁয়ে দেখেনি কোনদিন। বন্ধু মহলে এ আবদার করার সাহস জুটোতে পারে নি কেউ। নির্ঘাত ভালো মানুষ হতে হলে আমাদের সমাজে যে যোগ্যতা লাগে তার সবটাই আছে হাসান চৌধুরীর ভেতর। এমন নই যে এসব তাঁর ছুঁতে ইচ্ছে হয়নি কখন, খুব ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু সমাজের কোড অব কন্ডাক্টকে তিনি কোনদিন অসম্মান করেননি। তাঁর এই suppressed ডিজায়ার ট্রান্সফর্ম হয়েছে গল্প কবিতাই। অর্থাৎ হাসান চৌধুরীকে এখন এমন এক জীবন নিয়ে লিখতে হবে যে জীবন তিনি যাপন করেননি কখন। এমনকি যে জীবন সম্পর্কে তাঁর জানা-শুনাও নেই খুব একটা। এখন নানান প্রশ্ন এসে জমাট বেধেছে হাসান চৌধুরীর মনে : কেমন লাগে মাতাল হতে? মাতাল হয়ে কি কবিতা লেখা যায় কিংবা স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবাসা যায়? বেশ্যার ঐ পানসে ঠোটে সুখ থাকে? বেশ্যারা কি বৌয়ের মত জাপটে ধরে সুখে ? আর, জুয়া খেলায় কোনটা বেশি তীব্র - হারাটা নাকি জেতাটা ? আচ্ছা, একটা মানুষ নষ্ট হলে আর কি কি করতে পারে ? নষ্ট হতে হলে আর কি কি করতে হয় তাকে? এরকম নানান ধাঁচের ও ধরনের প্রশ্ন এসে ভিড় করছে হাসান চৌধুরীর মগজে।
এখন বেশ নিয়ম করে রহমান আসে হাসান চৌধুরীর সাথে দেখা করতে। তিনি একবার ভেবেছিলেন, এই একটি গল্প অসম্পূর্ণই রেখে দিবেন। কিন্তু রহমান যেভাবে অত্যাচার শুরু করেছে তাতে করে লেখাটা না শেষ করে স্বস্তি নেই তাঁর। রহমান এই প্রশ্রয়টা অবশ্য হাসান চৌধুরীর কাছ থেকেই পেয়েছে। হাসান চৌধুরী রহমানকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যেন দ্বৈত মানব হয়ে উঠেছেন। স্টিফেনসন-এর ‘man is not truly one but truly two’- কথাটা হাসানের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই সত্য হয়ে উঠেছে। রহমানের জোরাজুরিতে এক মধ্যরাতে ঘর ছাড়লেন হাসান চৌধুরী। উদ্দেশ্য, যে জীবন নিয়ে উপন্যাসটি লেখা হবে তার কিছুটা নিজেই যাপন করবেন। বুদ্ধিটা অবশ্য রহমানের। গল্পটি শেষ করার জন্য হাসানের কাছে এর কোন বিকল্পও ছিল না।
রহমান আর হাসান এখন পরম বন্ধুর মত অন্ধকারে হেটে বেড়াই। রহমান বাস্তবে exist করে না ঠিকই তবে তারই প্রয়োজনে ও তারই হাত ধরে হাসান আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে অন্ধকারের একজন। বেশ খানিকটা সময় চলে যায়। ইতিমধ্যে রহমানের অস্তিত্ব হাসানের জীবনে আরও তীব্র হয়ে ধরা দেই। হাসান এখন মাতাল হয়ে সুখ পায়, জমিয়ে জুয়া খেলে আর বেশ্যা পল্লীতে তার একটা কদরও তৈরি হয়েছে। প্রথম যে বার হাসান বেশ্যা পল্লীতে যায়, তখন বৌ আর সন্তানদের মুখ বার বার স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল। শেষ অব্ধি হাসান চোরের মত পালিয়ে এসেছিল ঐ বেশ্যালয় থেকে। আর এখন চোরের মতন ছুটে যায় সেখানে। সঙ্গে রহমানও থাকে। তবে জুয়া খেলার অভিজ্ঞতাটা আরও মজার। প্রথমবারই জিতে নিয়েছিল কয়েক বান্ডিল