প্রথমেই তাহাদের উপস্থিত বুদ্ধির সামান্য পরিচয় না দিলেই নয়। একবন্ধুকে খুঁজিতে যাইবে। তাহার নামখানি দীপু। বাড়ি অনেক দুর। একজনে কোথা হইতে ম্যানেজ করিয়া একখানি পুরাতন ওয়ান ফিফটি স্কুটার যোগাড় করিয়াছে। চালাইতেও শিখিয়াছে সদ্য। সেই স্কুটার নব চালক সহ মোট তিনজন রওনা হইয়াছেন। দীপুর বাড়ির অবস্থান লইয়া সংশয়। শুধু মনে আছে রাস্তার পার্শ্বেই তাহার অবস্থিতি। ফাঁকা রাস্তা পাইয়া স্কুটার ছুটিয়াছে বেগে। হঠাৎই একজন বলিয়া উঠিল এইতো বাড়ি, এইতো বাড়ি। সদ্য চালানো শেখা চালক ব্রেক করিতে নাপাড়িয়া সোজা বাড়ির ওপর চালাইয়া দিল। স্কুটার ঘরের পাটশোলার বেড়া ভাঙ্গিয়া এক চৌকিতে ধাক্কা মারিয়া থামিল। চৌকিস্থিত ব্যক্তি মাগো করিয়া লাফাইয়া উঠিল। চালক কিছুই হয়নাই ভাব করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, দীপু আছে? উল্লেখ্য, দীপুই চৌকিতে শুইয়া ছিল।
তো এই হইল দাদাদের গ্যাং। একবার সকলে মিলিয়া পরিকল্পনা করিয়াছে পিকনিক করিতে যাইবে। ইহা আমাদের এইস্থানের দস্তুর। প্রতি বৎসর জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহ হইতে আরম্ভ হয় এবং মোটমুটি ফেব্রুয়ারীর প্রথম পর্যন্ত চলে। তো যাহাই হউক, দিনক্ষন ধার্য হইয়াছে বাজেটও শুরু। কিছুতেই অর্থে কুলাইতেছে না। দেবদুতের ন্যয় তাদের দুইবন্ধু হাজির হইল। নেপাল-গোপাল। যমজ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাহারা বলিল অর্থ ব্যয় সম্ভব নহে কিন্তু পিকনিক যাইবই। তাহা হইলে উপায়! নেপাল-গোপাল কহিল, অর্থ ব্যয় করিতে পারিব না তবে পিকনিকের জন্য মাংসের যোগান দিতে পারিব। অতি উত্তম। নির্দিষ্ট দিনে তাহারা দুইজন একখানি নধর পাঁঠা লইয়া হাজির। সকলেই অবাক, কোথায় পাইলি! তাহারা বলিল, আম খাইবি খা, গাছ গুনিয়া কি হইবে। কেহই আর উচ্চবাচ্য করিল না। সেই পাঁঠা জবাই করিয়া পিকনিক সমাধা হইল। জানা গিয়াছিল রাধুনীর মরিচ প্রীতিতে সেই মাংস ঝরণার জলে ধুইয়া খাইতে হইয়াছিল। তো সকলে ফিরিয়া আসিলেন এবং রাত্রি বেলায় আড্ডাস্থলে মিলিত হইলেন পিকনিক স্মৃতি চর্বন করিতে। নেপাল গোপাল নাই। হঠাৎ দেখা গেল নেপাল-গোপালের বৃদ্ধা ঠাকুমা কুপি লইয়া আসিতেছেন। পিছনে দুই নাতি। এত রাতে ঠাকুমাকে দেখিয়া সকলেই অবাক। জিজ্ঞাসা করা হইল কি ব্যাপার! ঠাকুমা কাঁদিয়া পড়িলেন। কথা বলিতে পারিলেন না। পিছন হইতে নেপাল গোপাল অত্যন্ত চিন্তিত বদনে জানাইল, ঠাকুমার পোষ্য পাঁঠা পাওয়া যাইতেছে না। তাহারা পড়াশুনা বাদ দিয়া পাঁঠা খুঁজিতে বাহির হইয়াছে। পরদিন সকলে শুনিয়াই একবাক্যে বলিল ইহা কাহাদের কর্ম। নেপাল গোপাল নির্বাসিত হইল কোথায় বলা যাইবে না। বাকী সকলে দিন সাতেক পাড়ার মোড়ে পা রাখিতে পারিল না।
