এম.এ.এস উমর ফারুক
উচ্চ হাসির শব্দে সকালের ঘুম ভেঙ্গে গেল।
অসময়ে ঘুম ভাঙ্গার কারনে মেজাজটা বিগড়ে গেল। লেপ মোড়ানি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকার পরও হাসির শব্দটা কানে মধ্যে গিয়ে আঘাত করেছে। এমনিতেই রাত জেগে লিখতে গিয়ে ফজরের আযানের সময় ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়েছি। মাত্র ২/৩ ঘন্টা ঘুম হতে না হতে এরকম আচরন সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছে না দু চোখ। ঘুমের ভারে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু ঘুম আর চোখে আসে না। কারন উচ্চস্বরে কথা আর হাসি বিরতিহীন ভাবে চলছে। মনে প্রশ্নের দাগ কাটলো ব্যাচেলার মেসে মেয়ে কন্ঠে এত উচ্চ স্বরে কে কথা বলে। লেপের নিচ থেকে কান বের করে শুনতে থাকি।
বলছে তুমি আমাকে গতকাল ফোন দেও নি কেন?
আমার ফোনে টাকা ছিল না বলেই আমি ফোন দেইনি । তাই বলে তুমি ফোন দিবে না। একথা আমি ভাবতে পারিনি।
শোন আজ আমার একটু সমস্যা আছে। তোমাকে একটু সহযোগিতা করতে হবে।
সমস্যাটা হলো আমার হাতে কোন টাকা নেই। আজ ভার্সিটি যাচ্ছি । আমার বান্ধবী আমার কাছ থেকে খেতে চেয়েছে। তাদেরকে খাওয়াতে হবে।
জানি তুমি অনেক দুরে । এই মুর্হুতে টাকা দিতে পারবে না । তবে শোন যেহেতু আমার ফোনে টাকা নেই সেহেতু আমার ফোনে ১০০টাকা পাঠিয়ে দাও না ।
-প্লিজ
টাকা পাঠাতে ভুলবে না কিন্তু। আমি অপেক্ষায় রইলাম।
তারপর আবার উচ্চস্বরে হাসির শব্দ।
এবার আমি নিজের কাছে হিসাব মিলাতে পারছি না । এত সকালে ব্যাচেলার মেসে মেয়ের কন্ঠে প্রেমের আলাপ কে করছে। আশ পাশে কোন বাসা বাড়ি নাই যে তাদের কথা শুনতে পারবো। তাহলে কি মেসে কারো বান্ধবী এসেছে আড্ডা দিতে। বন্ধুর সাথে আড্ডা দিতে এসে আবার কার সাথে এভাবে কথা বলবে।
মণিপুরী পাড়ার নতুন মেসে উঠেছি। মাত্র তিনদিন হলো । পাশের রুমের কারো সাথে আমার পরিচয় নেই। পরিচয় হবার মত সময় হয়নি। কেননা চাকুরীর চাপে সকালে ঘুম থেকে জেগে অফিসে যেতে হয়। রাত ১১/১২ টার দিকে বাসায় ফিরতে হয়। সময়ের অভাবে বাসায় না খেয়ে হোটেলে খেয়ে বাসায় ফিরতে হয়। তাই বাসা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হয়নি আমার। মেসের ম্যানেজার আমাদের সাথে কোন কথা ঠিক রাখেনি। এ জন্য আমার রুমমেট নুরে আলম, বিপ্লব ও হানিফ বেশ ক্ষিপ্ত। সুমন দাদা বাসার ব্যাপারে অতিষ্ঠ হয়েছে। কারন সময় মত পানি নেই। যা চেয়েছি তা পাইনি। কোন ভাবেই মেনে নিতে পারে না তিনি। সুযোগ থাকলে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যেতেন। তবে সমস্যা নেই প্রানবন্ত ছোট ভাই জিপসীর। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি চলতি মাসেই বাসা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নেব। কিন্তু কে এই মেয়ে সকালে প্রেমের কথা বললেন। এই রহস্যে র জট খুলতেই হবে। তাই আর দেরি না করে লেপের নিচ থেকে বেরিয়ে এলাম। ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে দাত ব্রাস করতে করতে বাথররুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর গোয়েন্দা পুলিশের মত আশ পাশে তাকালাম। কিন্তু কোন মেয়ে নজরে ধরা পড়েনি। পাশে কিচেন রুমে কাজের বুয়া রান্না করছে।
বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এলাম কিন্তু মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন কে এই মেয়ে। আমার রুমমেট নুরে আলম ঘুরতে গেছে চট্রগ্রাম। ফলে আমার কথা বলার মানুষ নেই। কার কাছ থেকে জানতে চাই কিছুক্ষণ আগে মোবাইল ফোনে কোন মেয়েটি কথা বলল। পাশের বেডে শুয়ে আছে সুমন দাদা ।