টাকা। গুনে দেখেনি কত টাকা। জুয়ার টাকা ছুঁয়ে দেখতে ঘেন্না করছিল হাসানের। সে এখন মস্ত বড় জুয়াড়ূ। নিজের নামের ফ্লাটটা শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে জুয়ার কারণে। কারণ অবশ্য আরও কয়েকটি আছে- নিয়ম করে একটি মোটা অংক আইন-রক্ষাকারীদের দিতে হয়। তার আবার একটা ভাগ মন্ত্রী-এমপি পর্যন্ত চলে যায়। হাসানের বেশ মজাই লাগে বিষয়টি। রহমানের সাথ না ধরলে এই আজব অভিজ্ঞতাটা হত না তার।
হাসান রহমানকে এক্সপ্লোর করতে করতে কবে যেন সেই রহমান হয়ে উঠেছে। নষ্ট জীবনে নেশা ধরে গেছে তার। শেষ লেখাটা কবে লিখেছিল তার মনে নেই। পত্রিকাগুলো যাচ্ছেতাই লিখে তার ক্যারিয়ারের ইতি ঘটিয়েছে। হাসান চৌধুরী এখন সম্পূর্ণ ভাবেই নষ্ট জগতের একজন। তার নেশা ধরে গেছে মদ, জুয়া আর নারীতে। এখন সে নিয়ম করে বৌ-পেটাই।
একদিন মধ্যরাতে, জুয়ার আসর থেকে টলতে টলতে মধ্য রাস্তায় নেমে আসে হাসান চৌধুরী আর রহমান, কিংবা রহমান আর হাসান চৌধুরী। এ কথায় সে কথায় কথার বোমাটা প্রথম ফাটায় রহমান।
‘আজ তুমি একবারে নিঃম্ব। বৌ-বাচ্চারা ছেড়ে গেছে, সম্মান নেই, সম্পর্ক নেই, আছে শুধু অভাব আর নেশা। নষ্ট হওয়ার নেশা। কাল থেকে আমি গল্পটি লেখা শুরু করবো। তোমার গল্প। একজন লেখকের নষ্ট হওয়ার গল্প।’
হাসান চিৎকার করে ওঠে- তুই না , শুয়ারের বাচ্চা, গল্প লিখবো আমি। আমিই এখন তোকে নিয়ে লিখব। কোন শ্যালারা বলে, আমি অবক্ষয় নিয়ে লিখতে পারি না। এখন আমি টাটকা অবক্ষয় নিয়ে লিখব, ফ্রেশ অবক্ষয়! হা ! হা!
হাসতে হাসতে রাস্তায় ঢলে পড়ে যায় হাসান চৌধুরী।
রহমান হাসানকে ধরে তোলে- পারবে না। কারণ তুমি শুধুই আমার গল্পে বাস কর। বাস্তবে তোমার কোন অস্তিত্ব নেই। তোমার জগৎটা আমি তৈরি করেছি। তোমাকে লেখক বানিয়েছি আমি, তারপর আস্তে আস্তে তোমাকে নষ্ট করেছি। একজন লেখক তার গল্পের কারণে তার কল্পিত চরিত্রের সাথে মিশতে মিশতে কি করে সেই একসময় ঐ গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠে তাই দেখাব আমি এই গল্পে। তোমাকে আর আমার প্রয়োজন নেই।- অতি তাচ্ছিল্যের সাথে কথাগুলো বলেই হন হন করে আলোর মধ্যে ঢুকে গেল রহমান।
হাসান চৌধুরীর বিশ্বাস হয় না কিছুই।
‘আমি কি আজ বেশিই পান করেছি?’- মনে মনে ভাবে সে। নিজের শরীরের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে- আমার কি সত্যিই কোন অস্তিত্ব নেই? আমার বৌ-সন্তান, এত এত পুরষ্কার, এ-সবই অন্য কারও কল্পনা ? আমার গল্প-উপন্যাসগুলোও কি অন্য কারও লেখা কিংবা আদৌ লেখা হয়নি ওগুলো ? নাকি রহিম ফাঁদে ফেলে বেরিয়ে যেতে চাইছে আমার গল্প থেকে? ভাবতে থাকে হাসান চৌধুরী।
গল্পটি এখানেই শেষ করে উঠে পড়লেন এ-সময়ের ব্যস্ত গল্পকার আব্বাস উদ্দিন। গল্পটি এবারের ঈদ সংখ্যায় ছাপা হবে।
বি দ্র : লেখাটি ফাইনাল না। আরও কয়েকবার এডিট করা হবে। ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