আরেকবার খবর আসিল স্থানীয় লেডিস হস্টেলের মাঠে শসার চাষ হইয়াছে। মাঠ ভর্ত্তি শসা। চারিজনে মিলিয়া নৈশ অভিযানে শসা নিধন হইবে। ঠিক হইল দুইজনে পাঁচিল টপকাইবে আর দুইজন এইপারে থাকিয়া সংগ্রহ করিবে। জায়গায় পৌঁছিয়া মত মিলিল না। যাহারা এইপারে থাকিবে তাহাদের বিশ্বস্ততা লইয়া বাকী দুইজনের সন্দেহ দেখা দিল। অতঃপর পাঁচিল টপকাইতে হইল সকলেরই। কিছুক্ষন শুধু ধুপধাপ। অভিযান শেষে সকলে লাফাইয়া আসিতেই দেখা গেল শসা সমূহ দাদাদের এক দাদা কর্তৃক সংগৃহীত হইয়া গিয়াছে। দৌড়িয়া পলাইল সকলেই ধরা পড়িলেন আমার ভ্রাতা। তাহার কানে ধরিয়া বাড়িতে আনিলে যথেষ্ট উত্তম মধ্যমের পর ব্যাগ খুলিয়া দেখা গেল যাহা আসিয়াছে তাহা শসা নহে। চিচিংগা।
ইহা সকলই সমবায় কর্মসূচী। গ্রুপ ভাঙ্গিতে শুরু করিয়াছে। শুরু হইয়াছে দুই দুইয়ের অভিযান। দাদার দুই বন্ধু মানিকজোড়। কয়েকদিন হইতেই দুইজনকে সারাদিন খুঁজিয়া পাওয়া যায়না। একদিন খোঁজ আসিল তাহারা দুইজন সারাদিন স্থানীয় চায়ের বাগানে ঘোরাঘুরি করে। সুপারীর ব্যবসা শুরু করিয়াছে। ভাল কথা। কাজে লাগিয়াছে। একদিন দুই বন্ধু পিঠে বস্তা লইয়া বাগান হইতে বাহির হইতেছে। পথিমধ্যে বাগানের আর এক বন্ধুর সহিত দেখা-
:কিরে কোথায় গিয়াছিলি?
:তোদের পাড়ায় সুপারীগাছ কিনিয়াছিলাম তাই পাড়িয়া ফিরিতেছি।
বলিয়াই পা বাড়াইয়াছে। সেই বন্ধুও রওনা দিবে। বস্তার ভিতর সূপারী ডাকিয়া উঠিল, ম্যাহহ।।।।।ম্যাহহহহ। বস্তা ফেলিয়া দুইজনে চক্ষের পলকে অদৃশ্য হইয়া গেল।
ক্লাবের সামনে দিয়া কয়েকদিন যাবৎ এক বৃহৎ পাঁঠার বিচরন লক্ষ করিয়া আমার দাদা আর তাহার বন্ধু যারপরনাই উৎসাহিত হইয়া উঠিয়াছে। উৎসাহ আমার নজরে পড়ে নাই তবে পাঁঠাখানি আমিও লক্ষ্য করিয়াছি। একদিন সন্ধ্যায় গোপন বৈঠকে আমার পড়িল ডাক। বুঝিলাম ঘটনা। পাঁঠাখানি কয়েকদিন যাবৎ আসিতেছে না। গুপ্তচর খবর দিয়াছে পাঁঠা সেই লেডিস হস্টেল ভিতরে বাঁধা থাকে। কি করা যায় উপায় না পাইয়া আমার তলব। এইরুপ তলব মাঝে মাঝেই পড়িত তবে আমি বুদ্ধি দিয়াই খালাস। সরাসরি অভিযানে নামিতাম কম। নামিলেও সকলে তাহা হজম করিবার পরেই জানিতে পারিত। এক বাচ্চা যোগাড় হইল, হস্টেলে