একসময় বাধ্য হয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম দাদা সকালে কোন মেয়ে ফোনে কথা বলল। সুমন দাদা বিরক্তির সাথে হাসি দিয়ে বললেন সকালে মোবাইল ফোনে প্রেমের সংলাপ করেছে আমাদের কাজের বুয়া।
একথা শুনে আমি অবাক হই। কোন ভাবে বিশ্বাস করতে পারি নাই। কেননা আমাদের কাজের বুয়ার বয়ষ কমপক্ষে ২৮-৩০ হবে। বিবাহিত ছেলে মেয়ে আছে। চেহারায় বয়ষের ছাপ পড়েছে। তার গায়ের রং কালো । ভগ্ন চেহারার অধিকারীনী মহিলা ঝি য়ের কাজ করে জীবিকা নিবা©হ করেন। এই বয়ষে তিনি কি করে প্রেম করতে পারেন। ভাবতেই যেন কস্ট হয়। সুমন দাদার মুখে কথাগুলো শুনে বিশ্বাস না করে রান্না ঘরে বুয়ার সাথে কথা বলতে গেলাম। বুয়াকে জানাই আজ আমার কোন মিল হবে না । আমি বাইরে খেয়ে আসবো। বুয়া যখন আমার কথার উত্তর দেয় তখন তার কন্ঠ সকালের সেই কন্ঠের সাথে মিলে যায়।
আমার gনে যে রহস্যে ঘনঘটা ছিল তা পরিস্কার হয়ে গেল। আমি নিজেকে আর বিশ্বাস করতে পারছি না। এই অসম্ভবকে সম্ভব হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছে।
আসলে প্রেম মানে না কোন বাধা বিপত্তি। সকল বাধাকে উপেক্ষা করে প্রেম জয়লাভ করে। প্রেমের শক্তি কোন শক্তির কাছে মাথা নত করে না। কিন্তু বুয়ার সেই প্রেমিক ছেলেরা কি জানে তারা কার সাথে প্রেম করছে। আর এবিষয়ে জানার পর সত্য ঘটনাটি হবে।
এই ধ্রব তারায় ন্যায় সত্যকে বিচার করবে কে?
রুমে এসে চেয়ারে বসে সুমন দাদাকে বললাম এই আধুনিক যুগে মোবাইল এসে পাল্টে গেছে প্রেমের চিত্র।
সুমন দাদা আমাকে বলল,শোনেন আমরা জানতে পেরেছি এই কাজের বুয়া বর্তমানে ৩ টা ছেলের সাথে মোবাইলে প্রেম করে। বুয়া নিজেকে ভার্সিটির মেয়ে পরিচয় দিয়ে তাদের সাথে মোবাইলে কথা বলে। দিনে যেমন তেমন রাত জেগে কথা বলে প্রায়। এতে তার লাভ হলো মোবাইলে ছেলেদের কাছ থেকে বিভিন্ন ফন্দি এটে বিভিন্ন সময় টাকা নেয়। আর সেই টাকা পরিচিত মোবাইল ফেক্সি লোডের দোকানে দিয়ে টাকা নেয়। ছেলেরা যদি তার সাথে দেখা দেখা করতে চায়। তাহলে সে নানা সমস্যার কথা বলে এড়িয়ে যায়। যদি ছেলেরা দেখা করতে খুব চাপ দেয় সেক্ষেত্রে নিজের মোবাইলের সিমটি পাল্টিয়ে ফেলে। নতুন আবার কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়। এভাবে কতটা প্রেম করেছে এর কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে কাজের বুয়ার বয়স বাড়লেও মনটা তার চির সবুজ। রুপ লাবণ্য না থাকলেও কথায় বেশ মধু আছে। এই বিশেষ গুণ থাকার কারনে এখন প্রেম করে যাচ্ছে বীরদর্পের মত । আমি যতটুকু জানতে পেরেছি কাজের বুয়া কোন পড়ালেখো করেনি। যদি জানতো তাহলে আরো কত ছেলে যে তার প্রেমে হাবুডুবু খেত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
কথাগুলো শুনে যতটা মজা পেয়েছি তার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি অনেকবার। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মানব সভ্যতার অগ্রগতি কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে। মোবাইল ফোনের কারনে প্রেম ভালবাসার উন্নয়ন এতটা হয়েছে যা পুর্বের সব সব ঘটনাকে হার মানিয়েছে। মোবাইলে সর্ম্পক গড়ার ক্ষেত্রে কতটা সচেতন হওয়া প্রয়োজন সে সম্পর্কে আরো বেশি জানতে হবে।
কাজের বুয়ার প্রেমের শেষ পরিনতি কি হবে তা আমি জানি না তার পর...
: লেখক আমার বন্ধু সাংবাদিক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