তাহার ছিল অবাধ গতি। পরিকল্পনা হইল এইরুপ, বাচ্চাটি কাঠাল পাতা লইয়া খেলিতে খেলিতে পাঁঠার গলার রশি খুলিবে। পাতার লোভে পাঁঠা বাবাজী তাহার পিছু লইবে। গেটের ভিতর দিকে দুইপার্শ্বে উচু প্রাচীর। বসিয়া থাকিলে দেখা যায়না। সেই খানে ২৫-৩০ হাত রশি বিছানো হইবে। পাঁঠা রশির মাথায় পৌছাইলে বাচ্চাটির কাজ হইবে গলায় বাঁধিয়া দেওয়া। তার পরে তাহার ছুটি। আমি ২৫-৩০ হাত দূরে বসিয়া পাঁঠা টানিয়া আনিব এবং রশি পিছনে পাঠাইব। আমার পিছনে গেটের বাইরে মেইন রাস্তায় থাকিবে দাদা আর তার বন্ধু। তাদের হাতে রশি পোছিলে আমার ছুটি। সারা গোচারণ ভুমিতে ৩-৪ গরু রশির যোগান দিতে বাঁধনহারা হইয়া চরিতে লাগিল। শুরু হইল অভিযান। সব ঠিকঠাক। পাঁঠা আসিয়া রশির মাথায় বাঁধা পড়িল। আমিও টানিতে লাগিলাম। এইস্থানে পরিকল্পনায় কিছু ত্রুটি ছিল। পাঁঠার জাত স্বভাব আমরা ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তাহাকে সামনে হইতে টানিলে সে যে প্রতিদন্দ্বিতা মনে করে ইহাকে গুরুত্ব দেই নাই। আরও হইল পাঁঠার সাইজ দেখিয়া অতিশয় আহ্লাদিত হইলেও সাইজের সহিত শরীরের বলের কথাও স্মরনে ছিল না। ফলাফলে আমি টানিয়া একফুট আনিলেও সে টানিয়া তিনফুট পিছায়। দাড়াইতে না পারার কারনে আমিও শক্তি পাইনা। মিনিট দশেকেও তাহাকে কাবু করিতে পারিলাম না। এমতাবস্থায় চোখে পরিল তৃতীয় গলদ। দুইপার্শ্বে প্রাচীরের কারনে আমার যুদ্ধ কাহারও চোখে পড়ার কথা নহে কিন্তু ডান পার্শ্বের দ্বীতল বাড়ির ছাদের কথা বেমালুম ভুলিয়া ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়িল দুই সিস্টার কোমরে হাত রাখিয়া ছাদে দাড়াইয়া আমার কান্ড দেখিতেছে। রশি ছাড়িয়া পিছনে তাকাইতেই দেখি দাদা, দাদার বন্ধু দুইজনেই অদৃশ্য। একদৌড়ে রাস্তায় আসিলাম। তাহারা আমার নিকট হইতে অন্তত ২০০ মিটার দুরে দৌড়াইয়া পৌছিয়াছে।
আমার ঠাকুর দাদা বাঁচিয়া থাকিতে বাড়িতে মূরগী পুষিতেন। প্রায় ৪৫ খানা রোড আইল্যান্ড রেড ছিল। খাঁচায় থাকিত। মাঝে মাঝেই একটা করিয়া কমে। বাড়ির সকলেই চিন্তিত। খাঁচার দড়জাও বন্ধ। মূরগী যায় কোথায়। একদিন দ্বিপ্রহরে খাঁচায় মূরগীর ঝটাপটি। ঠাকুর দাদা রোজ এই সময় একটু নিদ্রা যান। সেই দিন কোন কারনে নিদ্রা আসে নাই। লাফাই উঠিয়া মূরগীর খাঁচার নিকট পৌছায়ই দেখিলেন খাঁচার ভিতর মূরগীর সাথে মূরগী হাতে আরেক দুইপেয়ে জীব। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

